উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশে সরকারি বেতন বৃদ্ধি : অর্থনীতি কি প্রস্তুত?


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:২০

স্থগিত রাখতে বলেছে আইএমএফ

॥ কাওসার রহমান ॥
চার বছর ধরে নিত্যপণ্যের বাজার যেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক নির্মম লুকোচুরি খেলছে। চাল, ডাল, মাছ, গোশত, ভোজ্যতেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই জীবনযাত্রার ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে যে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় প্রায় শেষ। নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে গেছে। আর নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ প্রতিদিন নতুন হিসাব কষে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে; খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় সার্বিক মূল্যস্ফীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের মূল্যায়নে মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এমন একসময়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বড় পরিসরে বাড়িয়েছে। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ায় না; কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পণ্য পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজার তথা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। অর্থনীতিবিদরা একে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে পণ্যের দামও বাড়ে। বাজারে এর অভিঘাত পুরোপুরি কাটার আগেই সরকারের সামনে এসেছে আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ এবং নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হতে পারে এবং পেনশনসহ মোট ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ছিল ৮৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা; নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই খাতে মোট ব্যয় প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা ব্যয়ের হিসাবে প্রায় ১৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
সংখ্যাগুলো শুধু বড়ই নয়, এগুলো বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে একটি কঠিন প্রশ্নও তুলে দেয়। যে অর্থনীতি এখনো চার বছরের মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি, যেখানে রাজস্ব আদায় ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে, সেখানে এত বড় পরিচালন ব্যয় বহনের সক্ষমতা সরকারের কতটুকু?
এটি কি কেবল বেতন বৃদ্ধির প্রশ্ন?
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের ন্যায্য পাওনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই মনে হতে পারে। বাস্তবতাও তা-ই। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনকাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত বা রিয়েল ইনকাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাই নতুন বেতন কাঠামোর দাবির পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। তবে এখানে প্রশ্ন হলো- সর্বশেষ পেস্কেলের সুপারিশ অনুযায়ী, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি বিচেনায় ৫ শতাংশ এবং স্বাভাবিক বিবেচনায় ৫ শতাংশ মোট ১০ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে ১২ বছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন মোটাদাগে ১২০ শতাংশ বেড়েছে। সেটি কি বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নাকি জোর করে কর্মকর্তাদের আরও ১০০ শতাংশ এবং কর্মচারীদের ১৪০ শতাংশ বেতন বাড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু অর্থনীতির প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। কারণ একটি রাষ্ট্র যখন ১৭ কোটি মানুষের অর্থনীতিতে মাত্র ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীর জন্য বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এর প্রভাব কেবল ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কীভাবে পড়বে।
বাজারের পুরোনো অভিজ্ঞতা নতুন আশঙ্কা
বাংলাদেশে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের হাতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ এলে ভোগব্যয় বাড়বে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আগাম ধারণা করেন যে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। ফলে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
জানা যায়, পে-স্কেল নিয়ে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির আলোচনায় এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেল ঘোষণা হলে প্রায়ই নিত্যপণ্যের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে, সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যায় এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও কর্মীদের বেতন বাড়ানোর চাপে পড়েন। তাই তেল-গ্যাসের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক ব্যবসার অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি খাতের আর্থিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ কারণেই এবার বিষয়টি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। বরং তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, এই মুহূর্তে সময়টি কি উপযুক্ত?
এই প্রতিবেদনের মূল প্রশ্নও এটি। চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং ঘাটতিপূর্ণ বাজেটের বাস্তবতায় এখনই কি এত বড় পরিচালন ব্যয় অর্থনীতির জন্য উপযুক্ত? নাকি এর মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করবে সেই ১৭ কোটি মানুষ, যাদের অধিকাংশই এই বেতন বৃদ্ধির কোনো সরাসরি সুবিধা পাবেন না?
আইএমএফের উদ্বেগ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর শুধু বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই; বরং প্রশ্ন উঠছে সময় নির্বাচন নিয়ে। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন চার বছর ধরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত যখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সরকারের পরিচালন ব্যয়ে এক লাফে বিপুল বৃদ্ধি অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে, এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্র।
এই উদ্বেগ কেবল দেশের অর্থনীতিবিদদের নয়। আইএমএফ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরকালে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায়। আলোচনায় সংস্থাটি জানতে চেয়েছে, পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিপুল পরিচালন ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে? এই ব্যয় কি বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে না? এসব বিবেচনায় সংস্থাটি পে-স্কেল বাস্তবায়ন আপতত স্থগিত রাখতে অথবা পিছিয়ে দিতে বলেছে। সেইসঙ্গে পে-স্কেল বাস্তবানের আগে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে অর্থের উৎস নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
টাকা আসবে কোথা থেকে?
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে বলে সরকারের নিজের হিসাবই বলছে। প্রশ্ন হলো- এই অর্থ আসবে কোথা থেকে?
অর্থনীতিতে কোনো সরকারই অতিরিক্ত ব্যয় করার জন্য অসীম সম্পদের মালিক নয়। আর বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, কয়েক বছর ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার যতটা বড় হয়েছে, কর আদায় সেই হারে বাড়েনি। ফলে ব্যয় বাড়ানোর সবচেয়ে স্বাভাবিক উৎস রাজস্ব সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে।
সরকার যদি বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যেতে পারে। অর্থনীতিতে একে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে শিল্প ও ব্যবসার জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যাবে। এতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কর্মসংস্থানও চাপে পড়বে।
আর বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার এখনো তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সতর্কতা বাড়ছে। ফলে এটিও সহজ সমাধান নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরোক্ষ অর্থায়ন বা অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি করা হলে উৎপাদন না বাড়িয়ে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এ কারণেই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নতুন পে-স্কেল নিয়ে মূল প্রশ্ন বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং অর্থায়নের উৎস।
২০১৫ সালের অভিজ্ঞতা কী বলে?
সরকারের পক্ষ থেকেও অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পরপরই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে এবং বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে সর্বশেষ পে-স্কেল কার্যকরের পর মূল্যস্ফীতির ওপর কিছু সময়ের জন্য চাপ তৈরি হয়েছিল, তবে তা স্থায়ী হয়নি। সেটি ৩ মাস স্থায়ী হয়েছিল। এবারও সরকারের ধারণা, প্রভাব থাকলেও সেটিও সাময়িক হতে পারে। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার তখনকার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় এবার এর প্রভাব কয়েক মাস দীর্ঘ হতে পারে বলেও সরকারি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পে-স্কেলের প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে ছয় মাসেরও বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, উচ্চ ভিত্তির কারণে হয়য়তো ছয় মাস পর মূল্যস্ফীতি কমে আসতে পারে, কিন্তু বাজারের উচ্চমূল্যের বাস্তবতায় পণ্যমূল্য কি কমবে? অর্থাৎ ছয় মাস পারে কি জিনিসপত্রের দাম কমে আসবে? বাস্তবতা হলো তা কখনোই কমবে না। তাহলে এই সময়ে এই ঝুঁকি নিয়ে ১৫ লাখ মানুষের জন্য দেশের ১৭ কোটি মানুষকে দুর্ভোগের মুখে ফেলার কারণ কী?
এখানে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী ছিল, জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল এবং রাজস্ব পরিস্থিতিও বর্তমানের মতো চাপে ছিল না।
আর আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি; অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং পরিচালন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ, সব মিলিয়ে অর্থনীতির সহনশীলতা আগের তুলনায় অনেক কম। এ কারণেই সময়ের প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন পে-স্কেল নিয়ে অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসছে, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন কি না, সেটি নয়; বরং এই মুহূর্তে এটি বাস্তবায়নের সময়টি অর্থনীতির জন্য উপযুক্ত কি না।
১৫ লাখের স্বস্তি, ১৭ কোটির শঙ্কা
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে পুরো বিতর্কের শেষে এসে একটি প্রশ্ন এড়ানো যায় না। আর সেটি হলো এই সিদ্ধান্তে লাভবান হবেন কারা, আর এর সম্ভাব্য মূল্য বহন করবেন কারা?
এর সহজ উত্তর নেই। একদিকে রয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগী, যাদের বড় একটি অংশ গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় আছেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন পে-স্কেল কেবল একটি আর্থিক সুবিধা নয়; এটি অনেকের কাছে দীর্ঘদিনের ন্যায্য পাওনা।
অন্যদিকে রয়েছে দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, যাদের বিশাল অংশ বেসরকারি খাতে কর্মরত, স্বনিযুক্ত, কৃষিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা দিনমজুর। তাঁদের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হয় না। বাজারে যদি নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়বে এই জনগোষ্ঠীর ওপর।
এখানেই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্নটি সামনে আসে, একটি সীমিত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য দাবি পূরণ করতে গিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হলে রাষ্ট্র কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে?
এছাড়া সরকারি বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে বেসরকারি খাতেও একই ধরনের বেতন সমন্বয়ের সামাজিক ও শ্রমবাজারগত চাপ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা নেই। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানে ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাই, নিয়োগ স্থগিত বা বিনিয়োগ কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও দেখা দিতে পারে। তাই ঝুঁকিটি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখা জরুরি।
রাজস্ব সংস্কার ছাড়া টেকসই সমাধান নেই
এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। বাংলাদেশের প্রকৃত সমস্যা শুধু পে-স্কেল নয়; বরং দুর্বল রাজস্ব ভিত্তি।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে রাজস্ব সংস্কার, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কয়েক বছরের মধ্যে একই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
তাদের মতে, যদি ধাপে বাস্তবায়নের সঙ্গে স্পষ্ট রাজস্ব সংস্কার কর্মপরিকল্পনা, ব্যয় সাশ্রয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতিও যুক্ত করা যায়, তাহলে অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে ধাপে বাস্তবায়নই একমাত্র সমাধান নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে অর্থের উৎস, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে আস্থার ওপর।
অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন
এই পুরো বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়, সেটি হলো অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একটি নীতি যদি একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি দেয়; কিন্তু অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের প্রকৃত আয় আরও কমিয়ে দেয়, তাহলে সেই নীতির সামগ্রিক ফলাফল নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই রাজস্ব আহরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সমন্বয় থাকতে হবে। সরকারকে ব্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে। আইএমএফ হয়তো সেটিই দেখতে চাইছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ বাড়বে। এতে সরকারি খাতের বাইরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই বেসরকারি খাতের মজুরি বা বেতন বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দিতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, আইএমএফ শুধু ঋণ দেয় না, অর্থনীতির সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে একইসঙ্গে কর সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপ্রয়াজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। অন্যথায় সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এটি একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, ‘নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এটি ধাপে ধাপে বা ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশ বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক সময় অতিক্রম করছে। তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এমন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, যাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সুবিধা পান, আবার একই সঙ্গে রষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি না হয়।’
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে বিতর্ক মূলত একটি বড় বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বহুস্তরীয়।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বাজেটের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু ‘বেতন বাড়বে কি না’ তা নয়। প্রশ্ন হলোÑ কীভাবে বেতন বাড়ানো হবে, কোন অর্থে বাড়ানো হবে, কত ধাপে বাড়ানো হবে এবং সেই ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?
এই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তর ছাড়া নতুন পে-স্কেল হয়তো প্রশাসনের একটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে, কিন্তু একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতিতে ক্লান্ত কোটি মানুষের জীবনে নতুন অনিশ্চয়তার ছায়াও ফেলতে পারে।