ভারত সরকারের অবস্থান নিয়ে লজ্জিত অরুন্ধতী রায়
২৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:২২
ভারতের প্রখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান লড়ছে, আমরা ভয়ে কুঁকড়ে আছি’। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারের অবস্থান এতটাই দুর্বল যে তা দেখে তিনি লজ্জিত বোধ করেন। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, একটি নির্বাচিত সরকার কেন অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে সাহস দেখাতে পারে না, যেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে নিজেরা তা মেনে নিত কি না—সেই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন। দিল্লিতে আয়োজিত একটি বইয়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলাকে “বিনা উসকানিতে ও অবৈধ” বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে গাজায় চলমান সংঘাতেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, একই ধরনের কৌশল—নারী ও শিশুহত্যা, হাসপাতাল ধ্বংস, শহর বিধ্বস্ত করা—এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান গাজার মতো নয়; এই নতুন সংঘাত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অরুন্ধতী রায় দাবি করেন, এই হামলার মাধ্যমে বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, যা মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার দায়িত্ব সেই দেশের জনগণের, কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নয়। তাঁর মতে, “মিথ্যাবাদী, প্রতারক ও দখলদার শক্তি” বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যা তিনি সরাসরি সমালোচনা করেন। নিজের বক্তব্যে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, একসময় ভারত দারিদ্র্য সত্ত্বেও গর্ব ও মর্যাদাবোধে সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই গর্ব ও সাহস হারিয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন বাণিজ্য চুক্তি করছে, যা দেশের কৃষক ও বস্ত্রশিল্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রেও “অনুমতি নেওয়ার” প্রসঙ্গ তুলে সরকারের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান অনেক সময় আপসকামী হয়ে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি ভারতের অবস্থানের দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে যে দেশটি নিজের নীতি ও অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারছে না। অরুন্ধতী রায় আরও অভিযোগ করেন, গাজায় সংঘাতের সময় ভারত সরকার ইসরায়েলে শ্রমিক পাঠিয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের পরিবর্তে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পরে ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকদের বাংকারে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি—যা তিনি অপমানজনক বলে উল্লেখ করেন। এসব ঘটনার মাধ্যমে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, “কে আমাদের এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে?”
তিনি বলেন, এখন ভারতীয় সমাজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে সমালোচনার পরিবর্তে কেবল প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা যায়। একসময় যেসব শব্দকে আমরা সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতাম, যেমন “সাম্রাজ্যবাদের দালাল”, তা এখন বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি তিনি গণমাধ্যম ও সিনেমার সহিংসতার সংস্কৃতিরও সমালোচনা করেন, যা সমাজে সহিংসতার মানসিকতা বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এআই ধীরে ধীরে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ জানান। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে লড়াইটি আর শুধু কোনো সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও মানসিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি বলেন, তাঁর নতুন বই ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ কেবল একটি আত্মজীবনী নয়, বরং একজন লেখকের স্মৃতিকথা। সেখানে তাঁর মায়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, কঠোরতা ও অনুপ্রেরণার দ্বৈত চিত্র উঠে এসেছে। তিনি জানান, তাঁর কাজ সবসময় যুদ্ধ, বিশ্বায়ন, করপোরেট শক্তি ও বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়কে ঘিরে।
শেষে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “আমি ইরানের পক্ষে অটলভাবে দাঁড়িয়েছি।” তাঁর বক্তব্য শেষে উপস্থিত দর্শকেরা দাঁড়িয়ে সমর্থন জানান, আর তিনি হাসিমুখে বিজয়ের চিহ্ন দেখান। “দিল্লিতে আমরা সবসময় প্রতিরোধ করি”—এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর অবস্থান ও মনোভাব দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন। তথ্যসূত্র : দ্য ওয়্যার