রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারের অনীহা
২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫১
আস্থাহীনতা ও প্রক্রিয়াগত বিরোধে রাজনৈতিক সংকটে যাচ্ছে দেশ
॥ ফারাহ মাসুম ॥
জাতীয় সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ ঘিরে যে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি আইন বা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের কাঠামো এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে গভীর মতপার্থক্যের প্রতিফলন। সংবিধান সংশোধন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস সবকিছু মিলিয়ে এই বিতর্ক এখন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
সংসদে আলোচনার সূচনাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তাদের মতে, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলকে নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই হবে গণতান্ত্রিক পথ।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এই প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও এর কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কেবল কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; বরং সেই কমিটি হতে হবে গণভোটের নির্দেশনা অনুসারে সংবিধান সংস্কারের জন্য এবং তা হতে হবে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ। তার প্রস্তাব, সরকারি ও বিরোধীদলের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষ একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারে।
সংকটের মূল : আস্থাহীনতা ও প্রক্রিয়াগত বিরোধ
এই বিতর্কের গভীরে গেলে স্পষ্ট হয়, সংকটটি কেবল আইনের ধারা বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত গভীর আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। অতীতে একতরফাভাবে গৃহীত সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সূচনা হয়েছে, তা আজও সম্পূর্ণভাবে মীমাংসিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।
বর্তমান বিতর্কেও সেই একই দ্বন্দ্ব নতুনভাবে সামনে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’-এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এটিকে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা শুরু থেকেই অবৈধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, রাষ্ট্রপতির এই আদেশ সংবিধানের কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষ যুক্তি দিচ্ছে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের যে সুস্পষ্ট মতামত প্রকাশ পেয়েছে, তা উপেক্ষা করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
এভাবে এক পক্ষ যেখানে আইনি বৈধতাকে মুখ্য করে দেখছে, অন্য পক্ষ সেখানে রাজনৈতিক বৈধতা বা জনরায়ের ওপর জোর দিচ্ছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানই বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু, যা সমাধানে পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপ অপরিহার্য।
নির্বাচন ও গণতন্ত্র : বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক ও অতীতের নির্বাচনগুলোকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, জনগণের ভোটাধিকার বারবার খর্ব হয়েছে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে দুর্বল করা হয়েছে, যার ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- সংবিধান কি কেবল ক্ষমতা পরিচালনার একটি দলিল, নাকি এটি জনগণের অধিকার সুরক্ষার একটি কার্যকর কাঠামো? বিরোধীদলগুলোর দাবি, সংবিধানের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিফলিত হয়, যখন তা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। অন্যদিকে সরকার পক্ষের বক্তব্য, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্ভব এবং সেটিই বাস্তবসম্মত পথ।
এই দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট করে যে, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর সমঝোতা ছাড়া সংবিধান সংস্কার কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে। টেকসই সমাধানের জন্য রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ অপরিহার্য।
‘সংবিধান ছুড়ে ফেলা’ বিতর্ক
সংসদে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর একটি আসে বিএনপি জোটভুক্ত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের কাছ থেকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন- সংবিধান কেন ছুড়ে ফেলতে হবে? এটি কি মনে করিয়ে দেয় ’৭১ পরাজয়ের দলিল? তার এই বক্তব্যে সংবিধানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও রাষ্ট্রের ভিত্তিগত কাঠামো রক্ষার প্রশ্নটি তোলা হয়। পার্থের দৃষ্টিতে, সংবিধান শুধু একটি আইনগত দলিল নয়, বরং স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীক।
তার এ অবস্থানের বিপরীতে বিরোধী সদস্যরা পাল্টা যুক্তি দেন যে, সংবিধান কোনো ধর্মীয় বা অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত দলিল, যা সময় ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক। তারা অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যও তুলে ধরেন, যেখানে সংবিধান সংশোধন ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছিল। তাদের মতে, জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক কাঠামো সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন হলে মৌলিক পরিবর্তনও অস্বাভাবিক নয়।
এখানে মূলত যে দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো- সংবিধান সংস্কার বনাম সংবিধান পুনর্লিখন। যদিও বিরোধী জোট সরাসরি সম্পূর্ণ পুনর্লিখনের দাবি এখন তুলছে না, তারা ‘মৌলিক সংস্কার’-এর ওপর জোর দিচ্ছে, যা বর্তমান কাঠামোর গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে সরকার পক্ষ সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে, যা তুলনামূলকভাবে সীমিত ও ধাপে ধাপে পরিবর্তনের পথনির্দেশ করে। এতে ধারণা করা যায়, সরকার অমৌলিক বা আংশিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যেখানে বিরোধীরা কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলছেÑ আর এই পার্থক্যই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক বৈধতা
বিরোধীদলীয় নেতা ও অন্য সদস্যরা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধান সংস্কারের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের যুক্তি, হাজারো মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে যে জনগণের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিই সংবিধানে প্রতিফলিত হওয়ার যোগ্য। এ উদ্দেশ্য থেকেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা শুধু আইনগত দলিল নয়; বরং জনগণের রাজনৈতিক চেতনার ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতীক। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, জনগণের অভিব্যক্তি ও গণভোটের রায়কে সংবিধানের সংস্কারের মূল মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষ এই প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা বলছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। সরকারের দৃষ্টিতে, আইনি কাঠামো ও সংবিধানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই প্রাথমিক। বিরোধী জোটও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বাদ দেয়ার কথা বলছে না; বরং তারা জোর দিচ্ছে, যে পরিবর্তন আনা হবে, তা যেন জনগণের গণভোটে প্রকাশিত মতামতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
এভাবে দেখা যায়, বিতর্কের মূল বিষয় হলো আইনি প্রক্রিয়া বনাম রাজনৈতিক বৈধতা। বিরোধীরা গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের রায়কে সংস্কারের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যেখানে সরকার প্রক্রিয়ার সীমা ও কাঠামো রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। এ দ্বৈত ফোকাসই বর্তমান সংবিধান সংস্কার বিতর্ককে জটিল ও তীব্র করে তুলেছে, যেখানে জনগণের আশা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণভোটের রায় পরিত্যাগের রাজনৈতিক প্রভাব কী
গণভোটের রায় যদি পরিত্যাগ করা হয়, তা দেশজুড়ে গভীর রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করবে। প্রথমত, জনগণের আস্থা সরকারের ওপর দৃঢ়ভাবে ক্ষুণ্ন হবে। যখন নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে তাদের মত প্রকাশ করে এবং সেটি উপেক্ষিত হয়, তখন তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি হতাশা ও অবিশ্বাস তৈরি করবে। এতে সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
দ্বিতীয়ত, বিরোধীপক্ষ ও নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিরোধে নামতে পারে। গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা হলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াবে, আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে বিভাজন আরও গভীর হবে এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের গণতান্ত্রিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদেশি পর্যবেক্ষক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক অংশীদাররা নির্বাচনী ও সংবিধানিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠবে। এতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ প্রভাবিত হতে পারে।
সর্বোপরি গণভোটের রায় পরিত্যাগ করা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। এটি শুধু এক নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, নাগরিক আস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই গণভোটের রায়কে মান্য করা এবং সেটির ওপর ভিত্তি করে সংবিধান ও নীতি প্রণয়ন করাই দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের শক্তি রক্ষার মূল চাবিকাঠি।
সমাধানের পথ : কোথায় মিলনবিন্দু?
বর্তমানে তীব্র মতবিরোধের মধ্যেও কিছু সম্ভাব্য সমাধানের পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে। প্রথমত, সংবিধান সংস্কারের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারের প্রস্তাবিত কমিটি যদি বাস্তবে গঠিত হয়, তবে সেটি অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। এই কমিটিতে বিরোধীপক্ষের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাঠামোগত ভারসাম্য অপরিহার্য। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, বরং পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। এতে কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য হবে।
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কমিটির পাশাপাশি একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশন রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের জন্য নিরপেক্ষ প্রস্তাবনা প্রস্তুত করবে। এটি সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তৃতীয়ত, বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও বৈধতা নির্ধারণে নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কমানো সম্ভব। এটি একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যেখানে সরকার ও বিরোধীপক্ষ উভয়ই সংবিধানের প্রস্তাব ও সংস্কারের বৈধতা নিয়ে আস্থা রাখতে পারবে। তবে এটি অতীতের মতো কোনোভাবেই আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির বিষয় হবে না।
চতুর্থত, গণভোটের রায়কে মূল মানদণ্ড ধরে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে জনগণের রায় সংবিধান সংস্কারের মূল মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সরকার ও বিরোধীপক্ষ উভয়ই ফলাফলকে সম্মান করবে।
এই চারটি পথের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র আইনি কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাজনৈতিক বৈধতা, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।
সংকট থেকে সম্ভাবনার পথে
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ক কেবল বিরোধের জায়গা নয়, এটি এক বিশাল সুযোগও বটে। বর্তমান মুহূর্তটি এমন সময়, যখন রাষ্ট্র নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের আস্থা ঘাটতি, রাজনৈতিক বিভাজন ও নির্বাচন ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি করতে পারে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ, নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
সংবিধান কোনো দলের নয়, কোনো সরকারের নয়- এটি একটি জাতির সম্মিলিত চুক্তি। তাই সংবিধানকে টেকসই ও কার্যকর রাখার জন্য ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর’ নয়, বরং ‘সমঝোতার রাজনীতি’ই একমাত্র কার্যকর পথ। সকল পক্ষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা ও যৌক্তিক সমাধানের ওপর ভিত্তি করে সংস্কার প্রক্রিয়া এগোলে তা শুধু আইনি বৈধতা অর্জন করবে না, বরং রাজনৈতিক বৈধতাও নিশ্চিত করবে।
সংসদের চলমান তীব্র বিতর্ক যদি কেবল ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অচিরেই এক বিভাজনের জন্ম দেবে। কিন্তু যদি এটি সংলাপের নতুন দরজা খুলতে পারে, যেখানে বিরোধীদল ও সরকার উভয়ই অন্তর্ভুক্ত এবং জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়, তাহলে সেটিই হবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন। সংবিধান সংস্কারের এ মুহূর্তটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এটি শুধু আইনের দলিল নয়, বরং দেশের জনগণের আশা, অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চেতনার দৃঢ় প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। এ সুযোগকে কাজে লাগানোই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার চাবিকাঠি।