মৌলভীবাজারে নির্বাচনে প্রস্তুত জামায়াত, দল গোছাচ্ছে বিএনপি
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:০১
আবদুল বাছেত মিলন, সিলেট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। সারা দেশের ন্যায় পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারেও নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এ জেলার চারটি সংসদীয় আসনে আসন্ন নির্বাচনে মাঠের লড়াইয়ে থাকবে মজলুম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি। ফ্যাসিবাদী আমলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিভিন্ন বাধার মুখে ছিল দল দুটি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর জামায়াত জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি অনেকখানি এগিয়ে রেখেছে। তবে আট দলের সাথে আসন সমঝোতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন হতে পারে, যা আলোচনাধীন।
অন্যদিকে বিএনপিও দল গোছানোয় মনোযোগ দিয়েছে। জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠনে এবং কর্মী সমাবেশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দলের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে এসেছে। জেলাটিতে কেবল বিএনপি ও জামায়াত নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও সক্রিয় রয়েছেন মাঠে। রাজনৈতিক সমীকরণে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা দল এনসিপিও গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করবে এবার। জেলার চারটি আসনেই খাসিয়া, মণিপুরী, ত্রিপুরাসহ পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
মৌলভীবাজার-১ (জুড়ী ও বড়লেখা) : জুড়ী এবং বড়লেখা উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ভোটার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৬৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬০ হাজার ১৬১ আর নারী ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে একজন। ঐতিহাসিকভাবে এ আসনটি পতিত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। যদিও সর্বশেষ বিতর্কিত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির তিনবার, বিএনপি দুবার, আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন পাঁচবার।
মৌলভীবাজার-১ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা, মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আমিনুল ইসলাম। সিলেটের জালালাবাদ কলেজের প্রভাষক তিনি। ছাত্রশিবিরের সাবেক এ নেতা একজন জনদরদি সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে অসংখ্য সামাজিক জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত। বড়লেখার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যাকবলিত অসহায় দুস্থ জনগণের বিপদে এগিয়ে এসে সবার নজর কেড়েছেন। কর্মজীবনের শিক্ষকতার পাশাপাশি সুজানগর আইডিয়াল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এলাকার নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে তার উদ্যোগের কারণে তিনি জননন্দিত। ৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে ছাত্রনেতা হিসেবে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছেন জামায়াতের এ প্রার্থী।
জামায়াতের এ প্রার্থী যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও নেশার ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষা, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়ন এবং নতুন পর্যটন এরিয়া গড়ে তোলা, জুড়িতে পৌরসভা করা, সর্বস্তরে বৈষম্য দূর করা এবং দুর্নীতি দূরীকরণ, আগর ও আতর শিল্পের বিকাশ করার বিশদ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি। ২০১২ সাল থেকে জামায়াত এ আসনে মাওলানা আমিনুল ইসলামকে নমিনি ঘোষণা করে। যার ফলে মানুষের মধ্যে নমিনির ব্যাপারে ব্যাপক পরিচিতি বেড়েছে। আমিনুল ইসলাম বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমরা জনকল্যাণমুখী অনেক কাজ করছি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন মিঠু। এছাড়া মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থীও মাঠে সক্রিয় প্রচারে রয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দিন মিঠু বলেন, নির্বাচনে আমরা জয়ী হবো। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলামের সাথে কনটেস্ট হবে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে বিজয় নিশ্চিত।
মৌলভীবাজার-২ : কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার অংশবিশেষ আসনটি বর্তমানে কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। আসনটিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে মাঠের চিত্র এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পৌরসভা ও গ্রামীণ জনপদের আসনটিতে ভোটার ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩৬ জন আর নারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪০ জন। আসনটি রাজনৈতিকভাবে জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ কুলাউড়ায় জন্মেছেন বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একসময়ের মজলুম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ১৯৯৬ সালের নির্বাচন করেছিলেন এ আসনে। তবে আসন্ন নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে লড়বেন। এছাড়া নিজ জন্মস্থান মৌলভীবাজার-২ আসনেও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তার। তবে এ আসনে জামায়াত সম্ভাব্য প্রার্থী করেছে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও জেলা আমীর ইঞ্জিনিয়ার শাহেদ আলীকে। আর এ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী শওকত হোসেন সকুকে। তবে দলের পক্ষ থেকে তাকে প্রার্থী করায় দলটিতে অন্তর্কোন্দল বেড়েছে। এ আসনে বিএনপির নেতা আবেদ রাজাকে প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে গত ২৭ নভেম্বর অনশন করেছে তার অনুসারী নেতা-কর্মীরা। ফলে বিএনপির জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে এ আসনের নির্বাচন। দলের মধ্যে শওকতুল জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন বলে দাবি দলটির নেতাকর্মীদের। কারণ চলতি বছরেই উপজেলার কাউন্সিলে তিনি পরাজিত হয়েছেন।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) : এ আসনটি জেলার প্রাণকেন্দ্র। দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৪২ জন, নারী ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৪৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের রয়েছেন ৩ জন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নির্বাচনী এলাকা হিসেবেও এটি পরিচিত। এ আসনে এবার প্রার্থী হিসেবে বিএনপি প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমানকে। অন্যদিকে সাবেক জেলা আমীর আব্দুল মান্নানকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের এ সাবেক জেলা আমীর নিয়মিত উঠান বৈঠক, গণসংযোগসহ দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) : এ সংসদীয় আসনটি শ্রীমঙ্গল উপজেলা এবং কমলগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। চা-বাগান ও পর্যটনকেন্দ্রিক রাজনীতি হয়ে থাকে এ এলাকাটিতে। আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৯ হাজার ১০৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ জন, নারী ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৯৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রে খবর, ভোটের মাঠে উভয় দলই সরব। দলগুলোর প্রচারণায় গুরুত্ব পেয়েছে পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। মৌলভীবাজার-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী করেছে সিলেট মহানগর সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট আব্দুর রবকে। আর বিএনপি প্রার্থী করেছে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী হাজী মুজিবকে। তিনি এর আগেও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেছেন।
মৌলভীবাজারের ৪টি আসনেই দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে নেমেছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল। ভোটাররা মনে করছেন, যিনি উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেবেন, তিনিই পাবেন জেলার মানুষের সমর্থন। এখানে জামায়াত এগিয়ে আছে। মৌলভীবাজারের ভোটের মাঠে জামায়াত ও বিএনপি প্রস্তুতি ও নতুন কৌশলে
এক সময়কার প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে মৌলভীবাজারের রাজনীতিতে তাদের দলীয় কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রস্তুতিতে সরব হয়ে উঠেছে।
বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা বিভক্তভাবেও কিছু আসনে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিছু খবরে বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগদান এবং একই আসনে আপন দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন বিএনপি ও অন্যজন জামায়াতের প্রার্থী হওয়ার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।
মৌলভীবাজার জেলাকে জামায়াতে ইসলামী তাদের সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এলাকাগুলোর মধ্যে গণ্য করে। বছরের পর বছর ধরে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী তাদের সদস্য সংগ্রহ এবং তৃণমূলের সংগঠনকে ধরে রেখেছে। প্রতিটি আসনে তাদের একটি নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্ক আছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সব আসনেই প্রার্থী প্রস্তুত রেখে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বার্তাও দিচ্ছে জামায়াত। এটিকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে জামায়াত নতুন নেতৃত্বের ওপর জোর দিয়েছে। এ অঞ্চলের নেতারা আগে থেকেই মাঠে কাজ গোছাতে পারায় কর্মী-সমর্থকরা সক্রিয় থাকতে পারছেন, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে। যদিও জামায়াত প্রতিটি আসনে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। ভোটের সমীকরণে যদি শেষ পর্যন্ত জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করে, তবে তাদের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের ভোট কেটে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যা নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেবে।
জামায়াতের দাবি, মৌলভীবাজারের রাজনীতিতে তাদের দল একটি অনিবার্য শক্তি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ চারটি আসনে তাদের সাংগঠনিক দৃঢ়তা, শক্তিশালী কর্মী বাহিনী এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক নিঃসন্দেহে একটি উচ্চমাত্রার প্রভাব হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর এবং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এ সময়ে, দলটির এ একক প্রস্তুতি স্থানীয় রাজনীতিতে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দাবি করেছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ, গ্রুপিংমুক্ত ও নির্বাচনমুখী’ দল। তিনি উল্লেখ করেন, তার দলের মূল লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করা।