ভারত কি বিএনপি-আ’লীগের সমঝোতা চায়?


১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৫

নেপথ্যের হিসাব, ঢাকার সীমারেখা

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি প্রশ্ন ক্রমেই আলোচনায় আসছে— ভারত কি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা বা নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে? বিশেষ করে অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফর, তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর, শেখ হাসিনাকে ঘিরে কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং দিল্লির সাম্প্রতিক ‘রিসেট’ তৎপরতা— সব মিলিয়ে এই প্রশ্নের পেছনে যুক্তি তৈরি হয়েছে।
ভারত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতা করাতে চাইছে— এমন কোনো প্রকাশ্য সরকারি অবস্থান প্রকাশ করছে না। প্রকাশ্যে ভারতীয় অবস্থান হলো, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ‘গঠনমূলক, ফরোয়ার্ড লুকিং সম্পর্ক চায় এবং সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে চায়।’
কিন্তু কূটনীতির আসল ভাষা সবসময় সরকারি বিবৃতিতে ধরা পড়ে না। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত— দিল্লির কৌশলগত স্বার্থ কি এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা থাকবে এবং কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে থাকবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
দিল্লির প্রথম শিক্ষা : শুধু একটি দলের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ : গত দেড় দশকে ভারতের বাংলাদেশনীতি কার্যত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল—এমন মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও এসেছে। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে দিল্লির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তৈরি হয়েছিল, ভারত তার সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে শক্তি জুগিয়েছে। ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর এই সম্পর্কের রাজনৈতিক মূল্য ভারতকে দিতে হয়েছে।
দিল্লির জন্য এখান থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে— বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল করা নিরাপদ নয়।
তাই এখন বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা ভারতের জন্য কেবল ‘বিকল্প দল’ খোঁজা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের অংশ হতে পারে।
২০২৬ সালের শুরুতেই আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ভারত নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা করছে এবং আওয়ামী লীগের বাইরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চাইছে। একই প্রতিবেদনে সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা বিএনপি ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
অর্থাৎ দিল্লি বুঝতে পেরেছে— আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক চালানো সম্ভব, কিন্তু বিএনপিকে বাদ দিয়ে নয়।
দ্বিতীয় হিসাব : আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক শূন্যতায় ঠেলে দেওয়া
এখানে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গটি আলাদা। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে মাঠপর্যায়ে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
এই বাস্তবতায় ভারত যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, সেটি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে। আবার আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও দিল্লির দীর্ঘদিনের যোগাযোগের একটি বড় অংশ অকার্যকর হয়ে যাবে।
তাই ভারতের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে— আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করা, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক করা।
এটি ‘বিএনপি-আওয়ামী লীগ জোট’ নয়। বরং এটি হতে পারে দুই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে একই সময়ে যোগাযোগ রাখার কৌশল। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে দোভালের ভূমিকা কোথায়? অজিত দোভালের কথিত ১৭-১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা সফর এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সফরটি ভারত বা বাংলাদেশ কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি এসেছে এবং একই সময়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে।
দোভাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত কূটনীতির মানুষ নন; তার মূল ক্ষেত্র জাতীয় নিরাপত্তা। ফলে তার সঙ্গে আলোচনা হলে সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে সীমান্ত, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, উত্তর-পূর্ব ভারত, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন থাকার সম্ভাবনা স্বাভাবিক। কিন্তু এখানেই একটি গভীর বিষয় আছে। দিল্লির কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে শুধু সরকার টিকে থাকা নয়। ভারতের জন্য স্থিতিশীল বাংলাদেশ মানে— উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা; সীমান্তে সহিংসতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ; কথিত ভারতবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতার সুযোগ সীমিত রাখা; চীনের কৌশলগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা; বন্দর ও যোগাযোগ সুবিধার ধারাবাহিকতা; বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহ এবং সর্বোপরি একটি কার্যকর ঢাকার সঙ্গে কাজ করা।
সুতরাং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো ন্যূনতম রাজনৈতিক সমঝোতা যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত কমায় এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আবার ভারতমুখী করে, দিল্লি সেটিকে স্বাগত জানাতে পারে। কিন্তু এটি সমঝোতা ‘করিয়ে দেওয়ার’ বিষয়টি মাত্রাগতভাবে সমান নয়।
আওয়ামী লীগকে কেন পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেখতে চাইবে না দিল্লি? এখানে ভারতের আরেকটি স্বার্থ কাজ করতে পারে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ভারতপন্থী একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্থির নয়।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা যদি ধরে নেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা থাকবে না, সেটি কৌশলগত ভুল হতে পারে। আবার আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব বা শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
তাই দিল্লির জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি হতে পারে— আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার সুযোগ রাখবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হবে বাংলাদেশের আইন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে; ভারতের মাটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এর একটি ইঙ্গিতও দেখা গেছে। আগস্টে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ ভারত সম্ভবত একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য খুঁজছে— হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্ল্যাটফর্ম না দেওয়া, কিন্তু ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আওয়ামী লীগ পুরোপুরি মুছে যাওয়ার পরিস্থিতি ঠেকানো।
বিএনপিকে নিয়ে ভারতের হিসাব
বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস সহজ নয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন ছিল। ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে বিএনপি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহও ছিল।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দিল্লির সামনে বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে হলে বিএনপি সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে হবে।
এ কারণেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর ভারতের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টে সম্ভাব্য সফর স্থগিত হওয়ার পর দুই দেশ এখন নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন তারিখ নিয়ে আলোচনা করছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি ঢাকার জন্য এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
এখানে ভারতের কৌশলটি সম্ভবত খুব বাস্তববাদী— বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, কিন্তু হাসিনা ইস্যুতে এমন ছাড় দেওয়া যাবে না; যাতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান বড় সংকটে পড়ে। বাংলাদেশ কতটা ‘পা দেবে’? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চায় এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, ভারতকে অন্য দেশের মতোই জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত।
অর্থাৎ ঢাকার দরজা বন্ধ নয়। কিন্তু দরজাটি শর্তহীনও নয়। বর্তমান সরকারের বক্তব্য থেকে তিনটি সীমারেখা স্পষ্ট।
প্রথমত, সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তবে সেটি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, ভালো প্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং সমতার ভিত্তিতে।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় স্বার্থ আগে। সরকার আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে বলে প্রধান হুইপ জানিয়েছেন।
তৃতীয়ত, হাসিনা প্রশ্ন। ঢাকা স্পষ্টভাবে প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত বলছে, বিষয়টি তাদের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে হাসিনা ভারতে অবস্থান করে রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে বিরত থাকলে তা নিয়ে সরব নাও হতে পারে।
সুতরাং বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাইতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের পছন্দের কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত মেনে নেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করা— দুটি এক বিষয় নয়।
‘সমঝোতা’ হলে সেটি কেমন হতে পারে?
যদি ভবিষ্যতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হয়, সেটি সম্ভবত দিল্লির তৈরি করা সরাসরি কোনো চুক্তি হবে না। বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকেই সেটি আসতে হবে। ভারতের সম্ভাব্য স্বার্থ হবে পাঁচ জায়গা— এক. সহিংসতা কমানো : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত ভারতের সীমান্ত ও নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে। দুই. একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা : বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তিন. উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ : ভারত বিশেষভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতবিরোধী রাজনীতি বা উগ্র কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি চায় না। এক্ষেত্রে বিএনপির ইসলামী দলবিরোধী পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখে। চার. চীন-পাকিস্তান ফ্যাক্টর : বাংলাদেশ যদি ভারত-চীন-পাকিস্তান প্রতিযোগিতার সক্রিয় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, দিল্লির নিরাপত্তা হিসাব জটিল হবে। পাঁচ. যোগাযোগ ও অর্থনীতি : চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, রেল-সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য— সব ক্ষেত্রেই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ আছে।
ঢাকার ‘লাল রেখা’ কোথায়?
বাংলাদেশ যদি কোনো সমঝোতার পথে যায়ও, সেটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজন আছে। একইসঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন ‘ভারতপন্থী’ বা ‘ভারতবিরোধী’ সমীকরণ নয়। প্রশ্ন হলো— কোন সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থকে সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করে।
এ কারণেই বিএনপি যদি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, সেটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার অর্থ হবে না। আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হলেও সেটি ভারতের নির্দেশিত হতে হবে— এমনটি হওয়া উচিত হবে না।
শেষ হিসাব
দিল্লির বর্তমান কৌশলকে তিনটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করা যায়— পুনঃসংযোগ, রাডারে ধরে রাখা, স্থিতি বজায় থাকা।
অর্থাৎ সম্পর্ক পুনঃসংযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ানো এবং বাংলাদেশে এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে।
এখানে বিএনপি এখন ভারতের জন্য অপরিহার্য বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ ভারতের জন্য অতীতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে সরাসরি ‘সমঝোতা করিয়ে দেওয়া’ ভারতের ঘোষিত নীতি— এমনটি দিল্লি প্রকাশ্যে আনতে চায় না।
বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে চিত্রটি বেশি পরিষ্কার, তা হলো—দিল্লি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে নতুন করে মানিয়ে নিচ্ছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।
বাংলাদেশ সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না। কিন্তু একইসঙ্গে ঢাকা আগের ধরনের একক-নির্ভর সম্পর্কেও ফিরতে আগ্রহী নয়— আর আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণও মানতে চায় না। সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট।
অতএব বাংলাদেশ কতটা ভারতীয় প্রচেষ্টায় ‘পা দেবে’, তার উত্তর নির্ভর করবে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর— দিল্লি কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করার বদলে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ও জনগণের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করবে?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের নতুন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার যথেষ্ট জায়গা আছে। আর যদি সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের শর্ত হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যকে দিল্লির নিরাপত্তা-চাহিদা অনুযায়ী সাজানো, তাহলে ঢাকার জন্য সেই সমীকরণ গ্রহণ করা অনেক বেশি কঠিন হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কে ভারতের পছন্দের দল— তা নয়; বরং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন কাঠামোয় পরিচালিত হবে— সেটিই আসল প্রশ্ন।