ইসলামী ব্যাংক সঙ্কট নিরসনে দরকার বাস্তবমুখী উদ্যোগ
১০ জুন ২০২৬ ২১:৫২
ইসলামী ব্যাংকের চলমান সঙ্কট নিরসন না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেকে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতে তীব্র বিতর্ক এবং ভিন্নমুখী ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৪ মে সাবেক এই ডেপুটি গভর্নরকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর দেশের সর্বস্তরে মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সবার অভিমত, বিএনপি কী এতটাই দেউলিয়া হয়েছে, তাদের পছন্দের কী কোনো বিতর্কমুক্ত দক্ষ ব্যাংকার নেই। নাকি এ বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগত লোক সুবিধার বিনিময়ে সরকার ও জনগণের স্বার্থ বিক্রি করে দিয়েছেন। তাই ব্যাংকের আমানতকারী এবং অর্থনীতিবিদদের মতামতের তোয়াক্কা করছেন না। দেশের অর্থনীতি; বিশেষ করে ব্যাংক খাত ধ্বংসের কারিগর অর্থ পাচারকারী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার তহবিলের পাহারাদার এ যুগের জগৎশেঠ এস-আলম ঘনিষ্ঠ মো. খুরশীদ আলমকে রাখতে কেন জনগণের বিরুদ্ধে সরকার রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করছে। এক ব্যক্তিকে রাখতে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের এমন আচরণ ফ্যাসিবাদেরই প্রতিধ্বনি বলে আমরা মনে করি। গণতন্ত্রের কালচার হলোÑ অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ স্টেকহোল্ডার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার পরও সরকার চিহ্নিত অভিযুক্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সত্যি, সেলুকাস বিচিত্র এদেশ!
আমরা জানি, দেশের ব্যাংকিং খাতের একসময়ের সবচেয়ে লাভজনক ও আস্থার প্রতীক ইসলামী ব্যাংক হাসিনার ফ্যাসবাদী আচরণে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখনো নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে চলছে। বলা যায়, খাদের কিনারে অবস্থান করছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে আবারও সঙ্কট শুরু হয়েছে।
বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এস আলমসহ ফ্যাসিস্ট পতিত আওয়ামী দোসর বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে যে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ও বিধান ঘাটতি (Provision Shortfall) তৈরি হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মূল ভিত্তি হলো ‘আস্থা’। এই আস্থার জায়গায় চিড় ধরলে কোটি গ্রাহকের আমানত যেমন ঝুঁকিতে পড়ে, তেমনি পুরো আর্থিক খাত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য আঘাতের চিত্র ইসলামী ব্যাংকের এই চলমান সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রেমিট্যান্সপ্রবাহে ধস নামবে। একসময় দেশের মোট প্রবাসী আয়ের সিংহভাগ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসত। চলমান অস্থিতিশীলতার কারণে প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হলে হুন্ডির প্রভাব বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও দুর্বল করবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প (CMSME) খাতের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকটিতে অচলাবস্থা চললে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে এবং কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। ইসলামী ব্যাংক এককভাবে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ ধারণ করছে। এ বিশাল আকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি তারল্য সঙ্কটে পড়ে, তবে এর চেইন রিঅ্যাকশন বা সংক্রামক প্রভাব অন্যান্য ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরও তীব্রভাবে আছড়ে পড়বে। রাজস্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব : আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে এই ব্যাংকের বড় ভূমিকা রয়েছে। অচলাবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে না পারলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যেতে পারে। জরুরি সংস্কার ও উত্তরণের পথ বিগত সময়ে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অ্যাক্ট-২০২৬-এর কিছু ধারা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং মালিকানা-নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের সুরাহা রাজনৈতিক বিবেচনায় না করে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু নীতিগত আশ্বাস না দিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব সঙ্কট সমাধানে সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে সবার আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ফ্যাসিস্টের দোসর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ইসলামী ব্যাংক রক্ষা করা মানে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা। এই অচলাবস্থা ভাঙতে বিলম্ব হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে পড়বে। ভেঙে পড়া সুশাসনের বার্তা বহিঃদেশে গেলে সরকারও আস্থার সঙ্কটে পড়বে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়।