ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফলের আহ্বান জামায়াতের


৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:১৫

আগামীকাল ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সফলের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। লংমার্চের সর্বশেষ প্রস্তুতির সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরে শুক্রবার ৩০ অক্টোবর বেলা ১১টায় মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর প্রতি এ আহ্বান জানায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।

এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে তৃতীয় দফার লংমার্চ কর্মসূচি পালন করবে ১১ দলীয় ঐক্য। জনগণের সাত দফা দাবি আদায় এবং সরকারের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আগামীকাল ৩১ অক্টোবর তৃতীয় দফা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা থেকে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লংমার্চ হবে। এটি আগের দুটি লংমার্চের তুলনায় সবচেয়ে দীর্ঘ কর্মসূচি।

তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল লংমার্চ সফল করতে স্ব স্ব প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সাত দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমাদের সাত দফা দাবির প্রথমটি হচ্ছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। সরকার জনগণের গণরায় অস্বীকার করে রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, অথচ অন্যটির ফলাফল অস্বীকার করা দ্বিচারিতা ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। সরকার আন্তরিক হলে আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। বিরোধী দল এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকে এখনো দেশে-বিদেশে চিকিৎসাধীন। জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যারা এখনো গ্রেফতার হয়নি, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার ও জ্বালানি সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারকে অবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, দেশে হত্যা, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং এবং রাজনৈতিক সংঘাত বেড়েই চলেছে। এমনকি সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক দলীয়করণ চলছে। সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের সর্বত্র দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ নিয়োগ, ডিলারশিপ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হাট-বাজার, ঘাট, বালুমহাল, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তন হয়নি শুধু চাঁদাবাজদের পরিচয় ও দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে শুরু করে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ মোট ১৯টি জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এই লংমার্চে অংশ নেবেন। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চ সফল করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক কিছু অসুবিধা হতে পারে। এ জন্য সাধারণ মানুষ, পথচারী, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা মহাসড়কের একটি পাশ ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয়।

লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন আচরণ করা যাবে না। পথে নতুন কোনো জেলা থেকে গাড়ি বহরে যুক্ত হলে সেগুলো বহরের একেবারে শেষ প্রান্তে যুক্ত হবে। নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত টিমগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে। অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রী সঙ্গে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক গাড়ির টোলের টাকা নিজ দায়িত্বে প্রস্তুত রাখতে হবে।

তিনি লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন। এদিন প্রায় ছয় শতাধিক গাড়ির এক বিশাল বহর নিয়ে লংমার্চের বহর সকাল ৮টায় রওনা হবে। পথে আরও গাড়ি যুক্ত হয়ে লংমার্চ দেড় হাজার গাড়ির বহরে পরিণত হবে। পথে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ভাঙ্গা (ফরিদপুর), গোপালগঞ্জ, ফকিরহাট(বাগেরহাট), রূপসা ব্রিজ হয়ে খুলনা। অতঃপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।

পথে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা (সকাল ৯টা); বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড় (সকাল ১১টা); খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর (বেলা ১২:৩০) ও ফুলতলার বাসস্টান্ডের স্বাধীনতা চত্বর (দুপুর ২টা); যশোরের মুড়লীর মোড় (বিকেল ৩:৩০); ঝিনাইদহের বাস টার্মিনাল (বিকেল ৫টায়) পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় রাত সাড়ে ৮টায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।