২৩ জুন পলাশী দিবস : পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার দিন


১৮ জুন ২০২৬ ০৯:৪৪

সোনার বাংলা ডেস্ক : ২৩ জুন পলাশী বিপর্যয় দিবস। পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার দিন। পলাশী ভাগ্যাহত এক নবাবের পরজয়ের দিন শুধু নয়, ইতিহাসের বাঁক ঘোরানো রক্তাক্ত উপাখ্যান। একটি জাতির উত্থান-পতনই শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দেয়া এক দুষ্টু ক্ষতের নাম। পলাশীর থরো থরো স্মৃতি রোমন্থন অতীতের বেদনাগুলো সামনে এনে হাজির করে; এর বিপরীতে জীবন এবং জমিনের নতুন বীজ বপনে চেতনার আলোকছটাকে দ্যুতিময় করে। অতীত হয়ে যাওয়া দুঃসহ বেদনার সরল রেখাগুলো নানা বক্রতা, জটিলতা আর ধোঁয়াশায় ঘেরা; যা এ জাতিকে প্রায় দুইশ’ বছরের গোলামিতে আবদ্ধ করেছিলো। উপমহাদেশের ইতিহাসে বিয়োগান্ত এ ঘটনা শুধু এই জনপদেরই নয় গোটা দুনিয়ার অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় এক সুদুরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছে। ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তনে তুর্কি খেলাফতের সাথে এই জনপদের বিচ্ছিন্নতাকে মোটাদাগে সুস্পষ্ট করে তুলেছে। প্রভাব পড়েছে ইরান, আফগানিস্তান আর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে। ইতিহাসের এ চড়াই-উতরাই আর আশা-হতাশার ঘটনা-দুর্ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের বুনিয়াদ গড়তে মানবগোষ্ঠীকে নিত্যনতুন চিন্তার দ্যোতনায় আন্দোলিত করে। ইতিহাস মানুষের বিশ্বাস এবং কর্মে প্রতিনিয়ত চিন্তার খোরাক জোগান দেয়। বর্তমানকে বিচার করে ভবিষ্যতের বুনিয়াদ গড়ার অপরিহার্য উপাদান ইতিহাস। পলাশীর বিয়োগান্ত ঘটনা আমাদের জাতিসত্তার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা এমন দুঃখ দিনের করুণ কাহিনী। পলাশীর দুঃসহ ঘটনা আমাদের ইতিহাস, অস্তিত্ব আর বিশ্বাসের শক্তিশালী ভিতগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো, যার প্রভাব আজও নানাভাবে বিদ্যমান। দুইশ’ বছরের ইংরেজ গোলামির অবসান ঘটলেও তার দুষ্টু ক্ষতের প্রভাব আমরা অনুভব করি প্রতিনিয়ত। পলাশী শুধু একটি মাঠের নাম নয়। পলাশীর শুধু কিছু আম গাছের সারি নয়। ভাগীরথীর তীরের আম্রকাননে দুই শক্তির লড়াইয়ের নামও পলাশী নয়। আপসহীন নবাব সিরাজের স্মৃতিগাথা এ ময়দান। পলাশী মানে স্বাধীনতা রক্ষায় একদল সাহসী বীর, তার বিপরীতে অজস্র বিশ্বাসঘাতক আর বেঈমানের অট্টহাসি। জাতিসত্তার বিনাসে একদল বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস ধারণ করে আজও এ ময়দান কথা বলে। ভাগীরথীর সেই স্রোত নেই। নদীর দুই পারের মানুষগুলো নেই। সেই সময়ের কৃষকরা নেই। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদের সারি সারি বাড়ি আর মুর্শিদাবাদের রাজদরবারের কল-কোলাহল নেই। এরপরও অসংখ্য স্মৃতি ধারণ করে ইতিহাস সচেতন মানুষগুলোর হৃদয়ে পলাশী প্রতিনিয়ত চেতনার বহ্নি জালায়। স্বাধীনতাকামী মানুষের মানসপটে পলাশী মানে প্রতিনিয়ত বিদ্রোহ আর যুদ্ধের দামামার মাঝে স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করা মীর জাফর, উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগমদের বিরুদ্ধে দ্রোহ। পলাশী আমাদের চিনিয়ে দিয়েছে নায়ক আর খলনায়কের শ্রেণি চরিত্রকে। পর্দার আড়ালে বাস করা কালো কেউটে, বিষধর কালফনী আর হিংস্র শাপদের মুখোশ উন্মোচন করেছে পলাশী। রায়দুর্লভ, ইয়ার উদ্দিন, উমিচাঁদ, জগৎশেঠরা এখন আর কোনো ব্যক্তিসত্তার নাম ধারণ করে না। এ নামগুলো একেকটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।
পলাশী শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার প্রেক্ষাপটকে উজ্জ্বল আলোয় নিয়ে এসেছিলো। পলাশীর স্মৃতিকে ধারণ করে তাই আজও বন্ধুরূপী বিশ্বাসঘাতক আর বেনিয়ার চরিত্র ধারণকারী খলনায়কদের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করতে পারি। আধিপত্যবাদের দন্তনখর শুধু ফেলানীর লাশই উপহার দেয় না, আমাদের স্বাধীনতা এবং সীমান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাম্রাজ্যবাদের চতুর্মুখী হামলা আমাদের অস্তিত্ব আর বিশ্বাসের বটবৃক্ষের শেকড় কাটে প্রতিনিয়ত। সাহায্যের নামে এনজিও তৎপরতা, উন্নয়নের স্লোগানে চরিত্রবিনাশী কর্মকাণ্ড। সংস্কৃতি বিকাশের নামে জাতিসত্তাবিরোধী চরিত্রকে হাজির করা। সবই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। আড়াইশ’ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এলেও পলাশী এবং নবাব সিরাজকে নিয়ে নির্মোহ আলোচনা খুব কমই হয়েছে। ইতিহাসের পেছনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হচ্ছে, বিজয়ীরাই ইতিহাস রচনা করে। যেখানে পরাজিত ব্যক্তির কথা স্থান পায় না। যদিও তাদের নাম চলে আসে; তবে সত্যকে এড়িয়ে মিথ্যাকেই তাদের নামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। নবাব সিরাজের ব্যাপারেও সত্যের চেয়ে মিথ্যাকেই বেশি স্থান দেয়া হয়েছে। একইভাবে পলাশীর বিয়োগান্ত ঘটনায় ষড়যন্ত্রের কুশীলব ব্রিটিশ বেনিয়ারা আজ ধোয়া তুলশিপাতা। পলাশী এবং নবাব সিরাজ সম্পর্কে সত্যাশ্রয়ী বইপুস্তক পাওয় দুষ্কর। ইন্টারনেটে যা কিছু তথ্য পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই তথ্য বিকৃতি বৈ কিছুই নয়। অত্র নিবন্ধে ইতিহাসের অদ্যোপান্ত লেখা যেমন সম্ভব নয়, একইভাবে ঘটনার কুশীলব সকলের বিবরণ তুলে ধরাও অসম্ভব। ইতিহাসের আলোর এ ক্ষীণধারা জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মকে চিরায়ত বিশ্বাস, আদর্শ, ঐতিহ্য, দেশপ্রেম আর স্বকীয়তা রক্ষায় নতুনভাবে উদ্বদ্ধ করবে- এটাই প্রত্যাশা।
বিগত কয়েক শতাব্দীকাল অব্দি বিশ্বব্যাপী ইংরেজ, ফরাসি, ডাচ এবং ওলন্দাজ শক্তি গোটা দুনিয়ায় শক্তির বলে দেশ দখল এবং সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। আজ যারা নিজেদের প্রথম শ্রেণির রাষ্ট্র বলে পরিচয় দিচ্ছে, তারা একসময় অতি দরিদ্র রাষ্ট্রের কাতারে শামিল ছিল। ব্রিটেনের বর্তমান জৌলুসের পেছনে তাদের দখলদারি আর আগ্রাসী বাণিজ্যিক কূটকৌশলই প্রধান উপজীব্য। ব্রিটিশ বণিকরা প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে বাণিজ্য উপলক্ষে। তাদের বাণিজ্যিক লাভ লোভে পরিণত হয় এবং আস্তে আস্তে এ দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হওয়ার জন্য তারা নানা কূটকৌশল আর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। ষোলশ’ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের একদল ব্যবসায়ী ইস্ট ইন্ডিজে ব্যবসা করার জন্য রানি এলিজাবেথের সনদ লাভ করে। এ কোম্পানির নাম ছিল ‘দি গভর্নর অ্যান্ড মার্চেন্টস অব লন্ডন ট্রেডিং ইন টু ইস্ট ইন্ডিজ’। বেশ কিছুকাল পর ‘দি ইংলিশ কোম্পানি ট্রেডিং ইন টু দি ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে আর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্যিক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের অন্যান্য বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সাথে দুটি কোম্পানি এক হয়ে যায়। ঐক্যবদ্ধ কোম্পানির নাম ‘দি ইউনাইটেড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব ইংল্যান্ড ট্রেডিং টু ইস্ট ইন্ডিজ’; সংক্ষেপে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এই কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করার অধিকার লাভ করে। ব্যবসার মাধ্যমে তারা আহমেদাবাদ, আগ্রা হয়ে ক্রমে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। এভাবেই আস্তে আস্তে তারা বাংলার নবাবী এলাকা এবং সমগ্র ভারত গ্রাস করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য এক প্রস্তাব পাস করে। প্রস্তাব অনুযায়ী ক্লাইভ প্রথমে উমিচাঁদকে বশে আনে। উমিচাঁদ মীরা জাফরের সাথে যোগাযোগ করে তাকে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে শরিক করে। ষড়যন্ত্রকারীগণ জগৎশেঠের বাড়িতে এক বৈঠকে মিলিত হয়। ইংরেজ কোম্পানির এজেন্ট ওয়াটস নিজের চেহারা ঢেকে মহিলাদের মতো পর্দা ঘেরা আসনে বসে এ বৈঠকে অংশগ্রহণ করে। বৈঠকে উমিচাঁদ রায়দুর্লভ, মীর জাফর রাজবল্লভসহ বেশ কয়েকজন কর্তা ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এখানেই তারা এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী মীর জাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সকল প্রকার সহযোগিতা করতে সম্মত হয়।
বাংলা বিহার ঊড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা তার নানা আলীবর্দী খাঁয়ের মৃত্যুর পরে রাজ সিংহাসনে আসীন হন। নবাব সিরাজের দুঃখজনক পরাজয়ের জন্য অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক অদূরর্শিতাকে দায়ী করেন। কেউ কেউ তো আগ বাড়িয়ে তাকে মদ্যপ এবং চরিত্রহীন বলতে দ্বিধা করে না। অবশ্য ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ ইতিহাস এভাবেই লেখা হয়েছে। আপনি যদি ওপার বাংলায় যান কিংবা মুর্শিদাবাদে গিয়ে গ্রামের সাধারণ সহজ সরল কৃষকদের জিজ্ঞেস করেন সিরাজউদ্দৌলা কেমন লোক ছিল? অধিকাংশ লোকই নেতিবাচক উত্তর দেবে। এর কারণ বিজাতিদের দ্বারা ইতিহাস রচিত হয়েছে আর সে ইতিহাসে পরাজিতদের চরিত্র হনন ছিল এক মৌলিক বিষয়। ড. মোহর আলী তার Mohor Ali, The History of Muslims of Bengal বইয়ে লিখেছেন, ‘পলাশী যুদ্ধের অব্যবহিত পর থেকেই সিরাজ চরিত্র হননের একটি অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হতে থাকে এবং যুদ্ধে পরাজয়ের সকল দায়দায়িত্ব তাদের ওপর নিক্ষেপ করা হয়। এটা খুব সহজেই বোধগম্য যে, সিরাজের বিরোধীরাই পলাশী যুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকাল শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে এবং পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সিরাজ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়নকে প্রভাবিত করেছে’। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের অর্থ এ নয় যে, একজন শাসক গিয়েছে আর একজন শাসক এসেছে। এ উপমহাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আইন, শাসন, সামগ্রিক জীবনাচার, ধর্ম, কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতা এবং অর্থনৈতিক জীবনে যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়, তাতে সমাজের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলো হয়ে যায় সবচেয়ে নিঃস্ব, দরিদ্র, নির্যাতিত। অপরদিকে একদল তোষামুদে দালাল তৈরি হয়, যারা সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যায়। এই সামগ্রিক পরিবর্তনকে একজন নবাবের পতন হিসেবে দেখা মানে ইতিহাসের অবমূল্যায়ন করা, জাতিসত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে বেখবর থাকা। মূলত বাংলার ক্ষমতা দখল এবং এখানকার সম্পদ লুণ্ঠনই ছিলো দখলদার ইংরেজদের মূল উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রধান বাধা ছিলো নবাব এবং সম্ভ্রান্ত তৎকালীন সমাজের মুসলিম পরিবারগুলো, যারা কখনো ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করতে রাজি ছিলো না। এজন্য তারা ষড়যন্ত্রের যে জাল বিস্তার করে তারই ধারাবাহিক ফল পলাশীর বিপর্যয়।
পলাশীর প্রান্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোনোভাইে সফল হতো না, যদি ষড়যন্ত্রকারীরা সৈন্যদের যুদ্ধ হতে বিরত না রাখতো। নবাবের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার, পদাতিক ৩৫ হাজার, অশ্বারোহী ১৫ হাজার মোট কামান ৫৩টি। এর বিপরীতে রবার্ট ক্লাইভের সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। এর মধ্যে এ দেশীয় সিপাহি ২২০০ এবং ইউরোপীয়ান সৈন্য ৮০০। নবাবের এতো বিপুল সৈন্য সংখ্যা কীভাবে পরাজিত হয়? মূলত পলাশী প্রান্তরে কোনো যুদ্ধ হয়নি। ষড়যন্ত্রকারীরা সৈনিকদের যুদ্ধ হতে বিরত রেখেছে এবং নবাবকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি মীর জাফর ও রায়দুর্লভের চক্রান্তে সৈন্যদের বিপুলসংখ্যক যুদ্ধ হতে বিরত থাকে। মীরমদন ও মোহন লাল স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে প্রাণপণ লড়াই করেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পরাস্ত করতে পারেননি। ২৩ জুন বাংলার শেষ স্বাধীন সূর্য এখানেই অস্তমিত হয়। ৩০ জুন রাজমহলে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করা হয়। ২ জুলাই ১৭৫৭ সাল তাঁকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় মুর্শিদাবাদে আনা হয়। রাতে মীর জাফরপুত্র মীরনের আদেশে ঘাতক মোহাম্মদী বেগ তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।
পলাশী বিপর্যয়ের পেছনে ঘরের শত্রু বিভীষণ যে ছিল প্রতিটি পদে পদে, তা বোঝা যায় খুব সহজেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিকের কেরানী পরবর্তীতে লর্ড উপাধি পাওয়া লর্ড ক্লাইভ তাঁর নিজের ভাষায় বলেছেন, ‘ইংরেজরা ঘরের টাকা খরচ করে যুদ্ধ করে ভিনদেশ দখল করেছে। কিন্তু ভারত দখল করতে ইংল্যান্ড হতে এক পয়সাও আনতে হয়নি। সমস্ত অর্থই পাওয়া গেছে ভারতে। কোনো সমাজ এবং জনপদে যদি বিশ্বাস ভঙ্গকারী কোনো গোষ্ঠী তৈরি হয়। জাতির অভ্যন্তরে বেঈমানের জন্ম হয়, তবে সে সমাজের অবস্থা এমন করুণ হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বাস এবং আদর্শের জায়গায় তাই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দরকার, তা হচ্ছে আদর্শের প্রতি দৃঢ় আস্থা, নিজ ঈমান এবং বিবেকের দায়বদ্ধতা। যে বিষয়টির অভাবে একটি রাষ্ট্র ও সমাজ ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা ইসলামী চিন্তানায়ক মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী তার এক ভাষণে উল্লেখ করে বলেন, এই যে ইংরেজরা দুইশ’ বছর এ উপমহাদেশ শাসন করলো। তাদের কোতয়াল, তাদের সেনাবাহিনী, তাদের পুলিশ এ দেশের জনগণের মধ্য হতেই সরবরাহ করা হয়েছে। মুসলমানের সন্তান হয়ে আরেক মুসলমানের গলা কেটেছে ইংরেজের অনুগত সেবাদাস কর্মচারী হওয়ার কারণে। এই উপমহাদেশ হতেই তারা তাদের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। যুগ ও সময়ের বিবর্তনে আমরা যেন আর একটি পলাশীর সামনে দণ্ডায়মান। এমনি সময়ে নতুন করে শপথ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। বাংলার পতনের রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ আব্বাস আলী খান লিখেছেন, ‘ধ্বংসের বীজ বহু আগেই রোপণ করা হয়েছিলো বাদশাহ আকবর কর্তৃক, যা ধীরে ধীরে বিশাল মহীরুহ আকার ধারণ করেছিলো।…. কোনো এক চরম অশুভ শক্তি শুধুমাত্র মুসলমানদের তৌহিদী আকিদা বিশ্বাস ও ইসলামী তামাদ্দুন ধ্বংস করার জন্য আকবরের প্রতিভাকে ব্যবহার করেছে, তা বিবেকসম্পন্ন মানুষমাত্রই বুঝতে পারেন। কিন্তু আকবর তাঁর নিজের স্বপ্নসাধ পূরণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
দেশপ্রেমিক সিরাজ এবং তার বিপরীতে একদল বিশ্বাসঘাতকের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের শিক্ষাকে ধারণ করে আজ বজ্র সাহসে বলীয়ান হওয়া দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। আমরা আমাদের চতুর্দিকে হায়েনার গোঙানি শুনতে পাই। রক্তচোষা ড্রাকুলারা আমাদের মানচিত্রে দন্তনখর বসাতে সদা অপতৎপরতা চালাতে নানা ছুঁতোয় বন্ধু সেজে হাজির হয়। সময় বয়ে চলে প্রতিদিন নতুন সূর্য উদিত হয়। প্রতিটি নতুন প্রভাতের আলোকছটায় নতুন সূর্যের রূপ রং একই থাকে। সবুজ বন বীথি আর নদীর ছলাৎ ছলাৎ বয়ে চলার শব্দে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় না। একইভাবে মীর জাফররাও যুগে যুগে নানা অবয়বে হাজির হলেও তাদের উদ্দেশ্য এবং শ্রেণিচরিত্র একই থাকে। সময়ের নির্মম বাস্তবতায় আমরা আরো একটি পলাশীর দ্বারপ্রান্তে। শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে বিশ্বাস এবং আদর্শের ভিত্তিতে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর রচনা সময়ের অনিবার্য দাবি।
তথ্যসূত্র : ১. ড. কে এম মোহসিন, পলাশীর যুদ্ধ, ২. প্রফেসর এম এ রহীম, নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, ‘আর কেনো পলাশী নয়’ স্মারকগ্রন্থ-১৯৯৭, ৩. Mohor Ali, The History of Muslims of Bengal. অনুবাদ-সালেহ মাহমুদ রিয়াদ, ৪. আজকের দুনিয়ায় ইসলাম, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী, অনুবাদ-মুনির উদ্দিন আহমদ, ৫. পলাশী চক্রান্তের নেপথ্যে, এরশাদ মজুমদার, ৬. আব্বাস আলী খান, বাংলার পতনের রাজনৈতিক কারণ, ‘বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস’।