ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা কেটে গেছে : ফিরছে গ্রাহকদের আস্থা
১৮ জুন ২০২৬ ০৯:৫২
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর হস্তক্ষেপ ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের ফলে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট ও সাময়িক অস্থিরতা কেটে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণ পর্ষদ ভেঙে নতুন প্রশাসক নিয়োগ এবং জরুরিকালীন তহবিল গঠনের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ও স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
তারল্য ঘাটতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ প্যাকেজ হিসেবে ইসলামী ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। এর ফলে ব্যাংকটির শাখা ও এটিএম বুথগুলোয় নগদ অর্থের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে।
গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে স্বস্তি ও আস্থা ফিরে আসছে। গ্রাহকদের একটি বড় অংশ ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে সংস্কার কার্যক্রম ও নতুন Neutral (নিরপেক্ষ) পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা আস্থার ভিত মজবুত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক
ব্যাংকটির রেমিট্যান্স সংগ্রহ, চেক ক্লিয়ারিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস বা সেলফিনের (CellFin) মতো ডিজিটাল সেবাগুলো বর্তমানে নির্বিঘ্নে চলছে। ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রাহকদের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং নতুন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা বোর্ডের অধীনে ব্যাংকটি তার হৃত গৌরব ও স্থিতিশীলতা দ্রুতই পুনরুদ্ধার করবে। সব মিলিয়ে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সঠিক পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকট কাটিয়ে পূর্ণ আস্থার সাথে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
সচেতন গ্রাহকরা বর্তমান সরকারের সৃষ্ট নয়া এস আলম সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলন করে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচালো মনে করেন বিশ্লেষকরা।
নয়া এস আলমের আগ্রাসনের প্রতিবাদ
দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম শরীয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি দখলে নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত-সমালোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপ। এরপর রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে রাতের আধারে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারপর প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ সব পদের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম পরিবার। পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে আলোচিত এই শিল্প গ্রুপটি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয় কয়েক লাখ কোটি টাকা। জানা যায়, ইসলামী ব্যাংক থেকে আত্মসাত করা সব টাকাই দেশের বাইরে পাচার করে এস আলম পরিবার। যার ফলে ভয়াবহ তারল্য সংকটে পরে ব্যাংকটি। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। তবে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পর ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। এরপর গ্রাহকদের আস্থা এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহের কারণে বিপুল পরিমাণ খেলাপি থাকা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ায় ব্যাংকটি। তারল্য সংকট কাটিয়ে লেনদেন স্বাভাবিক হয় ইসলামী ব্যাংকের। তবে গত ২৪ মে প্রতিষ্ঠানটির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। এতে আতঙ্কে আমানতের টাকা তুলে নেয়ার হিড়িক পড়ে যায়। জানা যায়, মো. খুরশীদ আলম এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতা গোটা অর্থনীতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গত ১০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ উদ্বেগের কথা জানান এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন।
আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে লুটপাট করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে। শরীয়াহভিত্তিক দেশের এই শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংটির ওপর গ্রাহকদের আস্থা থাকায় ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ফের ঘুরে দাঁড়ায় ব্যাংকটি। বিএনপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের ঘনিষ্ঠজনদের ম্যানেজ করে ব্যাংকটি ফের বেদখলের অপচেষ্টা চালায় এস আলমের দোসররা। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হঠাৎ করে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নিয়োগ করা হয়েছিলো। এর আগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান পদ থেকে অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমানকে অপসারণ এবং এমডি ওমর ফারুককে ৪৯ দিনের ছুটিতে পাঠানো হয়। সূত্রে প্রকাশ, এসব কিছুই করেন এস আলম ঘনিষ্ঠ বর্তমান সরকারের দুই দিন প্রভাবশালী মন্ত্রী। ষড়যন্ত্র গ্রাহকের কাছে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। শীর্ষ পদে ষড়যন্ত্রমূলক রদবদলে এই ব্যাংকটিতে সৃষ্টি চরম অচলাবস্থা হয়।
গ্রাহকদের টানা আন্দোলনে নতুন নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এরই মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় হাজার হাজার গ্রাহক আমানত তুলে নেন, অনেকে হিসাবও বন্ধ করে দেন। ফলে ঘুরে দাঁড়ানো ব্যাংকটির সব সূচকে অবনতি শুরু হয়। একইসঙ্গে তৈরি হয় তারল্য সংকট। দুই দফায় বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা ধারও দেন, ধার পাওয়ার পর ব্যাংকটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা মনে করছেন, তারল্য সংকট কেটে যাবে, কিন্তু বাস্তবে গ্রাহকদের উদ্বেগ কাটেনি। তারা অপেক্ষা করছেন নতুন পর্ষদ কেমন হয়, কারা দায়িত্বে আসেন তা দেখার। দুর্নীতিমুক্ত সৎ ও যোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালিত হলে আবারও গ্রাহকদের আস্থায় ফিরবে ব্যাংকটি- এমনটাই মনে করেন গ্রাহকরা। সেই লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে এবিবির স্বস্তি
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কর্তৃক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ব্যাংকটিকে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। গত সোমবার (১৫ জুন) এক বিবৃতেতে এ কথা জানায় সংগঠনটি। এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় ও ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানির স্বার্থে, আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সকল পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ১৫ জুন সোমবার দুপুরে এবিবির পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, এবিবি এ সিদ্ধান্তকে ব্যাংক খাতের জন্য সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ হিসেবে অভিহিত করে।
ইসলামী ব্যাংকে পেশাদার বোর্ড গঠনের দাবি গ্রাহকদের
ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। গত সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক এসব দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একইসঙ্গে ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন করে এবং পরবর্তীতে নীতিমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ঋণের নামে বের করে নেওয়া হয়। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। সংগঠনটি সাত দফা দাবি তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, জোরপূর্বক নেওয়া শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফেরত দেওয়া, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং লুটেরাদের পুনর্বাসন বন্ধ করা। অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত ও আস্থার প্রতিষ্ঠান। তাই দ্রুত সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই যে শুভ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তা দ্রুত ফলবে। গ্রাহকের আস্থার প্রতীক ইসলামী ব্যাংক পূর্ণ মর্যাদায় আবার ঘুরে দাাঁড়বে, সেই প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ।