নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে যুবকদের এগিয়ে আসতে
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:১১
লক্ষ্মীপুর সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যুবকদের নতুন বাংলাদেশ বির্নিমাণে এগিয়ে আসতে হবে। দেশ গড়ার মিছিলে আমিও সামনের সারিতে থাকবো। গত ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার লক্ষ্মীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল গণজমায়েতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাস্টার রুহুল আমীন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, কুমিল্লা মহানগরী আমীর কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মুহাম্মাদ রেজাউল করিম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতিকুর রহমান। এর আগে রায়পুর পৌরসভা আমীর হাফেজ ফজলুল করীমের অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে গণজমায়েতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জেলা সেক্রেটারি ফারুক হোছাইন নূরনবীর সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ঢাকাস্থ লক্ষ্মীপুর ফোরামের সভাপতি ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি ডা. আনোয়ারুল আযিম, ফেনী জেলার সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, নোয়াখালী জেলার সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা আলা উদ্দিন, ফেনী জেলা আমীর মুফতি আবদুল হান্নান, লক্ষ্মীপুর জেলা নায়েবে আমীর এডভোকেট নজির আহমাদ, জেলা নায়েবে আমীর এ আর হাফিজ উল্লাহ, নোয়াখালী জেলা নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ, জেলা সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা নাসির উদ্দিন মাহমুদ, এডভোকেট মুহসিন কবির মুরাদ, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্র নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন, লক্ষ্মীপুর পৌরসভা আমীর এডভোকেট আবুল ফারাহ নিশান, লক্ষ্মীপুর শহর শাখা শিবিরের সভাপতি ফরিদ উদ্দিন। উপস্থিত ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
অবিলম্বে সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তি দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যে দলের বেশিসংখ্যক শীর্ষনেতাকে খুন করা হয়েছে, সেই দলের নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এক এক করে ১০ জনকে খুন করেছে। আল্লাহ একজনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তিনি আমাদের ভাই এটিএম আজহারুল ইসলাম। আফসোসের বিষয় ৬টি মাস চলে গেল, বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদীদের তাড়ালো। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বোঝা এটিএম আজহারুল ইসলামের ঘাড়ে এখনো রয়েই গেল। এক এক করে জাতীয় নেতৃবৃন্দ সবাই বের হয়ে এলেন, এখনো এটিএম আজহারুল ইসলাম থেকে গেলেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কারাগারে। তাই সেদিন মনের কষ্ট নিয়ে বলেছি, আজহার ভাইকে ভেতরে রেখে আমি আর বাইরে থাকতে চাই না। আমি সরকারকে অনুরোধ করছি, আগামী ২৫ তারিখ নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে বলবো, আমাকে গ্রেফতার করুন এবং আমাকে কারাগারে পাঠান। যেদিন আজহারুল ভাইয়ের মুক্তি হবে তার পরের দিন আমাকে মুক্তি দিয়েন।
জামায়াতের আমীর বলেন, আমাদের সন্তানরা বিশাল একটি স্বপ্ন নিয়ে তারা জীবন দিয়েছিল। তারা বুক পেতে বলেছিল বুকের ভেতর তুমুল ঝড় বুক পেতেছি গুলি কর। কি সেই ঝড়। সেই ঝড় ছিল সমাজের অন্যায়, অবিচার দুর্নীতি এবং দুঃশাসন। কোনো যুগেই যুবকরা দুর্নীতি এবং দুঃশাসনকে সমর্থন করে না। বরং তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। তরুণদের এত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এলো। এরপর মনে হয় লক্ষ্মীপুরে চাঁদাবাজি নেই। সবাই সমস্বরে জানান দেয়, চাঁদাবাজি আছে। এ সময় তিনি বলেন, বিনয়ের সাথে বলি, দয়া করে চাঁদাবাজি-দখলবাজি বন্ধ করেন। দয়া করে মানুষের ওপর জুলুম করবেন না।
মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, ইসলাম কায়েম হলে সবাই তার ন্যায্য অধিকার পাবে। মহানবীর আমলে বেকার ছিল না, সন্ত্রাস ছিল না, শান্তির সমাজে পরিণত হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার আমলে। বাংলাদেশেও ইসলাম কায়েম হলে অন্যায়-অনাচার থাকবে না। আমরা সেই ইসলাম কায়েম করতে চাই। সেজন্য জামায়াত কর্মীকে আখলাক গড়ে তুলতে হবে। মানুষের প্রতি দরদ-ভালোবাসা বাড়াতে হবে। দারিদ্র্যমোচনে এগিয়ে আসতে হবে। ন্যায়বিচার করার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। দক্ষ হতে হবে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহ বেশি বেশি অধ্যয়ন করতে হবে। দাওয়াত দিয়ে গণজোয়ার তৈরি করতে হবে। মানুষের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে। প্রচলিত ভুলত্রুটি থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে হবে। তিনি বলেন, আদর্শবান নারী-পুরুষ তৈরি করতে হবে, যাতে চরিত্র দেখেই মানুষ ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হবে। তিনি আগামীতে ৫ আগস্টের চেয়ে আরও বড় আরেকটি বিপ্লবের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
মোবারক হোসেন বলেন, ২৪-এর গণআন্দোলনের পর মনে করেছিলাম বর্তমান সরকার ভালোভাবে দেশ চালাবে। আমরা কী দেখলাম, এখনো দেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি বন্ধ হয়নি। নিশ্চয় সরকার জানে, কারা চাঁদাবাজি করছে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, আপনারা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। তিনি বলেন, আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই। জামায়াতে ইসলামী ১০ দফা কর্মসূচিতে আনুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন চেয়েছিল। আপনারা আওয়াজ তুলুন আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি কায়েম করতে হবে। ইনসাফপূর্ণ সমাজ কায়েম করতে জামায়াতে ইসলামীকে সংসদে যেতেই হবে জানিয়ে মোবারক হোসেন বলেন, আপনারা দিনরাত কাজ করুন। আল্লাহ তায়ালা মদদ করবেনই।
কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, আওয়ামী লীগ অত্যাচার করেছে। আমাদের নেতৃবৃন্দকে শহীদ করেছে। সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। করতে হবে। একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই। ইসলামকে আমাদের অনুসরণ করতেই হবে। তাহলে ক্ষুধা-দারিদ্র্য ফ্যাসিবাদ আর থাকবে না। এখানে আর কোনো ফ্যাসিবাদ চাই না। ফ্যাসিবাদ থাকতে পারবে না।
ড. মুহাম্মাদ রেজাউল করিম বলেন, আজকের মহাসমুদ্র প্রমাণ করে জামায়াতকে নির্যাতন করে দমন করা যায়নি। শেখ হাসিনা দুটি প্রতিশোধ নিয়েছে। ২৮ অক্টোবর পল্টন ময়দানে হত্যা করেছে। শাপলা চত্বরে আলেমদের হত্যা করেছে। পিলখানায় সেনা অফিসার হত্যা ও জামায়াত নেতাদের হত্যা করেছে। খুনিদের এদেশে ঠাঁই হবে না। তিনি বলেন, সারা দেশে আগামী দিনে ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে উজ্জীবিত করেছেন আমীরে জামায়াত। আজ সারা দেশে স্লোগান উঠেছে সব দল দেখা শেষ, জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশ। তিনি এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তিতে দেরি হলে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে উঠবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন। তিনি লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে রেললাইন, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমানবন্দর তৈরির দাবি জানান।
এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই আগস্টে পাখির মতো গুলি চালিয়ে ২ হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে। অবশেষে ৪০ মিনিটের ব্যবধানে হাসিনা পালিয়েছে। আওয়ামী লীগ গণহত্যাকারী ফ্যাসিবাদী দল। নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদের ঠাঁই হবে না। তিনি এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তি এবং জামায়াতের প্রতীক ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা আহ্বায়ক আরমান হোসেন বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যবিরোধী দেশ গঠনের জন্য। আজ আমরা সংস্কারের জন্য কথা বলছি। কিন্তু কেউ কেউ আজ নির্বাচনের তসবিহ জপছে। তাদের কথায় মনে পড়ে যায় ’৭১ সাল পরবর্তী ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা। আবার আমরা নব্য ফ্যাসিস্টদের উত্থান দেখতে পাচ্ছি। তাদের বলতে চাই আবার কোনো ষড়যন্ত্র হলে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তাদেরও উৎখাত করবো, ইনশাআল্লাহ।
শহীদ ডাক্তার ফয়েজ আহমদের ছেলে ডাক্তার হাসানুল বান্না বলেন, আওয়ামী লীগ এ অঞ্চলকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করেছিল। সন্ত্রাসীদের বলতে চাই লক্ষ্মীপুরকে আর সন্ত্রাসের জনপদ বানাতে দেব না।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান পরিষদ নেতা এডভোকেট প্রিয়লাল নাথ বলেন, ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। যারা ইসলামপ্রিয় তারা ধর্মবিরোধী আচরণ করতে পারে না। কোনো ধর্মই এটা মনে করে না যে, অন্য ধর্মের মানুষকে অত্যাচার করা যায়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজ থেকে আমরা এ শিক্ষা পেয়েছি। এ সমাবেশ সফল হোক, সার্থক হোক।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এডভোকেট হাসিবুর রহমান বলেন, বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করা হয়েছে। আমরা মাথা নত করিনি। আমরা লড়াই করেছি ফ্যাসিবাদ তাড়ানোর জন্য। আদর্শ ভিন্ন থাকতে পারে। কিন্তু স্বৈরাচার যেন দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো।
ডা. আনোয়ারুল আযিম বলেন, লক্ষ্মীপুর ’৫২’র আন্দোলন এবং স্বাধীনতার অগ্রনায়ক লক্ষ্মীপুরের কৃতি সন্তান। লক্ষ্মীপুরকে সারাবিশ্বের মধ্যে সেরা করতে চাই। আসুন আমরা লক্ষ্মীপুরকে এমনভাবে গড়ে তুলি যাতে সমৃদ্ধশালী এলাকায় পরিণত হয়।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শুধুমাত্র জনগণের সেবক হবে
দেওয়ান মুরাদুজ্জামান (মতলব উত্তর) চাঁদপুর : জামায়াত ক্ষমতায় যেতে চায় আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে এ জমিনের মধ্যে কুরআনের আইন বাস্তবায়ন করার জন্য। ক্ষমতায় গেলে জামায়াত জনগণের সেবক হবে। জুলুম-নির্যাতন আর অত্যাচারের বিপরীতে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে জামায়াতের কাজ। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে গত ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিকেলে এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কথাগুলো বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি আরো বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বাড়বে না, বরং আরো কমবে। কেননা জামায়াত আল্লাহকে ভয় পায়। তাই সরকারি সম্পদ পুরোপুরি জনগণের খেদমতে ব্যয় তো করবেই, উল্টো জনগণকে ভালো রাখার জন্য নিজের পকেটের টাকাও ব্যয় করবে। এ সময় বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চাঁদপুরের সাবেক আমীর আবদুর রহিম পাটোয়ারী, সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট শাহজাহান মিয়া, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক আবুল হোসাইন, জামায়াত নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, এডভোকেট শাহজাহান খাঁন, মো. মোস্তফা কামাল, বিক্রম কলিমুল্লাহ্, মাওলানা আবুল হাসনাত, মো. মহররম আলী, ইব্রাহীম খলিল প্রমুখ।