অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:০২
দেশে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সেনাবাহিনী
সোনার বাংলা ডেস্ক : ঠিক বাংলাদেশি স্টাইল। গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ সশস্ত্র বাহিনীর বিমানে যেভাবে দেশ ছেড়ে মিত্রের বাড়ি গিয়ে উঠেছেন, একইভাবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। রাজধানীর কাঠমান্ডুতে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে ১৯ জন নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, তিনি দুবাই গেছেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। কেপি শর্মার পদত্যাগের পরও শান্ত হয়নি নেপাল। আগুন দেওয়া হয়েছে পার্লামেন্ট ভবন, মন্ত্রীদের বাসভবন এবং অনেক সরকারি স্থাপনায়। জনরোষ থেকে রেহাই পায়নি মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের বাসভবন ও পার্টি অফিস। বিক্ষোভকারীরা দেশটির সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে হামলা করেছে। বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝালানাথ খানালের স্ত্রী রাজ্যলক্ষ্মী চিত্রকর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা এবং তার স্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার ওপরও হামলা চালিয়েছে তারা। অর্থমন্ত্রীকে মারধরের ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এদিকে সংবিধান মেনে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার পাশাপাশি ভাঙচুর থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। রাতে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, নেপালের সার্বিক নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে সেনাসদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়েছেন। রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল। এ সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন ত্যাগ করে সংলাপে বসার আহ্বান জানান। খবর কাঠমান্ডু পোস্ট, দ্য হিমালয়ান, রয়টার্স, আলজাজিরা, আনন্দবাজার পত্রিকার।
গত ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আকস্মিকভাবে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের খবর আসে। এতে উল্লাসে রাজধানীর সড়কে নেমে আসে দেশটির সাধারণ জনতা। দখলে নেয় প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের বাসভবন। এ সময় শহরের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিক্ষোভকারীদের হাতে। লুটপাট, ভাঙচুর করে মন্ত্রীদের বসতবাড়িগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। অবশ্য এটা জনতার দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। লাগামহীন দুর্নীতি ও তরুণদের কণ্ঠরোধ করতে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেয় সরকার। যার প্রতিবাদেই এ বিক্ষোভের ডাক দেয় দেশটির তরুণ প্রজন্ম। ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ মুহূর্তের মধ্যেই বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয়, যা অল্প সময়ের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের প্রথম দিনই পুলিশের গুলিতে ২০ জন নিহত হন। এতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে পদত্যাগ করেন দেশটির কৃষিমন্ত্রী। এর আগে পদত্যাগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী কেপি অলির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল। আপদকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর কাছে দেশের দায়িত্ব তুলে দেন তিনি।
ভৈসেপাতিতে অবস্থিত নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের গভর্নর বিশ্ব পাউডেলের বাসভবনেও হামলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বুড়ানিলকণ্ঠায় অবস্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা এবং তার স্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার ওপরও হামলা চালিয়েছে। হামলার পর প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সাবেক মন্ত্রীর মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। কর্তৃপক্ষ দেউবা ও আরজুকে উদ্ধার করার আগেই তাদের বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং সরকারি ভবনগুলো ছাড়াও দলীয় কার্যালয় ও পুলিশ স্টেশনও বিক্ষোভের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভের আগুন থেকে রক্ষা পায়নি নেপালের সবচেয়ে বড় মিডিয়া গ্রুপ কান্তিপুর পাবলিকেশন। এতে কাঠমান্ডু পোস্টের সার্ভার ডাউন হয়ে যাওয়ায় এর পেজ অফলাইন হয়ে গেছে। পত্রিকার পক্ষ থেকে এক্স বার্তায় বলা হয়েছে হামলার কারণে সার্ভার ডাউন হওয়ায় কোনো প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যাচ্ছে না। সামাজিক মাধ্যমে এর সব আপডেট দেওয়া হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু প্রসাদ পাউডেলকেও কাঠমান্ডুর রাস্তায় ধাওয়া করেছে। এক ভিডিওতে দেখা গেছে, এক তরুণ বিক্ষোভকারী মন্ত্রীর দিকে ছুটে গিয়ে তাকে লাথি মারছে, এতে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে একটি লাল দেওয়ালে আছড়ে পড়েন। হিমালয়ান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিংহ দরবার, ফেডারেল পার্লামেন্ট, সুপ্রিমকোর্ট, বিশেষ আদালত, জেলা আদালত, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, ভূমি রাজস্ব অফিস এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও কার্যালয়ে আগুন এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিরোধী দল সিপিএনের (মাওইস্ট সেন্টার) চেয়ারম্যান পুষ্পকমল দহলের খুমালতার বাসভবনেও ইটপাটকেল ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। স্থানীয় সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, প্রশাসন কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন জেলায় মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক মন্ত্রী ও অন্য নেতাদের বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা ভারতীয় গণমাধ্যমের
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত তিন বছরে ঘটেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট, পাকিস্তানে ইমরান খানের পতন থেকে শুরু করে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন- সব ক্ষেত্রেই এক পরিচিত দৃশ্য দেখা গেছে গণবিক্ষোভে সরকারের পতন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো নেপাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারির পর শুরু হওয়া আন্দোলনে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২২ জন। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নামলেও দ্রুতই আন্দোলন রূপ নেয় দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে। একপর্যায়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি ও রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাওডেল। সূত্র বলছে, অলি দেশ ছেড়ে দুবাই পালানোর পরিকল্পনা করছেন।
বিক্ষোভকারীরা ‘কেপি চোর, দেশ ছাড়’ স্লোগান দিতে দিতে রাজধানীতে তাণ্ডব চালায়। অলি, রাষ্ট্রপতি পাওডেল ও মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজনের ব্যক্তিগত বাসভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রুলিং পার্টির এক নেতার মালিকানাধীন কাঠমান্ডুর বিখ্যাত হিলটন হোটেলও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক সংকট বা নির্বাচনী বিতর্ক, পরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন- এভাবেই জনরোষে ঘেরাও হয় রাষ্ট্রপতির বাসভবন থেকে শুরু করে মন্ত্রীদের বাড়ি। শ্রীলঙ্কার গোতাবায়া রাজাপাকসে পালান মালদ্বীপে, আর বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা পালান ভারতে।
নেপালে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা
২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে প্রজাতন্ত্র হওয়ার পর থেকে নেপালে একের পর এক সরকার পরিবর্তন হয়েছে। গত ১৭ বছরে গঠিত হয়েছে ১৪টি সরকার, বেশিরভাগই জোট সরকার। বর্তমান প্রজন্ম ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বেকারত্বে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনধারার বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘নেপো কিড’ আন্দোলন। অলি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে। তিনি চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রথম বিদেশ সফরে যান বেইজিংয়ে, যা প্রচলিত রীতি ভেঙে দেয়। সাধারণত নেপালি নেতারা প্রথম সফরে ভারত যান। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দিয়ে নেপাল ৪১ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পায়।
ভূ-রাজনীতির ছায়া
চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ট্রাম্প প্রশাসন নেপালকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কমপ্যাক্ট’ প্রকল্পে ফিরিয়ে আনে। এতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পায়। অলি চীনের বিজয় দিবস প্যারেডে অংশ নেওয়ার পর থেকেই তাকে স্পষ্টতই মার্কিনবিরোধী শিবিরে দেখা হয়। ফলে অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের মতো নেপালেও যুক্তরাষ্ট্র পর্দার আড়াল থেকে পরিবর্তনের খেলায় নেমেছে। বিশ্লেষক এসএল কান্তনের ভাষায়, ‘এটি শতভাগ মার্কিন প্রভাবিত বিপ্লব’। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে সঙ্গে চীন-আমেরিকার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। প্রশ্ন উঠছে নেপাল কি আরেকটি ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো?