পবিত্র ঈদে মুসলিম উম্মাহর করণীয়
১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:২৮
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
প্রতি বছরই রমজান আসে মুমিন-মুত্তাকিদের মাঝে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে। রমজান আসে ইবাদত-বন্দেগিতে সওয়াব লাভের অপার সুযোগ নিয়ে। এর অতি-উত্তম কারণ রমজান এলেই মুমিনের সওয়াব কয়েকশ’ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ মাফের মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ এক মাস পবিত্র রমজানের সিয়াম পালনের শেষদিকে, অর্থাৎ ২৯ রমজান সন্ধ্যায় আমরা অপেক্ষায় থাকি শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার জন্য। এদিন পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখা না গেলে পরদিন, অর্থাৎ ৩০ রমজান নিশ্চিতভাবেই শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়।
পবিত্র রমজান শেষে পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের (ঈদুল ফিতর) বাঁকা চাঁদ দেখামাত্র মুমিন হৃদয়ে খেলে যায় খুশির ঢেউ। কারণ পরদিন মুসলমানদের ধর্মীয় দুটি বড় উৎসবের একটি ঈদুল ফিতর। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশির উচ্ছ্বাস। ঈদ মানেই সুস্থ ও শালীন ধারায় বিনোদনচর্চার অবারিত সুযোগ। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অনাবিল আনন্দের উৎসব। রোজার মাধ্যমে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা লাভ হয়, তারই পূর্ণতা সাধনে যেন ঈদুল ফিতর আমাদের এনে দেয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এ ঈদ মূলত আমাদের মাঝে বিশ্বভ্রাতৃত্বের কল্যাণবার্তা নিয়ে আসে। শান্তির অনুপম বার্তাবাহী ঈদুল ফিতর মুসলমানদের মাঝে আসীম প্রেরণা সৃষ্টি করে। এদিন প্রতিটি মুসলিম সত্তা নব উৎসাহ-উদ্দীপনায় জেগে ওঠে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি এই পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি নেই, যাদের আনন্দ প্রকাশের নির্দিষ্ট দিন নেই। সেরূপ মুসলিমজাতির জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট দুটি দিন- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। নবী কারীম (সা.) নিজে ঈদ পালন করেছেন এবং সাহাবীদের ঈদ উদযাপন করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। মদিনায় হিজরত করে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, লোকজন দুটি দিনকে উদযাপন করে খেলাধুলা করছে। তাদের এ খেলাধুলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, আমরা জাহেলি যুগ থেকেই এ দুই দিন খেলাধুলা করতাম। তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, এ দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটি দিন দিয়েছেন; তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। (আবু দাউদ)।
ঈদের দিনের করণীয়
গোসল করা : পাক-পবিত্র থাকার জন্য গোসল অপরিহার্য। এজন্য ঈদের দিন গোসল করে ঈদগাহে যাওয়া উত্তম। তাই সব মুসলমানের উচিত ঈদের দিন খুব সকালে গোসল করে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা। মহানবী (সা.) ঈদের দিন গোসল করতেন। হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) ঈদের দিন (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন।’ (সুনানে বায়হাকি)।
নতুন পোশাক পরিধান : পোশাক-সাজসজ্জা সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম উপাদান। ঈদের দিন আমরা নতুন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে ঈদের নামাজ পড়তে যাব। ঈদের দিন নতুন বা উত্তম পোশাক পরিধান করা প্রয়োজন। মহানবী (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন। ইবনুল কায়্যিম (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) দুই ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার আগে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ (যাদুল নায়াদ)।
খাবার গ্রহণ : ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজ আদায়ের আগে খাবার গ্রহণ করা নবী কারীম (সা.)-এর একটি সুন্নত। তাই আমরা ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অবশ্যই খাবার খেয়ে ঈদগাহে যাব। হযরত বুরাইয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিনে ঈদের সালাতের আগে খেতেন না।’ (সুনানে তিরমিযী)।
হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া রাসূল (সা.)-এর সুন্নত। তাই মুসলমাদের উচিত পবিত্র এই ঈদের দিনে (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। তবে ওজররত ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য নয়। মহানবী (সা.) পায়ে হেঁটেই ঈদগাহে যেতেন। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত।’ (সহিহ বুখারি)।
ফিতরা আদায় : প্রতি বছর রমজানে আমরা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম-সাধনা, অর্থাৎ সাওম (রোজা) পালন করি। রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর জন্য আমরা ফিতরা আদায় করে থাকি। তাই ঈদের দিন সুবহে সাদিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের আগে ইন্তেকাল করেন, তার সাদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে না। আর যদি কোনো সন্তান সেদিন সুবহে সাদিকের আগে জন্মগ্রহণ করে, তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। (তাহতাবি)।
তাকবির বলা : পবিত্র ঈদের দিনে বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ তাকবির পড়ে থাকেন। এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারীম (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছানো পর্যন্ত ‘আল্লাহু আকবার, আল¬øাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্ল¬াল্ল¬াহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্ল¬াহিল হামদ’ (আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) তাকবির পাঠ করতেন। (মুসতাদরাক)।
খুতবা শোনা : আমরা পবিত্র ঈদের দিনে ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে অনেকেই খুতবা শুনি; আবার কেউ কেউ খুতবা না শুনেই চলে যাই। হযরত আবদুল্লাহ বিন সায়েব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের নামাজ শেষ করলেন, তখন বললেন, যার ভালো লাগে সে যেন বসে (খুতবা শোনার জন্য), আর যে চলে যেতে চায়, সে যেতে পারে।’ (সুনানে আবু দাউদ)।
মুসাফাহ ও মু’আনাকাহ করা : পবিত্র ঈদের নামাজ শেষে ধনী-গরিব, ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই একে-অপরের সঙ্গে বুকে বুক ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোলাকুলি করেÑ এমন দৃশ্য মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দেখা যায় না। ঈদের নামাজের পর মহানবী (সা.) তার সাহাবীদের সঙ্গে মুসাফাহ ও মু’আনাকাহ করতেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘হযরত হাসান (রা.) এক ঈদের দিন রাসূল (সা.)-এর কাছে এলেন। তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলাকুলি করলেন।’ (শারহুস সুন্নাহ)।
শুভেচ্ছা বিনিময় : মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্র দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) আনন্দ-উৎসবের দিন। এই দিনে আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধনী-গরিব সবাই সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকি। ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, সাহাবীরা ঈদের দিন ঈদের নামাজের পর বিভিন্ন রকমের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। ঈদ মোবারক ইনশাআল্লাহ, ঈদকুম সাঈদ- এ ধরনের বাক্য বলে একে-অপরের সঙ্গে ঈদের নামাজের পর শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।
আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেয়া : বিশ্বের মুসলমানরা পবিত্র ঈদের দিন আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজখবর নিয়ে থাকেন। আমরা দেশে-প্রবাসে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে টেলিফোন-ফেসবুকে খোঁজখবর নিয়ে থাকি। ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার একটি বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করে। আত্মীয়দের সঙ্গে সবসময় সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। নবী কারীম (সা.) বলেছেন, ‘যে আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।’ (সহিহ বুখারি)।
আনন্দ প্রকাশ : হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসূল (সা.) ঈদের দিন আমার গৃহে এসে দেখেন, দুটি মেয়ে গান গাইছে বদর যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এমন সময় হযরত আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে মেয়ে দুটিকে ধমকাতে লাগলেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, হে আবু বকর তাদের ধমক দিও না। মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও। প্রত্যেক জাতির ঈদ রয়েছে। আর আজ আমাদের ঈদের দিন। (সহিহ বুখারি)।
ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে মুসলমান তথা মুমিন হিসেবে আমাদের সবসময় পাপ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের হিসাব-নিকাশের কথা অন্তরে সবসময় জাগরুক রাখতে হবে। মৃত্যুর পর পরকালই আমাদের চিরস্থায়ী বসবাসের (জান্নাত ও জাহান্নাম) ঠিকানা। অর্থাৎ ইহকালের আমল-আখলাক, বেশভূষা, চলাফেরা, কথাবার্তা, আচার-আচরণ ইত্যাদি কৃতকর্মের ফলাফলেই আমাদের জন্য নির্ধারণ হবে চিরস্থায়ী বসবাসের ঠিকানা জান্নাত বা জাহান্নম। তাই সংযমের যে শিক্ষা দিয়ে গেছে পবিত্র মাহে রমজান, তা সারা বছর ধরে রাখতে হবে।
ঈদের দিনে পাপের দরিয়ায় ডুবে যাওয়া রমজানের শিক্ষার সঙ্গে উপহাস এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘোষণার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বৈ কিছুই নয়! অতএব আমাদের ঈদ হোক কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ইসলামী তরিকায়। আমাদের ঈদ হোক অপসংস্কৃতি ও পাপমুক্ত। ঈদের আনন্দ হোক আমাদের জন্য পুণ্যস্নাত। আল্লাহ রাব্বুল রাব্বুল আলামিন কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী এবং পাপমুক্তভাবে আমাদের পবিত্র ঈদ পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সাংবাদিক।