বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে দেবে কে?
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৪৭
॥ আবদুল হালীম খাঁ ॥
আমরা সবাই বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই। যে সমাজে আমাদের অধিকার পাবো। আমাদের সমস্যা, আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নসাধের কথা বলতে পারবো এবং সৎপথে চলতে পারবো। এমন একটি সমস্যামুক্ত ইনসাফপূর্ণ আদর্শ সমাজ আমরা সবাই চাই। এ চাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে চাওয়া ও পাওয়ার অধিকার সবার আছে।
এ দেশের নাগরিকগণ পাকিস্তান আমল থেকে শাসকগোষ্ঠীর কাছে এ দাবি করে আসছিল। জনগণ তখন সে অধিকার পায়নি। এ কারণে সংগ্রাম করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এ পর্যন্ত জনগণের সে আশা পূরণ হয়নি। বরং সমস্যা, দুর্নীতি, অবিচার ও লুটপাট ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিগত ১৬ বছর যাবত জনগণ শাসকশ্রেণির কাছে তাদের অধিকারের কথা বলতেই পারেনি। একান্ত ন্যায্য অধিকারের কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী, স্বাধীনতার শত্রু, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী ইত্যাদি বলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে ধরে কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছে। বিচারের নামে নাটক করে নির্দোষীদের দোষী বানিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কাউকে যাবজ্জীবন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। সম্মানিত জননেতাদের কুখ্যাত ডাকাতের মতো হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি লাগানো হয়েছে এবং চরমভাবে অপমানিত করা হয়েছে।
নির্বিচারে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাবেক সম্পাদক শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং শহীদ মীর কাসেম আলীকে ফাঁসি দিয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কারাগারে বন্দী করে খাদ্য ও ইনজেকশনে বিষ মিশিয়ে দিয়ে শহীদ করা হয়েছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জনগণের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করে স্বৈরাচার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে কিছুই আদায় করতে পারেনি। বরং রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র ও সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা চাপিয়ে দিয়ে কারাগারে বন্দি করে নির্যাতন করেছে। খুন-গুম করেছে। বাড়িঘর লুটপাট করে ভেঙে জ¦ালিয়ে দিয়েছে। বিরোধীদলের সবাই চাকরিচ্যুত করেছে। অনেকের বাড়িঘর, জমি-জিরাত ও দোকানপাট বেদখল করেছে। আরো অধিককে নির্যাতন করার জন্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনা গোপন আয়নাঘর বানিয়ে সেখানে শত শত বন্দিকে হত্যা করে রাতে তাদের লাশ বস্তায় ভরে ট্রাকে করে নিয়ে মেঘনা দিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আলেমদের বিশাল সমাবেশে রাতের অন্ধকারে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে তাদের লাশ বস্তাবন্দী করে নদী দিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে। জালিম হাসিনার নির্যাতনের শেষ ছিল না।
জনগণ হটতে হটতে তাদের পিঠ পেছনের দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। তখন যাদের মধ্যে প্রাণ ছিল, তারা জীবনবাজি রেখে জালিম হাসিনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। সরকারি চাকরির কোটা প্রথায় ভীষণ রকম বৈষম্য ছিল।
কোটা বৈষম্য কী?
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা প্রবর্তন করা হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মোট কোটা ছিল ৫৬ শতাংশ। যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৫ শতাংশ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ।
তবে সমস্যা যেটা হয়, তা হচ্ছে বেশিরভাগ চাকরিপ্রত্যাশীদের ছিল না কোনো কোটা। অর্থাৎ তাদের সবার প্রতিযোগিতা করা লাগতো ৪৪ শতাংশ সিটের জন্য। এ বৈষম্যের কারণে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। তাদের দাবি ছিল কোটা সংস্কার করা। যেন মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া তখন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, এ কোটা ব্যবহার করে সরকার তার অনুগত লোকদের সবখানে বসাচ্ছে। যেন গোটা জাতির ওপর আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনের দাবি মীমাংসা সম্পর্কে কোনো জবাব না দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উসকানিমূলক কথা বলতে থাকে। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোটা পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা কোটা পাবে? তার এ বক্তব্যের ফলে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। আরো জোরদার হয় আন্দোলন। সরকার চাপে পড়লে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা প্রথা বাতিল করে দেয় এবং আন্দোলন শেষ হয়। এরপর কেটে যায় ছয় বছর।
২০২৪ সালে বিরোধীদল ছাড়া ভোটারবিহীন সাজানো নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শপথ নেয়ার ছয় মাসের মাথায় ৫ জুন ২০১৮ সালে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে দেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন এবং ১৯৭২ সালের কোটা পুনর্বহাল করা হয়। ফলে আবারো ফুঁসে ওঠে ছাত্রসমাজ। হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে অভিহিত (তুচ্ছতাচ্ছিল্য) করেন। তার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সেদিন রাতেই উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। মধ্যরাতে ছাত্র-ছাত্রীরা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে হল থেকে বেরিয়ে আসেন। স্লোগান দিতে থাকেনÑ তুমি কে আমি কে; রাজাকার! রাজাকার! কে বলেছে! কে বলেছে! স্বৈরাচার! স্বৈরাচার!
ওবায়দুল কাদের এক বক্তব্যে বলেন, এসব রাজাকারকে প্রতিহত করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এর ফলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পরে তাদের পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া হয় গুলি। কারফিউ জারি করা হয়। দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়। রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সরকারের পক্ষের সকল বাধা ভেঙে ছাত্র-ছাত্রীদের তীব্র আন্দোলন দেখে সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সেনাসদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন, তারা গুলি চালাবেন না, তারা জনগণের পাশে থাকবেন। এ সিদ্ধান্তের পরই পরিস্থিতি পাল্টে চলে যায় ছাত্রদের পক্ষে। অবশেষে পতন হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারের।
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন সামান্য এক ‘কোটা আন্দোলন’ কীভাবে ১৬ বছর ধরে জেঁকে বসা এক শাসকের পতন ঘটায়! আসলে এর পেছনে শুধু কোটা আন্দোলন ছিল না। সাধারণ মানুষের দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষোভ, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চলা চরম অত্যাচার, গুম, খুন, সীমাহীন, দুর্নীতি, লুটপাট, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের অত্যাচার, চাঁদাবাজি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, প্রহসনের বিচার প্রক্রিয়ায় দেশখ্যাত আলেম-ওলামাকে ফাঁসি এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার অহংকার ও দাম্ভিকতার ফলে জনগণের যে ক্রোধের বারুদ জমা হয়, সেই বারুদে আগুন দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। আর বিশ্বের ইতিহাসে সাক্ষী, যেকোনো দেশের যেকোনো স্বৈরশাসক যখন ছাত্রদের বুকে গুলি চালায়, তখনই তার পতনের দিন গণনা শুরু হয়।
দেশ থেকে জালিম স্বৈরাচার শাসক হাসিনাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জনগণ খুশি হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল হয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আয়ু অতি অল্প সময়। শোনা যাচ্ছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ সরকার থাকতে পারবে। এ সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া।
বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের দায়িত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নয় এবং তার সে সময়ও নেই। এ কাজ হলো জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকারের। জনগণ দ্বারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী যদি নির্বাচিত হয়Ñ একমাত্র তারাই বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করতে পারবে। আর অসচ্চরিত্রের অযোগ্য লোক নির্বাচিত হলে পূর্বের মতোই প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য ও দুর্নীতি শুরু করবে। এটা সামাজিক জীবনে বহু পরীক্ষিত বিষয় এবং সবার জানা হয়ে গেছে।
তাই আগামী নির্বাচনের সময় জনগণকে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী চিনে তাদের ভোটে জয়যুক্ত করতে হবে। কোনো দল ও প্রার্থীদের শুধু মুখের কথায় বিশ্বাস করা যাবে না। তাদের স্বভাব-চরিত্র ও ব্যক্তিগত জীবনের কাজও দেখতে হবে। একই সঙ্গে আরো মনে রাখতে হবে কোনো মানবরচিত সংবিধান ও আদর্শ মানুষের কোনো সমস্যার সমধান করতে পারে না। একমাত্র আল্লাহর জীবনবিধান ও রাসূল (সা.)-এর আদর্শ এবং তাঁর দেখানো পথে বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব।
আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।’ (সূরা নিসা : ৫৯)।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘রমজান মাস, এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা গোটা মানবজাতির জীবনযাপনের বিধান আর এটা এমন সুস্পষ্ট উপদেশবাণীতে পরিপূর্ণ, যা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।
মুসলমানদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র পরিচালনার জীবনে কোথাও কোনো অস্পষ্টতা নেই। সকল বিষয়ই আল-কুরআনে আল্লাহ বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশকারী। এখন যারা আল্লাহর বিধান অনুসরণ করতে অস্বীকার করে, তাদের অবশ্যই কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৪)।
তিনি আরো বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাই অনুসরণ করো এবং তাকে বাদ দিয়ে অপরাপর পৃষ্ঠপোষকদের অনুসরণ বা অনুগমন করো না।’ (সূরা আরাফ : ৩)।
আরো বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।’ (সূরা বাকারা : ২০৮)।
উল্লেখিত আয়াতে ‘পরিপূর্ণ ইসলামের প্রবেশ করো’ বলতে বোঝানো হয়েছে কুরআনের বিধান পরিপূর্ণভাবেই মানতে হবে। কিছু মানলে আর কিছু অমান্য করলে চলবে না। অর্থাৎ শুধু নামাজ, রোজা, হজ-জাকাত করলে চলবে না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থায় কুরআনের বিধান মানতে হবে।
পৃথিবীতে নবী ও রাসূলের আগমনে উদ্দেশ্য ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে আল্লাহর আইন ও জীবনবিধান প্রতিষ্ঠা করা। এ উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে রাসূল (সা.) নিজে রাজনীতি করেছেন। সকল সাহাবায়ে কেরাম রাজনীতি করেছেন। তারা কেউ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না।
সুতরাং ইসলাম মানুষের জীবনের কোনো খণ্ডিত অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে। খণ্ডিতভাবে রাসূলের নেতৃত্ব গ্রহণ করা এবং কুরআনের বিধান অনুসরণ করার কোনো অবকাশ দেয়া হয়নি। কুরআন ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণের ব্যাপারে যদি কারো মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে মুসলমান হওয়া যাবে না।
হযরত ওমর (রা.)-এর কাছে এক লোক এসে একটি মামলা নিষ্পত্তি করে দেয়ার আবেদন পেশ করেছিল। সে ব্যক্তি ওই একই মামলা রাসূল (সা.)-এর আদালতে পেশ করেছিল। কিন্তু রাসূল (সা.)-এর দেয়া রায় তার মর্জিমাফিক ছিল না। এ কারণে সে পুনরায় ওমরের কাছে পেশ করেছিল। হযরত ওমর (রা.) তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এ মামলা কার কাছে পেশ করেছিলে? লোকটি জানালো, আমি মুসলমান, আমি নামাজ আদায় করি, রোজা পালন করি, ইসলামের পক্ষে জিহাদে যোগদান করি। একজন ইহুদি রাসূলের আদালতে আমার বিরুদ্ধে মামলা করলো আর সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে ইহুদির পক্ষে রায় দিয়ে দিলেন। এ রায় সঠিক হয়নি। আপনি ঘটনার পূর্ণ বিবরণ শুনে সঠিক ফয়সালা করে দিন। লোকটির কথা শুনে হযরত ওমর ভীষণ রেগে গেলেন। রাগে তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি জলদগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তুমি অপেক্ষা করো, আমি তোমার মামলার ফয়সালা করে দিচ্ছি। এ কথা বলে তিনি ঘর থেকে কোষমুক্ত তরবারি এনে বললেন, আল্লাহর বান্দা শোন, আল্লার রাসূল যে ফয়সালা করে দেন, তাঁর ফয়সালার সাথে যারা দ্বিমত পোষণ করে, তাদের ফয়সালা এভাবে করতে হয়Ñ এ কথা বলেই তিনি তরবারির আঘাতে লোকটিকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন।
রাসূল (সা.)-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছে গেল। হযরত ওমর একজন মুসলমানকে হত্যা করেছেন। লোকজন বিরূপ সমালোচনা করতে লাগলেন। ওমর কেন এমন কাজ করলেন। রাসূর (সা.)-এর যাবতীয় দ্বিধা দূর করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, ‘তোমার রবের শপথ! লোকেরা কোনোক্রমেই মুমিন হতে পারে না, যদি না তারা হে নবী আপনাকে তাদের পারস্পরিক যাবতীয় বিষয়ে বিচারক ও সিদ্ধান্তকারী হিসেবে মেনে না নেয়, আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মনে কুণ্ঠাবোধ করে এবং তা সর্বান্তকরণে মেনে না নেয়।’ (সূরা নিসা : ৬৫)।
অর্থাৎ হযরত ওমর যে ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন, সে মুমিন নয়, সে ব্যক্তি হলো মুনাফিক। সুতরাং ইসলাম গ্রহণ করার পরে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি কুরআনের আংশিক অনুসরণ ও খণ্ডিতভাবে নবীর নেতৃত্ব মানার কোনো অবকাশ নেই। পরিপূর্ণভাবে নবীর নেতৃত্ব মানতে হবে।
বিশ্বনবী (সা.) কুরআনের যে বিধান পেশ করেছেন, বিধানের কোনো একটি দিকও ত্যাগ করা যাবে না। এ কুরআনের বিধান পরিপূর্ণভাবে যেমন বাস্তবায়িত করতে হবে ব্যক্তি জীবনে, তেমনি বাস্তবায়িত করতে হবে জাতি ও রাষ্ট্রের বিস্তৃত অঙ্গনে। কোনো মুসলমান যদি রাজনীতি করতে চায়, তাহলে তাকে কুরআনের রাজনীতি করতে হবে।
আমরা যদি চরিত্রবান, সৎ, যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ, আদর্শ প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারি, তাহলে তাদের দ্বারা কোনো অন্যায়-অবিচার হবে না। তারা পক্ষপাতিত্ব করবে না, কোনো মানুষের অকল্যাণ ও ক্ষতির কাজ করবে না। কোনো দুর্নীতি ও বৈষম্য করবে না। কোনো সম্পদ তারা আত্মসাৎ করবে না। মানুষ না দেখলেও আল্লাহ সব দেখেন এ ভয়ে তারা সমাজে ন্যায়বিচার করবে। তাদের সাহায্যে সমাজের সাধারণ মানুষ সঠিক ও কল্যাণকর পথে চলা শুরু করবে। তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে। জল থেকে, স্থল থেকে, আকাশ থেকে, বাতাস থেকে, আলো থেকে, চারদিক থেকে তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে থাকবে। দেশের কোনো মানুষের কোনো অভাব থাকবে না। দেশে কেউ বেকার ভাসমান থাকবে না। কেউ গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত থাকবে না।
তখন সমাজে কোনো বৈষম্য ও দুর্নীতি থাকবে না এবং থাকবে না অবিচার, অনাচার ও লুটপাট। কারো কোনো অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে না। সমাজে কোনো অশান্তি থাকবে না, থাকবে শান্তি আর শান্তি। মানুষের মুখে সদা থাকবে আনন্দ ও হাসি।
এমন শান্তিপূর্ণ বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে চাইলে দেশের জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- আগামী জাতীয় নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। যারা দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। তারা জনগণের শাসক হবেন না, হবেন জনগণের সেবক ও খাদেম।