সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিষফল আইনশৃঙ্খলার অবনতি


৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫৩

জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণমানুষের মনে যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সৃষ্টি হয়েছিল, অল্প সময়ের ব্যবধানেই তা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকালে সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক— দেশে কি আদৌ কোনো কার্যকর সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে? পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া নৈরাজ্য ও বিচারহীনতার কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাভোগী, চাঁদাবাজ ও দখলদার গোষ্ঠী।
রাজধানীর মিরপুরের মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দানকারী এনজিও রাড্ডা পরিচালিত হাসপাতাল থেকে শুরু করে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও দখল কিংবা সাধারণ মানুষের নির্মাণাধীন বাড়ি দখলের চেষ্টার মতো ঘটনায় জাতি বাকরুদ্ধ। রাষ্ট্রের প্রধান কাজ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য। রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে জনগণের জানমাল দখল অকার্যকর রাষ্ট্রেই শুধু সম্ভব।
এখানেই থেমে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার শেষ নেই। কুমিল্লার কিশোর অপ্রতিম হত্যাসহ দেশজুড়ে অব্যাহত শিশু হত্যা ও নির্যাতন। পতিত ফ্যাসিস্ট গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের নামে ককটেল ও হাতবোমা বিস্ফোরণ এবং প্রকাশ্যে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদকের অবাধ বিস্তার প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে চরমভাবে ব্যর্থ।
আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতির মূল কারণ জুলাই চেতনার সাথে সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কেবল একটি দলের বিদায় আর অন্য দলের ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য ছিল না; তা ছিল ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার এবং সার্বিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যখন অপরাধীদের দলীয় পরিচয়ে ছাড় দেওয়া হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঢিলেঢালা ভাব দেখানো হয় এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দখলদারিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন তা জুলাইয়ের শহীদ ও আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগের সাথে সরাসরি প্রতারণা হিসেবে গণ্য হয়। এই সুযোগেই রাজনীতির মাঠে পুনরায় দুর্বৃত্তায়ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
আমরা বিশ্বাস করি, অচলাবস্থা নিরসন এবং আইনশৃঙ্খলার ধারাবাহিক অবক্ষয় রোধের একমাত্র পথ হলো— গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো এবং গণতন্ত্রের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা। কারণ গণভোটের রায় হলো দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক অর্থাৎ জনগণের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্ত। একটি সরকার যখন গণভোট ও জনগণের সুনির্দিষ্ট রায় মেনে পরিচালিত হয়, তখন তার ওপর জনগণের সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকে। জবাবদিহিমূলক সরকার কোনোভাবেই দলীয় ক্যাডার বা সুবিধাবাদীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে দিতে পারে না।
আমরা জানি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল শর্ত হলো রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। গণভোটের মূল চেতনা বাস্তবায়িত হলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আর দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে না। তারা কোনো রাজনৈতিক সুবিধাভোগীর কথা না শুনে কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে, যা এনজিও, হাসপাতাল বা ব্যক্তির সম্পদ দখলের মতো অপরাধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সক্ষম। বর্তমানে ফ্যাসিস্ট ও নতুন রূপের দখলদারদের যৌথ তাণ্ডবের প্রধান কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কর্মীদের অপরাধ আড়াল করা বন্ধ করে গণপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে, তখনই সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ভেঙে পড়লে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই শান্তি ফেরানো যায় না। গণভোট ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রীতির চর্চা নাগরিকদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রুখে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি জোগাবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের ফল। জুলাইয়ের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই দখলবাজি ও ছিনতাইয়ের রাজত্ব কায়েম হতে দেওয়া যায় না। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া প্রকৃত রায় বাস্তবায়ন এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার ও একটি নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করার আর কোনো বিকল্প পথ নেই।