আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্য


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:৪৮

॥ শরীফ আবদুল গোফরান ॥
দেশ আর জাতের সীমানায় শিশুর জন্ম হয় বটে। আসলে শিশুর কোনো জাত নেই। তার মনটাই তার স্বদেশ। সব শিশুই এক। যুক্তি না মানাই তার স্বভাব। সম্ভব-অসম্ভবের সীমা ডিঙিয়ে নিরুদ্দেশ উড়ে বেড়ানোই তার প্রকৃতি। ভূগোল-ইতিহাসের সে ধার ধারে না। তেপান্তরের অস্তিত্ব থাক বা না থাক তার, ওপর দিয়ে পঙ্খীরাজ ঘোড়া ছোটাতে তার আনন্দের কোথাও কমতি পড়ে না। পঙ্খীরাজ ঘোড়া সে জীবনে কখনো দেখেনি, দেখবেও না। তবুও তাতে চড়ে উড়ে যেতে তার কী অসীম আনন্দ। এ আনন্দ মনের আনন্দ, মনের আয়নায় ছবি দেখার আনন্দ। আনন্দের কোনো তুলনা নেই।
আসলে শিশু বাইরের চোখ দিয়ে যা দেখে, তার হাজারগুণ বেশি দেখে মনের চোখ দিয়ে। তার মন ছবি দেখার কাঙাল। নতুন নতুন ছবি, অসম্ভব আজগুবি সব ছবি। তাই শিশুসাহিত্য শিশুদের এত প্রিয়।
শিশুসাহিত্য সবাই লিখতে পারে না। আর ইচ্ছা করলেও লেখা যায় না। তাই বহু প্রতিভাবান লেখকও ভালো শিশুসাহিত্য লিখতে পারেননি। মনের একটা বিশেষ মুডেই শিশুসাহিত্য রচনা করতে হয়। সে মুডটি সকলের সহজে আসে না। মন দিয়েই শিশুসাহিত্য রচনা করতে হয়। তাই শিশুর মতোই হতে হয় শিশুসাহিত্যেকের মন। যে মন হবে শরতের আকাশের মতো। সেখানে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলানো যুক্তি অর্থের বাঁধন ছিঁড়ে উধাও হতে পারা। এককথায় শিশু মনের স্বপ্ন, কল্পনা আর ইচ্ছার খুব কাছাকাছি নেমে এসে একজন লেখক যখন সাহিত্য রচনা করেন, তিনি বয়স্ক হলেও শিশুর মতোই সরল হয়ে যান। তার হালকা চটুল ও ক্ষিপ্র উচ্চারণে আমরা স্পর্শ একটি দোলা অনুভব করি। সেদিক থেকে বলতে পারিÑ বয়স্কদের শিশুপনা এবং এ কথাটাও ঠিক, শিশুপনার জোরেই শিশুসাহিত্যের মাধ্যমে আমরা ছোটদের খুব নিকট পৌঁছে যাই। এক্ষেত্রে শিশুসাহিত্য হলো বুদ্ধিমানের ‘সরলতা’। আমাদের দেশে শিশু সাহিত্য রচনা করতে হলে, শিশু মনের কথামালা শিশুদের উপযোগী করে উপস্থাপন করতে হয়। এক্ষেত্রে সহজেই শিশু মনোজগতে প্রবেশ করে শিশুদের আগ্রহ, আনন্দ ও বেদনার কারণগুলো খুঁটে খুঁটে বের করে তা তাদের উপযোগী করে উপস্থাপন করতে হয়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, শিশুসাহিত্য রচনা করা অত সহজ নয়। এর জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। শিশুসাহিত্য শিক্ষামূলক ও তথ্যবহুল। কারণ শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের চরিত্র গঠনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষামূলক শিশুসাহিত্যের। শিশুরা যদি শৈশবকাল থেকে যথাযথ শিক্ষা না পায়, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ এক তমসাচ্ছন্ন অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
সাহিত্যের যে অংশ বা শাখা শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য রচিত, আমরা তাকেই বলতে পারি শিশুসাহিত্য। মানুষ যখন থেকে পড়তে শিখেছে, তার বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করা শুরু করেছে, শিশুসাহিত্যের জন্ম তারও অনেক আগে। মায়ের কোল থেকেই শিশু পরিচিত হয় তার সাহিত্যের সাথে। মুখে মুখে শোনা অজস্র গান ও ছড়াই তার এ সময়কার সাহিত্য। হোক না সেই ছড়া বা গান অর্থহীন, তবুও শিশুরা তা শুনে তৃপ্তিবোধ করে। দাদির কোলে শুয়ে শুয়ে ঐ সব ধ্বনি ও সহজ ছন্দের মাধুর্যে একসময় তৃপ্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে শিশু। রাতে যখন কোনো শিশু কান্না জুড়ে দেয়, তখন মা আকাশের চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে শিশুর দৃষ্টি ঐদিকে ফিরিয়ে ছড়া কাটে। দেখা যায় এরই মাঝে শিশুটি কান্না বন্ধ করে দিয়েছে। শিশুটি হয়তো ছড়াটির মর্ম বুঝতে পারেনি, কিন্তু মায়ের মুখে ছড়াটি এত ভালো লেগেছে যে, একসময় সে খিল খিল করে হেসে ওঠে। আবার নিজে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে চাঁদ মামাকে ডাকে। আয় আয় করে। তার অবুঝ মন যেন কত কিছু না ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে।
শিশুসাহিত্য শিখতে গিয়ে নিজেকে কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যেতে হয়। হাওয়ার পাখায় ভর করে উড়ে যেতে হয় আকাশে। সখ্য গড়ে তুলতে হয় চাঁদের বুড়ির সাথে। একসময় পরীর রাজ্যেও যেতে হয়। কল্পনায় ঘুরে বেড়ানো যায় সারা পৃথিবী। গভীর রাতে পথ চলতে চলতে একসময় ভূতের সাথেও দেখা হয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে ভূতের সামনে গিয়ে কথা বলতে হয়। একসময় ভূতের সাথে সম্পর্কও হয়ে যায়। বন্ধুর মতো ভূতটি পাশে বসে বসে কত দুঃখের কথাই না বলে। আমাদের বড় বড় মনীষীদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তারা সবাই ছোটবেলায় গল্পের রাজ্যে হারিয়ে যেতেন। দাদির কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে এ ধরনের কত গল্পই না শুনেছেন। সপ্তডিঙ্গা সাজিয়ে চলে যেতেন হাতেম তাইয়ের দেশে। সেখানে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। ফেরার সময় অনেক স্বর্ণ, মুক্তা নিয়ে পুনরায় নিজ দেশে ফিরে আসতেন। পরিণত বয়সে এসব মনীষী দাদুর কাছে শোনা ওসব কল্পকথাকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে রচনা করেছেন শিশুসাহিত্য। দুনিয়াব্যাপী এ ধরনের শিশু সাহিত্য রচনা হয়ে আসছে।
সব দেশের শিশুরাই শিশুসাহিত্যের সাথে পরিচিত। দেশে দেশে, কালে কালে হয়তো শিশুসাহিত্যের কিছুটা রূপান্তর আমরা লক্ষ করি, কিন্তু মূলে সারা দুনিয়ায় শিশুসাহিত্য এক ও অভিন্ন।
বাংলাদেশের সাহিত্যের যে কটি শাখা সবচেয়ে পুষ্ট এবং জনপ্রিয়, শিশুসাহিত্য সেগুলোরই একটি। জন্মলগ্নে এর অবস্থা ছিল রীতিমতো করুণ। যেমন গুণের বিচার, তেমনি পরিমাণের দিক থেকেও। ভারত বিভাগের পর ক্রমে নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষের মাধ্যমে এবং কিছুসংখ্যক সাহিত্যকর্মীর অদম্য উৎসাহ আর সৃষ্টির প্রয়াসে অল্পকালের মধ্যেই ঘটতে থাকে গুণে-মানে পরিমাণে বাংলা শিশুসাহিত্যের পুষ্টি লাভ আর অগ্রগতি। এ কাজে যারা প্রধান শিশুসাহিত্যকর্মী ছিলেন, তাদের নাম শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু তাই নয়, আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসেও তারা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের জন্ম মূলত ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে। উপমহাদেশের তৎকালীন শাসক ইংরেজদের এক প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাবার উদ্যোগের ফলে যে সৃজনকর্ম শুরু হয়, তাতে প্রধান ভূমিকা ছিল কিছু ইংরেজ মনীষীর এবং সময়কালীন বাঙালি লেখকদের। পরবর্তী পর্যায়ে কয়েক দশকের মধ্যেই ইংরেজ তথা খ্রিস্টান লেখকদের সংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে শূন্যের কোটায় নেমে আসে। ততদিনে বাঙালি লেখকরা নিজেদের জাতীয় দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। শিশুসাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও তখন ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন। যদিও শিশুসাহিত্য তখনো অনেকাংশেই ছিল শিশু এবং বয়স্কদের যৌথ ভোগের বিষয়।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আমরা শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে থাকি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে শিশু সাহিত্যের পরিধিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রকাশিত হতে শুরু করে শিশুসাহিত্য প্রকাশে সহায়ক বেশকিছু শিশু-কিশোর পত্রিকা। যেমন দাদা ভাই প্রকাশ করতেন ‘কচিকাঁচা’, যা পরবর্তীতে ইত্তেফাকের পাতায় স্থান পেয়েছে। অবজারভার ভবন থেকে প্রকাশিত হতো, ‘কিশোর বাংলা’। সর্বশেষ এ পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন রফিকুল হক দাদু ভাই। ‘মাসিক ফুলকুঁড়ি’ সম্পাদনা করতেন মাসুদ আলী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হতো ময়ূরপঙ্খী, সপ্তডিঙ্গা, সাম্পান ও মাসিক সবুজপাতা। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হতো ধানশালিক। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত হতো ‘শিশু’। চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত হতো ‘নবারুন’। পরবর্তীতে শিল্পী সবিউল আলমের তত্ত্বাবধানে টইটম্বুর। মাসিক কিশোর কণ্ঠ, যা বর্তমানে কবি মোশাররফ হোসেন খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। যতটুকু জানা যায়, প্রচার সংখ্যার দিক থেকে এ পত্রিকা সবার শীর্ষে। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি শিশুসাহিত্যের রাজপথে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে। এসব সাহিত্য পত্রিকা ও বিভিন্ন শিশু-কিশোর সংগঠনের সাহিত্য সভার সহযোগিতায় প্রচুর শিশুসাহিত্যিকের জন্ম হয়, যা আজ ফুলেফলে ভরপুর হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের বাঁকে বাঁকে।
ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর প্রকাশনা সংস্থার জন্ম হয়েছে। এসব সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে শত শত বই। পুরনো ধাঁচের সমাপ্তি ঘটিয়ে শিশুসাহিত্য আজ আধুনিকত্বে রূপ নিয়ে এক বিশাল রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তবে একটা কথা স্বীকার করতে হয়, তা হলো সত্তর দশকে শিশুসাহিত্যের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, আশির দশকেও তার ধারাবাহিকতা লক্ষ করা গেছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে একেবারে ভাটা পড়ে যায়। এর জন্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অধঃপতন এসবও দায়ী। শুধু শিশুসাহিত্যে নয়, এমনকি বড়দের সাহিত্যেও একটা ঝিমুনি ভাব আসে, যা আজও অব্যাহত আছে। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। চলতি শতাব্দীতে আমাদের শিশুসাহিত্যে কোনো দক্ষ তীরন্দাজের আবির্ভাব হতেও পারে। সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করার সময় তাই এখনো কিঞ্চিত বাকি।
তবে আমরা আশাবাদী, শিশুসাহিত্যে আগামী পৃথিবী আরো নতুনত্বে ভরে উঠবে। আমরা হয়তো সময়োত্তীর্ণ শিশুসাহিত্যিকদের লেখা পাবো আগামী দশকের প্রারম্ভে এবং সেটা পেলেই আমাদের শিশুসাহিত্যের মোড় একসময় ঘুরে যাবে। একসময় আমাদের শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হতো চীন বা রাশিয়ার বই-পুস্তক। বর্তমানে আমাদের দেশে কিছু কিছু সংস্থা শিশুদের উপযোগী সাহিত্য প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। তবে যে হারে শিশু সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে সাহিত্য বাড়ছে না।
১৯৭১ সালের পর থেকে শিশুসাহিত্য প্রকাশনার ক্ষেত্রে কিছু কিছু প্রকাশনা সংস্থা অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এ প্রকাশনাগুলো বর্তমান শিশুসাহিত্যের প্রয়োজন মেটাতে না পারলেও সময় অনুযায়ী যথেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছে।
শিশুসাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে শিশু একাডেমির ভূমিকা অনেক। শিশু একাডেমিরে জন্মের পর থেকেই শিশুসাহিত্যের ওপর যথেষ্ট কাজ করা হয়। প্রকাশিত হয় বিভিন্ন লেখকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত নানারকম বই। প্রকাশিত হয়ে আসছে ছোটদের পত্রিকা ‘শিশু’, ফলে এসবের মাধ্যমে শিশুসাহিত্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটে।
এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের বই ঘরের অবদানও কম নয়। বইঘর শিশুদের উপযোগী বই প্রকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ‘টাপুর-টুপুর’ নামে সুন্দর একটি শিশু পত্রিকা প্রকাশ করতো তারা। সম্পাদনা করতেন শিশুসাহিত্যিক এখলাস উদ্দিন আহমেদ।
শিশুসাহিত্য প্রকাশনার ক্ষেত্রে ঢাকার মুক্তধারার অবদানও কম নয়। মুক্তধারাও যথেষ্ট ভূমিকা রেকেছে শিশুসাহিত্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও। তাছাড়া আরো বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থা ও শিশুসাহিত্য বিকাশে যথেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছে। যেমন কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, ঝিঙ্গেফুল, সূচিপত্র। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শিশুসাহিত্য যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তার মানগত দিক ঠিক রেখে শিশুসাহিত্যিকরা পথ চলছে আগামীতে তা একটি শক্তিশালী সাহিত্য হিসেবে পরিগণিত হবে। ইতোমধ্যেই বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি।
লেখক : কবি।