রাষ্ট্রক্ষমতায় বিকল্পের সন্ধান


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:০৫

॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়; বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে উত্তরবঙ্গে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী ছিল, কিন্তু ২০২৪-এর পর সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ বদলে গেছে।
এর মধ্যে সরকারের আলোচিত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এক রহস্যজনক সফরে নির্ধারিত সূচির একদিন আগে দিল্লি গেছেন। কেউ কেউ তার এ সফরকে ওয়ান-ইলেভেনের পর ৬ দিনের সফরে তদানীন্তন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদের ভারত সফরের সাথে তুলনা করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বইয়ে বলা হয়েছে, এ সফরে পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে একটি সমঝোতা হয়। যদিও তাকে পরবর্তী সরকারের রাষ্ট্রপতি করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি।
এদিকে একটি দল ইতোমধ্যে ড. খলিলকে পরবর্র্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ, বাণিজ্য ও জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার খবর জানা যাচ্ছে। দলটি আশা করছে, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে যেভাবে দলটির যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন, সেভাবে পরবর্তী নির্বাচনের আউটকাম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক ফল এনে দেবেন।
রাষ্ট্রক্ষমতায় বিকল্পের সন্ধান
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়া শুধু আইনি ঘটনা নয়- এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূসংস্থানকে নতুন করে সাজিয়ে দিচ্ছে। এ রায়ের সবচেয়ে গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে, যেখানে গত দুই দশকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রভাব একাধিকবার ভেঙে পড়েছে, আবার ক্ষমতার জোরে বহুবার টিকে থেকেছে। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন- একদিকে রায়; অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। মাঝখানে উত্তরাঞ্চলে নতুন শক্তি, নতুন সমীকরণ এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বিকল্প নকশা।
উত্তরবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রাণবন্ত অঞ্চল। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর ইতিহাসে এ অঞ্চলের ভোটের আচরণ সাধারণত ক্ষমতাসীন বিরোধীপ্রবণতাকে অনুসরণ করে। হাসিনার রায়ের পর তিনটি বিষয় উত্তরাঞ্চলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- রায় ঘোষণার পর উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়, সরে দাঁড়ানো ও দলত্যাগের প্রবণতা বেড়েছে।
রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট- এসব জেলায় দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ী শ্রেণি, যারা আগে সরকারি সুবিধা পেয়ে দলটির পাশে ছিল, এখন সম্পূর্ণ দূরত্বে।
ছাত্র-যুব আন্দোলনের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জুলাই আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল রাজশাহী-রংপুর অঞ্চল। এ আন্দোলনের প্রজন্ম এখন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বিকল্প শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাদের চাহিদা তিনটিÑ (১) ন্যায়বিচার, (২) অবাধ নির্বাচন, (৩) প্রশাসনিক সংস্কার।
ইসলামী দলগুলোর পুনরুত্থান দৃশ্যে দেখা যায়, তাদের উত্থান জনমনে আশা জাগিয়েছে জাতীয় ধারার বিকল্প হিসেবে তাদের প্রতি জনগণের সমর্থন।
উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পুনর্গঠন
উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, নওগাঁ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁয়ে আওয়ামী লীগের যেটুকু সাংগঠনিক শক্তি ছিল, তা কয়েকটি কারণে ধসে পড়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়কে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয় ও বিভক্তি চলে এসেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় স্তরে নেতাদের দলে ‘থাকা বা না থাকা’ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এতে তরুণদের মধ্যে সরকার- প্রতিরোধী মনোভাবের দমে যাওয়ায় এখন উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের অবস্থান প্রায় নিষ্ক্রিয় এবং দলটি মূলত আইনি প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
ঠিক এ সময়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্রদের নেতৃত্বে জামায়াতের সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ ঘটেছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে তারা ‘রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান’ এবং ‘ইসলামী মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার’ এর নতুন ন্যারেটিভ তুলতে শুরু করেছে। এতে উত্তরাঞ্চলে তাদের পুনর্গঠন দ্রুতগতি লাভ করেছে।
‘ধর্মীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার’ ধাঁচের নতুন দল ও রাজনৈতিক ইসলামমুখী ফোরাম প্রবলভাবে উঠে আসছে, যেগুলো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট করার চেষ্টা করছে।
আওয়ামী লীগের পতন ও হাসিনার রায়ের পর উত্তরাঞ্চলে বিএনপি সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী বিকল্প হিসেবে দ্রুত পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। বগুড়া-রংপুর বেল্ট ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের ঘাঁটি; এখন সেই ঘাঁটি আরও দৃঢ় করার চেষ্টা হচ্ছে। হাসিনার মৃত্যু রায়ের পর বিএনপি ‘অত্যাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার সমাপ্তি’ ঘটেছে এমন ন্যারেটিভ তৈরিতে মনোযোগী হয়েছে। যদিও অনেক স্থানে বিএনপি প্রার্থীদের আওয়ামী সমর্থকদের আকর্ষণ করতে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়; ফলে ‘জুলাই প্রজন্ম’ এখন একটি রাজনৈতিক শক্তি। তারা আগের মতো অন্ধ দলীয় আনুগত্যে ফিরছে না, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে সংগঠিত হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে উত্তরের ভোট কোন দিকে যাবে- এটি এখন বড় একটি প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে কঠিন নির্বাচনী সময় এটি। রায়-পরবর্তী জনমত দলটির জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। আইনি তৎপরতায় নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি প্রার্থী সংকট, সংগঠনের ভাঙন, ভয়-সংকটে দলটি উত্তরাঞ্চলে প্রতীকী উপস্থিতি রাখতে পারবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
এ অবস্থায় বিএনপি সবচেয়ে লাভবান হতে পারে বলে আশাবাদী দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারা রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া-নওগাঁ-জয়পুরহাট-লালমনিরহাট-ঠাকুরগাঁও এলাকায় অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে জামায়াত ও ইসলামী জোট এখানে ‘কিংমেকার’ হতে পারে। যদি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তবে ইসলামী দলগুলো উত্তরের ২০-২৫টি আসনে নাটকীয় ভূমিকায় চলে আসতে পারে।
জুলাই সনদপন্থী তরুণ প্রার্থীদের প্রতি অনেক স্থানে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ‘নির্দলীয় তরুণ সংস্কারপন্থী’ প্রার্থীও অনেক আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শহর বগুড়া-রংপুর-দিনাজপুর-রাজশাহী অঞ্চলে।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। একটি দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত দল- আওয়ামী লীগ দ্রুত ধসে পড়েছে, আর তার শূন্যস্থান পূরণে বিএনপি, জামায়াত, নতুন রক্ষণশীল প্ল্যাটফর্ম এবং জুলাই প্রজন্মের দলগুলো একযোগে প্রবেশ করছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে মূলত, ‘উত্তরবঙ্গ বনাম কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্য’ এবং ‘জুলাই সনদের মূল্যবোধ বনাম পুরোনো রাজনীতি’-এর এক বড় পরীক্ষা।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মূলত তিনটি ব্লকের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে- প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থিত সংস্কারমুখী জোট। তারা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও দুর্নীতি দমনের বার্তা নিয়ে মাঠে আছে। উত্তরবঙ্গের মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ভোটার ও তরুণরা এদের প্রতি আগ্রহী।
দ্বিতীয়ত, বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ধারার দলসমূহ। হাসিনার পতন তাদের জন্য সুবিধাজনক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। বগুড়া, রংপুর, ঠাকুরগাঁওয়ে তাদের পারফরম্যান্স শক্তিশালী হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভাঙন তাদের মূল বাধা।
আঞ্চলিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীধারাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উত্তরাঞ্চলের বিদ্যমান শূন্যস্থানে কিছু নতুন মুখ; বিশেষত শিক্ষাজগত, আন্দোলনভিত্তিক নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সম্ভাব্য চমক দিতে পারে।
সম্ভাব্য ফল হিসেবে উত্তরবাংলার ৪২-৪৫টি আসনের মধ্যে বিএনপিধারা ১২-১৬টি পেতে পারে। ইসলামিস্ট ছাত্র-যুব আন্দোলনের সমর্থিত নতুন ধারা ও স্বতন্ত্ররা ২০-২৫টির মতো দখল করতে পারে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক যেটিÑ সংস্কারধারার নবীন নেতৃত্ব প্রথমবার জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
কোন শক্তি সামনে আসছে?
‘জুলাই প্রজন্ম’ ও প্রশাসনিক সংস্কারপন্থীধারা তারা মূলত তিনটি নীতির ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছে- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার-প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অপসারণ। এ ধারা সম্ভবত সংসদে কিংমেকার হিসেবে আবির্ভূত হবে। টেকনোক্র্যাট-রাজনৈতিক সমন্বয়ভিত্তিক নতুন মধ্যম শক্তি সামনে আসতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা নতুন ধরনের রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করছে- যেখানে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ, ক্লিন ইমেজের প্রার্থী ও নীতিনির্ভর রাজনীতি একত্রে উঠে আসতে পারে। উত্তরবঙ্গের কৃষি, পানি সংকট, আঞ্চলিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও শ্রমবাজারের বিশেষ চাহিদাকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে। এরা জাতীয় ক্ষমতা কাঠামোয় ‘উত্তরাঞ্চলীয় ব্লক’ হিসেবে ভূমিকা নিতে পারে।
কেন উত্তরবঙ্গ ভবিষ্যতের ক্ষমতার পরীক্ষাগার হতে পারে- এ প্রশ্নের জবাব হলো, এখানে আওয়ামী লীগ শূন্য হতে শুরু করছে; ফলে রাজনৈতিক শূন্যস্থান ব্যাপক। যুব সম্পৃক্ততার হার সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনিক নির্যাতন ও বিগত দমন-পীড়নের স্মৃতি উত্তরাঞ্চলে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে, যা ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এ এলাকায় বিদেশনীতি (ভারত-চীন), সীমান্তনীতি, পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক উন্নয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ইস্যু। আর হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক সংকেত।
উত্তরাঞ্চলে ভোটাররা একপ্রকার ‘রেজিম চেঞ্জ মুড’-এ আছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু দলের পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতায় নতুন বিকল্প-সংস্কারমুখী, টেকনোক্র্যাটিক ও আন্দোলন-উৎসারিত নেতৃত্বের বিকাশের সূচনা হতে পারে। উত্তরবাংলা তাই এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার নতুন দিশা নির্ধারণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভারত সফরের প্রভাব
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফরের রাজনৈতিক প্রভাব নির্বাচন-পরিপ্রেক্ষিতে বেশ জটিল হতে পারে। প্রথম বিবেচনায় আসতে পারে সম্ভাব্য প্রভাব রাজনীতিতে এবং নির্বাচনে। দৃশ্যত খলিলুর রহমান ভারত সফর করছে, কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ-এ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরামে অংশ নিতে। এটি দেখাচ্ছে যে অন্তর্বর্তী সরকার ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা’কে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ভোটারদের মধ্যে ‘দেশটাকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কৌশলগত সম্পর্কও গড়ে তোলা হচ্ছে’- এমন ভাবনাকে শক্তিশালী করতে পারে।
কৌশলগতভাবে, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ‘রাজনীতি ও নিরাপত্তা’ একত্রে ব্যবহারের একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে : ভোটপ্রচার না, স্রেফ সামাজিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে, বরং ‘নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ বিষয়েও গঠনমূলক কাজ করছে, যা কিছু ভোটারকে আকৃষ্ট করতে পারে; বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখে।
বিদেশি ন্যারেটিভ ও সঙ্কটের রাজনীতির একটি প্রভাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে খলিলুরের ঘনিষ্ঠতা বা অংশগ্রহণ, বিশেষত যদি এটি ‘ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত অঙ্গীকার’ হিসেবে প্রচার করা হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদী বা ধর্মীয় দলের পক্ষ থেকে এটি ‘ভারত হেজিমনি’ বা ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে আক্রমণাত্মক ন্যারেটিভ তৈরি করার সুযোগ দিতে পারে।
অনেক ভোটার; বিশেষ করে জাতীয়তাবাদ-চেতনায় থাকা বা বিদেশনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক যারা, তারা এ সফরকে রাজনৈতিক অপব্যবহার বা রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং এর ভিত্তিতে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা গঠন করতে পারে।
খলিলুর এমনভাবে ভারত-ভ্রমণ করছেন, যা ‘আঞ্চলিক সমন্বয় ও নিরাপত্তা’ এ গুরুত্ব দিচ্ছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। এটি ভোটারদের মধ্যে এমন ইমেজ গড়ে তুলতে পারে যে, অন্তর্বর্তী সরকার কেবল স্থানীয় রাজনীতি চালাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। একই সময় এ ধরনের সফর অন্তর্বর্তী সরকারের চালচিত্রকে ‘ন্যায্যতা, ন্যূনতম দক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা’ দেখাতে পারে, যা নির্বাচনী সময় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য সুবিধাজনক পয়েন্ট হতে পারে।
যেহেতু কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ নিরাপত্তা, সাইবার-সুরক্ষা, সন্ত্রাস দমন ইত্যাদির ওপর ফোকাস করে। নির্বাচনী সময়ে নিরাপত্তার ইস্যু ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াতে পারে; বিশেষ করে যদি নিরাপত্তা কাজের ফলাফল (বা অপ্রাপ্যতা) জনপ্রিয়ভাবে স্পষ্ট না হয়। এছাড়া সফর শেষে যদি কোনো বড় কৌশলগত চুক্তি বা সমঝোতা প্রকাশ পায় (উদাহরণস্বরূপ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা চুক্তি ইত্যাদি), বিরোধীরা এটিকে ‘অস্বাভাবিক প্রতিশ্রুতি’ বা ‘দেশীয় স্বার্থের ক্ষতি’ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।
তবে এ সফর নিয়ে ভোটারদের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও রয়েছে। কিছু ভোটার এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারে, ‘আমাদের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ফোরামে যাচ্ছে এবং আমাদের কণ্ঠ সেখানেও রয়েছে’, যা গর্ব বা জাতীয় মর্যাদার অনুভূতি জাগাতে পারে। অন্যদিকে যারা স্বৈরাচার, অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং বিদেশনির্ভরতার বিরুদ্ধে চেতনাশীল, তারা এটিকে ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ বা ‘সমঝোতার গোপন প্রচেষ্টা’ বলে ব্যাখ্যা দিতে পারে।
সফর শুধুমাত্র সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং যদি এটি কেবল প্রতীকী বৈঠক হয় আর কোনো বড় চুক্তি বা কার্যকর পরিকল্পনা না বের হয়, তাহলে এর নির্বাচনী প্রভাব সীমিত হতে পারে। জনমত যদি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ধীর বা বিভাজিত থাকে, তাহলে এমন কূটনৈতিক শক্তি-প্রদর্শন প্রত্যাশিত ভোটার আকর্ষণ তৈরি করতে নাও পারে। মিডিয়া এবং বিরোধীদের কনট্রোল করা সম্ভব নয়। তারা সম্ভাব্য নেতিবাচক ব্যাখ্যার সুযোগ পাবে (যেমন বিদেশ-নিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত, স্বার্থহানি ইত্যাদি)।
যদি এ সফরের ফলাফল নির্বাচন-আগে ‘দীর্ঘমেয়াদি’ প্রদান হিসেবে না দেখা যায় (যেমন প্রাপ্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, চুক্তি বাস্তবায়ন ইত্যাদি), তাহলে ভোটাররা প্রভাবশালী পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ হতে পারে। আর মঈন উ আহমেদের ৬ দিনের ভারত সফরের আঙ্গিকে কিছু যদি হয়, তাহলে এর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হতে পারে।
২০০৮-এর নির্বাচনের পুনরাবৃত্তির চেষ্টা?
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনটি ছিল একটি বিশেষ পরিবেশে, যখন ক্ষমতায় ছিল ওয়ান ইলেভেন উত্তর তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যেটি সেনা-সমর্থন পেয়েছিল। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনী গ্রন্থের বক্তব্য অনুসারে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের ৬ দিনের ভারত সফরের সময় পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার বিষয়ে সমঝোতা হয়। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ সমঝোতার প্রতিফলন ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ সমঝোতার অংশ হিসেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে একটি সূক্ষ্ম ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা হয়। যেখানে চারটি কারসাজিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাস করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জেতার মতো অনুকূলভাবে বিন্যাস করা হয়, যার ফলে আওয়ামী লীগের অনেকগুলো আসনে বিজয় নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত- ভোটার তালিকা প্রণয়ন বা সংশোধনের সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ সমর্থককে ভোটার হিসেবে সংযোজন করা হয়, যাদের হয়তো ভোটের বয়স হয়নি অথবা এ নামের কোনো মানুষই নেই। পরে তাদের ভোট জাল ব্যক্তির মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। তৃতীয়ত, সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ এমন আসন চিহ্নিত করা হয় (বেশিরভাগ নগর অঞ্চলে) যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে সাধারণভাবে প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হয়। এসব আসনে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়। আর এসব বাক্স গণনার সময় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। যার কারণে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রে শতভাগের বেশি ভোট প্রদত্ত হওয়ার রেকর্ড চলে আসে। একই সাথে বাস্তব ভোটার অংশগ্রহণের চেয়ে অনেক বেশি ভোট প্রদানের রেকর্ড স্থাপিত হয়। চতুর্থত, শেষ ধাপে কিছু আসনে ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়।
ঐ ষড়যন্ত্রের সাথে শেখ হাসিনার তদানীন্তন উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ কয়েকজন আমলা ও সেনা কর্মকর্তা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। ঐ নির্বাচনের সাথে যুক্ত একজন আলোাচিত সেনা কর্মকর্তার সাথে ব্যক্তিগত আলাপেও এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি বড় জোট গঠন করেছিল এবং তাদের সামনে ভোটবিহীনতা বা বড় রাজনৈতিক বাধা কম ছিল, যার ফলে অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও পর্যবেক্ষকরা তুলনামূলকভাবে ‘স্বাধীন ও সুষ্ঠু’ ভোট হিসেবে এর প্রশংসা করেছিলেন।
বাংলাদেশের ২০০৮ সালের স্টাইলে সম্প্রতি বিহার বিধানসভা নির্বাচন ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি রাজ্যস্তরের নির্বাচন, যা ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বিশেষ গুরুত্ব রাখে। কারণ বিহার জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক শক্তি উভয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যেসব প্রধান রাজনৈতিক জোট আছে, তাতে সরকারি জোট এনডিএ এবং বিরোধী জোট মহাগাঠমন্ধন বা ইন্ডিয়া জোট রয়েছে।
বিহারে ভোটের আগে ভোটার তালিকাকে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৪৮ লাখ ভোটার বাদ দেয়া হয়েছে। এসব ভোটার যেসব এলাকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, সেসবের প্রায় সকল আসনে এনডিএ প্রার্থী জয়ী হয়েছে। এর আগের নির্বাচনে এসব আসনে কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে বিরোধী প্রার্থীদের জয়ী হতে দেখা যায়।
ভোটারদের সুবিধার জন্য বিহারে কিছু আধুনিক ব্যবস্থাও; যেমন মোবাইল ফোন ডিপোজিট কাউন্টার বুথে এবং প্রার্থীর ছবিসহ ইলেকট্রনিক ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলোকে ভোট কারসাজির টুলস বানানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতিশ্রুতিমূলক ভোট বিষয়েও উন্নয়নমূলক ইস্যু; যেমন চাকরি, ‘অবকাঠামো’, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি প্রচুর গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো বিহারেও ভোটদাতা অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত উঁচু। বাংলাদেশে ৮৫% এরও বেশি ভোট পড়ে, যা আগের গ্রহণযোগ্য যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি। একইভাবে বিহারের এ নির্বাচনে আগের তুলনায় ১০ শতাংশ ভোট বেড়ে দ্বিতীয় ধাপে ৬৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অংশগ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় নির্বাচনেই ভোটার উৎসাহ ছিল, তবে ধারণা চেয়েও ভোট দেয়ার হার ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি। রাজস্থান-হরিয়ানা থেকে ট্রাকে ট্রাকে ভোটার এসে বিহারে ভোট দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
ফলাফল ও রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল বিজয় লাভ করে: ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ২৬৩টি আসন (প্রত্যক্ষ ভোট আসন) জয় পায় এবং তারা সরকার গঠন করে। ফলাফল এমন ছিল যে, তাতে একটি একক শক্তিশালী জোট তৈরি হয়ে যায়, যা পরবর্তী রাজনীতিতে তাদের প্রাধান্য বাড়ায়। এরপরের তিন মেয়াদে কার্যত বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হয়নি।
বিহারে ২০২৫ সালে এনডিএ একটি বড় বিজয় পেয়েছে। বিশেষভাবে বিজেপি এ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করেছে। প্রথমবারের মতো বিহার বিধানসভায় বিজেপি একক সর্বাধিক আসনদার শক্তি হলো। প্রতিদ্বন্দ্বী জোট ইন্ডিয়া পারফরম্যান্সে তলানিতে চলে যায়। যদিও এখন নানা ধরনের কারসাজির ভয়ানক চিত্র বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। এ অভিজ্ঞতাকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে বিজেপি ও সংঘ পরিবার।
আর বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের ২০০৮ এবং বিহারে ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী পছন্দ রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার কথা আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে ভারত সফরে গেছেন। এ সফরের প্রতি নজর রয়েছে অনেকের।
ঢাকায় আলোচনা রয়েছে- ড. খলিল দেশের ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিএনপির সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের দূরত্ব ঘোচাতে তিনি লন্ডন বৈঠক আয়োজনের প্রধান কারিগর ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের মতো নির্বাচন আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারেন। এজন্য তাকে ভবিষ্যৎ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার খবর জানা গেছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের আরো দুই চুক্তিভিত্তিক আমলাকে পরের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিপ্রণেতার ভূমিকায় আনার প্রতিশ্রুতির খবরও জানা যাচ্ছে। শুধু শর্ত হলো, তাদের নির্বাচনে দলটির কাক্সিক্ষত ফলাফল পেতে সহযোগিতা করতে হবে।