নেতারা ত্যাগ স্বীকার করলেই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হবে


৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:২৬

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
গোটা দুনিয়ার হিসাব মেলালে দেখা যায়, যে জাতি, জাতির স্বার্থে ঐকমত্যে কাজ করছে, তারা দুনিয়ায় উন্নতি করতে পারছে।
সিঙ্গাপুর একটি পোর্ট দ্বীপরাষ্ট্র। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা পেলেও ঐক্যবদ্ধভাবে তারা জাতির কল্যাণে কাজ করছে বলে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে পারছে। জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ না দেখে জাতীয় স্বার্থে তারা একমতে কাজ করে যাচ্ছে বলে তাদের নিজস্ব কৃষিজমির পরিমাণ নাই বললেই চলে, আবার শিল্প-কারখানাও তাদের কম। আমদানি করে, রফতানি করে তারা এত ভালো করছে। বড় বড় দেশের মালামাল সিঙ্গাপুর থেকে অন্যান্য দেশে রফতানি হয়।
অন্যদিকে ইহুদিরা অবৈধ ইসরাইল নামক দেশ জোর করে আরব ভূমিতে বসবাস করেও অর্থনীতিতে ছোট নয়, আবার পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। লোকসংখ্যা বেশি নয়। তারা জাতে ব্যবসায়ী। এমনকি শক্তিধর আমেরিকার অর্থনীতিও তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা অবৈধ জাতি হলেও নিজেদের মধ্যে ঐক্য রাখতে পেরেই তাদের প্রভাব গোটা দুনিয়া দেখার মতো। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলো সহায়-সম্পদ, জনবল, আর্থিক সুবিধা, জ্বালানির অন্যতম সরবরাহকারী হয়েও ঐক্যবদ্ধ না থাকার কারণে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে চলছে। পাকিস্তান ছাড়া কোনো দেশ পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেনি। বরং ইরানের স্বৈরশাসক পাহলভী পালানোর পর থেকে ইরানের অর্থনীতি-সমাজনীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এক আল্লাহয় বিশ্বাসী হয়ে ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে দুনিয়াকে শক্তির মহড়া দেখাচ্ছে। বিশ্বের মোড়লিপনা করে আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কাছে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। আশা করা যায়, ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠবে।
আমাদের বড় দুঃখ এবং বেদনার বিষয়— ৫৭টি মুসলিম দেশ আমরা আমাদের জনসম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্ঞানের সম্পদ, আমাদের মক্কা-মদীনার সম্পদসহ ঈমানের বলে বলীয়ন হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারছি না। এখানে অধীনতার খপ্পরে পড়ে কেউবা আমেরিকা বা ইউরোপের গোলামি করে নিজেদের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে চলছে। ৫৭টি মুসলিম দেশের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরম ওআইসি কোনো বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারছে না বা কাউকেই একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অপারগ।
ইরান যেভাবে তাদের দেশের জনমানুষের ঐক্য ধরে রেখে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে যুদ্ধে ট্রাম্পকে পরাজিত করার পথে। তাদের ঈমানের বল ৫৬টি দেশের চাইতেও মজবুত। সৌদি আরব মক্কা-মদীনার রক্ষক।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে চুক্তি করেছে। একে অপরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে; এমনকি সামরিক সাহায্য লাগলে তারা একে অপরকে সহযোগিতা করবে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সেনাপ্রধানদের সাথে একাধিক বৈঠক হয়েছে। কিছুটা হলেও মুসলমানদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। ইরান এখানে ভবিষ্যতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
আর ইরান যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে বাংলাদেশসহ আরো দেশ এই জোটে শরিক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি। ইসলামী দেশের ঐক্য হলে আমাদের সম্পদ, জনবল, জ্বালানি, সমুদ্রবন্দর, হরমুজ প্রণালি মুসলমানদের কাছে প্রেরণার উৎস হবে।
আফগানিস্তানের কথা আমরা ভুলেই গেছি। আফগানিস্তান কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথানত করেনি। আলখেল্লাহ পরে তারা ব্রিটিশকে তাড়িয়েছে, রাশিয়াকে তাড়িয়েছে, সর্বশেষ আমেরিকার সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। শুধুমাত্র তাদের আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে তাদের আজকের এই স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সব শক্তিধর দেশই আফগানিস্তানের এই বিজয় দেখে অবাক হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এরপরও পাকিস্তানের সাথে তাদের ছোট-খাটো মতবিরোধ জিইয়ে রাখা যাবে না বৃহত্তর মুসলিম ঐক্যের খাতিরে।
গত ৫৫ বছরে আমরা ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি। তাদের কথায়-কাজে, তাদের চাওয়া-পাওয়া নিয়েই আমরা ব্যস্ত। আমাদের স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করারও স্বাধীনতা নেই।
দীর্ঘদিন স্বৈরাচার হাসিনা দেশকে শুধু পরাধীনতার গ্লানিই আমাদের জন্য তৈরি করে রেখে যাননি, আমাদের অর্থনীতির ভিত ব্যাংকগুলোর মূলধন লুট করে বিদেশে পাঠানোর জন্য পথ করে দিয়েছিল তার সহযোগীদের। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে টাকা চুরির পথ করে দিয়েছিল তার দোসরদের।
আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস ও তেল কয়লাখনিগুলো বন্ধ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে আমাদের পঙ্গু করে রেখেছিল, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমাদের সমুদ্রপথ এবং সেখানে সম্পদ লুকিয়ে আছে তারও অনুসন্ধান সঠিকভাবে করি না। সারা দেশে আমাদের যে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, কয়লা মজুদ আছে, তা যদি সঠিকভাবে নির্ণয় করে উঠানোর ব্যবস্থা করতে পারি, তবে আমাদের জ্বালানির কোনো ঘাটতি হবে না। কোনো কোনো গবেষক তো বলেছেন, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে বাজারজাত করতে পারলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করার সুযোগ হবে।
আমাদের সমতল ভূমিতে ধান, পাট, গমসহ খাদ্যদ্রব্য, নিত্যপণ্য, তরিতরকারির উৎপাদনে দেখভাল করতে পারলে আমাদের জিনিসের আমদানি করতে হবে না। আমাদের উর্বর ভূমিতে ভিনদেশি ফল ড্রাগন, মরুভূমির ফল খেজুরও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে। আমাদের দেশের উৎপাদিত আম বিদেশেও রফতানি শুরু হয়ে গেছে। আমাদের সমস্যা জাতিগতভাবে ঐকমত্যের সরকার না থাকা। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তারা ব্যক্তি ও দলের স্বার্থে কাজ করেছে। প্রকল্প নিয়েছে। যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বাজেট বাড়িয়ে বাড়তি কামাইয়ের ব্যবস্থা করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। যতবড় প্রকল্প, তত বড় চুরির ব্যবস্থা হয়েছে।
আমরা এর প্রতিকার চাই। ৩৬ জুলাই আমাদের শিখিয়ে গেছে— আর না পরাধীনতা, আমরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চাই। আমাদের সঠিক চিন্তাবিদের অভাব নেই। অভাব আছে দলের ঊর্ধ্বে উঠে এদের কাজে লাগানোর। আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য টাকা খরচ করে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু মনিটরিং সঠিকভাবে করলেই চলবে। উদ্দেশ্য থাকবে দেশের জন্য, দেশের কল্যাণের জন্য আমরা সবাই দল-মত নির্বিশেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করব।
বর্তমানে ৩৬ জুলাইয়ের পর যে সরকার পেলাম, আমরা অনেক আশা করেছিলাম, এবার হয়তো আর বৈষম্যের শিকার হবো না। কিন্তু না— সব ক্ষেত্রে দলবাজি, চাঁদাবাজি কোনো অংশে কম হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জায়গা যেখানে স্বাধীনতার কথা আলোচনা করা হয়, সেখানেও দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। খুবই লজ্জাজনক। এর প্রতিকার অবশ্যই করতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে অতিসত্বর স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ছাত্র-জনতা কিন্তু আর সহ্যের সময় পার করতে দেবে না। কঠোর ভূমিকায় ছাত্র-জনতা আবার মাঠে নামবে। কূলকিনারা পাবেন না। যাবেন কোথায়। আওয়ামীদের তো তাদের দাদার দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আপনারা যাবেন কোথায়? আমরা কিন্তু আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতেই থাকবো এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশেই থাকবো। কারো অধীনতা নয়। কারো দলীয় আওতায় নয়। জাতীয় স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েই দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতে চাই।
জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের ভূরাজনীতির সাফল্য নির্ভর করছে। শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়া বুঝেই ঐকমত্যের রাজনীতি ও দলের সাথে ঐক্য করে দেশ চালিয়েছিলেন। সাফল্য যে আসেনি, তা বলা যাবে না। তবে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। জোট সরকারের দুজন মন্ত্রী জামায়াতের সাবেক আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সফলতার সাথে ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে দেখিয়ে গেছেন এ যুগেও সততা ও দুর্নীতিমুক্তভাবে মন্ত্রণালয় চালানো যায়।
আমরা এবার ৩৬ জুলাইয়ের আগে ও পরে এমনই আভাস পাচ্ছিলাম যে, জামায়াত ও বিএনপি আলাদা নির্বাচন করলেও সরকার গঠনের সময় হয়তো জাতীয় সরকারের মতো একটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বৈরাচার হাসিনার ফেলে যাওয়া দুর্নীতির আখড়া দেশটাকে ভালোর দিকে নিয়ে আসা যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পর হঠাৎ দুই-তৃতীয়াংশ সিট বিএনপির ভাগে পড়ায় তারা ভুলেই গেল দেশ চালানো যে এত সহজ নয়। ৭ মাস যেতে না যেতেই বিএনপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে কত কঠিন দেশ চালানো। মিডিয়ায় একটি ভাষণে সাবেক এমপি বলেছেন, বিএনপির সবাই চাঁদাবাজ নয়। তবে যারা চাঁদবাজি করছে তারা সবাই বিএনপির লোক। তাই ভালো লোক সব দলেই আছে, তাদের কদর করতে হবে। নতুন-পুরাতনের সমন্বয় করতে হবে। অভিজ্ঞতা ছাড়া দেশের কল্যাণ করা যায় না। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী অতিমাত্রায় দৌড়াচ্ছেন দেশটাকে আবার হাসিনার আমলের মতো তাঁবেদার পুতুল সরকারের মতো কিছু করা যায় কিনা?
ভুলে গেলে চলবে না, ৩৬ জুলাই শুধুমাত্র ছাত্রদের আন্দোলন কীভাবে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়ে একটি জাতীয় বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। বাংলাদেশের মানুষ অনেক ত্যাগ করেছে। এবার তারা ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চায়। তাই রাজনীতির সাথে জড়িত দল ও মতের লোকদের বুঝতে হবে দেশের কল্যাণ কোন পথে?
এখনো সময় আছে, অভিজ্ঞ রাজনীতির লোকদের সরকারি দল ও বিরোধীদলের লোকেরা বসে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখা দরকার। জনগণই আমাদের লক্ষ্য হওয়া দরকার। ব্যক্তি দলের ঊর্ধ্বে উঠে আসুন, ভূরাজনীতির কথা চিন্তা করে সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে গোলামি নয়— এই নীতিতে এগোতে হবে। টিআইবি এক রিপোর্টে বলেছেন, বিএনপি এবং জামায়াতকে সহিষ্ণু মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে দেশের স্বার্থে।
আমাদের জনশক্তি, সমতল ভূমি, সমুদ্রের সুবিধা সবই দেশ গড়ার অনুকূল। শুধু নেতাদের একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তবেই আমরা শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার অনুসরণে বাংলাদেশকে একটি সুখি-সমৃদ্ধশালী স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হব। আমাদের দেশের তরুণ সমাজ অত্যন্ত কর্মতৎপর। দেশে ও বিদেশে তাদের সঠিকভাবে গাইড করতে পারলে তারা আমাদের বড় শক্তিতে পরিণত হবে এবং দেশের কল্যাণে কাজে আসবে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com