ইসলামী সাহিত্যে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদান


২৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩১

বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারা প্রকাশের ইতিহাস সুদীর্ঘ। অনেক লেখক চিন্তাবিদের লেখা ইসলামী চেতনা ও ঐতিহ্যকে সাহিত্যের আঙিনায় সমৃদ্ধ করেছেন। তবে বিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় ধর্মীয় চিন্তা, কুরআনিক তাফসির, সিরাত ও নীতি-নৈতিকতামূলক গদ্যকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজ, প্রাঞ্জল ও আকর্ষক ভঙ্গিতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (১৯৪০-২০২৩) এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। প্রথাগত কঠিন আরবি-ফারসিমিশ্রিত আলেমদের ভাষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ জটিল শৈলী এ দুইয়ের মাঝামাঝি একটি সহজ ও প্রবহমান গদ্যরীতি তৈরি করাই ছিল তাঁর সাহিত্যিক সফলতার মূল চাবিকাঠি।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন একাধারে বিশ্বখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, প্রখ্যাত বাগ্মী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিশ্বজুড়ে কুরআনের তাফসির পেশ করার মাধ্যমে তিনি যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁর সাহিত্যকর্ম ছিল তারই একটি লিখিত রূপ। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল মুখে বক্তৃতা দিয়ে একটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কালজয়ী সাহিত্য। সাধারণ মানুষ যেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ছাড়াই কুরআনের শিক্ষা ও ইসলামী ইতিহাস বুঝতে পারে- এই তাড়নাই তাকে লেখনীতে উদ্বুদ্ধ করে।
আল্লামা সাঈদীর সবচেয়ে স্মৃতিযোগ্য ও বিশালাকার সাহিত্যকর্ম হলো বহু খণ্ডে বিভক্ত তাফসীরে সাঈদী। সাধারণত তাফসির গ্রন্থগুলোকে কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু ভাষা ও অলংকারের দিক থেকে এটি বাংলা গদ্যে এক অনন্য সংযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জটিল তাফসিরগুলোর ভাবানুবাদ না করে তিনি সমসাময়িক যুগের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কুরআনের মূল সৌন্দর্য, সুর এবং ব্যাকরণগত চমক কীভাবে মানবজীবনকে স্পর্শ করে, তা তিনি গতিশীল বাংলা ভাষার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার তাফসির পাঠ করলে মনে হয় তা কেবল শাস্ত্রীয় আলোচনা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য লিখিত একটি বাস্তবসম্মত নির্দেশনা।
ইতিহাস ও জীবনীভিত্তিক রচনায় আল্লামা সাঈদীর অলংকারপূর্ণ ভাষা ও আবেগঘন উপস্থাপন বিশেষ প্রশংসার দাবিদার। তার লেখাসী রাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন। এটি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জীবনীর ওপর রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষার অন্যতম পাঠকপ্রিয় সীরাত গ্রন্থ। এতে মহানবীর জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে শুষ্কভাবে উপস্থাপন না করে, অত্যন্ত নান্দনিক ও আবেগপ্রবণ গদ্যে আঁকা হয়েছে।
সাহাবীদের জীবনপ্রভা গ্রন্থে রাসূল (সা.)-এর অনুসারী সাহাবীদের ঈমানি দৃঢ়তা, ত্যাগ ও নৈতিকতার গল্পগুলো নিয়ে লেখা এই গ্রন্থমালা তরুণদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইতিহাসকে সাহিত্যের রসে জারিত করে পরিবেশন করায় তা সাধারণ পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
সমাজ সংস্কারে সাহিত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন আল্লামা সাঈদী। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। পারিবারিক জীবন ও নারী অধিকার বইয়ে ‘পারিবারিক জীবন ও আমাদের দায়িত্ব’, ‘ইসলামে নারীর অধিকার’ কিংবা পর্দার বিধান-সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোয় তিনি সামাজিক অবক্ষয় দূরীকরণ ও সুস্থ পারিবারিক কাঠামো গড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
আধুনিক জীবনযাত্রায় মানুষের মানসিক চাপ, নৈতিক অধঃপতন ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার বইগুলো দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করে।
আল্লামা সাঈদীর লেখনীর কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল, যা তাকে অন্যান্য ইসলামী লেখকদের চেয়ে আলাদা করে তোলে।
তার বিখ্যাত তাফসির মাহফিলের বক্তৃতার মতোই তার গদ্যে একটি স্বাভাবিক ছন্দ ও গতিময়তা বিদ্যমান। পাঠ করার সময় মনে হয় লেখক পাঠকের সামনে বসে সরাসরি কথা বলছেন। দুর্বোধ্য আরবি পরিভাষা এড়িয়ে তিনি সহজ-সরল বাংলা শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠকরাও জটিল ধর্মীয় তত্ত্ব সহজে বুঝতে পারে।
বাংলাদেশে যে বিশাল তরুণ ও সাধারণ পাঠকশ্রেণি ইসলামী সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে উঠেছেন, তার পেছনে আল্লামা সাঈদীর বইগুলোর অবদান অপরিসীম।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তার জীবনে ৭৫টিরও বেশি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অধিকাংশ বই-ই মূলত পবিত্র কুরআনের তাফসীর, পরকাল, সমসাময়িক ইসলামী জীবনব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বিষয়ক। তার রচিত প্রধান প্রধান বইগুলোকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোÑ ১. তাফসীর ও কুরআন বিষয়ক গ্রন্থ : তাফসীরে সাঈদী (সূরা আল-ফাতিহা), তাফসীরে সাঈদী (আমপারা), তাফসীরে সাঈদী (সূরা আল-আসর), পবিত্র কুরআনের মু’জিজা তালিমূল কুরআন আল কুরআনুল করীম (সহজবোধ্য বঙ্গানুবাদ)। ২. আকিদা, ঈমান ও পরকাল বিষয়ক : আখিরাতের জীবনচিত্র, ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা,আল্লাহ কোথায় আছেন?, আল্লাহ মৃতদের নিয়ে কী করবেন, জান্নাত লাভের সহজ আমল, দীনে হক-এর প্রতি দাওয়াত না দেয়ার পরিণতি, দীন বিজয়ের আন্দোলনে ধৈর্য। ৩. সীরাত, ইবাদত ও মুসলিম জীবন ব্যবস্থা : সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন (রাসূল সা.-এর জীবনী), রাসূলুল্লাহর (সা.) মোনাজাত, চরিত্র গঠনে নামাজের অবদান, সন্তান লালন-পালনের ইসলামী পদ্ধতি, পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্ব, হাদিসের আলোকে সামাজিক জীবন। ৪. সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সচেতনতামূলক : আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার মূলনীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলাম, কাদিয়ানীরা কেন মুসলমান নয়, নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে, খোলা চিঠি। ৫. ভ্রমণকাহিনী : নীল দরিয়ার দেশে (মিশর ভ্রমণের ওপর লেখা), দেখে এলাম অবিশ্বাসীদের করুণ পরিণতি
বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যকে একটি বদ্ধ ঘর থেকে বের করে সর্বস্তরের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। চিন্তা, দর্শন ও ইতিহাসকে সহজবোধ্য ভাষায় পরিবেশন করে তিনি বাংলা ইসলামী গদ্যে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তার রচিত গ্রন্থগুলো কেবল সমকালীন সময়ের জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যতের গবেষক ও ইসলামী অনুরাগী পাঠকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। (সাহিত্য ডেস্ক)।