ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা?
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:২১
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের জীবন ও সম্পদ। গত ২৫ নভেম্বর মঙ্গলবার রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার ১০ ঘণ্টা পর তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আর এ সময়ের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অন্তত দেড়হাজার বাড়িঘর। আশ্রয়স্থল হারিয়ে শত শত পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে হয়েছে। গত ২৬ নভেম্বর বুধবার এ রিপোর্ট লেখার সময় রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালে (পিজি হাসপাতাল) অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে ২৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে একটি পোশাক কারখানায়ও আগুন লেগেছে। এর আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লেগে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ধংস হয়ে গেছে। মিরপুরের শিয়ালবাড়ীতে আগুনে বহু মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে আগুন লাগার ঘটনায় মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। অনেকই প্রশ্ন তুলছেন- একের পর এক এ আগুন দুর্ঘটনা, নাকি সুপরিকল্পিত নাশকতা?
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড বেড়ে চলেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, বাজার; এমনকি আবাসিক ভবনেও আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান জীবন ও সম্পদ। এসব ঘটনার পর বারবারই প্রশ্ন উঠছে, এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো নাশকতার ইন্ধন? ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ দুর্ঘটনাজনিত হলেও এর ভয়াবহতা এবং ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঘটে যাওয়া বেশকিছু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর মিরপুরের পোশাক কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, প্রায় একই সময় চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ (সিপিইজেড) আদম ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা, টঙ্গীতে কেমিক্যাল গুদাম ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনাটি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। অতীতে চুড়িহাট্টা, নিমতলী ও বেইলি রোডের মতো ট্র্যাজেডিগুলো প্রমাণ করেছে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এসব ঘটনায় একদিকে যেমন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে, তেমনি হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কড়াইল বস্তিত কোনো স্থাপনা না থাকলেও এখানে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অগ্নিদুর্ঘটনা ছাড়া ঢাকা শহরের রাসায়নিক গুদাম ও কারখানায় বেশ কয়েকবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় মজুদ করা রাসায়নিক পদার্থের বিস্ফোরণে আগুন লেগে পুড়ে অঙ্গার হয় ৭৯টি তরতাজা প্রাণ। গুরুতর আহত হয় ৪১ জন। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় ১২৫ জনের প্রাণ। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক গুদামে দাহ্য পদার্থ মজুদের পরিণতি যে কত ভয়ংকর হতে পারে, নিমতলী ট্র্যাজেডির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তার জ্বলন্ত প্রমাণ। একসময় গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। গাজীপুরের কাশিমপুরের একটি পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ৫০ জন, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ আগুন লেগে ১২৪, নরসিংহপুরে হামীম গ্রুপের একটি অত্যাধুনিক বহুতল পোশাকশিল্প কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৬, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তাসংলগ্ন ভোগড়া শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত গরীব অ্যান্ড গরীব সোয়েটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২১, মহাখালীর একটি নিটিং কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১২ এবং নরসিংদীর একটি তোয়ালে কারখানার আগুন লেগে ৪৬ জন মারা যায়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এ ঘটনাগুলোয় ৭৯২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয় এবং ১০২ জন নিহত হয়। ২০২৪ সালে সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব আগুনে প্রাণ হারিয়েছে ১৪০ জন, আহত হয়েছে আরও ৩৪১ জন। ২০২৫ সালে প্রথম ৭ মাসে ১৫৪ জন আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছে। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হলেও প্রকাশ্যে আসেনি কোনো প্রতিবেদন।
২৫ নভেম্বর বিকেলে কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগে বিকেলে আর রাতে লাগে চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকার একটি পোশাক কারখানার গুদামে। ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টর আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, কড়াইল বস্তির আগুনে দেড় হাজারের মতো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গত ১৯ নভেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ঢালিপাড়া ধর্মগঞ্জ এলাকায় পলিথিনের দানা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডে কারখানার পলির দানা, দুটি মেশিন ও ওয়েস্ট পলি পুড়ে গেছে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার কারণে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো শেডে আগুনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ২৫ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনের সূত্রপাত ছিল বৈদ্যুতিক আর্ক এবং শর্টসার্কিটের কারণে। এ অগ্নিকাণ্ড কোনো নাশকতা ছিল না।