তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ইসলাম প্রচার-প্রসারে সহায়ক


৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫১

॥ আনিসুর রহমান এরশাদ ॥
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি ও দাওয়াতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মুদ্রণযন্ত্র, রেডিও-টেলিভিশনের পর ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন ও এআই দাওয়াতকে আরও বিস্তৃত করেছে। একজন আলেম, গবেষক, লেখক বা দাঈ একই সময়ে বিশ্বের লাখো মানুষের কাছে কুরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য ও নৈতিকতার বার্তা পৌঁছাতে পারছেন। প্রযুক্তি ইসলামের বিকল্প নয়; ইসলামী জ্ঞান ও মূল্যবোধকে বিস্তৃত করার শক্তিশালী মাধ্যম।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সম্ভাবনা : দাওয়াতের মূলনীতি, উদ্দেশ্য ও নৈতিকতা কুরআন-সুন্নাহ নির্ধারণ করবে; প্রযুক্তি হবে সেই বার্তা পৌঁছানোর বাহন। মহানবী সা. ভাষা, চিঠি, দূত ও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ ব্যবহার করেছেন। মাধ্যম পরিবর্তিত হলেও দাওয়াতের উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত। আধুনিক প্রযুক্তি দাওয়াতকে ভিডিও, অডিও, পডকাস্ট, ই-বুক, পোস্ট ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়। এটি একটি ‘রিচ মাল্টিপ্লায়ার’। কিন্তু বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো আর হৃদয় ও চরিত্রে পরিবর্তন আনা এক নয়। দাওয়াতের সাফল্য ভিউ, লাইক, ফলোয়ার বা পরিসরে নয়; মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে।
মসজিদের মিম্বার থেকে ডিজিটাল মিম্বার : মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, গ্রন্থাগার ও পাঠচক্র ইসলামী জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। প্রযুক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল মিম্বার হলো ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, পডকাস্ট, অনলাইন ম্যাগাজিন, ফেসবুক পেজ বা সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম; যেখানে কুরআন-হাদিস, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সমকালীন সমস্যার ইসলামী বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়। এর শ্রোতা স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। মিম্বরের স্থান বদলেছে, দাওয়াতের উদ্দেশ্য নয়।
কুরআন, হাদিস ও ইসলামী সাহিত্যের পুনর্জাগরণ
ডিজিটাল প্রযুক্তি ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণ ও সহজপ্রাপ্য করেছে, সবার নাগালে নিয়ে এসেছে। ডিজিটাল লাইব্রেরি, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন ডাটাবেজের মাধ্যমে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও প্রাচীন গ্রন্থ দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়। কুরআনের আরবি পাঠ, অনুবাদ, তাফসির, তিলাওয়াত ও বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান শিক্ষার্থী ও গবেষক উভয়ের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অডিওবুক, ভিডিও লেকচার, ডিজিটাল আর্কাইভ ও অনলাইন কোর্স ইসলামী জ্ঞানকে আরও সহজলভ্য করেছে।
হিদায়াতের দিকে আহ্বানের হাদিসের নতুন তাৎপর্য : হিদায়াতের দিকে আহ্বানকারীর জন্য অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াবের যে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, ডিজিটাল যুগে তার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইনে বিশুদ্ধ কুরআন-হাদিস ও কল্যাণকর জ্ঞান প্রকাশ করলে তা বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু একইভাবে ভুল হাদিস, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যাও দ্রুত ছড়ায়। ডিজিটাল দাওয়াত একইসঙ্গে বিশাল সুযোগ ও বড় আমানত।
ডিজিটাল দাওয়াতের বড় আমানত তথ্য যাচাই
প্রযুক্তির দ্রুততা যেমন শক্তি, তেমনি ঝুঁকিও। যাচাইয়ের আগেই ভুল ধর্মীয় তথ্য, মিথ্যা ব্যাখ্যা, মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ম্যালইনফরমেশন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাদিসের সূত্র, আলেমের বক্তব্য, কুরআনের আয়াতের প্রসঙ্গ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত ধর্মীয় উদ্ধৃতি যাচাই ছাড়া প্রচার করা উচিত নয়। ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই অপরিহার্য। শেয়ার করার আগে যাচাই— ডিজিটাল দাওয়াহর মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব।
ধর্মীয় কর্তৃত্বের নতুন বাস্তবতা : প্রযুক্তি ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের পাশাপাশি ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাঠামোও বদলে দিয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠিত আলেমের পাশাপাশি অযোগ্য ব্যক্তিও বিপুল মানুষের কাছে বক্তব্য পৌঁছাতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ধর্মীয় যোগ্যতার প্রমাণ নয়। বেশি ভিউ, লাইক বা ফলোয়ার থাকা মানেই বেশি জ্ঞানী হওয়া নয়। অনলাইন ধর্মীয় কর্তৃত্ব কখনো প্রচলিত কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে, আবার কখনো চ্যালেঞ্জও করে। জনপ্রিয়তা নয়, প্রামাণিকতাই ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি।
অ্যালগরিদম বনাম হিকমাহ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত আবেগ, বিতর্ক, উত্তেজনা ও চমকপ্রদ কনটেন্টকে বেশি দৃশ্যমান করে। কিন্তু ইসলামী দাওয়াতের ভিত্তি হলো হিকমাহ বা প্রজ্ঞা। অ্যালগরিদমের মনোযোগ পাওয়ার জন্য অতিরঞ্জন, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা মতভেদকে বিনোদনে পরিণত করলে দাওয়াতের নৈতিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যালগরিদমকে বুঝতে হবে, কিন্তু তার দাস হওয়া যাবে না। আকর্ষণীয় কনটেন্টের সঙ্গে সত্যতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।
বহু ভাষায় ইসলাম প্রচারের অভূতপূর্ব সুযোগ : মেশিন ট্রান্সলেশন, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও এআই ইসলামী জ্ঞানকে বহু ভাষায় দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলা ভাষার গবেষণা বা বক্তব্য বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বিদেশি ইসলামী সাহিত্য বাংলায় আনা সহজ হয়েছে। তবে কুরআন-হাদিসের অনুবাদে শব্দের পাশাপাশি প্রসঙ্গ, ব্যাকরণ, ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকে। তাই এআই অনুবাদ সহায়ক হলেও আলেম, আরবি ভাষাবিদ ও দক্ষ অনুবাদকের যাচাই প্রয়োজন। প্রযুক্তি অনুবাদকে দ্রুত করেছে; কিন্তু ধর্মীয় অনুবাদে বিশেষজ্ঞ মাধ্যমে যাচাই অপরিহার্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাওয়াত অবকাঠামো : এআই কুরআনের আয়াত অনুসন্ধান, হাদিস খোঁজা, সাহিত্য শ্রেণিবিন্যাস, অনুবাদ, বক্তৃতা লিখিত রূপ দেওয়া এবং শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এআই আলেমের বিকল্প নয়। তথ্য বিশ্লেষণ করলেও এটি সবসময় সূত্রের নির্ভুলতা, ফিকহি প্রেক্ষাপট, মতভেদ, আরবি ভাষার সূক্ষ্মতা বা তাফসিরের গভীরতা সঠিকভাবে বুঝতে নাও পারে। সেরা মডেল হলো ‘এআই-অ্যাসিস্টেড, স্কলার-ভেরিফায়েড’— এআই প্রস্তুতি ও অনুসন্ধানে সহায়তাকারী-সহকারী; যোগ্য আলেম, বিশেষজ্ঞ ও গবেষক যাচাই করবেন ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখবেন।
জ্ঞানভাণ্ডারের নতুন দরজা ডিজিটাল ইসলামী গ্রন্থাগার
মুসলিম সভ্যতার তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আকিদা, দর্শন, ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। ডিজিটাল আর্কাইভ দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতে পারে; সেমান্টিক সার্চ সম্পর্কিত আলোচনা খুঁজে দিতে পারে; অনলাইন গ্রন্থাগার বিভিন্ন সংস্করণ তুলনার সুযোগ দেয়। তবে কপিরাইট, নির্ভরযোগ্য সংস্করণ, সম্পাদকের যোগ্যতা, পাঠের শুদ্ধতা ও সূত্রের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল হওয়া মানেই নির্ভরযোগ্য হওয়া নয়।
ইসলামী চিন্তাবিদদের আলোকে প্রযুক্তি ও জ্ঞান
আবদুল হামিদ আবু সুলাইমান জ্ঞান, ওহি, মানবজ্ঞান, শিক্ষা, সমাজ ও সভ্যতার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন; প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণ ও সভ্যতার পুনর্গঠনের উপকরণ হিসেবে দেখা যায়। ত্বহা জাবির আল-আলওয়ানি কুরআন, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবতার সমন্বিত পাঠের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইবনে খালদুনের চিন্তায় ভাষা, যোগাযোগ, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও সঠিক শিক্ষকের গুরুত্ব রয়েছে। প্রযুক্তি পদ্ধতি বদলালেও এসব মৌলিক প্রয়োজন অটুট। প্রযুক্তি জ্ঞানচর্চার নতুন অবকাঠামো, যা পদ্ধতি বদলায়; জ্ঞানের মৌলিক শর্ত বদলায় না।
ডিজিটাল দাওয়াত মানে শুধু ফেসবুক পোস্ট নয়
ডিজিটাল দাওয়াতকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ রাখলে এর সম্ভাবনা অপূর্ণ থাকবে। গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট, অনলাইন কোর্স, পডকাস্ট, ভিডিও লেকচার, ই-বুক, শিশুদের শিক্ষা, তরুণদের প্রশ্নোত্তর, পরিবার ও নৈতিকতা বিষয়ক কনটেন্ট, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং সমকালীন সমস্যার ইসলামী বিশ্লেষণ— সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ডিজিটাল দাওয়াত হবে সমন্বিত জ্ঞান, শিক্ষা ও সংলাপের ব্যবস্থা।
তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে নতুন ভাষা : তরুণরা প্রশ্ন, তুলনা, মন্তব্য ও ভিন্ন মতের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ করে। তাই তাদের কাছে পৌঁছাতে তাদের ভাষা, প্রশ্ন, উদ্বেগ ও বাস্তব জীবন বুঝতে হবে। উপস্থাপনার ভাষা ও পদ্ধতি আধুনিক করা প্রয়োজন। কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, নৈতিকতা, প্রযুক্তি, এআই, পরিবেশ, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে হবে। তরুণদের জন্য ইসলামের সত্য-মূলনীতি অপরিবর্তিত রেখে উপস্থাপনার ভাষা সমকালীন করতে হবে।
ডিজিটাল দাওয়াতের ঝুঁকি তথ্যের বদলে উত্তেজনা
ডিজিটাল মাধ্যমে উত্তেজনা সহজে জনপ্রিয় হয়। ধর্মীয় মতভেদকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা রাজনৈতিক-সামাজিক উত্তেজনায় পরিণত করা দাওয়াতের উদ্দেশ্যের বিরোধী। সহজ করা, সুসংবাদ দেওয়া, মানুষকে বিমুখ না করা এবং ভালো কথা বলা— এসব ইসলামী নীতি ডিজিটাল যুগেও প্রযোজ্য। কোনো পোস্ট দেওয়ার আগে চারটি প্রশ্ন জরুরি: এটি কি সত্য? প্রয়োজনীয়? উপকারী? ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করে? দাওয়াতের লক্ষ্য উত্তেজনা সৃষ্টি নয়; সত্য, কল্যাণ ও মানুষের উন্নয়ন।
মতভিন্নতার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা : ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে মতভিন্নতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু জ্ঞানগত মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে জটিল ফিকহি বা আকিদাগত বিষয় সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে সূক্ষ্মতা হারাতে পারে। তাই কোথায় ইজমা, কোথায় মতভেদ, কোন মত কার, তার দলিল কী এবং কোনটি মৌলিক বা শাখাগত— এসব স্পষ্ট করতে হবে। মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও শালীন।
সৌন্দর্য ও ইতিবাচকতার দাওয়াত
ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্য— সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া, প্রতিবেশীর অধিকার, পিতা-মাতার সম্মান, দুর্বলদের অধিকার, পরিবেশের যত্ন ও মানুষের মর্যাদা ডিজিটাল দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম সম্পর্কে মানুষের ধারণা শুধু বক্তব্যে নয়, মুসলমানের আচরণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও গড়ে ওঠে। তাই দাওয়াতকে বলতে হবে শুধু ‘কী বিশ্বাস করতে হবে’ নয়, ‘কীভাবে উত্তম মানুষ হওয়া যায়’। ইসলামের সৌন্দর্যকে আচরণ, নৈতিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে প্রকাশ করা।
বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল দাওয়াতের সম্ভাবনা
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার বাংলাদেশে ইসলামী জ্ঞানকে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দাওয়াতের কার্যকর মাধ্যম; তবে বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ঝুঁকি রয়েছে। তাই শুধু বেশি কনটেন্ট নয়; প্রামাণিক, উচ্চমানের ও উন্নতমানের ডিজিটাল ইসলামী কনটেন্ট প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আলেম, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, অনুবাদক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
আধুনিক ইসলামী ডিজিটাল মিডিয়া মডেল
আধুনিক ইসলামী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গবেষণা, ধর্মীয় যাচাই, সম্পাদনা, প্রযুক্তি ও কনটেন্ট তৈরির পৃথক কিন্তু সমন্বিত ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে ট্রেসেবল নলেজ চেইন থাকা উচিত— উৎস, আয়াত বা হাদিস, হাদিসের মান, তাফসির বা ফিকহি ব্যাখ্যা এবং মতভেদ সহজে যাচাইযোগ্য হবে। ডিজিটাল ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে আবেগনির্ভরতা থেকে উৎসনির্ভর গবেষণায় রূপান্তর।
কনটেন্ট তৈরিতে ডিজিটাল ইজাজাহ সংস্কৃতি
প্রচলিত ইজাজাহর ধারণাকে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পেশাগত যাচাইয়ের সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেক কনটেন্টের জন্য আনুষ্ঠানিক ইজাজাহ বাধ্যতামূলক নয়; তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্য আলেম বা গবেষকের যাচাই/অনুমোদন থাকা উচিত। প্রযুক্তিবিদ, আলেম, গবেষক ও সাংবাদিকের ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতার সমন্বয় এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এআই যুগে আলেমের ভূমিকা বদলাবে
এআই যত শক্তিশালী হবে, ধর্মীয় জ্ঞান যাচাই ও ব্যাখ্যার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন ততই গুরুত্বপূর্ণ হবে। তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক নয়। কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও শরীয়ার সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ— তা নির্ধারণে মানুষের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিক দায়িত্ব প্রয়োজন। ভবিষ্যতের আলেমকে ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি ডিজিটাল সংস্কৃতি, মিডিয়া, প্রযুক্তি ও এআই বুঝতে হবে; প্রযুক্তিবিদদেরও ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিকতার মৌলিক কাঠামো জানতে হবে। এআই আলেমের বিকল্প নয়; বরং আলেমের কাজের নতুন সহায়ক অবকাঠামো।
প্রচারের পদ্ধতিকে বদলাবে তথ্যপ্রযুক্তি : প্রযুক্তির পরিবর্তনে ইসলামের আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বদলাবে না; বদলাবে মানুষের কাছে সেগুলো পৌঁছানোর পদ্ধতি। মিম্বর থেকে অনলাইন খুতবা, লাইব্রেরির বই থেকে স্মার্টফোনের ই-বুক এবং সরাসরি প্রশ্ন থেকে অনলাইন প্রশ্নোত্তর— যোগাযোগের গতি বেড়েছে। প্রযুক্তির দ্রুততা গভীর চিন্তা, অধ্যয়ন, চরিত্র ও অনুশীলনের বিকল্প নয়। প্রযুক্তি মাধ্যমকে পরিবর্তন করে, ইসলামের মৌলিক সত্যকে নয়।
দাওয়াতের ভবিষ্যৎ : ডিজিটাল থেকে মানবিক
দাওয়াহর ভবিষ্যৎ শুধু আরও বেশি প্রযুক্তি ব্যবহারে নয়; প্রযুক্তিকে আরও মানবিক করার মধ্যে। মানুষ এমন কনটেন্ট চায় যা তার প্রশ্নের উত্তর দেয়, সমস্যা বোঝে, দুঃখকে সম্মান করে এবং তাকে উন্নত মানুষ হতে সাহায্য করে। তাই ভবিষ্যতের প্ল্যাটফর্মে তথ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, পরামর্শ, সংলাপ, গবেষণা, আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়িত্বের সুযোগ থাকতে হবে। ডিজিটাল দাওয়াহর চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রযুক্তি নয়— মানুষের কল্যাণ ও চরিত্রের উন্নয়ন।
উপসংহার : তথ্যপ্রযুক্তি ইসলাম প্রচার ও ইসলামী জ্ঞান বিস্তারের ইতিহাসে অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্মার্টফোন একই সঙ্গে গ্রন্থাগার, শ্রেণিকক্ষ, মিম্বর, গবেষণাগার ও বৈশ্বিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা পালন করতে পারে। সুযোগের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। ভুল তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, সঠিক জ্ঞানও তেমনি দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই ডিজিটাল দাওয়াহর সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ইসলামী নৈতিকতার সর্বোচ্চ অনুশীলনের ওপর। কুরআনের হিকমাহ ও উত্তম উপদেশ, হাদিসের হিদায়াতের আহ্বান এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তৃত সক্ষমতাকে একত্র করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সত্যতা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, নৈতিকতা, গবেষণা ও যোগ্য আলেমদের তত্ত্বাবধান। ইসলামের প্রচারে তথ্যপ্রযুক্তির গতি গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু কুরআনের হিকমাহ হারানো যাবে না। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সফল ইসলামী ডিজিটাল আন্দোলন হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যা প্রযুক্তির আধুনিক ভাষা ও গতি গ্রহণ করবে; কিন্তু ইসলামের সত্যের সাক্ষ্য, নৈতিকতা, সৌন্দর্য, প্রামাণিকতা ও মানুষের হৃদয়-চরিত্র পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না।
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক।