উৎপাদন-পরিবহনসহ সব ধরনের ব্যয় বাড়ছে, ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৬
স্টাফ রিপোর্টার : দেশের অর্থনীতি যখন দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা সামলে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন করে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। গত ২০ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ নতুন মূল্য নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওই সময় দেওয়া একটি বক্তৃতার ভিডিও গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেছেন সরকার লুটপাটের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এছাড়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষুব্ধ। সামাজিকমাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা। একইভাবে কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় সব প্রধান জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন বা ফ্রেইট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি হিসাবে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে। অথচ সরকার যেদিন বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির দাবি করেছে, ওইদিনই বাংলাদেশে একাধিক গণমাধ্যমে বিশ্ববাজারের জ্বালানি তেলের মূল্য কমার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভের পাশাপাশি দুশ্চিন্তাও বেড়েছে। কারণ জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহক— সব খাতই সমস্যায় পড়ে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছালেও সংকটের সময়ে অনেক শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম ছিল। বিদ্যুৎ খাতেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও অনেক সময়ে সরবরাহ ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে ছিল। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘসময় লোডশেডিং হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ানো সিদ্ধান্ত হয়েছে গত ২১ সেপ্টেম্বর। ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক, নৌযান ও কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়ানোয় এর প্রভাব পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয় শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে; শিল্প পুলিশের এক মূল্যায়নে ৪০০টির বেশি কারখানা সংকটে পড়েছিল এবং কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধও হয়েছিল।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোজ এসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ)। গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার বিআইসিডিএ’র এক বিজ্ঞিপ্তিতে ৬টি ক্ষেত্রে ‘সারচার্জ’ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ও আইসিডির মধ্যে এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) থেকে আইসিডিতে খালি কন্টেইনার আনা নেয়া রয়েছে। সেইসঙ্গে রপ্তানি পণ্য বোঝাই এবং হ্যান্ডলিং চার্জও বেড়েছে।
বিআইসিডিএ মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে সরকারিভাবে লিটারে ২০ টাকা করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সে হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৭.৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১১৫ টাকা থেকে তা বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের দাম রয়েছে। আমরা সবগুলোয় গড়ে ৯.৮৫ শতাংশ করে বাড়িয়েছি; যেটা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একক কোনো বিষয় নয়; এটি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত। সাধারণ মানুষ চান ‘জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি কমানো এবং মূল্য আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া।
দেশে বাড়ার দিনই বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম : বাংলাদেশে বাড়ার দিনই বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম। গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে দেশে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। ঠিক একই দিনই বিশ্ববাজারে কমেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দামই কমেছে।
বিশ্ববাজারে কতটা কমলো তেলের দাম : গত ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর সরবরাহের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের অক্টোবর সরবরাহের দাম কমেছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে। এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে প্রায় ১৫৮ দশমিক ৯৯ লিটার থাকে। আর বর্তমান বাজারমূল্য অনুসারে প্রতি মার্কিন ডলারের দাম প্রায় ১২৩ টাকা। এই হিসাবে ব্রেন্ট ক্রুডের ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলার বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৫৬৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭৯ টাকা। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলার প্রায় ১২ হাজার ১১০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি লিটারের দাম প্রায় ৭৬ টাকা।
উল্লেখ্য যে, এগুলো বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আনুমানিক লিটারপ্রতি দাম। বাংলাদেশের পাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানি তেলের দাম এভাবে সরাসরি নির্ধারিত হয় না। পরিশোধন, পরিবহন, কর, শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ার পর খুচরা বাজারের দাম নির্ধারিত হয়। জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক নোটে বলেছেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বিঘ্ন থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। গত ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি ২০২৫ সালের গড় সরবরাহের তুলনায় প্রতিদিন ৬১ লাখ ব্যারেল কম। তবে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে নতুন করে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে তিনি ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে’ রয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শিগগির এ বিষয়ে ‘খুব বড় কিছু’ ঘটতে পারে। তেলের বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগকারীরা তাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। স্কাই লিংকস ক্যাপিটাল গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল তাকিয়েদ্দিনের মতে, তেলের দাম নির্ভর করবে রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার গতি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর। তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে অথবা জাহাজ চলাচলে আবারও সমস্যা তৈরি হলে তেলের সরবরাহ কমতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে আবারও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। সূত্র: সিএনবিসি।