আস্থা ফিরলেই ফিরবে বিনিয়োগ
২২ জুলাই ২০২৬ ২১:১২
ঘুরে দাঁড়াবে অর্থনীতি
॥ কাওসার রহমান ॥
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটকে অনেকেই মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বা রাজস্ব ঘাটতির সংকট হিসেবে দেখেন। কিন্তু এসব সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগের স্থবিরতা। নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন বাড়ছে না, উৎপাদন না বাড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে মানুষের আয়, ভোগ, রাজস্ব আদায় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি- সবই চাপের মুখে পড়েছে।
গত দুই বছরে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে কিংবা কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন তরুণরা। প্রতি বছর লাখ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের অভাবে তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দারিদ্র্য হ্রাসেরও বড় চ্যালেঞ্জ। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাস পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রবৃদ্ধি না হলে কর্মসংস্থান হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্যও কমবে না।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমানে ঋণপ্রবাহের নিম্নগতি নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে ব্যাংকে অলস অর্থ জমে থাকলেও তা উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাহিত না হওয়ায় প্রবৃদ্ধির গতি আরও মন্থর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় উৎপাদন ও শিল্প সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বেকারত্বের চাপ আরও বাড়বে।’
বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশ
বেসরকারি বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতে স্থবিরতা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ কিংবা নতুন সরকারের প্রচেষ্টা এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম। একই সময়ে মোট নিট এফডিআইও প্রায় ৪৪ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি কোম্পানিগুলো এখনো তাদের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশে পুনর্বিনিয়োগ করছে। কিন্তু নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এটিই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এলেও এর মধ্যে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে নিট বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এফডিআই বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে; নতুন বিদেশি মূলধনপ্রবাহ বাড়েনি। ডলার সংকটের কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি মুনাফা দেশে ফেরত নিতে না পেরে স্থানীয়ভাবে পুনর্বিনিয়োগ করেছে। ফলে পরিসংখ্যানে বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন শিল্প বা কর্মসংস্থান তৈরিতে তার প্রভাব সীমিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের বড় ধরনের পতন স্পষ্টভাবে দেখায় যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ঋণমানের অবনতি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও কার্যকর সংস্কার জরুরি।’
কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিদেশিরা
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা, মুনাফা সহজে নিজ দেশে নেওয়ার সুযোগ, ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক ঋণমানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এসব সূচকের কয়েকটিতে অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশ এখন তাদের কাছে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং) অবনমিত হওয়াও নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নীতির স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতার সূচক হিসেবে ঋণমানকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
এর বাইরে গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানায় ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে এসব ঘটনার আলোচনা এখনো হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি। এজন্য লজিস্টিকস, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, তা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। তাঁর মতে, কেবল রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিলেই বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সস্তা শ্রমশক্তি ছাড়া অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় বাংলাদেশ এখনো অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তার আগে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি।’
বন্ধ হচ্ছে শিল্প, বাড়ছে উদ্বেগ
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানির উচ্চ খরচ, উচ্চ সুদহার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী কিছুটা চাপ সামাল দিলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্প্রতি গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়েছেন। এটি সামগ্রিক শিল্প সংকটের একটি উদাহরণ মাত্র।
শিল্প গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের সাতটি এলাকায় ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫টি পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না থাকায় এবং ১৯০টি মালিকদের আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ মোট বন্ধ হওয়া কারখানার প্রায় ৮৬ শতাংশই কাজের অভাব ও আর্থিক সংকটের শিকার। বাকি কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের ঘাটতি ও অন্যান্য কারণে।
এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক নতুন করে বেকার হয়েছেন। একই সময়ে শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘ক্রয়াদেশের ঘাটতি, ব্যাংকিং সংকট ও ব্যবসা থেকে প্রস্থানের কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো শ্রমিক ছাঁটাইয়ের তথ্য সংগঠনকে জানায়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।’
অন্যদিকে গ্যাসসংযোগের সংকট নতুন শিল্পায়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করেও শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর উৎপাদনে যেতে পারছে না। বর্তমানে বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্প খাতে ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন ঝুলে রয়েছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘শুধু তিতাসের কাছেই প্রায় ৪৯০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসসংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া নতুন সংযোগের জন্য আরও প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৩০০টি আবেদন জমা আছে। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ সীমিত থাকায় এগুলো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘বিদ্যমান শিল্পকারখানাই যখন পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, তখন নতুন শিল্প স্থাপনের কথা বাস্তবসম্মত নয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে সরকারের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।’
কর্মসংস্থান সংকটের নীরব বিস্তার
একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু কয়েকশ’ মানুষের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করে না; এর সঙ্গে পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অসংখ্য সহায়ক খাতও সক্রিয় হয়। ফলে একটি নতুন বিনিয়োগের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতভাবে, একটি বিনিয়োগ স্থগিত বা একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় অর্থনীতি ও বহু মানুষের জীবিকা।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু শিল্পে নতুন বিনিয়োগ সেই হারে বাড়ছে না। উল্টো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ দীর্ঘসময় কর্মহীন থাকছেন, আবার অনেকে বিদেশমুখী হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, ‘কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। সরকারের একার পক্ষে এই বিপুল জনশক্তির জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই শক্তিশালী বেসরকারি খাতই কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান ভরসা। কিন্তু প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক জটিলতা সেই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।’
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ : ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান পেয়েছেন মাত্র ৮৭ লাখ। এরও অধিকাংশ সৃষ্টি হয়েছে কম উৎপাদনশীল খাতে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আশাব্যঞ্জক নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ৪২ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বও দ্রুত বেড়েছে। আগে যেখানে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মহীন ছিলেন, এখন সেই হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র আরও জটিল। কারণ আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করলেও তাকে কর্মরত হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে বেকারের সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা যায়।
এর বাইরে দেশে প্রায় ৯৬ লাখ নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী রয়েছেন, যারা না পড়াশোনায়, না চাকরিতে, না কোনো প্রশিক্ষণে যুক্ত। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এরা ‘নিট’ (ঘঊঊঞ) জনগোষ্ঠী। দীর্ঘ এক দশক ধরে এ সংখ্যা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি রয়েছে। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত করে, দেশের প্রকৃত কর্মসংস্থান সংকট সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক গভীর।
বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার ছায়া
অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সবচেয়ে প্রয়োজন স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা এখন নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণের আগে উদ্যোক্তারা এখন উৎপাদন ব্যয়, ঋণের সুদ, ডলারের বিনিময় হার এবং বাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ফলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।
অর্থনীতিবিদ ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘দেশে এমনিতেই পুঁজির সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার ও করের চাপ যোগ হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। তাতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বেসরকারি খাতও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে স্থির রয়েছে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ক্রমেই সরকারি ব্যয়নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা টেকসই কর্মসংস্থান তৈরিতে যথেষ্ট নয়।’
সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি
সব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠানটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করবে।
বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগকারীদের সহায়তা এবং নীতিগত সংস্কারে সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই উদ্যোগ।’
সরকার বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সম্প্রসারণ, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও নিয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল ঘোষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের মূল শর্ত।
বিশ্বব্যাংকও বলছে, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ বাণিজ্যনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সব প্রতিকূলতার পরও প্রায় ১৮ কোটির বৃহৎ ভোক্তা বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তিশালী তৈরি পোশাকশিল্প, বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং উন্নত অবকাঠামোর কারণে বাংলাদেশ এখনো বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্য।
এখন কী করা প্রয়োজন
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সরকারি ব্যয় দিয়ে সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হলেও কর্মসংস্থান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও শিল্পায়নের জন্য শক্তিশালী বেসরকারি খাত অপরিহার্য।
তাদের মতে, বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর, শুল্ক ও বিনিয়োগনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে- যাতে উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন। তৃতীয়ত, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগসেবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিতে হবে। পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ এখনো অনেক কম। সাম্প্রতিক সময়ে এফডিআই কিছুটা বাড়লেও তার বড় অংশই পুনর্বিনিয়োগ। নতুন বিনিয়োগ ও নতুন প্রযুক্তি আনতে হলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, করব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।’
নতুন অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশা প্রকাশ করেছেন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও সংস্কারের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি পাবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, বিনিয়োগকারীরা কেবল প্রণোদনা দেখেন না; তারা দেখেন নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ব্যবসার নিরাপত্তা। তাই আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ অতীতেও বৈশ্বিক মন্দা, মহামারি ও যুদ্ধজনিত অভিঘাতসহ নানা সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। তাই বর্তমান সংকটও অতিক্রম করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট আজ শুধু মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি কিংবা রাজস্বের চাপ নয়; সবচেয়ে বড় সংকট বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। বিনিয়োগ ছাড়া নতুন শিল্প হবে না, নতুন শিল্প ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস- কোনোটিই সম্ভব নয়।
অতএব বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এখন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে- সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।