পরিবহন ক্ষেত্রের দীর্ঘকালীন পাপ মোচন করতে হবে
২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৬
॥ মাহবুবুল হক ॥
বিষয়টা নতুন কিছু নয়। অনেক পুরনো। সব দেশেই ছিল। সব দেশেই কিছু না কিছু থাকে। এখনো আছে। কোথাও বেশি, কোথাও কম। কিন্তু এই উপমহাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশ নিজেদের বা অপর দেশের জ্ঞান-গরিমা, শিক্ষা-দীক্ষা, গবেষণা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে। আমরা সমাধান করতে পারিনি। কথাটা কেমন যেন সহজ-সরল হয়ে গেল। উপর্যুক্ত বাক্যের সরল ব্যাখ্যা হলো, আমরা নৌপরিবহন ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করেছি, সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি, কিন্তু সফলকাম হতে পারেনি। অর্থাৎ ব্যর্থ হয়েছি।
কথাটা কি সত্য? আমরা কি সত্যি যারপরনাই চেষ্টা করেছি? না করিনি। করার প্রয়োজন বোধ করিনি। এটা যে একটা সমস্যা বা অনেক বড় সমস্যা, সেটাই তো আমরা বুঝতে পারিনি। অক্ষম হয়েছি। এটা জাতিগত অক্ষমতা। মুদ্রাগত অক্ষমতা। মূর্খতাজনিত অক্ষমতা।
আসলে চরম সত্য কথা হলো- আমরা সমস্যাটার সমাধান করার জন্য তেমন কোনো চেষ্টা করিনি। করিনি এ কারণে যে. এটা যে একটা সমস্যা, সেটাই তো আমরা এখনো অনুধাবন করতে পারিনি। পারিনি বলে এ বিষয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
দুনিয়ার সব বিষয়ে আমাদের মাথাব্যথা আছে। আমাদের কথাবার্তা আছে। আমাদের আড্ডাবাজি আছে। আমাদের মতামত আছে। অভিমত আছে। পরামর্শ আছে। উপদেশ আছে। কিন্তু সড়ক ও পানি পথের দুর্ঘটনার বিষয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। চিন্তাভাবনা নেই। কথাবার্তা নেই। গবেষণা নেই। পরামর্শ নেই।
এদেশের বড় কোনো দার্শনিক, বড় কোনো রাজনীতিবিদ, বড় কোনো শিক্ষাবিদ, বড় কোনো সংস্কারক, বড় কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামী, বড় কোনো উন্নয়ন সংগ্রামী কি কখনো পরামর্শ বা উপদেশ দিয়েছেন যে- সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনা নিয়ে তোমরা মাথা ঘামাবে না। ওটা একটা প্রাকৃতিক বিষয়। ওটা হবে। ওটা রোধ করা যাবে না। মানুষের হায়াত- মউত, দুঃখ-কষ্ট মানুষের হাতে না। ওটা সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর হাতে। যার যখন মৃত্যু লেখা আছে, যেভাবে মৃত্যু হওয়ার কথা আছে, সেভাবেই মানুষ আহত হবে, মৃত্যুর মুখে পতিত হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
না, এমন পরিচ্ছন্ন কথা আমরা কখনো শুনিনি। তবে মৃত্যুর কথা আছে। মৃত্যু যে আল্লাহর তরফ থেকে নির্ধারিত, সে কথাটিও আছে। তবে সেই মৃত্যু আর এখন যে আমরা আলোচনা করছি, সেই মৃত্যু কিন্তু এক বিষয় নয়। ভিন্ন বিষয়। ভিন্ন কথা। ভিন্ন প্রসঙ্গ।
মজার বিষয় হলো, দুনিয়ার অন্যান্য দেশে কেন এত সড়ক দুর্ঘটনা হয় না, সেটাও কিন্তু আমাদের মাথায় আসে না। প্রশ্নের বা কৌতূহলের উদ্ভব হয় না। কেন যেন ওই দিকটায় আমাদের দৃষ্টি একেবারেই যায় না। আমরা ধরেই নিয়েছি ওটা মহান আল্লাহর বিষয়। ওসব নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা গুনাহগারির বিষয় হবে। ওসব দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরানো ঠিক হবে না। সে কারণেই কিন্তু সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের বিষয়ে আমরা সবসময় দারুণভাবে নির্বিকার থাকি। মনে হয় সড়ক দুর্ঘটনা বা লঞ্চ দুর্ঘটনার বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষের মনে এর বাইরে আর কোনো কথা নেই।
দুর্ঘটনার বিষয়ে একবার এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।’ এ বিষয় নিয়ে কিন্তু অনেক তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছিল। লক্ষ করা গিয়েছিল, সেসময় দেশের মানুষ মন্ত্রীর কথা হুবহু মেনে নেয়নি বা মানতে পারেনি।
এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা যে মন্তব্য করেছিলেন, তা হলো- এটা একটা রাজনৈতিক বিষয়। মন্ত্রীর বক্তব্য ধর্মীয় আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটা ছিল একটা এক ধরনের ব্যতিক্রম। সেটা নিয়ে আমরা আর কথা বলতে চাচ্ছি না।
গত বছরের (২০২৫ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত) ছয় মাস ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বহু জায়গায় ঘুরেছি। একটা বড় ধরনের কোনো সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের চোখে পড়েনি। অনিয়মজনিত বা আইন-কানুন, বিধিবিধান ও কাস্টমস লঙ্ঘন করার কারণে হঠাৎ কখনো কোথাও পুলিশ চেক করছে বা কথা বলছে, এমনটুকুই শুধু দেখেছি। আমরা নিজেরাও গাড়ি নিয়মমতো পার্কিং না করতে পারার কারণে দণ্ড বা ফাইন দিয়েছি; বিশেষ করে সেন্ট্রাল লন্ডনে এমনটা হয়েছে।
আজকাল তো আগের মতো লন্ডনের রাস্তাঘাটে খুব একটা পুলিশ দেখা যায় না। সবকিছু চলে অনলাইনে। ফাইনের কাগজ অফিস বা বাসার ঠিকানায় চলে আসে।
গাড়ি চলে পিঁপড়ার মতো। একদম শৃঙ্খলার সাথে। গাড়ির গতিবেগও যেন সবার সমান। ফাঁক রেখে যে যার মতো গাড়ি চালায়। সবাই খুব মনোযোগের সাথে অপরের অসুবিধা অনুধাবন করার চেষ্টা করছে।
এ পরিস্থিতিতে এসে কবি কামিনী রায়ের সেই কবিতার কথা আমার বারবার মনে হয়েছে-
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
আমি লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতাম বা রাস্তা পার হতাম। আহা সেকি আনন্দ! রাস্তায় পা দিতেই সব গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। আমি টুকটুক করে পা ফেলে রাস্তার ওপাশে যাই, আর সবাই হ্যাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে! এই মহাজনী দৃশ্য দেখে আমার খুব ভালো লাগতো। গর্বে বুক ফুলে উঠতো। নিজেকে দারুণ কিছু মনে হতো। মনে হতো, আমি বাংলাদেশের একজন গডফাদার! অথবা ব্রিটেনের স্যার উপাধিপ্রাপ্ত কোনো কেউকেটা। রাস্তার অপর পাড়ে পৌঁছেই ঘাড় ফিরিয়ে গাড়িওয়ালাদের বুড়ো আঙুল দেখাতাম। ওরা হাসতো, হাত নাড়তো, টা-টা করতো।
আরে আমি তো বুড়ো মানুষ, আমার কথা বাদ। যেকোনো সৃষ্ট জীব গাড়ির সামনে পড়লে গাড়ি যেন অটোমেটিক থেমে যেত। এ যেন এক আধুনিক কোনো চুম্বক পদ্ধতি! অমিত ডিজিটালাইজেশন!
স্থলে, নদীবন্দরে, বিমানবন্দরে বা সাগরবন্দরে একই অবস্থা। একই ছবি। একই শৃঙ্খলা। কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। সবখানেই বিধি-ব্যবস্থা।
এসব দেখে মাঝে মাঝে মনে হতো এরা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর চেয়েও আইনকে বেশি ভয় করে, ‘রুল অব ল’কে বেশি ভয় করে।
এক দেশি বন্ধু বললেন, আরে ভাই রাস্তাঘাটে দণ্ড দিতে দিতে এমন অবস্থা হয়, মাসের আয়ের অর্ধেকই শেষ হয়ে যায়। ফাইনকে সবাই খুব ভয় করে। বাড়তি কোনো আয় তো এখানে নেই।
সবচেয়ে মজা লাগতো শিশুরা যখন হাসতে হাসতে রাস্তা পার হতো। আর তখনই আমার মনে হতো, হায়রে বাংলার শিশুরা, ওরা কত ভয়ে ভয়ে রাস্তা পার হয়! কত উৎকণ্ঠা তখন তাদের চোখে-মুখে উদ্ভাসিত হয়!
আরেক দেশি বললেন, আরে ভাই এখানে তো জীবনের মূল্য আছে। মানুষের মূল্য আছে। জীবজন্তুর মূল্য আছে। কুকুর-বিড়ালের মূল্য আছে। দেশে তো এসবের কোনো মূল্য নাই। শুধু মূল্য আছে কালো টাকার।
দেশে তো ৭০ বছর ধরেই দেখছি, রাস্তাঘাটে পূর্বে মুড়ির টিন বাস চলত, এখন চলে ভাঙা বড় বড় গাড়ি। এসবের আর শেষ হয় না। এসব কি আমদানি হয়? তবে শেষ হয় না কেন?
আগে দেখতাম, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২০-২২ জন বনিআদম রাস্তাঘাটে মৃত্যুবরণ করতো। এখন তো গত দুইমাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে হাজারেরও অধিক বনিআদম নিহত হয়েছে।
করোনার সময় অনেকেই হিসাব করতো প্রতিদিন কয়জন গেল? দেখা যেত, করোনা যখন ছিল না, তখন রাস্তাঘাটে এক্সিডেন্ট করে অনেক বেশি মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুমুখে পতিত হতো। লোকেরা বিরক্ত হয়ে বলতো, তাহলে থাক, করোনাই থাক।
এদেশে জীবন হত্যাকারী মহামারিকেও হার মানিয়েছে নৌপথ ও রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার মহামারি। কোনো প্রতিকার হয়নি। কোনো চেঁচামেচি হয়নি।
তবে হ্যাঁ একজন লোক নয়, একজন মানুষ নায়ক বীর ইলিয়াস কাঞ্চন, যিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বহু বছর ধরে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ বলে স্লোগান দিয়ে দিয়ে এখন রণক্লান্ত, অসুস্থ ও নিস্তব্ধ।
বহু বছর আগে রাস্তায় তার প্রিয়তম স্ত্রী নিহত হওয়ার পর সেই যে তিনি রাস্তার দুর্ঘটনা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা বহুদূর এগিয়ে গিয়েও শেষমেশ কূল পায়নি। তার ডাকে কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল, বিরোধীদল বা সমাজের উঁচু তলার মানুষ তেমনভাবে সাড়া দেয়নি। পোড় খাওয়া কিছু মধ্যবিত্ত তার সাথে ছিলেন। তারাই তাকে বিপুলভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
এদেশের পরিবহন খাত বরাবরই ছিল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে। এমপিদের হাতে। মন্ত্রীদের হাতে। বাইরে থেকে কেউ এসে এই ক্ষেত্রে কখনো নাক গলাতে পারেনি। দলবদল হয়েছে। কিন্তু ঘুরেফিরে দেখা গেছে, তিনটি দলের নেতাকর্মীদের দখলেই ছিল বা আছে পরিবহন খাত।
বাইরে থেকে আন্দোলন করে এখানে প্রবেশের সুযোগ কারো ছিল না। মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ আমলে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন ওই সেক্টরের মন্ত্রী। রাজা ও প্রজা একজনই। মন্ত্রী হিসেবে তিনি পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করেছেন তথাকথিত সরকারের বিরুদ্ধে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের মানবিক, নৈতিক ও যৌক্তিক আন্দোলনকালে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছিল, পরিবহন খাতের অন্তত ড্রাইভারদের কিছু শিক্ষা-দীক্ষা থাকতে হবে। যাতে তারা এক্ষেত্রের আইনকানুন, বিধিবিধান এসব ভালো করে জানতে পারে। বুঝতে পারে। তাদের সহকর্মীদের বোঝাতে পারে। বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সেই আন্দোলনের সময়টি। পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তার সভাপতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী গডফাদারের মতো উচ্চকণ্ঠে বললেন, ড্রাইভারদের লেখাপড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গাড়ি চালানোর সময় গাড়ির সামনে উপস্থিত মানুষ ও জন্তু-জানোয়ার চিনলেই হলো। এর বেশি কিছু লাগবে না। এভাবেই মূর্খতার মধ্যে রয়ে গেল গোটা সেক্টরটি। মানবিক মূল্যবোধের যে বাণী চলচ্চিত্রকার ইলিয়াস কাঞ্চন উচ্চকিত করেছিলেন, তা নির্মমভাবে নির্বাসিত হয়ে গেল। মানুষ প্রতিদিন মরতে লাগলো। বাস-ট্রাক বিপুল উৎসাহে হরদম চলতে থাকলো। মাঝে মাঝে ভাঙা গাড়ি অর্বাচীনরা আবার ভাঙতো। এসবই লোক দেখানো। এর ভিতরে অনেক কিন্তু ছিল। সবাই বুঝতো। বুঝলে কী হবে, টেবিলের সব পাশেই তো একই ধরনের লোক। যারা কিছুটা হাউ-কাউ করত, তাদের পকেটে কিছু গুঁজে দেওয়া হতো। যাঁরা প্রতিবাদী ছিলেন, প্রতিবাদে অনঢ় ছিলেন। অটল ছিলেন। তারা খুন, গুম, জেল জরিমানা, অত্যাচার-অবিচারের সম্মুখীন হত।
আরো দেখা গেল এদেশের মানুষ রাস্তাঘাটে বেধড়ক নিহত পরিবারের জন্য কান্নাকাটি করতো না। কান্নাকাটি করতে থাকলো ভাঙা গাড়ির জন্য। হায়রে গাড়ি। কিছু গাড়ি থানায় থানায় নষ্ট হলো। কিছু গাড়ি থানা থেকে উধাও হয়ে গেল। এসবই হলো পরিবহন বাগানের নানা রঙের ফুল।
এসবের মধ্যে এদেশের কোটা আন্দোলনের পূর্বে একবার একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে গেল। একই স্কুলের দুজন ছাত্র-ছাত্রী চলমান বাসের ধাক্কায় নিহত হলো। দুঃখের ছায়া প্রথমবারের মতো ঘনীভূত হল। বিস্তারিত হলো। ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদের বহ্নিশিখা স্কুল থেকে স্কুলে, মাদরাসা থেকে মাদরাসায়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সবখানে। একপর্যায়ে ছাত্ররা রাস্তাকে নিরাপদ করার জন্য দেশের সকল রাস্তার দখল নিয়ে নিল। তারা রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসালো। ট্রাফিক পুলিশের মত গাড়ির লাইসেন্স পারমিটসহ সকল কাগজ তাদের হাতে প্রদর্শন করার হুকুম দিল। সারা দেশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। কোথায় পেল তারা এত সাহস! কয়েকদিন তারা রাজধানী ঢাকার মিন্টো রোডসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ রোডে বসে পড়ল। মন্ত্রী-সচিবসহ সবার গাড়ি চেক করতে থাকলো। এতে দেশের উচ্চমহলের যে অমলিন চেহারা উদ্ভাসিত হয়, তা শুধু দুঃখজনক নয়, দেশ ও জাতির জন্য কলঙ্কজনকও।
গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই। ড্রাইভারের কাগজপত্র ঠিক নেই। ড্রাইভার এর মূল কাগজও ঠিক নেই। বোঝা গেল কেন রাস্তাঘাটে এত এক্সিডেন্ট হয়। এক্সিডেন্ট এর মূল কারণগুলো সব ছড়িয়ে পড়ল মানুষের ঘরে ঘরে। ছাত্ররা যখনই অবৈধ কাগজ দেখেছে, তখনই তারা ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার করেছে। তারা ফিরে তাকায়নি গাড়ির মালিককে এবং ড্রাইভারকে। তারা দেশবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে দেশের সবকিছুই ভুয়া। সুতরাং গাড়ির চাপায় মানুষ কেন মরবে না?
এ আন্দোলন যে কত তীব্র হতে পারে, সরকার তা কোনোভাবেই অনুভব করতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা ছিল নিরেট সেকেন্ডারি স্তরের ছাত্র। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এতে অংশগ্রহণ করেনি। অথবা তাদের এই কিশোর-কিশোরী ছাত্ররা অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। একটা পবিত্র পাপমুক্ত আন্দোলন ছিল এটা। এই আন্দোলনের সাথে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ছিল। তাদের বাবা-মা ও অভিভাবকদের স্বার্থ ছিল। ভবিষ্যতের স্বার্থ ছিল। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। এটা ছিল মহান আল্লাহর তরফ থেকে একটা স্বতঃস্ফূর্ত অনিবার্য আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা না খেয়ে না দেয়ে জীবনবাজি রেখে আন্দোলন করেছে। একপর্যায়ে সরকারের পুলিশ বাহিনী এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শত শত শিক্ষার্থীকে পুলিশরা আহত করে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে জামিন ছাড়া জেলখানায় পাঠানো হয়। স্বাধীনতার পর এর চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অমল বিমল নির্মল কোনো আন্দোলন দেশবাসী কখনো দেখেনি। শুধুই ত্যাগ। শুধুই নিঃস্বার্থ অভিলাষ। এই পরিশীলিত, পরিপাটি স্বপ্নময় আন্দোলন পরবর্তীতে গড়ে তুলেছিল কোটা আন্দোলন।
বলতে দ্বিধা নেই, কোটা আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরা এই শিশু ও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই সত্য ও নিপুণ আন্দোলনের দীক্ষা পেয়েছিল। এই শিশু-শিক্ষার্থীরাই দেশ ও জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তারা যে পবিত্র আলো জ্বেলেছিল, সেটাই আলোক স্তম্ভ হিসেবে জাতিকে পথ দেখিয়েছে।
তাদের কথা এখন আর কেউ মনে করে না। যেমন মনে করে না কোটা আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের। দেশবাসীর মনে আছে যারা ভুয়া ভুয়া বলে দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করেছিল, তাদের বহু শিক্ষার্থী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর পর মুক্তি পেয়েছিল। আজ এই প্রেক্ষাপটে তাদের সবাইকে আমরা জাতীয় বীর বলে ঘোষণা করছি। তাদের অভিনন্দন শুভেচ্ছা ভালোবাসা ও অকৃত্রিম দোয়া জানাচ্ছি।
২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের আনন্দের সময়ে রাস্তা ও নৌপথে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মহান আল্লাহ যেন শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন- এই মুহূর্তে এটাই আমাদের একান্ত কামনা।
অজ্ঞতা, মূর্খতা, স্বার্থপরতা, কুটিল-জটিল রাজনীতি, মানুষের জীবন ও জগৎকে উপেক্ষা ও অবহেলার কারণে সড়ক ও নৌপথে মৃত্যুর যে ফাঁদ তৈরি হয়েছে, তা বর্তমান সরকার যদি নির্মূল করতে চান, তাহলে এখন যে ন্যূনতম ব্যবস্থা রয়েছে, তা দিয়ে কোনোভাবেই এই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। আমূল পরিবর্তন করতে হবে দেশের সড়ক ও নৌপরিবহন ক্ষেত্রে গত ৮০ বছরে যত পাপ ও অপরাধ পুঞ্জীভূত হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। থাকবে কেন? সরকারসমূহ তো পাপ ও অপরাধ নিয়ে ডিল করেনি। এখন ডিল করতে হবে। এক্ষেত্রের হিমালয়ান পাপ মোচন করার জন্য যা যা করা দরকার, সম্মিলিতভাবে সরকার ও দেশবাসীকে সেই প্রচেষ্টায় নামতে হবে।