মিষ্টি আমের তেতো স্বাদ


১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:৩০

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
প্রাচীন আমলের পুরনো গ্রাম। কয়েকশ’ বছর এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে। বনেদি এলাকা বলতে যা বোঝায়, এটি তাই। অন্য আর দশটি গ্রাম থেকে একেবারে আলাদা। বড় বড় দীঘি ও পুকুর, সারাক্ষণ ছোট ছোট ঢেউয়ে টলমল করছে। চারদিকে ঘন গাছ-গাছালিতে ঠাসা। আগের দিনে দীঘির পাড় বা নদীর ধার ঘিরেই গড়ে উঠতো গ্রামের বসতবাটি। সারি সারি ঘরবাড়ি, কিছু মুসলমানদের, কিছু হিন্দুদের। কোথাও কাছাকাছি, কোথাও দূর-অদূরে। কিন্তু তাদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধনের মতো রয়েছে যোগসূত্র। ঈদে-চাঁদে, পূজা-পার্বণে পারস্পরিক দেয়া-নেয়ার বন্ধন অটুট। হিন্দুদের বাড়িগুলো দেখতে সাজানো-গোছানো, বেশ সুন্দর মনে হয়। তারা পূজার ফুলের জন্য প্রচুর ফুলের গাছ লাগায়। বাড়িতে ঢুকতেই রংবেরঙের ফুল দেখা যায়। দূর থেকেই নজর কাড়ে টকটকে লালজবা।
পাশেই মুরাদনগর থানা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল তখনো। এখনকার মতো এত ঘরবাড়ি ওঠেনি। থানার উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশপাশের কয়েক গাঁয়ে আর কোনো স্কুল নেই- এটাই একমাত্র সবেধন নীলমণি! শিশুশ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। সকাল ও দুপুর, দুই শিফটে স্কুল বসে। সামনেই বড় মাঠ। ছুটির শেষে ফুটবল খেলা চলে। কল-কাকলীতে মুখর থাকে চারপাশ।
গাঁয়ের প্রত্যেক বাড়ির ছেলে-মেয়েরাই এখানে পড়তে আসে। আমাদের বাড়ির সব কচি-কাঁচারাও এখানেই শুরু করে প্রথম পাঠ। আলোর প্রথম দ্বীপটি জ¦ালিয়ে দিচ্ছে মানুষের মনে, বহুকাল বইছে এ ভার। সেই ব্রিটিশ আমলের বিদ্যালয়। সুনামের সাথে বহাল আছে আজও। এ স্কুলের প্রান্ত ডিঙিয়েই শহরে যাওয়ার ছাড়পত্র নিতে হয়।
আমারও হাতেখড়ি এই বিদ্যালয়ে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হলো। বাড়ির সম্পর্কিত কয়েকজন চাচা পড়েন এখানে। কেউ ক্লাস ফোর, কেউ ফাইভে। পাশের রঘুরামপুরের অনেক ছেলেও চাচাদের সাথে একই ক্লাসে পড়ে। এক এক করে সবাই এসে রাস্তার মাথায় এসে জড়ো হয়। নানা রকম গল্প, হল্লা করতে করতে দলবেঁধে চলে সবাই। ছোট হিসেবে চাচারা আমাকেও সাথে নেয়।
গ্রামের মেঠোপথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেক দূরে। হেঁটে হেঁটে অনেকগুলো বাড়িঘর পেরিয়ে যেতাম আমরা স্কুলে। পথের দুই পাশে ফল-ফলাদির ঘন গাছপালা। সকালের রোদ মিশে যায় সবুজ পাতার রাশে। মিষ্টি সোনালি রোদ জাফরি কাটা নকশায় ছেয়ে থাকে গাছের নিচে।
স্কুলের পাশেই পরপর ক’টি হিন্দু বাড়ি পড়ে। একটা বাড়ি বিশাল বড় আর গাছপালায় ঠাসা। বাড়ির পূব-পাশটায় সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে অসংখ্য আমগাছ। প্রচুর আম ধরেছে। বোল ফুটে কচি কচি আম বড় হচ্ছে ধীরে ধীরে। আসা যাওয়ার পথে আমরা দেখি। তখন বৈশাখ মাস। দেখতে দেখতে আমের গায়ে দেখা দিচ্ছে পাকা সোনালি আভা। ঝাঁঝালো গরম বাতাস। মাঝে মাঝে আমের শাখায় ঝাঁপটা মেরে পালিয়ে যাচ্ছে। ঝরে পড়ছে দু-একটা আধপাকা আম। লোভ সামলানো দায়। প্রতিদিনকার মতো আমরা হেঁটে বাগানটা পার হচ্ছিলাম। হঠাৎ কাঁচা-পাকা আমের থোকায় চোখ পড়তেই যেন সবার চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। নাজিম (ছদ্মনাম) বলল,
‘এ্যাই চল! আম পেড়ে খাই’!
কথাটা খুব মনে ধরল, সবার মনের কথা যে! আর যায় কোথা! দুদ্দাড় শুরু হলো আম পাড়া! বেশ কিছু আম পাড়া হলো। মহানন্দে মজা করে সাবাড় করা হলো। ভালো মানুষের মতো মুখ করে আমরা স্কুলে গেলাম।
ততখনে খবর রটে গেছে। একটু পরই বাগানের মালিক বের হয়ে এলেন। তিনি সোজা ছুটলেন স্কুলের হেড মাস্টারের খোঁজে। দূর থেকে ভদ্রলোককে আসতে দেখে সবাই ভয়ে জড়োসড়ো! ঝড়ের বেগে ঢুকলেন তিনি হেড স্যারের রুমে …
-‘আপনি কি হেড মাস্টার? আচমকা আক্রমণের মুখে পড়ে থতমত খেলেও মুহূর্তে সামলে নিলেন তিনি। বললেন,
‘বসুন, দয়া করে’।
-‘আপনার কাছে আমার একটি নালিশ আছে’!
-‘বেশ তো, কী নালিশ করতে চান বলুন!’
-‘আপনার স্কুলের ছাত্ররা আমার গাছের আম পেড়ে খেয়েছে। আপনার কাছে এর বিচার পেতে চাই!’
-‘আপনি তাদের দেখেছেন?’
-‘না’
কয়েকজনের নাম ঠিকই বললেন। কারো কাছ থেকে শুনেছেন মনে হয়। ছাত্রদের নাম শুনে মাস্টার মশাইয়ের তালু জ¦লে গেলো! তারই স্কুলের ছাত্রদের বিরুদ্ধে আম চুরির অভিযোগ? এ কি সহ্য করা যায়! তিনি রেগে আগুন হলেন। পুরো এলাকায় রটে গেলো- ‘যাত্রাপুর স্কুলের ছেলেরা গৃহস্থ্যের বাগানে চুরি করে আম খেয়েছে!’
পুরো স্কুলে হুলুস্থুল পড়ে গেছে! পূর্ব পাড়া ও রঘুরামপুর গ্রামের ছাত্রদের আম চুরির ঘটনায় গ্রামজুড়ে তোলপাড়। ব্যাপারটা সুরাহা করতে হেড মাস্টার সাহেব আমগাছের মালিক আর ছেলেদের ডাকলেন নিজ কক্ষে।
এক এক করে সবাই এসে দাঁড়ালো। হেড মাস্টার ছাত্রদের দেখিয়ে বাগান মালিকের কাছে জানতে চাইলেন-
-‘কারা কারা আম পেড়েছে আপনার গাছ থেকে?’ কিন্তু তিনি কাউকে চিনতে পারলেন না।
নিজামকে ডেকে হেড মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন,
-‘তোমরা কি উনার গাছের আম চুরি করেছো?
নিজামসহ সবাই নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করলো-
-‘জি স্যার আমরা আম পেড়েছি।’ স্যার জিজ্ঞেস করলেন-
-‘সাথে কারা কারা ছিল?’
সবাই সত্য কথা বললেন, আমার নামও বললেন। আমি আম না পাড়লেও সাথে থাকার অভিযোগে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো হেড মাস্টারের রুমে।
হেড স্যার গৃহস্থ্য ভদ্রলোককে বললেন,
-‘আপনি চলে যান, আমি এদের বিচার করবো।’
নিজামসহ সবাইকে এবার হেড স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
-‘কেন তোমরা উনার গাছের আম চুরি করলে ?’ সবাই বললো–
-‘লাল টুকটুকে আম দেখে লোভ সামলাতে না পেরে আমরা কয়েকটা আম পেড়েছি স্যার!’
– ‘তোমরা কি জান না মালিকের কাছে জিজ্ঞেস না করে অনুমতি না নিয়ে অন্যের গাছের আম-কাঁঠাল পাড়া যায় কি?’
-‘না স্যার!’
-‘স্যার, আমাদের ভুল হয়ে গেছে, আমাদের মাফ করে দিন!’
কিন্তু হেড স্যার ছিলেন কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলা ও শাসনের মানুষ। তিনি বললেন,
– ‘আম চুরির জন্য তোমাদের শাস্তি পেতেই হবে।’
শাস্তির ভয়ে সবার হৃদয় প্রকম্পিত। হেড স্যারের রাগ বড় ভয়ানক! স্কুলের কোনো রকম বিশৃঙ্খলা তিনি বরদাশত করেন না। পুরো স্কুলে কানাঘুষা- আম চুরি করেছো, এবার বুঝবে চুরি করে আম খাওয়ার মজা!’
এবার শাস্তির পালা! একজন একজন করে টেবিলের কাছে ডাকছেন হেড স্যার। প্রথমেই ডাকলেন পালের গোদা নিজামকে। স্যারের সামনে যেতেই পিঠে বেত্রাঘাত, শপাং! শপাং! তারপর একে একে আম চুরি ও চুরির আম খাওয়ার দায়ে সবাইকে বেত্রাঘাতের শাস্তি পেতে হলো। আমারও রেহাই মেলেনি। সেদিন আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। ধুকধুক করে কাঁপছিল বুক, প্রতিটি শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলাম!