সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে সেইফ এক্সিট দেয়ার কূটচাল পর্দার অন্তরালে


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৭

॥ জামশেদ মেহদী ॥
অবশেষে অনেক ধূম্রজাল সৃষ্টি করে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বাংলাদেশের জনগণের ঘাড় থেকে সরে যেতে বাধ্য হলেন। তিনি কি সরে যেতে বাধ্য হলেন, নাকি আপস-মীমাংসা ও শলা-পরামর্শের মাধ্যমে তাকে তার কৃত অপরাধের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রথম ধাপ পার করলো বিএনপি সরকার? সাবেক প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর বিদায় নিয়ে বিএনপি সেই ২ বছর আগে থেকেই নাটক শুরু করেছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুপ্পুর বোঝা তাদের ঘাড়ে পড়তে যাওয়ার উপক্রম হলে অবশেষে বাধ্য হয়েই তাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হলো। এখন প্রশ্ন হলো- পদত্যাগের মধ্য দিয়েই কি চুপ্পু পর্ব শেষ হলো? নাকি চুপ্পু-কাণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে?
এই মুহূর্তে সে সম্পর্কে সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ তার বিদায়ের ৩৬ ঘণ্টা পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যেসব বয়ান দিচ্ছেন, তাতে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, চুপ্পুকে হয়তো সেইফ এক্সিট দেওয়ার কূটচাল পর্দার অন্তরালে প্রণয়ন করা হচ্ছে।
চুপ্পুর পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এনসিপি ঢাকার একাধিক স্থানে ছোট ছোট মিছিল বের করে এবং চুপ্পুর গ্রেফতার ও বিচার দাবি করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মন্তব্য করে যে, চুপ্পুর পদত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরাচারের দোসর সরে গেল। এরই মধ্যে গত ২৬ জুলাই রোববার এনসিপির দাবির পটভূমিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অদ্ভুত কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আইন অনুযায়ী সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ছয় মাস নিরাপত্তাসহ রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা তিনি পাবেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বৈরাচারের শেষ দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় এবং বর্তমান সরকারের প্রায় ছয় মাস সময়ে সাংবিধানিকভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধিবিধান অনুযায়ী তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সেই সময়টায় সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ কিংবা এ বিষয়ে আদালতে কোনো মামলা করা যায় না। এর বহির্ভূত কোনো সময়ে যদি কেউ কোনো বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেটিতে তাদের স্বাধীনতা আছে। তবে আমরা আমলে নেওয়ার মতো কোনো বিষয় এখানে দেখিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ি রাষ্ট্রপতির টেলিফোনের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কথা বলার জন্য কি সত্যিই লন্ডন যেতে হয়? এই ইন্টারনেটের যুগে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসেই যোগাযোগ করা সম্ভব। তাই লন্ডনে গিয়ে কথা বলতে হবে, এমন দাবি আমার কাছে একেবারেই অলীক মনে হয়।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুনে অবাক হতে হয়। বিভ্রম হয়, তিনি কি চুপ্পুর পক্ষে কথা বলছেন? নাকি ভারতীয় মিডিয়ার সুরে কথা বলছেন? চুপ্পুর পদত্যাগের দুদিন আগে থেকেই একটি খবর চাউর হয়ে গিয়েছিলো যে, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নাকি লন্ডনে গিয়ে সেখান থেকে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন। এই অভিযোগের ব্যাপারে ভারতের অন্তত ৩টি টিভি নিউজ পোর্টাল ঠিক একই সুরে কথা বলেছে। তারাও বলেছে যে, ইন্টারনেটের এই যুগে যে কেউ যে কারো সাথে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে কথা বলতে পারেন। বঙ্গভবনের মতো সুরক্ষিত জায়গায় বসে সাবেক প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর পক্ষে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলতে অসুবিধা কোথায়?
অনেকটা কোরাস বা ঐক্যতানের মতো এসব কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখানে রয়েছে একটি বিরাট ফ্যালাসি। বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ কোথাও ফোন করেন এবং যদি সেই ফোন কোনো কর্তৃপক্ষ ট্যাপ করতে চান, তাহলে সেটি করা মোটেই কঠিন নয়। কিন্তু বিদেশের মাটিতে এভাবে অপর দেশের ফোনে আড়িপাতা এবং সেটি রেকর্ড করা অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন। এজন্যই এস আলমরা সিঙ্গাপুরে এবং আওয়ামী লীগাররা ভারতে বসে টেলিফোনে যত কথা বলছেন তার সবগুলো বাংলাদেশের পক্ষে ট্র্যাপ করা সম্ভব হয়নি এবং হবেও না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায় কথায় আইন ও সংবিধানের কথা বলেন। তিনি বলেছেন যে, আইন অনুযায়ী সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে নাকি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নাই। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৬ মাস নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা নাকি তিনি পাবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কথার পর আমি সংবিধান ঘেঁটে দেখলাম। সংবিধানের ৪র্থ ভাগে ৪৮ অনুচ্ছেদ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কথা বলা আছে। কিন্তু এই ৭টি অনুচ্ছেদ বা উপ-অনুচ্ছেদের কোথাও এ কথা লেখা নাই যে, আগামী ৬ মাস তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাবেন। বরং সংবিধানে নয়, নির্বাহী সিদ্ধান্তে ৬ মাস প্রেসিডেন্ট থাকার পর বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাদি তিনি পাবেন। আর যতদিন তিনি প্রেসিডেন্ট থাকবেন, ততদিন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা-মোকদ্দমা করা যাবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে অথবা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ করার পর তিনি যদি কোনো অপরাধ করেন, তাহলে অবশ্যই তিনি আইনের আওতায় আসবেন। কাজেই আগামী ৬ মাস চুপ্পু দায়মুক্তি পাবেন- এটি আইনের অপব্যাখা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের কথায় বিএনপি তার সাহায্য পেয়েছেন, কিন্তু জনগণ তার কোনো সাহায্য তো দূরের কথা, সহানুভূতিও পায়নি। জুলাই বিপ্লবকালে যখন শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী এবং আওয়ামী পেটোয়া পুলিশ বাহিনী পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাকে মেরেছে, তখন চুপ্পুর হৃদয়ে সেসব আহত এবং শহীদদের জন্য কোনো দরদ দেখা যায়নি।
আর পদত্যাগ করার পরও তিনি ৬ মাস সুরক্ষা পাবেন- এ কথা সালাহউদ্দিন কোথায় পেলেন? তিনি কি এত তাড়াতাড়ি মরহুম প্রেসিডেন্ট এরশাদের কথা ভুলে গেলেন? এরশাদের পতনের ৭ দিনের মাথায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই মর্মে ভুল তথ্য দিলেন যে, চুপ্পুর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই! তাহলে এরশাদকে গ্রেফতার এবং বাসা তল্লাশি করে অস্ত্র মামলা দেওয়া হয়েছিল কীভাবে? এরশাদ তো ভোটে হাফেজ্জি হুজুরকে পরাজিত করে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আর সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিল দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া শেখ হাসিনা! এখনো তো সেই সংবিধানই আছে যে সংবিধান অনুযায়ী এরশাদকে গ্রেফতার এবং বিচার করা হয়েছিল অস্ত্র মামলায়।
বিএনপির মন্ত্রীরা কুখ্যাত এস আলমের অপকর্মের দক্ষিণহস্ত হিসেবে চুপ্পুর ভূমিকা হয় জানেন না, না হয় জেনেও না জানার ভান করছেন। ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও তার কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্সসহ এস আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। এ বিষয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনির একটি বাংলা দৈনিকের রিপোর্টারকে বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে জেএমসি বিল্ডার্সের ২৪টি কোম্পানির নাম দিয়ে মোট ৮১ দশমিক ৯২ শেয়ার হস্তান্তর করা হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এসব শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন। কেননা তিনি তখন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি ডিরেক্টর হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করে এসব শেয়ার অনুমোদন করেন। এ সম্পর্কে যে মামলা হয়েছিলো, সেই মামলায় ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন শিশির মনির।
তারেক রহমানের সরকার চিকিৎসার নামে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পরিবারসহ ১২ ব্যক্তিকে সরকারি খরচে লন্ডন ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেয়। ডেইলি স্টারের রিপোর্ট মোতাবেক লন্ডনে অবস্থানকালে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে আলাপ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে হাসিনার সাথে চুপ্পুর টেলিফোনিক সংলাপ এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু ডেইলি স্টারের রিপোর্ট তিনি অস্বীকার করবেন কীভাবে? ডেইলি স্টার তো গত ২৩ জুলাই রিপোর্ট ছেপেছিলো, যার শিরোনাম ছিলো- President Shahabuddin may resign soon. তখন তো বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ধরনের রিপোর্টকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার এক দিন পরই তো সেই রিপোর্টটি সত্য হয়ে গেল। কিন্তু রিপোর্টের হেডিং যদি সত্যি হয়, তাহলে ভেতরের রিপোর্টটি মিথ্যা হয় কীভাবে? ভেতরের রিপোর্টে বলা হয়েছে, President Mohammed Shahabuddin is likely to resign soon, according to multiple sources familiar with the matter.
According to the sources, Shahabuddin spoke by phone with former prime minister Sheikh Hasina during a visit to London for medical treatment in May this year. Hasina has been living in exile in India since July 2024. The president travelled to London on May 9 and returned on May 18.The sources claimed intelligence agencies later learned about the conversation, after which a message was conveyed to the president suggesting that he step down.
বাংলা অনুবাদ : “একাধিক সূত্রের খবরে প্রকাশ, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করবেন। ঐসব সূত্রে বলা হয় যে, সাহাবুদ্দিন এবছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরকালে টেলিফোনে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ৯ মে লন্ডন গমন করেন এবং ১৮ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। সূত্র দাবি করেন যে, গোয়েন্দা বিভাগ পরবর্তীতে এই সংলাপ সম্পর্কে জানতে পারে। এটি জানার পর প্রেসিডেন্টকে জানানো হয় যে তিনি যেন পদত্যাগ করেন।”
ডেইলি স্টারের রিপোর্টটি ছাপা হয় ২৩ তারিখে। এরপর ধারণা করা যায় যে, গোয়েন্দা বিভাগ সম্ভবত এই টেলিফোনের অডিও দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে দেয়। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ২৩ তারিখেই প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে বলে। সংবিধান মতে, প্রেসিডেন্টকে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের নিকট দাখিল করতে হয়। স্পিকার তখন চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড ছিলেন। গত ২৩ জুলাই তারিখেই স্পিকারকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফেরার জন্য বলা হয়।
স্পিকার ২৪ তারিখ সকালের টিকিট পান এবং ২৪ জুলাই থাই এয়ারওয়েজযোগে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকা পৌঁছেন। একই দিন বিকেল ৫টা ১ মিনিটে প্রেসিডেন্ট তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের নিকট পাঠান। স্পিকার তৎক্ষণাৎ সেটি গ্রহণ করেন এবং সংবিধান মোতাবেক অস্থায়ীভাবে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এই হলো সংক্ষিপ্ত, কিন্তু চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ঘটনার পরও ঘটনা আছে। ৮০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ চুপ্পুর বিরুদ্ধে আছে। আরো অন্যান্য অভিযোগ আছে। এখন তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে চাচ্ছেন। বিদেশ গেলে তিনি কি আর ফিরে আসবেন? অভিযুক্ত খাঁচার পাখিকে কি বিএনপি সরকার খাঁচা থেকে ছেড়ে দিয়ে আকাশে উড়তে দেবে? এটিই এখন একটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com