আলোকে তিমিরে

মুসলিমদের সেক্যুলার `সভ্যতা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

মাহবুবুল হক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০২

॥ মাহবুবুল হক ॥
ফিলিস্তিন ও গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল পাশ্চাত্য সভ্যতার সাহায্য ও সহযোগিতায় গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে যে ক্রমাগত ধ্বংসলীলা সৃষ্টি করে চলেছে, সাধারণভাবে এ বিষয়ের ওপর দুই ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান-গবেষণা আছে। একটি হলো, পাশ্চাত্য সভ্যতার সেক্যুলার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্যান ইসলামিজমে জমতে না পারে, সে কারণে আল-আকসা মসজিদের চারপাশে ইসরাইল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণে সবসময় লেগে থাকা। আল্লাহ তায়ালা তো মক্কার কাবা শরীফকে মুসলমানদের কেন্দ্র বানিয়েছেন, সুতরাং তারা মক্কাকেন্দ্রিক হোক। আল-আকসা ছেড়ে দিক। দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে এ প্রক্রিয়াই চলছে। এটা শুধুই ইসরাইলের বিষয় নয়, বিষয়টি সেক্যুলার বিশ্বের। গোটা সেক্যুলার বিশ্বের স্বার্থ এখানে দারুণভাবে জড়িত। এ কারণে এখানকার দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম-যুদ্ধ সবকিছুকে ক্রুসেড বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়া সরাসরি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত। বিশ্ব জানে, পাশ্চাত্য সেক্যুলার সভ্যতা গত ৮০ বছর ধরে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে কী কী প্রক্রিয়ায় সেক্যুলার বিশ্বে পরিণত করা হয়েছে। কোনো কোনো দেশকে রাজতান্ত্রিক, কোনো কোনো দেশকে সমাজতান্ত্রিক এবং কোনো কোনো দেশকে সেনাতান্ত্রিক দেশে পরিণত করা হয়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সভ্যতা হলো গির্জা ও রাজার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ধর্ম থেকে দূরে চলে যাওয়া নাসারা ও ইহুদিদের মনগড়া কথিত সম্মিলিত সভ্যতা (আসলে অসভ্যতা)। এ তথাকথিত সভ্যতা আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজম। ক্যাপিটালিজমের কেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কমিউনিজমের কেন্দ্র ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই মতবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিবাদ- বিসম্বাদ লেগেই ছিল। কিন্তু অবাক করা কাণ্ড, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করার জন্য ক্যাপিটালিজমের সর্দাররা মধ্যপ্রাচ্যে কমিউনিজমের সর্দারকে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার কারণে কমিউনিজম অন্তত দুটি দেশের ওপর নিজেদের লাঠি ঘোরাতে পেরেছিল। ইরাক ও লিবিয়া। দেশ দুটি ছিল বলতে গেলে সেনাতান্ত্রিক। পাশ্চাত্য সভ্যতা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছে, রাজতন্ত্রকে বজায় রাখলে তাদের অনেক সুবিধা হবে। একটি দেশের রাজা-বাদশাহ বা মন্ত্রিসভাকে কোনোরকমে বুঝ দিতে পারলেই তো হয়। তাহলে তো আর জনগণের সামনে জবাবদিহি করার কোনো প্রশ্ন নেই। সেনাশাসিত দেশ এবং বাদশা-শাসিত দেশের মধ্যে তারা কোনো পৃথক অস্তিত্ব টের পেল না। দুই ধরনের গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা বা চুক্তি করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সব ধরনের চুক্তি সহজেই হয়ে যায় ।
খুব লক্ষ করলে দেখা যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ কখনো থেমে থাকেনি। নানা ছুঁতা-নাতায় এক মুসলিম দেশের সাথে আরেক মুসলিম দেশের যুদ্ধ প্রায় লেগেই ছিল। কখনো সেখানে শান্তি আসেনি। ফলে জামাল উদ্দিন আফগানির প্যান ইসলামিজম ষাটের দশকের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়ে। দুনিয়ার মুসলিম এক হও… আরো কিছুদিন পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে উচ্চকিত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় এ স্লোগানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। দেশভেদে তারা তাদের মতো যুদ্ধ ও শান্তি বজায় রেখে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলছিল। সেই অস্তিত্ব ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। যদিও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তাদের বন্ধু সেক্যুলার রাষ্ট্রের কর্ণধারদের উপদেশ ও পরামর্শে ঙৎমধহরুধঃরড়হ ড়ভ ওংষধসরপ ঈড়ঁহঃৎরবং (ঙওঈ), গড়ঃধসধৎ অষ-অষধস অষ-ওংষধসর (গঅঅ), জধনবঃধ অষ-অষধস অষ-ওংষধসর ইত্যাদিসহ বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক বা মুসলিম সংগঠনের অস্তিত্ব সবসময় বজায় ছিল। কিন্তু কার্যত কোনো সংগঠনেই ব্যাপকভিত্তিক কোনো কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতার মসজিদ নির্মাণের জন্য, মাদরাসা ও এতিমখানা নির্মাণের জন্য, বাড়িঘর তৈরির জন্য এবং শ্রমিকসহ নিম্নশ্রেণির মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য বেশকিছু কাজ করেছে। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যেই বৈধ বা অবৈধভাবে বাংলাদেশি কর্মজীবীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। ইসলামের জন্য এ সম্পর্ক- এমনটা ভাবার কারণ নেই। এটা পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের। এ মুসলিম দেশগুলো শুধু মুসলিমদের কর্মসংস্থান করে, এমনটা নয়।
মুসলিম উম্মাহর সদস্য হওয়া আর মুসলিম দেশের জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়। দুটিকে এক করে দেখা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সৌদি আরব বিনা চার্জে অর্থাৎ বিনা পয়সায় বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী সংগ্রহ করেছে। গৃহনির্মাণের জন্য তারা যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, তার ওপর মাত্র ৫% সার্ভিস চার্জ নিয়েছিল। কোনো সুদ বা লাভ গ্রহণ করেনি। রাবেতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও নেপালে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। জিয়াউর রহমানের আমলে যত রোহিঙ্গা এসেছিল, হাসপাতাল তৈরিসহ তাদের থাকা খাওয়া ও বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, এজন্য বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ সবসময় তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এসেছে।
পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের সাথে মুসলিম দেশগুলোর চুক্তি আছে। তারপর এক এক করে প্রায় শেষ হয়ে গেল- আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনসহ কত দেশ! এ বছর ছাড়া ইসরাইলের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। অথচ আফ্রিকার দেশে দেশেসহ মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ লাগানোর সকল অপকর্ম চালিয়ে এসেছে এ তথাকথিত সভ্যতা। অস্ত্রের গোডাউন খালি করার জন্য এবং নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি ও সরবরাহের জন্য শুধু যুদ্ধ গৃহযুদ্ধ লাগিয়েছে এ সভ্যতা তাই নয়, তাদের প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের সরকার পরিবর্তনেও তারা বিশাল বিশাল নষ্টামির আয়োজনও করেছে। প্রকাশ্যে যা করছে, তা হয়তো বিশ্ববাসী দেখছে। কিন্তু গোপনে যা করছে, তা হয়তো সবকিছু আমরা জানতে পারছি না। জানতে পারছি যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে তারা মিশর, সুদান, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে। ইরানকে ধ্বংস করার জন্য এ নিকৃষ্ট সভ্যতা প্রকাশ্য ও গোপনে যা কিছু করার, তাই করছে। কিন্তু ইরান মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজস্ব শক্তির ওপর এখনো টিকে আছে।
এ পরিস্থিতিকে হাঙ্কিনটন বলেছেন, ‘ক্রাইসিস অব সিভিলাইজেশন’। কিন্তু আমরা তো কোনো তথাকথিত ক্রাইসিস দেখছি না। আমরা দেখছি ‘ডেমলিসিং অব আদার সিভিলাইজেশন’ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অন্য সভ্যতার এ ধ্বংসলীলা কার্যকর রয়েছে। যদি তাই না হবে, তাহলে সেক্যুলার সভ্যতা, সবই মরীচিকা। প্রতিপক্ষ তো তৈরি করতে হবে। সেজন্যই দেশে দেশে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে প্রতিপক্ষ তৈরির কারখানা। এটা হলো অতি সংক্ষেপে গত প্রায় ১০০ বছরের এক ধরনের খতিয়ান।
অন্য খতিয়ানে আমরা দেখি, মহান আল্লাহ কুরআনে বার বার বলেছেন, তোমরা কি দুনিয়ায় সফর করো না? তোমরা কি দেখ না, যেসব জাতি আমাকে অস্বীকার করেছে, তাদের আমি কীভাবে ধ্বংস করেছি?
এ দুটি বাক্যকে কুরআনে নানা ভঙ্গিমায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআনের অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি এক জাতিকে দিয়ে অন্য জাতিকে ধ্বংস করেছি।
কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের কথা থেকে ঈমানদারগণ ধরে নিয়েছেন যে, মুসলিম দেশগুলো একের পর এক ধ্বংস হচ্ছে তাদের নিজস্ব মুনাফিকির কারণে। তারা আল্লাহর সাথে মুনাফিকি করছে। তারা শত্রুর সাথে হাত মেলাচ্ছে। ফিলিস্তিনে, গাজায়, লেবাননে এ বছর শিশুসহ প্রায় এক লাখ বনি আদম শাহাদাত বরণ করেছে। কিন্তু চারপাশের মুসলিম দেশগুলোর কোনো চৈতন্য নেই। কোনো আফসোস নেই। কোনো পেরেশানি নেই। তারা নিজেরা কী করে টিকে থাকবে, সে চিন্তায় তারা অস্থির! এই তো মাত্র কদিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কাতার সরকার নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য দামি বিমান উপহার দিল, আর ঠিক সে সময় হামাসকে সাহায্য করে বলে, ইসরাইল কাতারের ওপর আক্রমণ করে বসলো।
বিশ্ব দেখলো কীভাবে চলছে বিষয়গুলো। একই সভ্যতা চোরকে বলছে চুরি কর, আর গৃহস্থকে বলছে সজাগ থাক। ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ চলছে, সে অবস্থাতেও ইসরাইল প্রতিদিন শত শত শিশুকে হত্যা করেছে। যুদ্ধে যাই হোক, ফিলিস্তিনকে, গাজাকে ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। সেখানে সেক্যুলার সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে চায়।
মহান আল্লাহর কঠিনতম শাস্তি থেকে বাঁচতে হলে মুসলিম দেশগুলোকে তথাকথিত সেক্যুলার সভ্যতা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের নিজস্ব জীবন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার দিকে তাওবা করে ফিরে আসতে হবে। আরব জাতীয়তাবাদকে ভুলে যেতে হবে। মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ভুলে যেতে হবে। মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে। তবেই যদি মহান আল্লাহ মুসলিমদের রক্ষা করেন।