সম্পাদকীয়

ভূমিকম্প : বিল্ডিং কোড মানতে বাধ্য করতে হবে


২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:০০

দর্শন শাস্ত্রের অ-আ, যুক্তিবিদ্যার ক-খ হলো পৃথিবীতে কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনাই কারণ ছাড়া ঘটে না। যাকে যুক্তিবিদ্যার ভাষায় বলা হয়, কার্যকারণ। গত শুক্র ও শনিবার (২১ ও ২২ নভেম্বর) ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে কয়েকবার ভূমিকম্পের পর এর কারণ এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে। যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে পরামর্শ দিচ্ছেন, সতর্ক করছেন। আবার অনেকে গুজব এবং ভীতিও ছড়াচ্ছেন। আমরা মনে করি, আলোচনা-পর্যালোচনা এবং সতর্ক করার মধ্যে যতটা কল্যাণ; গুজব ও ভীতি ছড়ানো ততটাই ক্ষতিকর এবং অপরাধ।
একজন ঈমানদার হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, পবিত্র কুরআনের ঘোষণা, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করানÑ যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা রূম : ৪১)। হ্যাঁ, মানুষের বিভিন্ন কাজের ফলেই আসে সুদিন এবং দুর্দিন। ভূতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের নানা কারণ তুলে ধরছেন। সেই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, মানুষের কৃতকর্মের ফলেই তা সৃষ্ট, এতে সন্দেহ নেই। যেমন ভূপৃষ্ঠের হঠাৎ পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরি ও শিলাচ্যুতির কারণে সাধারণত ভূমিকম্প হয়। সবার আগে যে কারণের কথা উল্লেখ করা হয়, তার জন্য মানুষ সরাসরি জড়িত। এটি প্রমাণ করতে কোনো তথ্য হাজির করার প্রয়োজন নেই। মানুষ ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠি স্বার্থের কারণে পাহাড় কেটে, নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ পানি অপরিণামদর্শীর মতো উত্তোলন করে ভূপৃষ্ঠের ওপরি ভাগে পরিবর্তন ঘটায়। নিজ হাতে মানুষ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায়। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো বিপদ ডেকে আনে। বৈজ্ঞানিক কারণের বাইরেও এজন্য অনেক অনুষঙ্গ দায়ী বলে মনে করেন ধর্মীয় স্কলাররা। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্প কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক গভীর সতর্কবার্তা। এমন সময় মানুষের দায়িত্ব হলো দ্রুত তাওবা করা, আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা, বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করা এবং স্মরণে মগ্ন থাকা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব রাতারাতি তাদের কাছে আসবে না, যখন তারা গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকবে?’ (সূরা আরাফ : ৯)। এবং অন্যত্র উল্লেখ আছে, ‘তোমাদের ওপর যত বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কর্মফলের কারণে; আর আল্লাহ তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সূরা শুরা : ৩০)। কুরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে ‘যিলযাল’ ও ‘দাক্কা’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যিলযাল মানে কম্পনে কম্পন সৃষ্টি হওয়া, আর দাক্কা মানে প্রচণ্ড শব্দের অভিঘাতে কেঁপে ওঠা। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘এ উম্মত ভূমিকম্প, বিকৃতি এবং পাথরবর্ষণের সম্মুখীন হবে, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রসার ঘটবে এবং মদপান (এককথায় অশ্লীল) বেড়ে যাবে।’ (তিরমিযী : ২২১২)। কিয়ামত যত নিকটবর্তী হবে, ভূমিকম্প তত ঘন ঘন ঘটবে। কুরআনে উল্লেখ আছে, ‘ওহে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের ভূকম্পন হবে ভয়াবহ।’ (সূরা হজ: ১-২)। হাদিসে ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে অবৈধ সম্পদ অর্জন, আমানতের খিয়ানত, জাকাতকে জরিমানা ভাবা, ধর্মহীন শিক্ষা, আত্মীয়তার অবহেলা, মসজিদে অশালীন কথাবার্তা, অযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব ইত্যাদি। (তিরমিযী : ১৪৪৭)।
অতএব বর্তমানে ভূমিকম্পগুলো কেবল ভূগর্ভস্থ প্লেট সরণের ফল নয়; এগুলো মানুষের পাপাচার ও অবাধ্যতার জন্য আল্লাহর পাঠানো সতর্কবার্তা। ইতিহাসে দেখা যায়, আল্লাহ অনেক জাতিকে ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংস করেছেন। তাই প্রতিটি কম্পন আমাদের জন্য একটি স্মরণ: আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তাওবা করা, নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং তাঁর রহমত ও নিরাপত্তার জন্য মন জাগানো। সাথে সাথে কোনো বিপদ ও দুর্যোগ ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করার কথায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগে নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকা। বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করা। যেমন এ মহানগীর ৯০ ভাগ বাড়িই তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে, বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করে- সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার দেয়া এ তথ্য কতটা ভয়াবহ! ভাবলেই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে।
তাই আমরা মনে করি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ করতে কঠোর হতে হবে। বিল্ডিং কোড মানতে বাধ্য করতে হবে। ইমারত নির্মাণের সময় ভূমিকম্পে টিকে থাকতে পারে- এমন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। আল্লাহ না করুন, যদি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যায়, উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো সরঞ্জাম ও উন্নত প্রযুক্তি প্রস্তুত এবং মাঝে মাঝে মহড়ার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব এটি শুধু কথার কথা যেন না হয়। অবশ্যই গুজব ও অস্থিরতা কাম্য নয়। ধৈর্যের সাথে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
আমাদের বিশ্বাস, বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় কারণগুলো আমলে নিয়ে আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাহায্যে ভূমিকম্পসহ সব বিপর্যয় উত্তরণে সফল হব, ইনশাআল্লাহ।