নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর ব্যালটের মুদ্রণ নিয়ে অভিযোগের ভিত্তি নেই
২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:২৫
সোনার বাংলা রিপোর্ট: ডাকসু নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন দেশের সেরা মেধাবীরা। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা ছিলেন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে এমন দৃশ্যত কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি। তারপরও যারা হেরেছেন, তারা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মদদে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। কারণ এমন বিতর্ক দেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। সামনের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন, এতে এর প্রভাব পড়বে। তাই এমন বিতর্ক বন্ধ হওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সাদা দলের রিটার্নিং অফিসারদের বক্তব্য : নির্বাচনে পরাজিত ছাত্রদল, বাগছাসসহ বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা অভিযোগ জানিয়েছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এবারের ডাকসুতে ১০ রিটার্নিং অফিসারের মধ্যে ৮ জনই ছিলেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের মধ্যে ১৬টি হলের প্রাধ্যক্ষই সাদা দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া অধিকাংশ হলের রিটার্নিং অফিসাররাও সাদা দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে।
এ বিষয়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের রিটার্নিং অফিসার ও সাদা দলের কলা অনুষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বলেন, আমার চোখে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি। শিক্ষার্থীরা সেখানে অতিরিক্ত ভোট কাস্টের অভিযোগ করলেও আমরা কোনো ভোট জালিয়াতির প্রমাণ পাইনি।
সাদা দলের বিবৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, সাদা দল একটা নিউজের ওপর ভিত্তি করে এ বিবৃতি দিয়েছে। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা কোনো অনিয়মের অভিযোগ তোলেনি। ফজলুল হক মুসলিম হলের রিটার্নিং অফিসার ও সাদা দলের আরেক নেতা সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, রোকেয়া হল ও অমর একুশে হলের দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মোটাদাগে কোনো অনিয়ম হয়নি। হল সংসদে যারা বেশি ভোট পেয়েছে, ডাকসুতে তারাই জয়লাভ করেছে। হলের ভোটের একটা প্রতিফলন ডাকসুতেও দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, কোনো কারচুপির ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও বলেন, ভোটগণনার সময় আমরা যখন ব্যালট বিন্যস্ত করছিলাম, তখন সেখানে উপস্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট, সাংবাদিক ও হলের প্রভোস্টরা বুঝেছিলেন ফলাফল কী হবে। পরবর্তীতে সেটাই দেখা গেছে। ভোটগণনার পুরো প্রক্রিয়া সিসিটিভির মাধ্যমে সরাসরি দেখানো হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে সাংবাদিকদের সামনে ব্যালট বাক্স সিলগালা করা হয়েছে। তাই এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
সূর্যসেন হলের রিটার্নিং অফিসার ও সাদা দলের কলা অনুষদের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, নির্বাচনে সবকিছুই উন্মুক্ত ছিল। সবার সামনেই সবকিছু হয়েছে। ঠিকমতো ভোট কাস্টিং হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও ব্যালট পেপারের মধ্যেও কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা ঘটেনি। প্রতিটি কার্যক্রম অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমান হলের রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. শেখ মু. ইউসুফ বলেন, আমি একবাক্যে বলতে পারিÑ নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়নি। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
উদয়ন কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কেন্দ্রীয়ভাবে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যই আমাদের বক্তব্য। আমার এর বাইরে বিশেষ কিছু বলার নেই।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল
গত ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন হয়। ভোটার ছিল ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন। নির্বাচনে ডাকসুর ২৮টি পদের ২৩টিতে জিতেছে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। প্রচারের শুরু থেকে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল।
তদন্ত চলছে, জবাব দেওয়া হবে
অরক্ষিত অবস্থায় ব্যালট ছাপানো নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি বিতর্ক শুরু হলে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘যে ওএমআর মেশিনে স্ক্যানিং করে ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ সম্পন্ন করা হয়, তা নীলক্ষেতের কোনো দোকানে সম্ভব নয়। সুতরাং যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ করা হয়েছে, তাতে এটি অরক্ষিত থাকার সুযোগ নেই। এছাড়া নির্বাচনের আগে-পরে বা গণনার সময়ও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট, পর্যবেক্ষক, সাংবাদিকসহ কেউই এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেননি। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর ব্যালট পেপারের মুদ্রণ নিয়ে অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে না।’
নির্বাচনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্নগুলো আসা উচিত। ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় প্রত্যেক প্যানেলের প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক, শিক্ষক সবাই ছিলেন।
কিন্তু ব্যালট নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর আরেক বিজ্ঞপ্তিতে ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেছেন, ব্যালট পেপার-সংক্রান্ত অভিযোগটি নির্বাচন কমিশন অতীব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করছে। শিগগিরই একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হবে। ব্যালট বিতর্ক শুরু হওয়ার আগে ১৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর নির্বাচিত নেতারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে তাঁরা কাজও শুরু করেছেন।
ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ব্যালট নীলক্ষেতে ছাপানোর বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, নীলক্ষেতে কাটিং শেষে প্রি-স্ক্যান ও পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তারা তাদের মূল অফিসে এনে প্রি-স্ক্যান সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট পরিমাণে প্যাকেটে ভরে সিলগালা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরবরাহ করে। তারা ব্যালট প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়ায় ও আনা-নেওয়ায় চুক্তি মোতাবেক সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
ভিসি বলেন, ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি নীলক্ষেতে ২২ রিম কাগজ দিয়ে ৮৮ হাজার ব্যালট ছাপায়। যা থেকে প্রিন্টিং, কাটিং, প্রি-স্ক্যান পর্ব শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যালট প্যাকেটে সিলগালা করে ৮৬ হাজার ২৪৩টি ব্যালট সরবরাহযোগ্য করা হয় এবং অতিরিক্ত ব্যালটগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে নষ্ট করে ফেলা হয়।
তিনি বলেন, ব্যালট পেপার ছাপানোর স্থান বা সংখ্যা সুষ্ঠু নির্বাচনকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে না। কারণ ব্যালট পেপার ভোটের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ব্যালট পেপারটি ছাপানোর পর তা নির্দিষ্ট পরিমাপে কাটিং করতে হয়। তারপর সুরক্ষা কোড আরোপ করে ওএমআর মেশিনে প্রি-স্ক্যান করে তা মেশিনে পাঠযোগ্য হিসেবে প্রস্তুত করতে হয়। এরপর চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তার সিলসহ স্বাক্ষর ও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত হলেই তা ভোটগ্রহণের জন্য উপযুক্ত হয়। এ সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই পূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে।
ভিসি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে ২ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৪টি ব্যালট ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়। মোট ভোটার ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন এবং ভোটার প্রতি ৬টি ব্যালট ছিল। মোট ভোট দিয়েছেন ২৯ হাজার ৮২১ জন ভোটার। মোট ব্যালট ব্যবহার করা হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৬টি। অবশিষ্ট ব্যালট ৬০ হাজার ৩১৮।
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভোটারদের স্বাক্ষরিত তালিকার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। এ বিষয়ে ইতোপূর্বে আমরা বিস্তারিত জানিয়েছি যে, কোনো প্রার্থী যদি সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের বা কোনো একটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা পর্যালোচনা করার জন্য সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চান, তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা মনোনীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত কোনো স্থানে তা দেখতে বা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
ভোটারদের স্বাক্ষরযুক্ত ভোটার তালিকা দেখানোর বিষয়ে ভিসি বলেন, আমরা পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে তারা বলছেন, কোনো প্রার্থী যদি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণে নির্দিষ্ট কারো স্বাক্ষর পর্যবেক্ষণ করতে চায় সেক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা মনোনীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে দেখানো যেতে পারে।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ‘নির্বাচনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্নগুলো আসা উচিত। ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় প্রত্যেক প্যানেলের প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক, শিক্ষক সবাই ছিলেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সাদা দলের (বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন) শিক্ষকরা ছিলেন, পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন শিক্ষক নেটওয়ার্কের শিক্ষকরাও। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকলে তাঁরা সেটা বলতে পারেন। যথাযথ প্রশ্ন থাকলে প্রশাসনের উচিত সেগুলো অ্যাড্রেস (জবাব দেওয়া) করা। কিন্তু টু দ্য পয়েন্ট (সুনির্দিষ্টভাবে) প্রশ্ন না করে বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের মতামতকে সম্মান না করার প্রবণতাটাকে আমরা একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখব।’