নেই পোস্টারে, আছে হৃদয়ে শহীদ শান্ত


১৭ জুলাই ২০২৬ ১৭:২২

শহীদ শান্ত

আসমা আফরিন

১৬ জুলাই ২০২৪
সকালবেলা, আমাদের বহু প্রতীক্ষিত কক্সবাজার ট্যুরের দিন।
উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনা নিয়েই আমরা রওনা হলাম।
কিন্তু চট্টগ্রামের কুমিরায় স্টেশনে হঠাৎ ট্রেন থেমে যায়।
খবর এল — IIUC-এর ছাত্ররা রেলপথ অবরোধ করেছে।
প্রথমে বিরক্তি লাগছিল।
দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি, তার ওপর এই অজানা অপেক্ষা।
তারপর ও ভাল লাগছিল।
এরা তো দাঁড়িয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে!
গর্বে বুকটা ভরে উঠলো।
যত কষ্ট হয় হোক। তবুও কেউ রুখে দাঁড়াক।
এরমধ্যেই আমরা শুনতে পাচ্ছি। আমাদের খুব কাছেই ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। তবে কোন রিয়েল খবর পাচ্ছি না।
একসময় ট্রেন ছাড়ে,
কিন্তু জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্য আমাদের হৃদয় আর ছুঁয়ে যায় না।
ট্রেনের সিটে বসে আমি ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে জানতে পারি —
রংপুরে ১ জন, চট্টগ্রামে ৩ জন শহী- হয়েছে। পুলিশ সবচেয়ে বেশি গুলি করেছে চট্রগ্রামে!
খবর দেখে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠে! না জানি কার পরম আদরের ধন শেষ হয়ে গেল!
রাতে কক্সবাজারের হোটেল রুমে ফিরে, ফোনটা হাতে নিলাম। নীরবতার মাঝখানে আচমকা চোখ আটকে গেল এক হৃদয় বিদারক খবরে— শ/হিদদের তালিকায় আছে আমাদের সেই শান্ত ভাইটা!
শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত৷
কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম।
আমি কাঁপা হাতে শান্তর প্রোফাইলে ঢুকি। উপরের দিকেই লেখা:
“যে হৃদয় শা’’হাদাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করে, সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না।”
চোখটা ঝাঁপসা হয়ে এলো
কিভাবে সম্ভব!
নিজের শাহাদাতের আগমন কী নিজেই দেখতে পেয়েছিল?
সেদিন একই সময়ে একই স্পটে শহীদ হয়েছিল ওয়াসিম আর শান্ত।
ওয়াসিমের নাম পোস্টারে, ব্যানারে, শিরোনামে।
আর শান্ত?
শান্ত হারিয়ে গেল নীরবতায়।
ওর কী দোষ ছিল?
স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কী সবার আগে সে রুখে দাঁড়ায় নি?
তবে কেন তাঁর বীরত্ব কোনো হেডলাইনে লেখা হলো না?
ওর দলের ভাইয়েরা শহীদের ক্রেডিট নিতে চায়নি বলে?
ওর মৃত্যুটা ক্যামেরায় ধরা পড়েনি বলে?
আজ, আমি কেবল একজন ফেসবুক বন্ধু হিসেবে শান্তর কাছে নিজেকে ঋণী মনে করি না—
আমি একজন মানুষ হিসেবে লজ্জিত।
১৬ জুলাই যারা শ/হী/দ হয়েছিল, তারা কেউ কারো থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামেনি।
আবু সাইদের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাড়ানো ওরা কেউ জানতো না, তবুও শান্তরা এগিয়ে গিয়েছিল।
হয়তো শান্তও পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল —
কিন্তু কেউ দেখেনি বলে তা ইতিহাসে লেখা হলো না!
শান্তর হৃদয় ছিল শহীদের মতো পবিত্র
তার স্বপ্ন ছিল সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর।
আমরা সেই হৃদয়টাকে উপেক্ষা করেছি।
শান্ত,
তুমি শহীদ হয়েছো গোপনে,
নীরবতার ভিতরেই রচনা করেছ এক সাহসিকতার গাঁথা —
যা আজও লেখা হয়নি কোনো দেয়ালে,
বলা হয়নি কোনো ভাষণে!
তোমার বুক, যেখানে গুলি লেগেছিল —
সেখানে বেঁচে ছিল এক স্বপ্ন, এক আগুন,
যা নিভে গেলো…
নির্বাক এই সমাজের নীরবতায়।
তোমাকে কেই মনে না রাখলেও আমার মতো কিছু মানুষ মনে রাখবে —
প্রতিটি শোকের সময়ে,
প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবা/দে,
প্রতিটি স্বৈরাচার তাড়ানোর মুহূর্তে।
আল্লাহ তোমার শাহা-দাত কবুল করুক (আমিন)

আসমা আফরিনের
ফেসবুক ফ্রেন্ড মিরাদুল মোমীনের সৌজন্যে

শহীদ শান্ত

সম্পর্কিত খবর