বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাথে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বৈঠক

রাজনীতিতে ঐক্যের সুবাতাস

ফারাহ মাসুম
১৭ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:০৭

বেশ খানিকটা অনিশ্চয়তার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈষম্যবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ঐক্যের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দলের কোনো পক্ষ থেকে খবর প্রকাশ না করা হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষনেতা জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। লন্ডনে তারেক রহমানের বাসায় এ সাক্ষাতের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন। গত সপ্তাহে সোনার বাংলার প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে আভাস দেয়া হয়েছিল আর বিএনপিপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি মারুফ কামাল খান সোহেল এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে গত ১৫ এপ্রিল মঙ্গলবার সাক্ষাৎকারের বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। জামায়াতের আমীর এ সাক্ষাৎকারের বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘এ সময় অনেক বিষয়ে কথা হয়েছে। সবকিছু ইতিবাচক।’ আর ঠিক এ সময়টায় চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি আলোচনা ও ঐক্যের মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে যেতে চায়।
দুই শীর্ষনেতার সাক্ষাৎ ঃ খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে লন্ডনে সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর। তাদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তা জানতে চোখ সামনের দিকে রাখতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
গত ১৫ এপ্রিল দেওয়া এ ফেসবুক পোস্টে মারুফ কামাল লেখেন, ‘ইউরোপ সফর শেষে লন্ডন পৌঁছে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশে ফিরেছেন। জিয়া-দম্পতির বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসায় গিয়ে তারা দেখা করেন। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎ পর্বে তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এখন তার পুত্রের বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তিনি আরও লেখেন, বেগম জিয়ার সঙ্গে জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতার সাক্ষাতে কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা জানা যায়নি। দুই ডাক্তারের এ সাক্ষাৎ রাজনীতির রসায়নে নতুন কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, নাকি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েই থাকবে- তা বুঝতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে সামনের দিকে।
সেনাপ্রধানের বিষয়ে মারুফ কামাল খান বলেন, ‘বেগম জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিলেত যাওয়ার আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও সস্ত্রীক তার বাসায় গিয়ে দেখা করেছিলেন। সে সাক্ষাৎকার নিয়েও বিশদ কিছু জানা যায়নি।’
বেগম খালেদা জিয়ার সাথে  সাক্ষাতের পর গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ‘বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের সাথে আমাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। আমরা একসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। উনার খোঁজখবর নেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বহুদিন পর আমাদের দেখা হয়েছে। আমরা উনার জন্য দোয়া করেছি, উনার কাছে দোয়া চেয়েছি। দুজনের সাথে অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেক কথাই হয়েছে। এখন বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে সবকিছু ইতিবাচক।’ মারুফ কামাল খান সোহেল তার পোস্টে উল্লেখ্য করেছেন।

জামায়াত আমীরের এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্পষ্ট যে, রাজনীতির পাল্টাপাল্টি ধারা থেকে ইতিবাচক ধারায় অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ পরিবর্তন শুধু বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, সেইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিএনপির চাপ প্রয়োগ ও টানাপড়েনের সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। গত ১৬ এপ্রিল বুধবার এ প্রতিবেদন লেখার দিনই বিএনপির সাথে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। এ বৈঠকে শেষে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিএনপিকে খুশি মনে হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাবার আগে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সস্ত্রীক অসুস্থ বেগম জিয়াকে দেখতে যান। এর আগে তিনি রাওয়া ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ ও হানাহানির পরিবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এটি চলতে থাকলে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। এরপর নানা পক্ষ থেকে বৈষম্যবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিসমূহের মধ্যে ঐক্য তৈরির চেষ্টা করা হয়। এ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অনেকখানি কমে আসে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও দায়িত্বশীল পর্যায়ে থেকে হানাহানি সৃষ্টির মতো বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি।
প্রধান উপদেষ্টার সাথে বুধবারের বৈঠকের আগেই বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, শুধু নির্বাচন নয়, আরও অনেক বিষয়ে কথা বলবে বিএনপি। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, আগেরবারের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তার সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তখন এ বক্তব্যে তারা সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তখনই তারা প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছিলেন প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এর পথনকশা যথাযথভাবে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে- যাতে নির্বাচন কমিশন সে অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারে।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, তখন প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে আশ্বস্ত হয়ে ‘দ্রুত’ নির্বাচন বা চলতি বছরের ‘জুন-জুলাইয়ের মধ্যে’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা থেকে বিএনপি সরে আসে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্যে তার আগের অবস্থানের হেরফের দেখছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। প্রধান উপদেষ্টা সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে এ বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। বিএনপি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চায়।
সমঝোতার আভাস
যতদূর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার কথা বললেও জুনের মধ্যে হলেও বড় কোনো আপত্তি করবে না। এমনকি নির্বাচিত সরকারই সংস্কার করবেÑ এমন বক্তব্য থেকেও বিএনপি সরে আসতে পারে। সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে যে প্রশ্নমালা দেয়া হয়েছে, তাতে মাত্র ৪টি বিষয়ে কমিশনের সাথে একমত পোষণ করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। এসব দাবির সাথে জামায়াত ও এনসিপি একমত হওয়ায় এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা যাবে। কিন্তু সংবিধান ও নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে বিএনপি নমনীয় হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। এটি হলে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বড় কোনো বাধা থাকবে না বলে জানা যাচ্ছে।
এর বাইরে আরেকটি বিকল্প প্রস্তাব অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় রয়েছে। সেটি হলো রাষ্ট্র সংস্কারের বড় বড় সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠন করা। যে সরকারের উপপ্রধান উপদেষ্টা হবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির মধ্যে এখনো ইতিবাচক মনোভাব তৈরির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। জামায়াতও চাচ্ছে জরুরি সংস্কার বাস্তবায়ন করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কার আনা। এ লক্ষ্যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরির জন্য গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ ছয় কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব কমিশনের প্রধানদের নিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঐকমত্য কমিশন। দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে একটি সনদ (জুলাই সনদ) তৈরি করা হবে। এ জুলাই সনদের ভিত্তিতে হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
জুলাই সনদ দ্রুত প্রণয়নের বিষয়টি সরকারের পাশাপাশি প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাড়ার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। এর বাইরে সেনাবাহিনীর চিন্তা বা সিদ্ধান্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনী এখন মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ বাহিনী এখন অনেকখানি দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা অর্জন করলেও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধান দীর্ঘদিন মাঠে বাহিনীকে রাখার পক্ষে নন। মার্চ মাসে, সরকার সশস্ত্র বাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্যাপ্টেন, তার সমতুল্য বা তার বেশি পদমর্যাদাসহ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়িয়েছিল। উপরন্তু ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বাংলাদেশ কোস্টগার্ড এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে ডেপুটেশনে থাকা অফিসারদের জন্য বাড়ানো হয়েছে। চতুর্থবারের মতো সরকার সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন বা উচ্চতর পদে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা মোতায়েনে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর দীর্ঘায়িত মোতায়েন পেশাদারিত্ব, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মতো পরিস্থিতি নিয়ে আসে।
সম্ভবত এ বিবেচনায় সেনাপ্রধান ডিসেম্বর বা এর পরপরই নির্বাচনের অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দিয়ে এসেছেন। তিনি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে। এ রূপান্তর ও নির্বাচন তখনই সম্ভব, যদি রাজনৈতিক দলগুলো গঠনমূলক সাড়া দেয়। এখন সে ধরনের একটি পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে আশা করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এখন সেভাবে আর দেখা যাচ্ছে না।
ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত?
২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিপদের সম্ভাবনা আপাতত না থাকলেও ভয়াবহ কিছু ঘটানোর ষড়যন্ত্র রয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে ভারতের সাথে সম্পর্ক, আইনশৃঙ্খলা, ব্যবসার জন্য নিরাপদ পরিবেশে বিঘ্ন ঘটানো, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে অশান্তি সৃষ্টি এবং সেইসাথে বেসামরিক সামরিক সম্পর্ক ভবিষ্যতের জন্য শুভসূচনা ব্যাহত করতে একাধিক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা নেয়া। এক্ষেত্রে রাস্তায় অরাজকতা সৃষ্টির বিষয়টিও সামনে রাখা হয়েছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের মৌলিক ম্যান্ডেট রাষ্ট্র সংস্কার হলেও এমন একটি ধারণা প্রচার করার চেষ্টা হচ্ছে যে, একটি অন্তর্বর্তী সরকার নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন করবে না, যা একটি নির্বাচিত সরকারের বিশেষাধিকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অপরিহার্য ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং একটি নির্বাচিত সরকারে মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করা। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টাদের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ পছন্দকে সমর্থন করে।
ভারতীয় বিশ্লেষকরাই এ বয়ান সামনে নিয়ে আসছে। তাদের বয়ান অনুসারে, ঢাকায় দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনার বিদায় সত্ত্বেও দিল্লি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠনকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইউনূসকে তার ‘শুভেচ্ছা’ অফার করেছেন। বলেছেন, নয়াদিল্লি প্রতিবেশী ঢাকার সাথে কাজ করতে ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ মোদি লিখেছেন, ‘প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আমার শুভকামনা।’ ‘শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য আমাদের উভয় দেশের জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তিনি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে শুভেচ্ছা এবং আনন্দ বিনিময় করেছেন, সর্বশেষটি হলো ঈদ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর পাশাপাশি ভারতে থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে একের পর এক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ অস্থিরতায় ইন্ধন দেয়া হয়েছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দিল্লির কর্মকর্তারা চান আগের সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুসারে বাংলাদেশ চালাবে। দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি একটি সর্বজনবিদিত সত্য যে, নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের প্রাথমিক সম্পর্ক থাকবে ভারতের সাথে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ভৌগোলিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সম্ভবত ভারতের প্রতি হাসিনার পছন্দের ক্ষোভে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং চীনের কাছে পৌঁছান, বুঝতে পারেনি যে তারা ভারতের প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
ভারতের বিশ্লেষকদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, যখন প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছিলেন, তখন সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার বহু প্রতীক্ষিত বৈঠকের সময় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিতে বরং মনোনিবেশ করেছিলেন বলে মনে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদির দিল্লিতে প্রত্যাবর্তনের পর ভারত কর্তৃক ঘোষিত প্রথম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি ছিল নেপাল ও ভুটানের সাথে বাণিজ্য ছাড়া তার স্থল সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় বিমানবন্দর এবং বন্দরগুলোয় ট্রানজিট করা তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি কার্গোর জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা। এটি ছিল দুই দশকের পুরনো একটি চুক্তি। এতে বোঝা যায়, দিল্লির মুখের কথা আর বাস্তব পদক্ষেপে কতটা ব্যবধান রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকরা এটিকে মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন যে, ভারতের উত্তর-পূর্ব একটি ‘ভূমিবেষ্টিত’ অঞ্চল, সমুদ্রে প্রবেশের জন্য অঞ্চলটি ঢাকার ওপর নির্ভরশীল।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ভারতের বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, রাজনৈতিক ফ্রন্টে ছাত্র আন্দোলন তিনটি মূল দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কাজ শুরু করেছেÑ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগের বিচার, শাসন সংস্কার এবং গণপরিষদের নির্বাচন। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় নেতার অভাবের কারণে একটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে, কারণ খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান উভয়ই যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ তার কর্মীদের ওপর হামলা, মুক্তিযুদ্ধসহ হাসিনা পরিবারের প্রতীক ধ্বংসের মাধ্যমে প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। হাসিনা কর্তৃক নিষিদ্ধ রক্ষণশীল ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী এখন নতুন আশার মুখ দেখছে। তবে এ বছরের ডিসেম্বরে বা জুনের মধ্যে নির্বাচন হলে স্পষ্ট বিজয়ী হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে দিল্লি অনুকূল মনে করে না। এজন্য এখনকার বাস্তবতা পরিবর্তন করতে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে ধারণা করা হয়। এজন্য ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মধ্যে এমন অনৈক্য তৈরি করতে চায়, যাতে সেটি সফল হলে ভারত মিত্র রাজনৈতিক শক্তি আবার বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
ভারতের কিছু স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের বিষয়ও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যেও একটি ক্ষেত্র হলো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। মিয়ানমার নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশের ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত যাওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান শ্যু ডক্টর খলিলুরকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এ রোহিঙ্গাদের কোথায় প্রত্যাবাসন করা হবে, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। যেখানে রাখাইন রাজ্যের সরকারি নিয়ন্ত্রণে কেবল কিছু শহুরে পকেট রয়েছে এবং বেশিরভাগ এলাকা জাতিগত আরাকান সেনাবাহিনীর অধীনে রয়েছে। বাংলাদেশ এভাবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে থাকবে এবং ক্যাম্পের বাইরে সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধের ওপর তাদের অংশগ্রহণের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অক্ষম থাকবে, তেমন একটি অবস্থা বৃহৎ দেশটি প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশ বাস্তবিকপক্ষে সমস্যাটি অতিক্রম করার ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন উত্তরণের কাজটি সহজতর করার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের সদিচ্ছা অর্জন করেছে। মার্চ মাসে সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অন্তর্বর্তী সরকারের সূচিত সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন এ সরকারকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থতার একটি কারণ বলে মনে করছে। এজন্য এ সরকারের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার একটি অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে ইসলামী শক্তির উত্থানকে। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদকে এক্ষেত্রে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য সেটিকে অনেকখানি ব্যর্থ করে দিতে পারে। বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের হাত থেকে মুক্তি অর্জন করতে পারে।