দৃপ্ত ঈমানের জীবনগাথা শহীদ কামারুজ্জামান


২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৪

॥ আব্দুল ওয়াদুদ সরদার ॥
দৃপ্ত ঈমান শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একজন মুমিনের অন্তরের অটল শক্তি, আত্মার দীপ্তি এবং জীবনের দিশারী। এমনই একজন ক্ষণজন্মা প্রাণপুরুষ ছিলেন শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।
২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রজনী বাংলার আকাশে এক গভীর বেদনাময় রাত। এই দিনেই ফ্যাসিস্ট হাসিনার রোষানলের শিকার হয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে শহীদ করা হয় অদম্য বিশ্বাসের প্রাণপুরুষ, ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিত পুরধা শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে। তার শাহাদাত শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি ছিল এক আদর্শ, এক বিশ্বাস, এক সংগ্রামের প্রতীকী পরিণতি।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
শহীদ কামারুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালে, শেরপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সৎ ও ধর্মপ্রাণ। পরিবারের ধর্মীয় পরিবেশ ও ইসলামী শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তাঁকে গড়ে তোলে এক আলোকিত চরিত্র হিসেবে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়ন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি ইসলামী আদর্শের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যুক্ত হন। তার নেতৃত্বগুণ ও স্পষ্টভাষিতা তাকে দ্রুতই একজন প্রভাবশালী সংগঠকে পরিণত করে এবং তিনি একপর্যায়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামী আন্দোলনে অবদান
ছাত্রজীবন শেষ করে বৃহত্তর জীবনে শহীদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। মৃত্যুর আগ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করেছেন ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে কুরআনের সেই আহ্বান, ‘তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর। (সূরা মায়েদা : ২)।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, আর তার জন্য দরকার নৈতিকতা, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা।
কর্মজীবনে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সাংবাদিকতার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যান।
বিচার ও বিতর্ক
২০১০-এর দশকে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রেক্ষাপটে কামারুজ্জামান গ্রেফতার হন এবং তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের এক ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়।
এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকারপক্ষ এটিকে ন্যায়বিচারের প্রয়াস হিসেবে দেখলেও, এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, স্বার্থ হাসিলের নীলনকশা। ফলে দেশে-বিদেশে এটিকে বিভিন্ন সমালোচনার ভিত্তিতে জুডিশিয়াল কিলিং হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।
ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংবাদের পরও শহীদ কামারুজ্জামান ছিলেন অবিচল, ধৈর্যশীল এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পিত।
শাহাদাত : চূড়ান্ত ত্যাগের মুহূর্ত
২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাতে তাকে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তিনি দৃঢ়তা ও অবিচল থেকে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সমর্পণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বে তার পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রেক্ষাপটে এ বীরপুরুষ দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘মৃত্যুর ফয়সালা আসমানেই হয়। আমি আমার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁরই কাছে হাজির হতে যাচ্ছি।
প্রাণভিক্ষা বা ক্ষমা চাইতে হলে তাঁর কাছেই চাইবো। অন্য কোনো শক্তির কাছে আমি মাথা নত করব না। জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তায়ালার কাছে নিবদ্ধ। আমাদের সকলকেই তাঁর কাছে একদিন হাজির হতে হবে। জান্নাতের সিঁড়িতে তোমাদের সাথে আমার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।’
তাঁর এই শাহাদাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কুরআনের সেই অমোঘ বাণী, ‘তোমরা আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, রবের কাছ থেকে তাঁরা রিজিক প্রাপ্ত।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৬৯)।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ
শহীদ কামারুজ্জামান ছিলেন বিনয়ী, দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী একজন নেতা। তিনি কখনো ক্ষমতার মোহে পড়েনি, বরং সত্যের পথে অবিচল থেকেছেন।
তার জীবনের মূল শিক্ষা ছিল- সত্যের পথে অবিচল থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ইসলামী আদর্শে জীবন গঠন করা।
উত্তরাধিকার ও প্রেরণা
তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে আমরা স্মরণ করি এক নির্ভীক সৈনিককে, যিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন আদর্শের জন্য ত্যাগই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না, সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই, আল্লাহর পথে ত্যাগই সর্বোচ্চ সফলতা।
উপসংহার
শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের জীবন একটি জ্বলন্ত প্রদীপের মতো, যা অন্ধকারে পথ দেখতে শেখায়। তার শাহাদাত আমাদের অন্তরে নতুন করে জাগ্রত করুক ঈমান, ত্যাগ ও সত্যের প্রতি ভালোবাসা।
আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করুন এবং আমাদের তাঁর আদর্শের পথে চলার তাওফিক দিন, আমীন। ছুম্মা আমীন।
লেখক : সাংবাদিক ও শ্রমিক নেতা।