পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী অপতৎপরতা : স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হুমকি

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে স্থায়ী সেনাক্যাম্প সময়ের দাবি


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৫:২৮

॥ হামীম হারুন ॥
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে আন্দোলনের নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী অপতৎপরতা ও সেনাবাহিনীর দিকে অস্ত্র তাক করার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা এসেছে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ;রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি এ তিনটি জেলা নিয়ে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড় এবং ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ি অঞ্চলে ঘটে চলা বিভিন্ন সন্ত্রাসী তৎপরতা, অস্ত্র উদ্ধার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় কোনো আধিপত্য বিস্তার বা সাধারণ চাঁদাবাজির ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং বহিরাগত মদদের যোগসূত্র।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের মুসলিমসহ অন্যান্য সাধারণ নাগরিকদের দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এমন দুর্গম এলাকায় স্থায়ী সেনাক্যাম্প রাখা হয় অতি স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে। যারা এ গুরুত্ব অস্বীকার করে তারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শত্রু। তারা কৌশলগত গুরুত্বকে ছাইচাপা দিয়ে অস্থিরতা উসকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার কুশীলব চক্রের দোসর।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তন প্রায় ১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত জটিল— উঁচু পাহাড়, গভীর খাদ এবং দুর্গম অরণ্য একে সাধারণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক কঠিন ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। ভারতের দুটি রাজ্য (মিজোরাম ও ত্রিপুরা) এবং মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যের সাথে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে এই অঞ্চলের। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ঠিক সংলগ্ন হওয়ায় এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুর্গম পাহাড়ি ঢাল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষে দ্রুত সর্বত্র পৌঁছানো সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই পার্বত্য অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী অপশক্তির ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭৩ সালের দিকে লারমা ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘শান্তিবাহিনী’, যা ছিল মূলত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ এর সামরিক শাখা। শান্তি-বাহিনীর লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
যদিও ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির তথাকথিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং শান্তি-বাহিনী অস্ত্র সমর্পণের নাটক মঞ্চস্থ করে। কিন্তু ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ গঠন করে এবং সময়ের পরিক্রমায় এই দলগুলো ও তাদের বিভিন্ন উপদল। যেমন— কেএনএ বা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নানা নামে সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে। এক কথিত শান্তি বাহিনীর বদলে হয় অসংখ্য দল-উপদল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থান এবং পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও বাঙ্কারের সন্ধান প্রমাণ করে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। তারা নতুন নামে অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
সাম্প্রতি সেনা অভিযানে গোপন আস্তানার সন্ধান
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও যৌথবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় জোরালো অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে যা উন্মোচিত হয়েছে, তা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। বিচ্ছিন্নবাদী গেরিলা অপতৎপরতার অংশ। যেমন— সেনাবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা এবং থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি-গুহা ও গহিন অরণ্যে কেএনএ-এর একাধিক স্থায়ী বাঙ্কার, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সন্ধান মিলেছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিদেশি অস্ত্র, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকি এবং সামরিক যোগাযোগের ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এই গোষ্ঠীগুলোর কাছে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের চালান পৌঁছাচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজি করে অর্জন করা অসম্ভব। এর নেপথ্যে বড় ধরনের অপশক্তির মদদ আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ে সাম্প্রতি সময়ে ঘটে যাওয়া ব্যাংক ডাকাতি, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অপহরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনাগুলো সাধারণ বিচ্ছিন্ন কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নয়। বরং এটি একটি সুসংগঠিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের অংশ। প্রশ্ন কারা সেই নেপথ্যের মদদদাতা গোষ্ঠী।
নেপথ্যের মদদদাতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলো নিয়ে আলোচনা করলে যে বিষয়টি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসে, তা হলো— বহিরাগত শক্তির মদদ। অতীতে শান্তি-বাহিনীর উত্থান ও বিস্তারের পেছনে ভারতের কিছু প্রভাবশালী গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার ইতিহাস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রকাশনায় বারবার উঠে এসেছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণগুলো দেখলে বিষয়টি নিশ্চিত হতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই।
ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সরাসরি ছত্রছায়ায় ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে শান্তি-বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডারদের জন্য প্রশিক্ষণ শিবির, অস্ত্রাগার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে ভূরাজনৈতিক চাপে রাখার একটি কৌশল হিসেবে ভারত এই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠিকে ব্যবহার করেছে। যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আছে। যেমন— ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম উপজাতিদের সশস্ত্র সংগঠন শান্তি-বাহিনীকে ত্রিপুরা এবং মিজোরামের সীমান্ত এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় ও গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প তৈরি করে দেয়। নথিপত্র অনুসারে, শান্তি-বাহিনীর সদস্যদের ভারতের দেরাদুনের কাছাকাছি চাকরাতাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সামরিক কেন্দ্রে অ্যামবুশ আক্রমণ এবং আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস অপ্রচলিত বোমা) তৈরির মতো উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘টিট-ফর-ট্যাট বা পাল্টা চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারতের এই নীতিকে একটি কৌশলগত ‘প্রেসার ভাল্ব’ বা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে, তৎকালীন সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো (যেমন : উলফা, নাগা ও মিজো) বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় পাচ্ছিল। এর জবাবে ভারত শান্তি-বাহিনীকে মদদ দিয়ে ঢাকাকে উল্টো ভূরাজনৈতিক চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছিলো।’
বাংলাদেশের সামরিক বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, ভারত সরকার তাদের কূটনৈতিক শক্তির জোরে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের কাছে নিজেদের নির্দোষ হিসেবে সাফাই গাইতে এ বয়ন তৈরি করেছিলো। সম্প্রতি কানাডা আমেরিকা, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অপকর্ম প্রকাশের তাদের এ বয়ান বিশ্ব আর বিশ্বাস করছে না। কিন্তু বাংলাদেশ তার পক্ষে পাল্টা বয়ান উপস্থাপনে জোরালো ভূমিকা দেখাতে পারছে না। তাই আঞ্চলিক সমীকরণ পাল্টে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান দেখাতে পারছে না।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সমীকরণ
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বের নীতি বজায় রাখে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করার কথা বলে, তবুও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সীমান্ত এলাকার গতি-প্রকৃতি নিয়ে সবসময়ই এক ধরনের জটিলতা বজায় থাকে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান গৃহযুদ্ধ এবং সে দেশের আরাকান আর্মির উপস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, যিনি অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহ দমন অভিযানেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাহাড়ে দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত ল্যান্ড কমিশন বা ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন’ সংস্কার ও কার্যকর করার মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের জমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা ও সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে এবং একইসাথে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সাথে সাথে তিনি পাহাড়ি এবং ওই অঞ্চলের সাধারণ বাঙালি— উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজার পক্ষে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, স্থায়ী সেনাক্যাম্প না থাকলে দুর্গম এ অঞ্চল সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। দেশের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়মিত সেনাক্যাম্পের উপস্থিতি অপরিহার্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী, কিছু এনজিও এবং সুবিধাভোগী মহল এই স্থায়ী সেনাক্যাম্প স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।
কিন্তু স্থানীয় সাধারণ মানুষ স্থায়ী সেনাক্যাম্পের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জানান, অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র, মাদক এবং বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে সেনাক্যাম্পের বিকল্প নেই। পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং শান্তিপ্রিয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের শিকার। সেনাক্যাম্পগুলো তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গমাঞ্চলগুলোয় সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়নমূলক কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য নিরাপত্তা বলয় অত্যন্ত জরুরি।
তবে কেন স্থায়ী ক্যাম্পের বিরোধিতা
যারা স্থায়ী সেনাক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার বা নতুন ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করেন, তাদের যুক্তি হলো— এটি নাকি ‘সামরিকীকরণ’ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে ভিন্ন কথা। সেনাক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করা হলে বা কমিয়ে আনা হলে সেখানে তৎক্ষণাৎ সশস্ত্র চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের রাজত্ব কায়েম হয়, যা সাধারণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। ক্যাম্প বিরোধিতার মূল কারণ হলো— সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং এলাকা দখলের রাজত্ব টিকিয়ে রাখা। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশেই এমন দুর্গম, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যময় এলাকায় স্থায়ী সেনাক্যাম্প আছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রেক্ষাপট
পাহাড়ে বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় সেনাক্যাম্প রাখা পৃথিবীর প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রেই একটি সাধারণ এবং অবশ্যপালনীয় নিরাপত্তা কৌশল। যেমন— ভারতের মতো বিশাল রাষ্ট্রেও নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর এবং জম্মু-কাশ্মীরের মতো দুর্গম ও সংবেদনশীল পাহাড়ি অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং সেখানে স্থায়ী সামরিক ক্যাম্প ও আসাম রাইফেলসের পোস্ট বসানো হয়েছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় ভারত সরকার কখনোই সেখানে সেনাক্যাম্পের বিষয়ে আপস করে না। চীনের সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি ও মরুভূমি অঞ্চলে পিপলস লিবারেশন আর্মি (চখঅ)-এর স্থায়ী দুর্গ ও সুরক্ষিত ক্যাম্প রয়েছে। মিয়ানমার সরকারও তাদের সীমান্ত পাহাড়ি অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখে।
পৃথিবীর কোনো দেশই তার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলকে অরক্ষিত রাখে না। সুতরাং বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সেনাক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করা কেবল অবাস্তবই নয়, বরং তা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
সরকারের বক্তব্য
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী জানিয়েছেন, দেশের এক ইঞ্চি জমিও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যা যা করা প্রয়োজন সরকার তাই করবে।
তিনি আরো বলেন, এলাকার উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শান্তিপূর্ণ অবস্থান। বর্তমান সরকার পার্বত্য এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সুপেয় পানি সরবরাহে কাজ করবে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি ৭টি ধারা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিরোধীদলের বক্তব্য
পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশে সারা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছে বিরোধীদল। বিরোধীদলগুলো ফেরানোর নামে কোনো ধরনের বিদেশি বা দেশীয় চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি সবার সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেককে কেন্দ্র করে কী হচ্ছে? ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের পেছনে না দৌড়ে সঠিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিকদের জীবন নিয়ে তামাশা করার অধিকার কারোর নেই। সময় থাকতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।’

হামীম হারুন হাুরুন ইবনে শাহাদাত