সাদাপাথর ও জাফলংয়ে কোটি টাকার ক্ষতি

সিলেট-সুনামগঞ্জে উজানের ঢলে পানিবন্দি হাজারো মানুষ


১ জুলাই ২০২৬ ২০:১৪

আবদুল বাছেত মিলন, সিলেট : ভারতের মেঘালয় ও আসামে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং স্থানীয়ভাবে টানা ভারী বর্ষণে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলের পানিতে দুই জেলার প্রধান নদনদীর পানি হু-হু করে বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও উন্নতি হয়নি পরিস্থিতির। ফলে সাদাপাথর ও জাফলংয়ে ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার সম্পদ ও কর্ম।
কয়েকদিনের বন্যার পানির তোড়ে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ‘সাদাপাথর’ পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং গোয়াইনঘাটের জাফলং জিরো পয়েন্টে প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে কয়েকশ’ দোকানপাট। এদিকে পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়ায় জেলা সদরের সাথে তাহিরপুরের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও লোকালয় প্লাবিত হওয়ায় দুই জেলার লাখ লাখ মানুষ নতুন করে চরম বন্যা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টির চেয়ে সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলের অতি ভারী বৃষ্টিপাতই এই আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ। গত সপ্তাহে ভারতের মৌসিনরামে রেকর্ড ৫২৬.৪ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে (সোহরা) ৪৭০.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের এই বিপুল পরিমাণ পানি পিয়াইন, ধলাই ও যাদুকাটা নদী হয়ে বাংলাদেশে তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে।
এছাড়া সিলেটে পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় সিলেটের নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া ও পানি বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসের শেষ এবং জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সিলেট বিভাগ এবং ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, যা বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে।
পর্যটন কেন্দ্রে বিপর্যয় : ব্যবসায়ী ও মাঝিরা কর্মহীন
উজান থেকে নেমে আসা ধলাই নদীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে গেছে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ‘সাদাপাথর’ পর্যটন কেন্দ্র। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানান, পর্যটকদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে গত ২১ জুন থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাদাপাথর স্পট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হঠাৎ পর্যটন বন্ধ হওয়ায় ওই এলাকার অন্তত ১৭০টি নৌকার মাঝি এবং স্থানীয় কয়েকশ’ ব্যবসায়ী সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে পিয়াইন নদীর পানি আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করে। এতে জাফলং জিরো পয়েন্ট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কয়েকশ’ দোকানপাট লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। প্রবল স্রোতে দোকানপাটের মালামাল ভেসে যাওয়ায় মাত্র এক রাতের ব্যবধানে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তাহিরপুর
সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের উজান থেকে আসা ঢল যাদুকাটা, রক্তি ও বৌলাই নদী দিয়ে তীব্র বেগে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুর্গাপুর ও শক্তিয়ারখলা এবং তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর নামক তিনটি প্রধান নিচু স্থান প্লাবিত হয়েছে।
সড়কের ওপর দিয়ে বর্তমানে তীব্র স্রোতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যাতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো সাধারণ মানুষ।
আকস্মিক এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা টিম : পানিবন্দি ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে স্পিডবোটের ব্যবস্থাও জরুরি।
নিম্নাঞ্চলের শত শত ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ভবনগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আলোর ব্যবস্থা করে রাখা দরকার। যাতে করে সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন, উজান ও স্থানীয় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সুরমা ও কুশিয়ারার অন্যান্য পয়েন্টেও পানি দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করবে। তবে ভৌগোলিক কারণে এটি স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টি কমলে লোকালয় থেকে পানি দ্রুত নেমে যাবে।
সম্ভাব্য বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন যৌথভাবে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। হাওর, চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের তাদের গবাদিপশু, জরুরি কাগজপত্র ও শুকনো খাবার গুছিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সিলেট অঞ্চলের মৌসুমি এই দুর্যোগ থেকে স্থায়ী সমাধান পেতে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞরা নানা পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, সিলেট অঞ্চলের এই পুনরাবৃত্তিমূলক বন্যা কেবল সাময়িক জোড়াতালির মাধ্যমে বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ও টেকসই পরিকল্পনা। এজন্য যা করতে হবে এর মধ্যে নদী ও হাওরের নাব্য বৃদ্ধি (ক্যাপিটাল ড্রেজিং)। সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, ধলাই ও যাদুকাটাসহ প্রধান নদনদী এবং প্রাকৃতিক হাওরগুলোর তলদেশে জমে যাওয়া পলিগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনন (উৎবফমরহম) করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে উজান থেকে আসা ঢল দ্রুত নেমে যেতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতি ও যৌথ পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। যেহেতু বন্যার মূল কারণ ভারতের মেঘালয় ও আসামের অতিবৃষ্টি, তাই ভারতের সাথে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) আবহাওয়ার উপাত্ত আদান-প্রদান এবং উজান থেকে আসা পানির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জরুরি।
বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ। এজন্য হাওর ও নিম্নাঞ্চলে যত্রতত্র আড়াআড়ি সড়ক নির্মাণ না করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে পর্যাপ্ত কালভার্ট, ব্রিজ ও এলিভেটেড (উড়াল) সড়ক নির্মাণ করতে হবে। নদীর তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোকে টেকসই ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
এদিকে চলমান আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জাফলং ও সাদাপাথরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং তলিয়ে যাওয়া ফসলের কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।