পঞ্চগড়ে পোকায় খাচ্ছে সবুজ চা পাতা
৬ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৫৬
আসাদুজ্জামান আসাদ, পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ে চা বাগানে কচি পাতা খেয়ে নষ্ট করছে পোকা। কিছু কিছু পাতা বাদামি রং ধারণ করে ঝরে পড়ছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও প্রতিকার মিলছে না। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে প্রতি বছর বাড়ছে চা পাতার উৎপাদন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের প্রার্দুভাবে নষ্ট হচ্ছে সবুজ চা পাতার বাগান। অনেক চা চাষি পাতা উত্তোলনের পরিবর্তে চা গাছের আগা কেটে দিয়েছে। কচি পাতা ক্ষতি হওয়ায় অনেক বাগানে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে। চা চাষিরা একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করলেও কাক্সিক্ষত ফল মিলছে না। ফলে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে চলতি মৌসুমে কাঁচা পাতার দাম ভালো পেলেও শুধুমাত্র পোকামাকড়ের দাপটে লোকসানের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
পঞ্চগড়ের সমতল ভূমি চা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। সে হিসাবে বর্ষা মৌসুমে সাধারণত চা গাছে দ্রুততম সময়ে নতুন কুঁড়ি-পাতা গজায়, যা ৯ মাসে চা উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপুণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ঠিক এ সময়েই বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চা চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন চা বাগানে প্রথমে পাতার নিচে ছোট ছোট লাল মাকড়সা দেখা যায়। এরপর পাতার সবুজ অংশ শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। অন্যদিকে লুপার ক্যাটারপিলার কচি পাতা খেয়ে ফেলে, যা নতুন পাতা গজাতেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে নির্ধারিত সময়েও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। পাতা তোলার বিপরীতে অনেক ক্ষুদ্র চা চাষি বাগান থেকে পাতা কর্তন করে ফেলছেন।
পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড বলছে, এটি মৌসুমি সমস্যা। পোকামাকড়ের আক্রমণে ফলনও ব্যাহত হচ্ছে। তবে এজন্য চা চাষিদের অজ্ঞতা, ভালোমানের কীটনাশক না পাওয়া এবং কীটনাশকের অপ্রয়োগকে দায়ী করছে চা বোর্ড। পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচতে চা বাগানে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।
পঞ্চগড় চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা এখন অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতি বছর বাড়ছে চা চাষের পরিধি। গত বছর চা উৎপাদন মৌসুমে ১ হাজার ৫২৮টি নিবন্ধিতসহ মোট ৭ হাজার ৩৪৮টি ছোট বড় চা বাগানে মোট ৮ হাজার কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ দশমিক ৮৭ কেজি কাচা চা পাতা উৎপাদন হয়েছে। তৈরিকৃত চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০ টি চা কারখানা কাচা পাতা সংগ্রহ করে তৈরিকৃত চা উৎপাদন করছে। চা বাগান মালিক ও চাষিরা জানান, চা উৎপাদকারী হিসেবে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে পঞ্চগড়।
চা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, পঞ্চগড়ে এবার চায়ের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে চা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা বাগান। সরেজমিন দেখা গেছে, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবারও চায়ের সবুজ পাতায় ভরে গেছে বিভিন্ন এলাকা। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে মৌসুমের শুরুতেই অন্য মৌসুমের তুলনায় উৎপাদন বেড়ে গেছে। সাধারণত প্রতি বছরের মার্চ মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চা উৎপাদনের মোক্ষম সময়। এ সময়ের মধ্যে ৭-১০ দফায় বাগান থেকে চা পাতা তোলা হয়। তবে জুলাই-আগস্ট চা উৎপাদন ভরা মৌসুমে ৩-৪ দফায় চা পাতা তোলা হয়।
ক্ষুদ্র চা চাষিরা জানান, তারা মাত্র ২-৩ বিঘা জমিতে চা চাষ করেছেন। এবার তাদের ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু কিছু দিন ধরে পোকার আক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। এছাড়া উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও এলাকায় অনেক চাষি চা পাতা উত্তোলন করতে পারেননি। পোকামাকড়ের কারণে চাহিদামতো পাতা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে লাল মাকড়সার লুপার ক্যাটারপিলার কারেন্ট পোকা, মশক পোকা, শুশুনি পোকার আক্রমণে দিশেহারা। অতিরিক্ত খরচে বারবার কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না বলে জানান চাষিরা।
চা বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন বাগান নিয়মিত পরিদর্শন করে নির্ধারিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, আক্রান্ত পাতা তাপসারণ সময়মতো স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক চাষির অভিযোগ বাস্তবে এসব পরামর্শ মেনে চললেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কয়েকদিন পর আবার নতুন করে পোকার আক্রমণ দেখা দিচ্ছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল দক্ষিণ গোয়ালপাড়া গ্রামের চা চাষি এ এন এ গোলাম রব্বানী মানিক এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমরা ক্ষুদ্র চা চাষি। ৩-৪ একর জমিতে চা চাষ করেছি। এবার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে পোকার আক্রমণ ব্যাপকহারে বেড়েছে। চা উৎপাদনে ভরা মৌসুমেও এ এলাকায় অনেক চা চাষি পাতা উত্তোলন করতে পারেননি।
জগদল উত্তর গোয়ালপাড়ার চা চাষি আব্দুল ওয়াহাব মানিক বলেন, আমার চা বাগানে লুপার ক্যাটারপিলার পোকা আক্রমণ করেছে। এই এক জাতের পোকার জন্য তিনবার করে কীটনাশক ওষুধ দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। কীটনাশকের দামও বেশি। আমাদের খরচ বেড়ে গেছে। আবার পোকার জন্য উৎপাদন কমে গেছে। পোকার কারণে চায়ের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে, লাল হয়ে যাচ্ছে। ওষুধ দিই, কোনো কাজ হচ্ছে না। বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ বদল করে দিয়েছি, কাজ হচ্ছে না। পোকা যায় না। বাগানে লাল মাকরশা, লোপার, শুশুনি পোকাসহ নানান জাতের পোকা লেগেছে।
চা চাষিরা জানান, প্রতি একরে ৩০০০ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ কেজি পর্যন্ত কাঁচা পাতা পাই। এখন আড়াই হাজার থেকে ২ হাজার ৯০০ কেজি কাঁচা পাতা পাচ্ছি। চা উৎপাদন একবারেই কমে গেছে। এভাবেই হতাশার কথা জানালেন, তেঁতুরিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার চা চাষি মো. ফজলে করিম ও কাবুল হোসেন।
কাবুল বলেন, প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ পাতা তুলতাম এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিয়েছি। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। দাম ভালো থাকলেও পোকার কারণে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আমির হোসেন বলেন, এবার চায়ের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বিভিন্ন বাগানে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ রয়েছে। এ কারণে ফলন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। চা চাষিদের কিছুটা অসচেতনতা এবং কীটনাশকের অপপ্রয়োগসহ ভালোমানের কীটনাশক না পাওয়ার কারণেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, চা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে চাষিদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা যেহেতু একটি মৌসুমভিত্তিক কীটনাশকের আক্রমণ, এজন্য মৌসুম শেষে এমনিতেই আক্রমণ অনেকটা কমে যাবে। আমরা আশা করছি, সার্বিকভাবে উৎপাদনে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না।