সরকার কথা না মানলে আন্দোলন চলবে : ডা. শফিকুর রহমান
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:১৯
২৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় রাজধানীর মগবাজারস্থ আলফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিট সাংবাদিকদের এক মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এমপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার কথা না মানলে আন্দোলন চলবে। কোনো ক্রেডিট নেওয়ার জন্য নয়, জনগণ ও জনগণের প্রয়োজনে আমরা জাতীয় সংসদে কথা বলতে চাই। এর আগে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় আমাদের পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সাথে নেওয়ায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়েছে। কারণ জনগণ সরকার ও বিরোধীদলের সম্মিলিত উদ্যোগকে আস্থার সাথে গ্রহণ করায় এটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কেউ এমন অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করেছেন, যা সত্যি দুঃখজনক। চলমান জ্বালানি সঙ্কট, গণভোটের রায়সহ ৭ দফা দাবি উপেক্ষা করায় আমরা জনগণের কাছে চলে এসেছি। লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছি। জনগণ ব্যাপকভাবে এতে অংশগ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদে কথা বলার এবং সমস্যা সমাধানের সুযোগ না পেলে আমাদের এ ছাড়া আর কী করার ছিলো?
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিট সাংবাদিকদের এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা দেশের বিরাজমান জনদুর্ভোগ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জুলাই সনদ ও গণভোটকে উপেক্ষা করার নেতিবাচক প্রভাব, চলমান রাজনৈতিক অবস্থা, বিরোধীদলের চলমান লংমার্চ কর্মসূচি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেন। বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা মতবিনিময়কালে মন খুলে বাংলাদেশ ও জনগণের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বিরোধীদলীয় নেতার কাছে তুলে ধরেন। তাদের পেশাগত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সাংবাদিকরা বিরোধীদলীয় নেতার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, তিনি শুধু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের নেতা নন, তিনি দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের নেতা। সাংবাদিকরাও এদেশের জনগণেরই অংশ, তাই তিনি তাদেরও নেতা। তারা তাকে দেশে জনগণের কল্যাণে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতাও সাংবাদিকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুবব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আব্দুর রব, এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, সাইফুল আলম খান মিলন, মোবারক হোসাইন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি; কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান ও এডভোটেক হেলাল উদ্দিন।
মতবিনিময় সভায় দেড় শতাধিক বিট সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে থেকে এটিএন বাংলা, একুশে টিভি, ৭১ টিভি, এটিএন নিউজ, মোহনা টিভি, দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি নিউএজ, দৈনিক যুগান্তর, নিউজ ২৪ টিভি, বৈশাখী টেলিভিশন, দৈনিক সংগ্রাম, এখন টেলিভিশন, ইসলামী টিভি, বাংলা নিউজ, আমাদের সময়, দৈনিক ইনকিলাবের বিট সাংবাদিকরা বক্তব্য রেখেছেন। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সম্মানে আয়োজিত দুপুরের মধ্যাহ্নভোজে আমীরে জামায়াত অংশ নেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। ১৭ তারিখ আমরা শপথ নিলাম, প্রথমে সংবিধান সংষ্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পরে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে। কিন্তু তারা নিলেন না। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তারা ঠিক কথা দিয়েছেন। তারা এবং আমরা নির্বাচনের আগে একই সুরে কথা বলেছি। কিন্তু সরকার গঠন করার পর তাদের সুর পাল্টে গেছে। বিরোধীদল হিসেবে আমাদের আসলে তেমন কিছুই করার সুযোগ নেই, সরকার যদি জনগণের সমস্যা সমাধানে তাদের দেয়া অঙ্গীকার পূরণ না করে। তখন বাধ্য হয়ে আমাদের জনগণের কাছেই ফিরে আসতে হয়। তাদের সাথে নিয়ে আন্দোলন করতে হয়।
তিনি আরো বলেন, আমরা মনে করি, সরকারি দল আন্তরিক হলে সবাই সরকার ও বিরোধীদল মিলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। সরকার গঠনের পর পরই জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে আমাদের দেয়া নোটিশ আমলে নেওয়ায় আলোচনার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু এখন তারা আমাদের ৭১, ৬২, ৬৮ ধারা কিছু আমলে নিতে চায় না।
জ্বালানি সঙ্কট, সীমান্ত হত্যা, সার সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলা, শিশু নির্যাতন নিয়ে দেয়া অনেক নোটিশ কোথায় আছে, তা আমরা জানি না। কিন্তু একজন মন্ত্রী ৩০০ বিধিতে দাঁড়িয়ে যেকোনো সময় কথা বলতে পারেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধীদলের জন্য সেই সুযোগ নেই। তা নির্ভর করে সরকারি দলেরও ওপর। তাই বলি ইচ্ছে করলে সরকারি দল সব কিছু করতে পারে, কিন্তু বিরোধীদল কিছুই করতে পারে না।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, সরকারের ক্রেডিট নেওয়ার মানসিকতার কারণে বিরোধীদলের অনেক নোটিশ উপস্থাপনাকে তারা হাস্যকর করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে তিনি কাতার আমীরের ইন্তেকালের পর সড়কের নামকরণ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়িয়ে এশিয়ার অন্যান্য দেশ; যেমন— চীনের সাথে তুলনা করে বলছে, তাদের চেয়ে আমাদের দাম কম। আমার প্রশ্ন হলো— তাদের মতো জীবনযাত্রার মান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আগে করুন। তারপর তুলনা করুন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে সর্বক্ষেত্রে। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকরা বেকার হবে। মালিকরা ব্যাংক ঋণ নিতে ব্যর্থ হবে। প্রতিটি জিনিসের উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাধ্য হয়ে মালিকরা কারখানা বন্ধ করে দেবেন। তখন বেকার জনশক্তি কোথায় যাবে? সমাজে অপরাধ আত্মহত্যা বাড়বে। এ দায় সরকাকেই বহন করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে গেলে কিংবা যথাসময়ে অর্ডার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বায়াররা চলে যাবে। একবার চলে গেলে সহজে ফিরবে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলাম। সরকার আমাদের প্রস্তাব নিলো না। আমাদের ভালো কথা তারা শুনছে না। আমার দেখা দেশের যত বিরোধীদল এসেছে, আমাদের মতো গঠনমূলক কোনো দল আমার চোখে পড়েনি। আমরা এ গঠনমূলক ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আমরা ফাইল ছোড়াছুড়ি করব না। জনগণের দাবি পূরণে জনগণের কাছেই ফিরে আসব।
তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেল বাড়ানোর পর যারা সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগের প্রস্তাব করেছে, তাদের সমালোচনা করে বলেন, আমরা কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করব। আমরা সুযোগ-সুবিধার জন্য নয়, দেশ ও জনগণের সেবার জন্য সংসদে এসেছি। আমরা প্লট, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি নিইনি। অনেকে প্রশ্ন করেন— আমি বাসা নিয়েছি? না, আমি সরকারি বাসা আমার নামে লিখে নিইনি। আমি এখানে থাকি না, সরকারি কাজ করি। সরকারি অফিস যেমন ব্যবহার করি, ঠিক তেমনি ব্যবহার করি। যতদিন বিরোধীদলের নেতা আছি, ততদিন থাকবো, ততদিন এ বাসায় সরকারি কাজে ব্যবহার করব। এটি সবাই করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত ৩টি স্তম্ভ। আইন বিভাগ (খবমরংষধঃঁৎব), শাসন বা নির্বাহী বিভাগ (ঊীবপঁঃরাব), বিচার বিভাগ (ঔঁফরপরধৎু)। এর বাইরে ৪র্থ স্তম্ভ হলো মিডিয়া। এটি সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ। আপনাদের দায়িত্ব সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরা। কালোকে কালো সাদাকে সাদা বলতে হবে।
তিনি বিরোধীদলের নেতার মুভমেন্ট মিডিয়া কভারেজ করা এবং সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্পর্কে বলেন, আমি বক্তব্য যা বলি, ফটো কার্ডে তা থাকে না। এ প্রতিশ্রুতি দিলে আমি সাক্ষাৎকার দিতে আমার আপত্তি নেই।
তার বক্তব্যের জবাবে সাংবাদিকরা সমস্বরে বক্তব্য বিকৃত না করার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন আপনারা প্রধানমন্ত্রীরও সাক্ষাৎকার নেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে তিনি এবং জামায়াতে ইসলামী সংসদের সাথে সাথে শান্তিপূর্ণ সমস্ত কর্মসূচি নিয়েও দেশের মানুষের পাশে থাকবে।