জুলাই বিপ্লবের বেনিফিশিয়ারিদের ক্ষমতার লোভের ফাঁদে দেশ


৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৪১

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
জুলাই ৩৬ বিপ্লব না হলে বা হাসিনা না পালালে যারা রাজনীতিতে সরব হতে পারতেন না বা দাদাদের দেশ থেকে নিজ দেশে ফিরতেই পারতেন না, রাজনীতি তো দূরে থাক; তারাই এখন রাজনীতিতে সরব। ক্ষমতায় না গিয়েই ক্ষমতার ভাব দেখিয়ে জায়গা-জমি দখল, চাঁদাবাজি, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে ক্ষমতা খাটিয়ে বৈধ-অবৈধ কাজ আদায় করে নেয়া এখন ওপেন সিক্রেট। জুলাই ৩৬-এ যারা জীবন দিল, যারা আহত-পঙ্গু হলো, তাদের একেবারে ভুলে গিয়ে তথাকথিত রাজনীতিবিদরা তাদের অবৈধ কাজকে বৈধতা দেয়ার জন্য আগের মতো যেনতেন নির্বাচন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পাঁয়তারা করছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার জুলাই ৩৬-এর পরপরই ক্ষমতায় এসে ভুল করেই বিপ্লবী সরকার ঘোষণা না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নাম দিয়ে পুরনো কায়দায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার পা ধরে সালাম করা প্রেসিডেন্টের কাছে শপথ নিয়ে জটিলতার মধ্যে পড়েছে। সুযোগ নিচ্ছে নতুন ফ্যাসিবাদীর জন্ম নেয়া কুশীলবরা।
মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্পষ্ট ঘোষণা ছিলÑ তারা জুলাই ৩৬-এর দায়ীদের বিচার করা, দেশের বিভিন্ন বিভাগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা এবং জুলাই-পরবর্তী সময়ের আলোকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেয়া। জুলাই সনদ ইতোমধ্যে সংস্কার কমিটি দীর্ঘদিন বিভিন্ন দলের সাথে আলাপ-আলোচনা করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে চূড়ান্ত কপি। এ সনদে কিছু দ্বিমতও আছে। তবে দুনিয়ার আইনাঙ্গনের প্রথা অনুযায়ী অধিকাংশের মতের ওপরই সিদ্ধান্ত হয়, এমনকি ফাঁসিরও আদেশ দেয়া হয়, যা বাংলাদেশে আমরা দেখেছি।
আগেই বলেছি, যারা জুলাই ৩৬-এর বেনিফিশিয়ারি, তারাই অতি উৎসাহে এখন জুলাই সনদের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখাচ্ছে। হঠাৎ করেই বিএনপির বড় নেতা, যিনি কিংস পার্টি করার ব্যাপারে দৌড়ঝাঁপের খবরাখবরে ভাইরাল হচ্ছিল, আমি তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানতাম। মেজর সাহেব বলেই ফেললেন, জুলাই সনদ দরকার নেই। আবার আরেকজন- তাকেও আমি ভালোই জানতাম, তিনিও বলেই ফেললেন, জামায়াতে ইসলামীকে ব্যান্ড করা দরকার। তিনি কি বুঝেশুনে বললেন, নাকি দলের মধ্যে মান বাড়ানোর জন্য বললেন, বোঝা গেল না। তাদের নমিনেশন তালিকায় তার নামও দেখলাম না। কারণ বর্তমানে জুলাই ৩৬-এর বেনিফিশিয়ারি, অর্থাৎ জুলাই বিপ্লব না হলে যারা দাদাদের দেশ থেকে বাপের দেশে ফিরতেই পারতেন না, তারা এখন শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বাকশাল থেকে মুক্ত করে গণভোটের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আর দেশের সব মত ও পথের লোকদের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদী ও মুসলিম ধ্যান-ধারণার একটি দেশ গঠনে সচেষ্টা ছিলেন, সেই দলের ঘাড়ে চড়ে চট্টগ্রাম নিবাসী হঠাৎ করেই বিএনপির মুখপাত্র হয়ে আবির্ভূত হলেন এবং সবাইকে পেছনে ফেলে বিএনপিকে ভারতের দালাল পার্টি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জানি না, তিনি ছাত্রদলের সভাপতি ও সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন কিনা? আমার জানা মতে, ছাত্রদলের অনেক নেতা আছেন, তাদের খুব একটা বড় পদে দেখা যাচ্ছে না বা তাদের কর্মকাণ্ড মিডিয়ায় কম আসছে। বিএনপি নামে বড় দল হলেও বর্তমানে জুলাই ৩৬-এর পর তাদের গ্রাম থেকে শুরু করে শহর-বন্দর, হাট-বাজার, ঘাট সবই স্বৈরাচারীরা চলে গেলে তারা দখলে নিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি করে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
বর্তমানে মিডিয়ার যুগ। তাই কেউ ভালো কাজ করলেও প্রচারে আসে আবার খারাপ কাজ করলেও প্রচারে আসে যা আমাদের হাতের মোবাইল ফোন খুললেই দেখা পাওয়া যায়। তাই তো তারেক রহমান দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছেনÑ এবারের নির্বাচন সহজ হবে না।
অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরের লোকেরা জুলাই ৩৬ ঘটানোর জন্য জেলে যাওয়া, গুম হওয়া, বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ধূলিসাৎ হওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনো জুলুম-নির্যাতন নেই, যা তারা ভোগ করেনি। জুলাই ৩৬-এর শহীদের তালিকা ১২ খণ্ডে ৩টি ভাষায় প্রকাশ করে এক অনবদ্য ভালো কাজ করেছে, যা আজও সরকার পক্ষ বা বড় দল বলে পরিচিত তারা করতে পারেনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জামায়াত-শিবিরেরর অসখ্য নেতাকর্মীসহ জুলাই মাসে আমরা জেলে ছিলাম। ৫ আগস্ট বিপ্লবের ফলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পর ৬ আগস্ট আমরা জেলখানা থেকে মুক্ত আকাশে ফিরে আসি। রিজভী ভাইসহ বিএনপির লোকেরাও জেলে ছিল। তাই দেশে জেল, আয়নাঘর, খুন-গুমের স্বীকার আমরা সবাই হয়েছি আবার দেশটা গড়তেও চাই আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত থেকে।
পথ-মত ভিন্ন হলেও লক্ষ্য আমাদের দেশ গড়ার। বর্তমানে জুলাই সনদ পাস নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি চলছে। যে জুলাই ৩৬ না ঘটলে আমাদের অস্তিত্বই ছিল না, সেই সনদের জন্য গণভোট করতে এত আপত্তি কোথায়? দীর্ঘদিন সব দলের অংশগ্রহণে যে সনদ প্রকাশ্যে প্রধান উপদেষ্টাসহ দেশের গণ্যমান্য লোকের সামনে সই-স্বাক্ষর হয়েছে, তার আইনগত স্বীকৃতিতে এত বাধা কিসের। টাকার খরচের কথা খুবই ছোট ব্যাপারই আমি বলব। কারণ আমাদের ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী, হাসিনার পিয়নের কাছে ৪শ’ কোটি পাওয়া গেলে বহু এমন বড় বড় রুই-কাতলের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করে এ টাকার জোগান দেয়া যেতে পারে।
ইসলামী ব্যাংক ইসলামপন্থীদের দ্বারা তৈরি হলেও এস আলম ব্যাংকের প্রায় ৮০% টাকা লুট করে বিদেশে পাঠিয়েছে, অন্যান্য ব্যাংকের টাকাও আছে। আমরা দেশে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাই। দেশের টাকা বিদেশে না পাচার করে দেশে বিনিয়োগ করে দেশের উন্নতিতে শরিক হন। মানুষের চলার জন্য কত টাকা লাগে? এদেশের যত টাকা চুরি হয়েছে, তা কিন্তু চোররা খেয়ে মরতে পারবে না। দেশে যেমন লাঞ্ছিত হলেন, আখিরাতেও চরম পরিণতির জন্য অপেক্ষা করুন। তাই বলি, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া সমুদ্রের ১ ফোঁটা পানির মতো। গোটা সমুদ্র আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাই ক্ষমার দরজা আল্লাহর কাছে খোলা। যে কাউকেই মহান আল্লাহ মাফ করতে সক্ষম। এদেশের মানুষ ৫৪ বছর ঠকেছে সব দলের কাছেই। আর ঠকতে চায় না। জুলাই ৩৬ শিখিয়েছে দেশে বা বিদেশের প্রভুরা কাউকে অন্যায় থেকে রক্ষা করতে পারে না। সব অন্যায়কারী দেশ থেকে পালিয়েছে- এমপি, মন্ত্রী, আমলা, বিচারপতি, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে গ্রামের মেম্বার পর্যন্ত।
তাই তো জামায়াত-শিবির দেশের জন্য দশের জন্য কাজ করে জুলাই ৩৬-এর পাওনা পেতে শুরু করেছে। দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসুতে শিবিরের প্যানেলের অভিনব বিজয় দেশ-বিদেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আসলে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ছাত্র-জনতার জন্য কল্যাণমূলক কাজ করলে তার ইতিবাচক ফল আল্লাহ দেবেনই, কোনো সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে জামায়াত ইতোমধ্যেই দেশের ৩০০ সিটে তাদের যোগ্য, শিক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত নমিনি ঘোষণা করেছে। তারা ঘরে ঘরে দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছেন ভালো লোকের নির্বাচনের জন্য। সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। রিকশাওয়ালা, পানের দোকানদার, ঠেলাওয়ালা থেকে শুরু করে সরকারি, বেসরকারি আমলা, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যবসায়ী; এমনকি বিদেশিদের কাছেও জামায়াত-শিবির প্রশংসা পাচ্ছে। আগামী যেকোনো নির্বাচনে মানুষ আর দুর্নীতিগ্রস্ত চাঁদাবাজ বা ভারতের গোলামদের ভোট দেবে না। নেতা নির্বাচন করবে না। আকাশে-বাতাসে রব উঠেছে সবাইকে দেখা শেষ এবার দাঁড়িপাল্লার পালা। আমার নিজেরও গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের ছোট থেকে বড় সবার থেকে মতামত নেয়ার সুযোগ হয়েছে এবং হচ্ছে তারা জামায়াতকে ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু ভালো পরিবেশ দরকার। আইনশৃখলা ঠিক রাখতে হবে। ইতোমধ্যে এলাকায় এলাকায় মারামারি শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। কোনো দলের অবৈধ আবদার রাখা যাবে না। সবার জন্য মাঠে সহাবস্থানের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।
খুশির খবর জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দল একমত হয়ে জুলাই সনদ সম্পর্কে তাদের মত প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছে এবং তারা এক বাক্সে ভোট দেবেন বলেও জানান দিয়েছে। যা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
পুলিশপ্রধান ইতোমধ্যেই তাদের কাজের উদ্যোগ নিয়েছেন আবার সতর্কও করেছেন অবৈধ চাপের। পুলিশের বেতন দেয়া হয় দেশের মানুষের টাকায়। তাই তাদের কোনো দলের পক্ষে কাজ করা যাবে না। এক্ষেত্রে একটা কথা মনে রাখতে হবে- একদিনে ৩০০ আসনে ভোট নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বিভাগওয়ারি ভোট হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সহজ হবে। মাত্র ৩ জন পুলিশ দিয়ে কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা আয়ত্তে আনা যাবে না। কমপক্ষে ১০ জন পুলিশ লাগবে একেকটি ভোট কেন্দ্রে। এছাড়া তো আনসার থাকবেই।
আবার ফিরে আসি জুলাই সনদের বৈধতার বিষয়ে। জুলাই সনদের বৈধতা না দিলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও বিপদে পড়বে। কারণ আমাদের সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার পদ্ধতি নেই। তাদের কাজকর্মও ভবিষ্যতে অবৈধ হয়ে যেতে পারে। তাই ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত কাজের বৈধতা দেয়ার জন্য জুলাই সনদ গণভোটে পাস করতে হবে। জনগণই দেশের সর্বোচ্চ মত দেয়ার মালিক। ইতোপূর্বে দেশে ৩ বার গণভোট হয়েছে, তাই এদিক-সেদিক না তাকিয়ে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, এ সরকারের স্বার্থে অনতিবিলম্বে গণভোটের আয়োজন করা হোক। কোনো দলের প্রতি দরদ না দেখিয়ে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত লোকদের সুচিন্তিত মত এবং সব দলের স্বাক্ষরযুক্ত সনদ গণভোট দিন। কেউ বড় দল বা ছোট নয়, দেশ সবার। সবাইকে আহ্বান জানান হ্যাঁ বা না ভোটে অংশগ্রহণ করতে। আমরা আশা করি, দেশের ছাত্র-জনতা যেভাবে ৫ আগস্ট মাঠে নেমেছিল, তার চেয়েও আনন্দঘন পরিবেশে হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হবে। দেশের কল্যাণ হবে। বর্তমান সরকারের মান অনেক উচ্চে উঠে যাবে। এর আলোকে জাতীয় নির্বাচন হলে দেশ রাহুমুক্ত হবে। আর ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর উদয় হতে পারে না।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]