২১ শতকের বিজ্ঞানে মুসলমানদের সৃজনশীল অবদান
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৬
॥ এইচ এম জোবায়ের ॥
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবসভ্যতার অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। ইসলামের ইতিহাসে একসময় মুসলিম বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন ও প্রকৌশলে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইবনে সিনা, ইবনে হাইসম, আল-বিরুনী কিংবা আল-খওয়ারিজমির মতো মহিরুহদের আবিষ্কার ও গবেষণা আজও বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে আছে। তবে প্রশ্ন জাগে- বর্তমান সময়ের মুসলমানরা কতটুকু অবদান রাখছেন আধুনিক বিজ্ঞানে? হ্যাঁ, আধুনিক যুগেও মুসলমানদের অবদান কম নয়। যদিও সংখ্যার বিচারে এখনো তা পর্যাপ্ত নয়, তবুও বিশ্বমানের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে মুসলমানদের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলিম গবেষক ও চিকিৎসকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সার জাফরুল্লাহ চৌধুরী লিভার ও কিডনি রোগে বিশেষ গবেষণা করেছেন। নোবেল বিজয়ী ড. আবদুস সালাম যদিও পদার্থবিজ্ঞানে বিখ্যাত, তবুও তাঁর গবেষণা চিকিৎসা প্রযুক্তিতেও প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিককালে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মুসলিম বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন ও টিকা উন্নয়নে অংশ নিয়েছেন। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ড. নাজহববহ রহমান জেনেটিক ক্যান্সার গবেষণায় বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসী কাদরি কলেরা ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। ইরানি বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল, ন্যানোমেডিসিন ও টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করছেন।
পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন
নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি পদার্থবিজ্ঞানী ড. আবদুস সালাম (১৯৭৯) গ্ল্যাশো ও ওয়েইনবার্গের সঙ্গে যৌথভাবে ইলেক্ট্রোউইক থিওরি উদ্ভাবন করেন, যা আধুনিক কতাভৌত বিজ্ঞানের মূল স্তম্ভ। এই তত্ত্বের মাধ্যমে দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎচুম্বকীয় বলকে একটি একক বল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই তত্ত্ব বিজ্ঞানের জগতে মৌলিক বলগুলোকে একীভূত করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল, যা কতা পদার্থবিদ্যার ধারণাকে বদলে দেয়।
সৌদি আরব, কাতার ও ইউএইতে স্থাপিত গবেষণা কেন্দ্রগুলোয় মুসলিম পদার্থবিজ্ঞানীরা শক্তি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও ন্যানো-সায়েন্সে কাজ করছেন। এসব দেশ তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোয় রসায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বড় আকারে বিনিয়োগ করছে।
প্রযুক্তি ও প্রকৌশল
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় মুসলমানরা পিছিয়ে থাকলেও উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবদুল মবিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিংয়ে গবেষণা করছেন। তুরস্কে ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে সেলচুক বাইরাকতার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যিনি ‘বাইরাকতার ড্রোন’ তৈরি করে বিশ্বে সাড়া ফেলেছেন, যা এটি একটি উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন সামরিক ড্রোন যান। এটি নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং বোমা বর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি একটি লড়াইয়ে সক্ষম ড্রোন, যা সামরিক অপারেশনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি দীর্ঘক্ষণ ধরে আকাশে উড়তে পারে, দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনে নিজস্ব অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আক্রমণও করতে পারে। এই ড্রোনটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি, যার ফলে এটি সামরিক ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার গবেষকরা সাইবার সিকিউরিটি ও এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় কাজ করছেন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তরুণ প্রোগ্রামাররা আইসিটি খাতে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করছেন এবং বিশ্বজুড়ে আউটসোর্সিং শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা
ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে আধুনিক গবেষণা চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২০ সালে ‘হোপ প্রোব’ (Hope Probe) মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে আরব বিশ্বের প্রথম মহাকাশ মিশন সম্পন্ন করে। এতে বহু মুসলিম বিজ্ঞানী সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে. মুসলিম দেশগুলোও মহাকাশ গবেষণায় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তুরস্ক ২০২৮ সালের মধ্যে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরি ও নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। ইরান সফলভাবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে এবং মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি করছে।
পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন
পরিবেশ বিজ্ঞান ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মুসলিম গবেষকরা অবদান রাখছেন। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. সেলিমুল হক আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি)’-এর পরিচালক ছিলেন। ২০২২ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ তাকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা জলবায়ুু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তার অবদানের জন্য ছিল। তিনি পরিবেশ ও জলবায়ুু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তিনি জলবায়ুু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নে কাজ করে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলো ছড়িয়েছেন।
পরিবেশ ও জ্বালানি গবেষণা
মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন, সৌরশক্তি ও পানি-সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে মনোযোগ দিচ্ছে। সৌদি আরবের KAUST (King Abdullah University of Science and Technology) বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কোসহ অনেক মুসলিম দেশেই বিজ্ঞানীরা সৌরশক্তি প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী ও কার্যকর করার গবেষণা করছেন। কাতার ও তুরস্কের গবেষকরা বায়ুশক্তি ও সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনে নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম বিজ্ঞানীরা কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের গবেষকরা বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত গবেষণা করেছেন। মিশরের গবেষকরা বর্জ্য থেকে জ্বালানি (Waste-to-Energy) রূপান্তরে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। ইরানের বিজ্ঞানীরা পরিবেশবান্ধব ন্যানো-টেকনোলজি ব্যবহার করে পানি ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। মরক্কো ও তিউনিসিয়ার গবেষকরা কৃষিতে সৌরশক্তি ও জৈব জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশে মুসলিম গবেষকরা লবণাক্ত সহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খাদ্য সংকট মোকাবিলায় অবদান রাখছেন। ড. হায়াত সিন্দি (সৌদি আরব) পরিবেশবান্ধব বায়োসায়েন্স ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজের জন্য পরিচিত। ড. সালিমুল হক (বাংলাদেশ) জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম বিজ্ঞানী।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলমান হলেও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মুসলিম বিজ্ঞানীর সংখ্যা হাতে গোনা। মুসলিম বিশ্বের বহু দেশেই শিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গবেষণা তহবিলের সংকট এবং মেধা পাচার (Brain Drain) মুসলিম বিজ্ঞানীদের অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মুসলিম বিশ্বে ভালো গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চেয়ে ‘মসনদ’ দখল ও টিকে থাকার দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়। এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রেরও অংশ বটে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান মুসলিম বিজ্ঞানীরা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয় অবদান রাখলেও সামগ্রিকভাবে মুসলিম বিশ্বকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে। প্রাচীন গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলে মুসলিম দেশগুলোকে শিক্ষায় বিনিয়োগ, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই আধুনিক বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নেতৃত্বে রূপ নেবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক।
[email protected]