নবী নন্দিনী হজরত ফাতিমা (রা.)
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:৩৬
॥ মনসুর আহমদ ॥
হজরত ফাতিমা (রা.) ছিলেন ইসলামের মহানবী মুহাম্মদ সা. এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার কন্যা। তিনি মুসলিম নর-নারীর কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত। মক্কায় কুরাইশদের দ্বারা তার পিতার ওপর নির্যাতন ও দুর্দশার সময় ফাতিমা (রা.) সবসময় তার পাশে ছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি মুহাম্মদ সা.-এর চাচাত ভাই আলি ইবনে আবি তালিবের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের চারটি সন্তান হয়। তাঁর পিতা হজরত মুহাম্মদ সা.-এর পরলোকগমনের কয়েক মাস পরেই তিনি পরলোকগমন করেন এবং মদিনার জান্নাতুল বাকিতে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তবে তার কবর অচিহ্নিত রয়েছে।
জন্ম : হজরত ফাতিমা (রা.) ৬০৫ সালে মক্কায় খাদিজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মদিন সম্পর্কে নানা মতভেদ আছে, তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতে, তিনি প্রথম কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পাঁচ বছর পর কাবাঘর সংস্কারের সময় ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন জয়নব, রুকাইয়াহ এবং উম্মে কুলসুমের পর মুহাম্মদ সা.-এর চতুর্থ কন্যা। মাতা হজরত খাদিজা তাঁর অন্য সন্তানদের জন্য ধাত্রী রাখলেও ফাতিমাকে ধাত্রীর হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিজের কাছে রেখে স্বীয় তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করেন।
হজরত ফাতিমার ইসলাম গ্রহণ : রাসূল মুহাম্মদ সা.-এর নবুয়্যত লাভের পরপরই ফাতিমা তার মা খাদিজার ও অন্যান্য বোনদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের প্রথম ভাগের নারীদের সাথে বাইয়াত লাভ করেন। হজরত আয়েশা, ইমাম আয যুরকানি তার শারহুল মাওয়াহিবত গ্রন্থে এ মতকে গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন, ফাতিমার চারিত্রিক গুণাবলি পরিস্ফুটনের ক্ষেত্রে খাদিজার স্পষ্ট অবদান রয়েছে।
শৈশবকাল : শৈশব থেকেই হজরত ফাতিমা (রা.) তাঁর পিতা মুহাম্মদ সা.-এর ধর্ম সম্পর্কে বুঝতে পারতেন, তাঁর পিতার কষ্ট দেখে তিনিও কষ্ট অনুভব করতেন। একদিন মসজিদে নববীতে সিজদা থাকা অবস্থায় কুরাইশ নেতাদের আদেশে উকবা ইবনে আবু মুয়াত মুহাম্মদ সা.-এর পিঠে উটের পচা-গলা নাড়ি-ভুঁড়ি উঠিয়ে দিয়েছিল, ফাতিমা এ ঘটনা শুনতে পেয়ে দ্রুত এসে তাঁর পিতার পিঠ থেকে এসব পচা নাড়িভুরি নামিয়ে দেন ও পরিষ্কার করে দেন। এরপর ফাতিমা কুরাইশ নেতাদের সাথে ঝগড়া করেন। এ ঘটনা মুহাম্মাদ সা.-এর জন্য অনেক পীড়াদায়ক ছিল; কষ্টের ছিল। তিনি কাফিরদের অভিশাপ দিয়েছিলেন এবং তৎপরতার ভূমিকার জন্য ফাতিমার প্রশংসা করেছিলেন।
কিশোর বয়সে ফাতিমা পিতার হাত ধরে কাবার প্রাঙ্গণে গিয়েছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ সা.কে একা পেয়ে হাজরে আসওয়াদের নিকটে কাফেররা তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং বিভিন্ন কটু কথা বলে মুহাম্মদ সা.কে উত্তেজিত করতে থাকে। হেনস্থার এক পর্যায়ে আক্রমণ করে মুহাম্মদ সা.-এর দাড়ি ধরে টানাটানি করতে থাকে ও চাদর গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস লাগাতে শুরু করে। এমনকি এক পর্যায়ে মুহাম্মদ সা.-এর মাথায় আঘাত করে, ফলে মাথা ফেটে রক্তস্নাত হয়ে যায়। এই ঘটনা দেখে ফাতিমা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যান। সেইদিন আবু বকরের সাহায্যে মুহাম্মদ সা. ও রাসূলের মেয়ে ফাতিমা শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি পায় এবং তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। এসব ঘটনা ছোট থেকেই ফাতিমার ওপর ধর্মীয় প্রভাব ফেলে, ফলে ফাতিমা ছোটবেলা থেকেই পিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত হয়ে বড় হয়েছিলেন।
শি’বে আবি তালিবে ফাতিমা : ৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে যখন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মদ সা.-এর ওপর নির্যাতনের নতুন পথ হিসেবে তার সম্প্রদায়কে আদেশ করলো, মুহাম্মদ সা.কে তাদের হাতে হত্যার জন্য তুলে দেওয়া হোক, তুলে না দেওয়া পর্যন্ত বনু হাশিম ও বনু আবদুল মুত্তালিব সম্প্রদায়কে বয়কট করা হবে। মক্কার সব গোত্র এক হয়ে ঘোষণা দিলো, মুহাম্মদ সা.কে হত্যার জন্য তুলে না দেওয়া পর্যন্ত এ দুই সম্প্রদায়ের সাথে সব আরবীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য করবে না। এই কঠিন সময়ে ফাতিমাসহ (রা.) আহলে বাইতের সবাই দুঃখ-কষ্টে দিনানিপাত করেছে, সবাই খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছে, এ অবরোধ প্রায় তিন বছর চলছিল।
তখন ফাতিমা বয়সে ছোট হলেও অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার সাথে পিতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেইজন্য তিনি পিতার আদর ও স্নেহ বেশি মাত্রায় পেতে থাকেন। মদিনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত মক্কায় পিতার দাওয়াতী কার্যক্রমের সাহায্য করেন। পিতার বিরুদ্ধে কেউ কটূক্তি করলে ফাতিমাও তার জবাব দিতেন। আর এ কারণেই তার ডাকনাম হয়ে যায়- ‘উম্মে আবিহা (অর্থঃ পিতার মা অর্থাৎ মুহাম্মদ সা.-এর মা) এবং এ সময়ে তার মা খাদিজা মারা গেলে তিনি পরিবারের অন্যতম কর্তা হিসেবে সুদৃঢ় হাতে দায়িত্ব পালন করেন।
হিজরত ও ফাতিমা : যে রাতে মুহাম্মদ সা. আলীকে নিজ গৃহে রেখে আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় হিজরত করলেন, সেই রাতে ফাতিমা তাঁর বোনদের সাথে মক্কায় নিজ গৃহে ছিলেন। তারপর আলী তিন দিন মক্কায় থেকে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট কুরাইশদের গচ্ছিত অর্থ-সম্পদ মালিকদের নিকট প্রত্যার্পণ করে মদিনায় পাড়ি জমালেন। ফাতিমা ও তার বোন উম্মে কুলসুম মক্কায় থেকে গেলেন। মুহাম্মদ সা. মদিনায় পৌঁছে একটু স্থির হওয়ার পর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে পরিবারের লোকদের নেয়ার জন্য একজন সাহাবীকে পাঠালেন। সেই সময় ফাতিমা (রা.) মদিনায় গমন করেন।
হজরত ফাতিমা-আলীর বিয়ে : সর্বপ্রথম আবু বকর ও ওমর ফাতিমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা. অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইমাম হাকিম নিশাপুরি তার মুসতাদরিক আল হাকিম গ্রন্থে ও সুনানে নাসাঈ গ্রন্থে এসেছে যে, ওমর মুহাম্মদ সা.-এর নিকট প্রস্তাব নিয়ে আসলে তিনি বলেন, সে এখনো ছোট এবং আবু বকর প্রস্তাব নিয়ে আসলে, মুহাম্মদ সা. তাঁকে বলেন, আবু বকর! আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা কর। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ওমরকেও মুহাম্মদ সা. একই কথা বলেন। তুমিও আল্লাহ্র সিদ্ধান্তের অপেক্ষা কর।
বিবাহের তারিখ ও ফাতিমা-আলীর বয়স : ২য় হিজরিতে বদরের যুদ্ধের পরে হজরত আলীর সাথে হজরত ফাতিমার বিয়ে হয়। বিয়ের সঠিক তারিখ ফাতিমা ও আলীর বয়স নিয়ে জীবনী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ বলেছেন, উহুদ যুদ্ধের পর আলী-ফাতিমার বিয়ে হয়। আবার এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ সা. আয়িশাকে ঘরে নেয়ার ৪ মাস পরে আলী-ফাতিমার বিয়ে হয় এবং বিয়ের ৯ মাস পরে তাদের বাসর হয়। সেই হিসেবে বিয়ের সময় ফাতিমার বয়স ১৫ বছর ৫ মাস এবং আলীর বয়স ২১ বছর ৫ মাস ছিলো।
ইবনে আবদুল বার তার ‘আল-ইসতিয়াব’ গ্রন্থে এবং ইবনে সাদ তার তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আলী-ফাতিমার বিয়ে হয় মুহাম্মদ সা. মদিনায় আসার ৫ মাস পরে রজব মাসে এবং বদর যুদ্ধ থেকে ফেরার পর তাদের বাসর হয়, সেই হিসেবে হজরত ফাতিমার বয়স তখন ছিলো ১৮ বছর। আবার আল তাবারির তারিখ গ্রন্থে বলা হয়েছে, হিজরতের ২২ মাসের মাথায় জিলহজ মাসে আলী-ফাতিমার বাসর হয়, বিয়ের সময় আলী ফাতিমার থেকে ৫ বছরের বড় ছিলেন।
হজরত আলীর সাথে হজরত ফাতিমার বিবাহ : উসুদুল গাবা গ্রন্থে ও তাবাকাত গ্রন্থে ইবনে সাদের বর্ণনা মতে হজরত আলী হজরত ওমরের পরামর্শ পেয়ে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট ফাতিমার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে যান। এরপর মুহাম্মদ সা. সন্তুষ্টচিত্তে ফাতিমা আর আলীর বিবাহ সম্পন্ন করেন। তবে ভিন্ন একটি বর্ণনা মতে হজরত আলী আনসারী সাহাবা বা তার এক দাসীর পরামর্শ পেয়ে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট গিয়েছিলেন।
মুহাম্মদ সা. আলীর সাথে ফাতিমাকে বিবাহ দিতে রাজী হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দেনমোহর কি দিবে? আলী উত্তর দিলেন, আমার ঘরে কিছুই নেই আপনার দেওয়া একখানা বর্ম ছাড়া, যার মূল্য ৪ দিরহামও হবে না।
এই বিবাহ সম্পন্ন করার সুবিধার্থে উসমান ইবনে আফফান বর্মটি ৪৭০ দিরহাম দিয়ে কিনে নেন। এই অর্থ মুহাম্মদ সা.-এর হাতে দেয়া হয়, মুহাম্মদ সা. ৭০ দিরহাম বিবাহের আয়োজনে ব্যয় করেন ও ৪০০ দিরহাম ফাতিমা-আলীর বিবাহের দেনমোহর নির্ধারণ করেন।
হজরত ফাতিমা অবশ্য আলীর দারিদ্র্য সম্পর্কে তার পিতার নিকট আপত্তি তুলেছিলেন। তখন মুহাম্মাদ সা. তাকে বলেছিলেন, আলী দুনিয়াতে একজন নেতা এবং আখিরাতেও সে সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একজন হবে। সাহাবীদের মধ্যে তার জ্ঞান বেশি, সে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাছাড়া সবার আগে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এরপর আরবের প্রথা অনুযায়ী কনের পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সা.ও বর পক্ষ থেকে আলী নিজে খুতবা দান করেন। তারপর উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে খোরমা বিতরণ করা হয়।
বিবাহের খুতবা : বিবাহের সময় মুহাম্মদ সা. ও আলী উভয় পক্ষ থেকে দু’জনই খুতবা পাঠ করেছিলেন। মুহাম্মদ সা.-এর খুতবা : “সকল প্রশংসা আল্লাহর! যিনি তার দান ও অনুগ্রহের কারণে প্রশংসিত, শক্তি ও ক্ষমতার জোরে উপাস্য, শাস্তির কারণে ভীতিপ্রদ এবং তাঁর কাছে যা কিছু আছে তার জন্য প্রত্যাশিত। আসমান ও জমিনে তিনি স্বীয় হুকুম বাস্তবায়নকারী। তিনি তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা দ্বারা এ সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করেছেন, তারপর বিধিনিষেধ দ্বারা তাদের পার্থক্য করেছেন, দীনের দ্বারা তাদের শক্তিশালী করেছেন এবং তাঁর নবী মুহাম্মদ সা. দ্বারা তাঁদের সম্মানিত করেছেন। (সংক্ষেপিত)।”
আলী খুতবা পাঠ : মুহাম্মদ সা. আলী ও ফাতিমার দাম্পত্য সুখের জন্য দোয়া করেন। এভাবে অতি সাধারণ ও সাদাসিধে ভাবে হজরত আলী-ফাতিমার বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের শেষে মুহাম্ম দ আবেগ ভরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতিমাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে সবচেয়ে শক্ত ঈমানের অধিকারী, সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে ভালো নৈতিকতা ও উন্নত মন-মানসিকতার অধিকারী ব্যক্তির নিকট গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি।”
আলীর বাসর ঘর প্রত্যক্ষ করে বলেছিলেন, খেজুর গাছের ছাল ভর্তি বালিশ-বিছানা ছাড়া তাদের ঘরে আর কিছু ছিল না। তাদের আর্থিক অবস্থা এতই খারাপ ছিলো, আলী তার একটি বর্ম এক ইহুদির নিকট বন্ধক রেখে কিছু যব ও খাদ্য আনেন। তবে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এ বিয়ে উপলক্ষে একটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ ভোজ অনুষ্ঠান করেছিল। আল-ইসাবার বর্ণনা মতে, হামযা দুটো বুড়ো উট যবাই করে আত্মীয়দের খাইয়েছিলেন।
দারিদ্র্য : ফাতিমার পরিবার ছিলো দরিদ্রতায় ভরাডুবিতে। কিন্তু ফাতিমার অন্য বোনদের অবস্থা বেশ সচ্ছল ছিলো। জয়নবের বিয়ে হয়েছিলো আবুল আসের সঙ্গে, রুকাইয়া আর উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করে ছিলো আবু লাহাবের পুত্রদ্বয়, পরবর্তীতে উসমান একে একে দুইবোনকেই বিয়ে করেন, এরা প্রত্যেকে আরবের ধনী ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু অপরদিকে আলী ছিলেন আর্থিক দিক থেকে জরাজীর্ণ যুবক, সেও উচ্চ বংশের জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে থাকলেও অনেক ছোট বয়সে (১০ বছর বয়সে) ইসলাম গ্রহণ করে নিজেকে ইসলামে নিবেদিত করেন, এইজন্য ব্যক্তি জীবনে বেশি অর্থোপার্জন করতে পারেননি। এজন্য তার আর্থিক দুরাবস্থার কথা চিন্তা করে আলীর পুত্র হাসান ও হোসাইনের লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন মুহাম্মদ সা. ও তার চাচা আব্বাস। এভাবে আলী মুহাম্মদ সা.-এর পরিবারের সাথে যুক্ত হোন।
ফাতিমা ১৮ বছরে স্বামী গৃহে গিয়ে দেখেন সেখানে খেজুর গাছের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিশ ও বিছানা, এক জোড়া জাঁতাকল, দু’টো মশক (পানি সংগ্রহের পাত্র), দু’টো মাটির ঘর আর কিছু আতর-সুগন্ধি ছাড়া আর কিছুই নেই। আলীর গৃহে কোনো দাস-দাসী না থাকার কারণে ফাতিমা সব ধরনের কাজ একাই করতেন। ইতিহাসবিদগণ বলেছেন, জাঁতাকল ঘুরাতে ঘুরাতে তার হাতে কড়া পড়ে যায়, মশক ভর্তি পানি টানতে টানতে তার কোমরে দাগ হয়ে যায়। তবে হজরত আলী এবং তাঁর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ সবসময় ঘরের কাজে ফাতিমাকে সাহায্য করতেন।
এই সময় ফাতিমার পিতা মুহাম্মদ সা. এক যুদ্ধ থেকে বিজয়ী বেশে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধবন্দীসহ মদিনায় ফিরেন। তাই, আলী ও ফাতিমা মুহাম্মদ সা.-এর নিকট গিয়ে ফাতিমাকে ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য একজন দাস চাইলেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা.সাথে সাথে দাস দিতে অস্বীকৃতি দিয়ে জানালেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমাদের আমি এখান থেকে একটি দাসও দিব না। আহলুস সুফফার লোকেরা না খেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছে। তাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারছিনে। এগুলো বিক্রি করে সেই অর্থ আমি তাদের জন্য খরচ করবো।’
এরপর ঐদিন সন্ধ্যায় মুহাম্মদ সা. আলীর বাড়ি গিয়ে একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়ে আসেন, যেই দোয়া একটি দাসের থেকেও উত্তম। দোয়াটি হল- প্রতি নামাজের পর ১০ বার সুবহানাল্লাহ, ১০ বার আলহামদুলিল্লাহ্, ১০ আল্লাহু আকবর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ্, ৩৩ বার আল্লাহু আকবর।
আলী(রা.) বলেছেন, এ দোয়া জানার পরে আমি জীবনে কোনোদিন বাদ দেইনি, এমনকি সিফফিনের রাতেও না। এরপরে আরো একদিন অভাবে পরে ফাতিমা মুহাম্মদ সা.-এর দ্বারস্থ হয়েছিলো কিছু চাইবার জন্য, সেইদিনও মুহাম্মদ সা.কন্যা ফাতিমাকে ৫টি উত্তম দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
ছোটখাট দাম্পত্য কলহ : দাম্পত্য জীবন মানেই সেখানে স্বামী-স্ত্রীতে ছোট-খাটো দাম্পত্য কলহ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক, আর হজরত ফাতিমা আর আলীর উভয় জীবনই ছোটবেলা থেকেই কঠোর সংগ্রাম করে কেটেছে, মুহাম্মদ সা.-এর সহযোদ্ধা হয়ে ইসলামের দাওয়াতে নিজেদের জীবন নিবেদিত করেছে। এরই মধ্যে আলী-ফাতিমার সংসার ছিলো অভাবের সংসার। ফলে তাদের সম্পর্ক মাঝে মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠতো, মুহাম্মদ সা.-এর নিকটও সে বিচার চলে যেত, রাসূল সা. তখন দুজনের মধ্যে আপস করে দিতেন।
একবার আলী তার সাথে রুষ্ট ব্যবহার করেন, এ বিচার ফাতিমা তার পিতা রাসূল মুহাম্মদ সা.-এর নিকট দিলে আলী ফাতিমার প্রতি অনুতপ্ত হোন এবং পুনরায় খারাপ ব্যবহার না করার শপথ নেন।
হজরত আলীর দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছা : আলী (রা.) একবার ফাতিমার বর্তমানেই আরেকটি বিবাহের ইচ্ছা পোষণ করেন। ফাতিমা এ কথা শোনার সাথে সাথেই বিচলিত হয়ে পরেন ও কঠোর বিরোধিতা করেন। ফাতিমা এ অভিযোগ তার পিতার নিকট নিয়ে যান। মুহাম্মদ সা. এ কথা শোনার সাথে সাথে রাগান্বিত হলেন। আলী আবু জেহেলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাবে, ফাতিমা এ কথা শোনার পরে আরো ক্ষেপে গিয়ে তার পিতাকে গিয়ে বললেন, আলী তো এখন আবু জেহেলের মেয়েকে বিয়ে করছে। মুহাম্মদ সা. এ কথা শুনে আরো রেগে গেলেন। কেননা আবু জাহেল ছিল ইসলামের চরম শত্রু, ইসলামের ব্যপারে আবু জাহেল ও পুত্র খুবই বিরোধিতা করেছিল। তারা সারা জীবন মুহাম্মদ সা. ও তাঁর পরিবারের বিরোধিতা করে এসেছে এবং কষ্ট দিয়ে এসেছে। তাদের ব্যপারে আল্লাহ ও তার রাসূল অসন্তুষ্ট ছিলো। আবু জাহলের এ কন্যার নাম নিয়ে মতপার্থক্য আছে, সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে ‘জুওয়ায়বিয়া’। তাছাড়া আল আওরা’, আল-হানকা’, জাহদাম ও জামিলাও বলা হয়েছে। এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট বায়াত হন এবং রাসূলের কাছ থেকে কিছু হাদিসও বর্ণনা করেন।
কিন্তু বিষয়টি ছিল বেশ জটিল। কারণ আলী ইসলামের বিধি অনুসারে ফাতিমাকে রেখেও আরো একাধিক বিয়ে করতে পারে, সে অধিকার আল্লাহ তাকে দিয়েছে। অন্যদিকে কলিজার টুকরো মেয়েকে আবু জাহেলের কন্যার সাথে সতীনের ঘর করতে হবে ব্যাপারটি রাসূল সা.কে কষ্ট দেয়। রাসূল মুহাম্মদ সা. রাগান্বিত হয়ে মসজিদে সকলের উদ্দেশে ভাষণটি দেনঃ
মুহাম্মদ সা.-এর বাণী : বনু হিশাম ইবনে আল মুগিরা আলীর সাথে তাদের মেয়ে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আমার অনুমতি চায়। আমি তাদের সে অনুমতি দেব না (৩ বার)। তবে আলী ইচ্ছা করলে আমার মেয়েকে তালাক দিয়ে তাদের মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। কারণ আমার মেয়ে আমার দেহেরই একটি অংশের মতো, তাকে যা কিছু অস্থির করে তা আমাকেও অস্থির করে, আর যা তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রাসূলের মেয়ে ও আল্লাহর দুশমনের মেয়ের কখনো সহাবস্থান হতে পারে না।
আলী তখন মসজিদে উপস্থিত ছিলেন, চুপচাপ সবকিছু শুনে বাসায় গিয়ে, ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে ফাতিমার নিকট ক্ষমা চাইলেন এবং এ ঘটনার পর ফাতিমা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আলীর একক স্ত্রী হিসেবে অতিবাহিত করেন। এ সময়ে ফাতিমা হাসান, হোসাইন, উম্মে কুলসুম ও যায়নাব এ চার সন্তানের মা হন।
ইতিহাসবিদগণ তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলেছেন, এই ঘটনা আলী-ফাতিমা বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা, ২য় হিজরিতে প্রথম সন্তান হাসান জন্মগ্রহণের পূর্বেই। সবকিছু বিবেচনা করে আলী আবু জাহেল কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন এবং তাকে আত্তাব ইবনে আসিদ বিয়ে করেন।
হাসান-হোসাইনের জন্ম : ৩য় হিজরিতে আলীর প্রথম সন্তান হাসান জন্মগ্রহণ করে। সংবাদ পেয়ে মুহাম্মদ সা. ছুটে এসে সদ্যপ্রসূত সন্তানকে দুই হাতে তুলে তার কানে আযান দিলেন এবং দৌহিত্র হাসানের মাথা মুড়িয়ে তার চুলের সমপরিমাণ ওজনের রূপা গরীব-মিসকিনদের মধ্যে দান করে দিলেন। হাসানের বয়স এক বছরের কিছু বেশি হতে না হতেই ৪র্থ হিজরির শাবান মাসে ফাতিমা হোসাইনের জন্ম দিলেন।
নানা মুহাম্মদ সা.-এর আদর ও স্নেহ : মুহাম্মদ সা.-এর এই দুই দৌহিত্রকে খুব ভালোবাসতেন। কেননা খাদিজার পরে তার আর কোনো স্ত্রী সন্তান জন্ম দেননি। আর বংশ রক্ষার জন্য কোনো পুত্রসন্তানও ছিল না। তাই মুহাম্মদ সা. এদেরকে নাতী ও পুত্রের উভয় আদর-সোহাগ দিয়ে এক সাথে বড় করেছেন। মুহাম্মদ সা.হাসান-হোসাইনের প্রতি বিশেষ ভালোবাসায় ভরপুর ছিলেন। তার নমুনা কিছু ঘটনা থেকে বুঝা যায়। তারা দুইজন নানার কাছে গেলে, মুহাম্মদ সা. তাঁদের জড়িয়ে ধরতেন, তাদের গায়ের গন্ধ শুকতেন। মুহাম্মদ সা. তাদের চাদরে জড়িয়ে রাখতেন। এবং হাসান-হোসাইনকে নিজের ছেলের সমতুল্য বলে অভিহিত করেছেন। এসব কারণে ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ পেলেই রাসূল মুহাম্মদ সা. হাসান-হোসাইনকে দেখতে যেতেন, এমনকি ফাতিমার বাড়িতে গিয়ে ছাগীর দুধ দুইয়ে হাসানকে পান করিয়েছেন এবং হাসান-হোসাইনের কান্নার আওয়াজ পেয়ে ফাতিমা তিরস্কার করেছেন।
একদিন রাসূল তাদের একজনকে কাধে করে মদিনায় বাজার করছিলেন, নামাজের সময় হলে তিনি হাসান অথবা হোসাইনকে পাশে রেখে মসজিদে ইমামতি করতে দাড়িয়ে গেলেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় সিজদায় কাটালেন যে, পিছনের মুক্তাদিরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, নামাজ শেষে কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এত লম্বা সিজদা করেছেন যে, আমরা ধারণা করেছিলাম কিছু একটা ঘটেছে অথবা ওহি নাজিল হচ্ছে। জবাবে তিনি বললেন- না, তেমন কিছু ঘটেনি। আসল ঘটনা হলো, আমার পিতৃসম হাসান/হোসাইন আমার পিঠে চড়ে বসেছিল।
এছাড়া মুহাম্মদ সা. মসজিদের মিম্বরের ওপর বসে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ বন্ধ করে, হাসান ও হোসাইনকে নিয়ে তাঁর পাশে মিম্বারে বসান। মুহাম্মদ সা. তাঁর নাতীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলা করতেন, দৌড়াদৌড়ি খেলা খেলতেন, ছোয়াছুয়ি খেলা খেলতেন, জড়িয়ে ধরে চুমো খেতেন; এমনকি হোসাইন মুহাম্মদ সা.-এর বুকের ওপর পা দিয়েও খেলা করতেন। মুহাম্মদ সা. হোসাইনের ব্যপারে বলেছে, হে আল্লাহ! আমি তাকে ভালোবাসি এবং সেও আমাকে ভালবাসে। তাকে যারা ভালোবাসে আপনি তাদের ভালোবাসুন। হোসাইন আমার অংশ এবং আমি হোসাইনের অংশ।
কন্যা যায়নাব ও উম্মে কুলসুমের জন্ম : এরপর ৫ম হিজরিতে ফাতিমা প্রথম কন্যা সন্তানের মা হন। মুহাম্মদ সা. তার নাম রাখেন যায়নাব। ফাতিমার বড় বোনের নাম ছিল যায়নব, তার বোনের নামেই নিজের মেয়ের নাম রাখেন যায়নব। এর দু’বছর পর ফাতিমা দ্বিতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমের মা হন। তার নামও মুহাম্মদ সা. তার অপর মৃতকন্যা উম্মে কুলসুমের নামে রাখেন। এভাবে ফাতিমা তার কন্যার মাধ্যমে নিজের মৃত দুই বোনের স্মৃতিকে ধরে রাখেন, বাচিয়ে রাখেন।
মুহাম্মদ সা.-এর পরিবারের খোঁজ খবর : বিয়ের পরেও ফাতিমা পিতার সংসারের সকল বিষয়ের খোঁজ-খবর রাখতেন। এমনকি অনেক সময় তাঁর সৎ মা’দের ছোটখাট রাগ-অভিমানের ব্যাপারেও মীমাংসা করতেন। মুহাম্মদ সা. সকল সন্তানদের মধ্যে ফাতিমাকেই একটু বেশি ভালোবাসতেন। আবার স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশাকে বেশি ভালোবাসতেন, এটা সবাই বুঝতে পারতো। এইজন্য মুহাম্মদ সা. যেদিন আয়েশার ঘরে থাকতেন ঐদিন বেশি হাদিয়া পাঠাতেন, এইজন্য অন্য স্ত্রীরা মনঃক্ষুণ্ন হতেন। এবং ফাতিমাকে মাধ্যম বানিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট বার্তা পাঠাতেন, যেন সাহাবারা সকল ঘরেই হাদিয়া পাঠায়, যা তারা পাঠাতে চায়। কিন্তু ফাতিমা এ কাজটি মীমাংসা করতে ব্যর্থ হন।
ফাতিমার দরজায় আবু সুফিয়ান : যখন মুহাম্মদ সা. মক্কা বিজয়ের কথা চিন্তা করতে লাগলেন, মক্কাবাসী নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে হয়রান হয়ে গেল। তারা আবু সুফিয়ানকে মদিনায় পাঠালো মুহাম্মদ সা.-এর নিকট এ ব্যাপারে একটা আপস করার জন্য। আবু সুফিয়ান সর্বপ্রথম তার কন্যা রাসূলের স্ত্রী উম্মে হাবিবা রামালাকে মাধ্যম বানিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট সুপারিশের জন্য পাঠালেন, কিন্তু তিনি সে সুপারিশের কথা অস্বীকার করলো, এমনকি মুহাম্মদ সা.-এর বিছানায় বসার অনুমতি দিলেন না। এরপর আবু সুফিয়ান আবু বকর ও ওমরের নিকট গেলেন, মুহাম্মদ সা.-এর নিকট মক্কাবাসীর জন্য সুপারিশ করতে। এরা প্রত্যেকে অস্বীকার করলো।
সবশেষে আবু সুফিয়ান ফাতিমার ঘরে গিয়ে আলীর নিকট অনুরোধ করলেন, মক্কাবাসীর জন্য সুপারিশ করতে। ফাতিমার নিকট পরামর্শ চাইলো এ ব্যাপারে, এমনকি ছোট্ট বালক হাসানের কাছেও অনুরোধ করলো, মুহাম্মদের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। এরা প্রত্যেকে আবু সুফিয়ানের সুপারিশ অস্বীকার করেছিলেন।
মক্কা বিজয় অভিযানে ফাতিমা
১০ হাজার মুসলমান সঙ্গীসহ মুহাম্মদ সা. ফাতিমাসহ ৮ম হিজরিতে মদিনা থেকে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। ৮ বছর পূর্বে তিনি একদিন বড় বোন উম্মে কুলসুমের সঙ্গে মক্কা ছেড়েছিলেন, আজ আবার মক্কায় ফিরছেন। তাঁদের কাফেলা মক্কা পথে ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলো। সন্ধ্যা নামতেই মক্কার পৌত্তলিক বাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এসে উপস্থিত হলেন। মক্কাবাসীদের ব্যাপারে মুহাম্মদ সা.-এর সিদ্ধান্ত জানার জন্য। সারা রাত অপেক্ষা করে ভোরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তারপর মক্কায় গিয়ে সবাইকে ইসলাম কবুল করতে বললেন।
মুহাম্মদ সা. যিতুওয়া নামক বাহনের পিঠে চড়ে সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে সাদ ইবনে উবাদাকে পতাকাবাহী নিযুক্ত করলেন। এরপর মক্কা বিজয়ের দিন মুহাম্মদ সা. আযাখির পথ ধরে মক্কায় প্রবেশ করে উম্মুল মুমিনীন খাদিজার কবরের নিকটে তাঁবু স্থাপন করলেন, সঙ্গে কন্যা ফাতিমাও ছিলেন। ফাতিমা যেদিন মদিনায় হিজরত করছিলেন, সেইদিন আল হুওয়ায়রিস ইবনে মুনকিয নামক এক ব্যক্তি তার বাহনের পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে জীবন বিপন্ন করে ফেলেছিল। মুহাম্মদ সা. মক্কায় প্রবেশ করে আলীকে নির্দেশ দেন এ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য।
ফাতিমা ও তার পিতা মুহাম্মদ সা. এইদিন মক্কার সব পুরাতন স্মৃতি স্মরণ করে আবেগ প্রবণ হয়ে পরে। মুহাম্মদ সা.ও তার কন্যা ফাতিমাসহ গোটা পরিবার মক্কাতে ১৯ দিন মতান্তরে ২ মাস অবস্থান করেন। এই সময়ে ফাতিমা তার আম্মা খাদিজার কবরও জিয়ারাত করেন। ৮ম হিজরির পরের হিজরি সনে মুহাম্মদ সা.-এর তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করেন, ১০ম হিজরিতে মুহাম্মদের স্ত্রী মারিয়া আল কিবতিয়ার গর্ভজাত সন্তান ইবরাহিমও মৃত্যুবরণ করেন। এখন সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা ছাড়া আর কেউ জীবিত থাকলোনা।
পিতার অন্তিম রোগ শয্যায় হজরত ফাতিম (রা.)
অসুস্থকালীন ঘটনা
১১ হিজরির সফর মাসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম তাঁর সকল স্ত্রীদের সামনে তাঁর কন্যা ফাতিমাকে কাছে ডেকে কানে কানে বললেন, হে আমার কন্যা! আমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী। এ কথা শুনে ফাতিমা কেঁদে ফেলেন। মুহাম্মদ সা. আবারও বললেন, আমার পরিবারের মধ্যে তুমি সর্বপ্রথম আমার সাথে মিলিত হবে, এই কথা শুনে ফাতিমা খুশি হয়ে গেলেন।
হজরত ফাতিমা এ কথা কারো নিকট প্রকাশ না করেই নিজের বাড়িতে চলে গেলেন। এদিকে মুহাম্মদ সা.-এর অসুস্থকালীন সেবা তাঁর স্ত্রীগণ পর্যায়ক্রমে করতে থাকলেন। যেদিন তিনি স্ত্রী মায়মুনা বিনতে আল হারিসের ঘরে অবস্থান করছিলেন, সেইদিন অসুস্থতা আরো বেড়ে গেলো। মুহাম্মদ সা. সকল স্ত্রীদের অনুমতি নিয়ে হজরত আয়েশার গৃহে অবস্থান করতে লাগলেন। এদিকে নবী কন্যা ফাতিমা আলীর গৃহ থেকে এসে রাত জেগে ধৈর্যসহকারে অসুস্থ পিতার সেবা-শুশ্রƒষা করতে লাগলেন। এর কিছু পরেই উত্তরোত্তর রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে লাগলো এবং কষ্টের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে চললো।
পিতার এ কষ্ট দেখে ফাতিমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আব্বা! আপনার কষ্ট তো আমি সহ্য করতে পারছিনা। পিতা তার দিকে স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, আজকের পর থেকে তোমার আব্বার আর কোনো কষ্ট নেই।
মুহাম্মদ সা.-এর মৃত্যুর দু’দিনের মধ্যেই আবু বকর খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন। পিতাকে হারিয়ে ফাতিমা গভীরভাবে শোকাতুর হন, এমনকি তিনি পিতার কবরের নিকট গিয়ে কবরের মাটি মুখে মেখে ঘ্রাণ নিতে শুরু করেছিলেন। সাহাবারা মুহাম্মদ সা.-এর দাফন-কাফন শেষ করে ফাতিমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
পিতার বিয়োগে কবিতা রচনা
ফাতিমা তার পিতার বিয়োগে ব্যথাতুর হয়ে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি শুরু করেন।
আকাশের দিগন্ত ধুলিমলিন হয়ে গেছে,
মধ্যাহ্ন-সূর্য ঢাকা পড়ে গেছে এবং যুগ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। নবীর পরে ভূমি কেবল বিষণ্ন হয়নি, বরং দুঃখের তীব্রতায় বিদীর্ণ হয়ে গেছে। তার জন্য কাঁদছে পূর্ব-পশ্চিম, মাতম করছে সমগ্র মুদার ও ইয়ামান গোত্র। তার জন্য কাঁদছে বড় বড় পাহাড়-পর্বত ও বিশালকায় অট্টালিকাসমূহ।
হে খাতামুন নাবিয়্যীন, আল্লাহর জ্যোতি আপনার প্রতি বর্ষিত হোক, আল-কুরআনের নাজিলকারী আপনার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন।’
ফাতিমা পিতার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আরো কিছু কবিতা আবৃত্তি করেন, মূলত আরবদের কবিতা চর্চা ছিলো তাদের আবেগ ও ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এসব কবিতায় পিতার প্রতি ফাতিমার গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। এবং কবিতা সাহিত্যে তার যে দখল ও মেধা রয়েছে, বিষয়টি প্রমাণ করছে। কবিতাটি হলো-
ভূমি ও উট হারানোর মত আমরা হারিয়েছি আপনাকে
আপনার অদৃশ্য হওয়ার পর ওহি ও কিতাব আমাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে
হায় ! আপনার পূর্বে যদি আমার মৃত্যু হতো !
আপনার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হতো না
এবং মাটির ঢিবিও আপনার মাঝে অন্তরায় হতো না।
জিহাদের ময়দানে
জিহাদের ময়দানে ফাতিমা উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন। উহুদ যুদ্ধে তার পিতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর দেহে ও মুখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্ত ঝরছিলো, তখন ফাতিমা খেজুরের চাটাই আগুনে পুড়িয়ে তার ছাই ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিয়েছিলো। সাহাবা সাহল ইবনে সা’দ বর্ণনা করেছেন, “মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম উহুদের যুদ্ধে আহত হলেন, সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল, মাথায় তরবারি ভাঙ্গা হলো, ফাতিমা রক্ত ধুতে লাগলেন, আর আলী ঢালে করে পানি এনে ঢালতে লাগলেন। ফাতিমা যখন দেখলেন, যতই পানি ঢালা হচ্ছে ততই রক্ত বেশি বের হচ্ছে, তখন তিনি একটি চাটাই উঠিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ক্ষতস্থানে লাগালেন, তখন রক্তপড়া বন্ধ হয়।”
উহুদের যুদ্ধে ফাতিমার দাদা হামযা শহীদ হন, ফাতিমা সবসময় তার দাদার জন্য দোয়া করতেন। ফাতিমা খন্দক ও খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। খায়বার বিজয়ের পর সেখান থেকে উৎপাদিত গম থেকে ফাতিমার জন্য ৮৫ ওয়াসক নির্ধারণ করে দেন। মক্কা বিজয়েও তিনি মুহাম্মদ সা.-এর সফরসঙ্গী হন। মুতা অভিযানে তার চাচা জাফর ইবনে আবি তালিব শহীদ হোন।
ফাতিমার প্রতি মুহাম্মদ সা.-এর বাণী
ফাতিমার মর্যাদা মুহাম্মদ সা.-এর কন্যা হবার দরুন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ফাতিমার চরিত্র, ত্যাগ, আনুগত্য ও ইবাদত তাকে আরো বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করেছে। সূরা আল আহযাবের আয়াতে পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মুহাম্মদ সা. আলী পরিবারকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘তোমাদের সঙ্গে যে যুদ্ধ করে, আমি তাদের নিকট যুদ্ধের মতো। তোমাদের সাথে যে শান্তি ও সন্ধি স্থাপন করে, আমি তাদের নিকট শান্তির মতো। মুহাম্মদ সা. বহুবার আলী পরিবারকে আহল আল বাইত বলেছেন ও আলী পরিবারের পবিত্রকরণের জন্য আল্লাহ্র নিকট দোয়া করেছেন।
হজরত ফাতিমার ব্যপারে মুহাম্মদ সা. এক বাণীতে বলেছিলেন, ‘হে ফাতিমা, আল্লাহ তোমার খুশিতে খুশি হন এবং তোমার অসন্তুষ্টিতে অসন্তুষ্ট হন।’
হজরত ফাতিমা সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা
এছাড়া মুহাম্মদ সা. ফাতিমাকে জান্নাতে নারীদের সর্দার ঘোষণা করেছেন-
১. আনাস ইবনে মালিক বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ সা. বলেছেন, মরিয়াম বিনতে ইমরান, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, আসিয়া বিনতে মুজাহিম হচ্ছে যুগ অনুসারে জান্নাতের নারীদের নেত্রী। এই ৪ নারীকে পৃথিবীর সকল নারীদের মধ্যে অনুকরণীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২. হজরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, ফাতিমা আমার দেহের একটি অংশ, কেউ তাকে অসন্তুষ্ট করলে, সে আমাকে অসন্তুষ্ট করবে। ইমাম আস-সুহাইলি এ হাদীসের ভিত্তি করে বলেছেন, কেউ ফাতিমাকে গালিগালাজ করলে কাফির হয়ে যাবে।
৩. ইবনুল জাওজি বলেছেন, মুহাম্মদের সা.-এর অন্য সকল কন্যাকে ফাতিমা এবং অন্য সকল স্ত্রীকে আয়েশা সম্মান ও মর্যাদায় অতিক্রম করে গেছেন।
৪. আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ সা. বলেছেন যে, ফেরেশতা আমাকে এ সুসংবাদ দেন যে, ফাতিমা হবে আমার উম্মতের সকল নারীর নেত্রী এবং হাসান-হোসাইন হবে জান্নাতের অধিবাসীদের নেতা।
৫. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, মুহাম্মদ সা. আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসাইনকে কাছে ডেকে বললেন, হে আল্লাহ! এরা আমার পরিবারের সদস্য। তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করুন। এছাড়াও মুহাম্মদ সা. বহু জায়গায় আলী পরিবারবর্গকে নিজের পরিবার আহল আল-বাইত অভিহিত করেছেন।
হজরত ফাতিমার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
সকল ঐতিহাসিকগণ গবেষণা করে ফাতিমার মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্বের কিছু কারণ খুজে বের করেছে। এসব কারণে ফাতিমাকে নারীদের অনুকরণীয় ভাবা হয়, পৃথিবীর সব অগ্রগামী ৪ নারীদের মধ্যে অন্যতম ভাবা হয়।
১. ফাতিমার পিতা ছিলেন মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদ সা.। ২. তাঁর মা ছিলেন জান্নাতের নারীদের নেত্রী, সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা বিনতে খুওয়ায়লিদ। ৩. তার স্বামী ছিলেন দুনিয়া ও আখিরাতের নেতা আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবু তালিব। ৪. তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হোসাইন হলেন জান্নাতের যুবকদের নেতা এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রিয় মুখ। ৫. তাঁর দাদা শহীদদের মহান নেতা হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব। ৬. তাঁর অন্য দাদা ইসলামের সকল কাজে অগ্রগামী আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। ৭. তাঁর চাচা বিশিষ্ট সেনানায়ক জাফর ইবনে আবি তালিব।
আল্লাহর প্রিয় পাত্রী নবী নন্দিনী
ফাতিমা নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র প্রিয় পাত্রী ছিলেন, আল্লাহ সবসময় তার খাবারে বরকত দিয়েছেন, মুহাম্মদ সা.-এর একদিন দোয়ার পরে তিনি এরপরে তেমন ক্ষুধার্ত থাকেননি। একদিন এক প্রতিবেশীনির অল্প পরিমাণ খাবার মুহাম্মদ সা.সহ পরিবারের সবাই খেয়ে শেষ করতে পারেননি। আল্লাহ্ ঐ খাবারে খুব বরকত দান করেছিলেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে অনুসরণে হজরত ফাতিমা
ফাতিমা তার নিজের কথাবার্তা, চালচলন, উঠাবসা প্রতিটি ক্ষেত্রে তার পিতাকে অনুসরণ করতেন। এইজন্য অনেকে বলেছে, ফাতিমা কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর উত্তম প্রতিচ্ছবি। আয়েশা (রা.) বলেন, ফাতিমা যখন হাঁটতেন, তার হাঁটা মুহাম্মদের (সা.) হাঁটা থেকে একটুও এদিক ওদিক হতো না। হজরত আয়িশা আরো বলেছেন, আমি ফাতিমার চেয়ে বেশি সত্যভাষী আর কাউকে দেখিনি, তবে যার কন্যা (মুহাম্মদ) তার কথা আলাদা। আয়েশা (রা.) আরো একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেটা আবু দাউদ ও তিরমিজিতে উল্লেখিত হয়েছে।
“আয়েশা (রা.) বলেন, আমি কথাবার্তা ও আলোচনায় মুহাম্মদের(সা.) সাথে ফাতিমার চেয়ে বেশি মিল আছে এমন কাউকেই দেখিনি। ফাতিমা যখন রাসূলের নিকট আসতেন, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে চুমু দিয়ে স্বাগত জানাতেন। ফাতিমাও পিতার সাথে একই রকম করতেন। মুহাম্মদ সা. যে পরিমাণ ফাতিমাকে ভালোবাসতেন, সেইভাবে অন্য কোনো সন্তানকে ভালোবাসতেন না।”
ফাতিমা ও মুহাম্মদের স্নেহমাখা সম্পর্ক
পিতার প্রতি ভালোবাসা
মুহাম্মদ সা. তার কন্যা ফাতিমাকে যেমন ভালোবাসতেন, ফাতিমাও তার পিতা মুহাম্মদ সা.কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। মুহাম্মাদ সা. কোনো সফর থেকে যখন ফিরতেন তখন তার কন্যা ফাতিমার সাথে দেখা করতেন এরপর ঘরে ফিরতেন। পিতাও কোনো যুদ্ধে গেলে ফাতিমা উদ্বিগ্ন ও দুঃচিন্তায় ভুগতেন এবং পিতার জন্য অধীর আগ্রহে ঘরে বসে থাকতেন। একবার মুহাম্মদ সা. সফর থেকে ফিরে ফাতিমার ঘরে যান, ফাতিমা তার পিতার জীর্ণ অবস্থা দেখেই কাঁদতে লাগলেন, মুহাম্মদ সা. বললেন, কাঁদছো কেন? ফাতিমা প্রতিত্তর দিলেন, আব্বু! আপনার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে এবং আপনার পরিধেয় বস্ত্রও ময়লা ও নোংরা হয়েছে, এ দেখেই আমার কান্না পাচ্ছে।
ফাতিমা তার পিতার অল্প দুঃখ দেখেই কেঁদে ফেলতেন এবং পিতার বিরুদ্ধে কেও লাগলে, ফাতিমা তার বিরুদ্ধে লাগতেন।
পিতার থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসা
মুহাম্মদ সা.-এর সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন ফাতিমা এবং একাধিক বর্ণনায় তার নাম ঘোষণা করেছেন। মুহাম্মদ সা. একদিন বলেছিলেন, নারীদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ফাতিমা এবং পুরুষদের মধ্যে আলী। এছাড়াও একদিন আলীর প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ সা. বলেছিলেনÑ ফাতিমা আমার নিকট তোমার চেয়ে আমার বেশি প্রিয়। আর তুমি আমার নিকট ফাতিমার থেকে বেশি সম্মানের পাত্র।
একদিন মুহাম্মদ সা. ফাতিমার গৃহে গিয়ে দেখেন, উটের পশমে তৈরি নিম্নমানের কাপড় পরিধান করে ফাতিমা যাতায় গম পিষতেছেন। মেয়ের এ অবস্থা দেখে পিতা কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, ‘ফাতিমা! আখিরাতের সুখ-শান্তির জন্য দুনিয়ার এ তিক্ততা মেনে নাও।’ প্রচণ্ড ক্ষুধায় ফাতিমার মুখমণ্ডল তখন রক্তশূন্য হয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়েছিল। কন্যার এ কঠিন অবস্থা দেখে মুহাম্মদ সা. আল্লাহর নিকট তার ক্ষুধা ও সংকীর্ণতা দূর করার জন্য দোয়া করেছিলেন।
পিতা থেকে তিরস্কার ও সতর্কীকরণ
ফাতিমার পিতা মুহাম্মদ সা. দুনিয়ার সাজসজ্জা ও চাকচিক্য পছন্দ করতেন না। একবার আলী ফাতিমাকে একটি স্বর্ণের হার উপহার দেন। এটি দেখে মুহাম্মদ রাগান্বিত হন এবং ফাতিমাকে দুনিয়ার বিনোদন থেকে দূরে থাকতে বলেন। পরে ফাতিমা সেই হার বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে একটি দাস ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। তখন মুহাম্মদ সা. বলেন, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি ফাতিমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়েছেন।
আবার মুহাম্মদ সা. কোনো এক যুদ্ধ থেকে ফিরে অভ্যাস অনুযায়ী ফাতিমার গৃহে ঢুকবেন, ফাতিমা পিতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ঘরের দরজায় দামী পর্দা ঝুলালেন এবং দুই ছেলে হাসান ও হোসাইনের হাতে রূপোর চুড়ি পরালেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা. এতে খুশি না হয়ে বেজার হয়ে বাসায় ফিরে গেলেন। তখন ফাতিমা ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে পর্দা ছিড়ে ফেললেন এবং দুই ছেলের হাত থেকে চুড়ি খুলে ফেলেন। এবং তারা মুহাম্মাদ সা.-এর নিকট গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। মুহাম্মদ সা. তখন বলেছিলেন, এরা আমার পরিবারের সদস্য। আমি চাইনা পার্থিব সাজ-শোভায় তারা শোভিত হোক।
মুহাম্মদ সা. তাঁর কন্যা ফাতিমাকে সব সময় বলেছেন, নবীর কন্যা হওয়ার কারণে পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে না। সেখানে মুক্তির একমাত্র উপায় হবে আমল ও তাকওয়া। মুহাম্মদ সা. তাঁর কন্যাকে বলতেন, তুমি আমার অর্থ-সম্পদ থেকে যা কিছু চাওয়ার চেয়ে নাও, তবে আল্লাহ্র নিকটে ক্ষমার ব্যপারে আমি কিছুই করতে পারবো না। আবার চুরির আইনের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য ঘটনাক্রমে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও যদি চুরি করে তাহলে আমি তার হাত কেটে দেব।
মৃত্যুবরণ ও জানাযার নামাজ
মুহাম্মদ সা.-এর ইন্তেকালের ৮ মাস, মতান্তরে ৭০ দিন পর ফাতিমার মৃত্যু হয়। আর কেউ কেউ রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের ৪ মাস পরে ফাতিমার রা. ইন্তেকালের কথাও বলেছেন। আর মৃত্যুর পর তার পরিবারের মাঝে ফাতিমাই সর্বপ্রথম ইন্তেকাল করেন, মুহাম্মদ সা.-এর ভবিষৎবাণী সত্য হয়। হজরত ফাতিমার জন্ম যদি নবুয়্যতের ৫ বছর পূর্বে ধরা হয়, তাহলে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ২৯ বছর। সুন্নি গবেষক ও অধিকাংশ সাহাবীই এ মত সমর্থন করেছেন। মৃত্যুর পূর্বে ফাতিমা তেমন শয্যাশায়ী বা বড় কোনো রোগাক্রান্ত হননি।
আল-ওয়াকিদী বলেছেন, ১১ হিজরির ৩ রমাদান ফাতিমা ইন্তেকাল করেন। স্বামী আলী ও আসমা বিনতে উমাইস তাকে গোসলের কাজ সম্পন্ন করেন কিছু বর্ণনায় আবু বকর ও আলীর নাম এসেছে। ফাতিমার দাদা আব্বাস তার জানাযার নামাজ পড়ান। তবে কেউ কেউ জানাযার নামায পড়ানোর ব্যপারে আবু বকর ও আলীর নাম উল্লেখ করেছেন। আলী, ফাদল ও আব্বাস কবরে নেমে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। তার জানাযায় খুব কম মানুষ অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। কারণ রাতে ইন্তেকাল হয় এবং ফাতিমার অসিয়ত অনুযায়ী রাতেই তাঁর দাফন হয় এবং মৃত্যুর পর ফাতিমার পর্দা রক্ষার জন্য আসমা বিনতে উমাইসের বুদ্ধিতে লাশের বাহনকে খেজুরের ডালের সাথে পর্দা লাগিয়ে নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। এ পদ্ধতি মদিনায় সর্বপ্রথম দেখা যায়।
দাফনের স্থান
আল ওয়াকিদী বর্ণনা করে বলেন, বেশিরভাগ মানুষ ফাতিমার কবর জান্নাতুল বাকি গোরস্তানে বলে থাকলেও, তাঁকে মূলত আকিলের বাড়ির এক কোনে দাফন করা হয়েছে। তাঁর কবর ও রাস্তার মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ৭ হাত।
হাদিস বর্ণনা
হজরত ফাতিমা (রা.) সর্বমোট ১৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে ১টি মুত্তাফাকুন আলাইহি। এছাড়া ইমাম আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী তাদের নিজ নিজ সংকলনে ফাতিমার বর্ণিত হাদিস সংকলন করেন। আর ফাতিমা থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন তারা হলেনÑ হাসান, হুসাইন, আলী ইবনে আবি তালিব, আয়েশা, সালমা উম্মে রাফি, আনাস ইবনে মালিক, উম্মে সালামা, ফাতিমা বিনতে হোসাইনসহ আরো অনেকে। ইবনুল জাওজি বলেন, ফাতিমা ছাড়া মুহাম্মদ সা.-এর অন্য কোনো মেয়ের হাদিস বর্ণনা পাওয়া যায় না।