অল্প বৃষ্টিতেই থৈথৈ চট্টগ্রাম নগরী


৪ জুন ২০২৬ ১১:১৯

মুহাম্মদ ইমরান সোহেল, চট্টগ্রাম : মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই ডুবন্ত নগরীতে পরিণত হয় চট্টগ্রামের অন্তত ২০টিরও বেশি এলাকা। এই জলাবদ্ধতায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ চরম ভোগান্তি পোহায়। রাস্তাঘাট, অলিগলি ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় থমকে যায় নগরের স্বাভাবিক গতি। এতে করে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েন ব্যবসায়ীরাও।
দীর্ঘসময় ধরে নগরে এমন ভোগান্তিতে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম হয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার খবর চাউর হলে সংসদ অধিবেশনে দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত প্রচার চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এতে করে সমস্যা সমাধানে আশান্বিত হওয়ার বিপরীতে বাসিন্দাদের হতাশা ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
নগরের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা সাবরিনা আফরোজ সোনার বাংলাকে বলেন, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি বছর দেখে আসছি, সামান্য বৃষ্টিতেও পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটে। তবে গত বছর পানি কিছুটা কম হয়েছিল। এবার আগের ধারাবাহিকতায় মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কোমরসমান পানি জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার এমন দুর্ভোগ থেকে কবে স্থায়ী মুক্তি মিলবে তা বলতে পারছি না।
চাক্তাইয়ের স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল্লাহ মজুমদার বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ধরন অন্য অঞ্চলের তুলনায় একটু আলাদা। নগরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৫৭টি খাল নদী ও সাগরে গিয়ে মিশেছে। এসব খাল দিয়েই বর্ষার পানি প্রবাহিত হয়। তবে নদী ও সাগরে জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারে না। ভাটার সময় হলে বৃষ্টি থামার এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে নেমে যায় পানি। কিন্তু এর আগেই সামান্য সময়ের জলাবদ্ধতা ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু।
জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন মেগা প্রকল্প
চট্টগ্রাম নগরীরর জলাবদ্ধতা নিরসনে ১২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে আলাদা তিনটি মেগা প্রকল্প। দফায় দফায় ব্যয় ও সময় বাড়ানোর পর চলতি বছরের জুন মাসে এসব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটির ৯২ শতাংশ, একটির ৯৩ শতাংশ এবং অন্যটির ভৌত অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ। এদিকে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের আর সময় আছে মাত্র দুই মাস।
প্রকল্পগুলো থেকে আসন্ন বর্ষায় নগরবাসী সুফল পাওয়ায় আশায় যখন বুক বাঁধছে, তখন বর্ষা মৌসুমের আগেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিতেই বন্দরনগরের বিভিন্ন সড়ক ও এলাকা ডুবেছে। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বাণিজ্যিক রাজধানী বন্দরনগর চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা থেকে আদৌ কি মুক্তি পাবে না?
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দুই সেবা সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কর্মকর্তা, নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় লোকজন জানান, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অধীনে চলতি বছর আসন্ন বর্ষার আগে দুটি খালের (হিজড়া ও জামালখান) সংস্কারকাজের সুবিধার্থে দেওয়া অস্থায়ী প্রায় ৪০টি বাঁধের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, অনেক নালা-নর্দমা ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হওয়ায় সেখানে পানি সড়কে উঠে যায়। এছাড়া তিন মেগা প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া (এখনো ৫ থেকে ৮ শতাংশ কাজ বাকি) এবং চসিকের দেরিতে নালা-নর্দমায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করা, মুরাদপুর এলাকায় বক্স কালভার্ট নির্মাণকাজের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়েছে।
তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত সেবা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা হলেও আগের মতো বেশি দুর্ভোগ হচ্ছে না। প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু সমস্যা থাকতে পারে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গার প্রধান আবহাওয়া কার্যালয়ের গত এপ্রিলের (২৭ থেকে ২৯ তারিখ) তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সম্প্রতি সৃষ্ট হওয়া জলাবদ্ধতায় বৃষ্টি কমলেও প্রবর্তক মোড়ে হাঁটুপানি থাকতে দেখা যায়। ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হওয়ায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছিল মানুষ।
আট হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএ নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দিন বলেন, সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খালের ৩৪টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি খালের (জামালখান ও হিজড়া) কাজ চলছে। দুটি খালের কাজ করার সুবিধার্থে দেওয়া বাঁধের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এই কারণে বাঁধগুলো অপসারণ শুরু হয়েছে। এতে পানি চলাচল ক্রমে স্বাভাবিক হচ্ছে। আগামী অক্টোবরে আবার কাজ শুরু হবে।
বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্পের পরিচালক চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফরহাদুল আলম বলেন, এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকার চসিকের ২.৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প। এর কাজ বাকি আছে ৫ শতাংশ। প্রকল্পের অধীনে খাল খননকাজ শেষ। সেখানে পানি চলাচলে কোনো সমস্যা নেই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নালার সঙ্গে খালে সংযোগ স্থাপন করেছি। যাতে পানি নেমে যেতে পারে। মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। নগরের যেসব জায়গায় সচরাচর পানি ওঠে, ওসব জায়গার খোঁজ নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোথাও পানি ওঠেনি। এবার আমরা পরিকল্পনা করে খাল ও নালা খনন করছি। পানিপ্রবাহের পথ পরিষ্কার থাকায় পানি জমেনি।
কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিনুল হক চৌধুরী জানান, খালের সব অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ করে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে।
যে পাঁচ কারণে জলাবদ্ধতা
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার কারণ শনাক্তে প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে প্রধান করে চার সদস্যের গঠিত কমিটি পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কারণ হলো- অতিবর্ষণ ও একইসঙ্গে কর্ণফুলী নদীতে পূর্ণিমার সময় অতিরিক্ত জোয়ার, খালের সংস্কার কাজের চলমান অংশে মাটি থাকার ফলে খাল সংকোচন, নগরের খাল ও নালা-নর্দমা বেদখল, নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে খাল-নালায় বর্জ্য ফেলা এবং নিয়মিত খাল-নালা থেকে মাটি উত্তোলন না করা। কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা সমাধানে ৬টি স্বল্পমেয়াদি ও ১১টি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করেছে কমিটি। স্বল্পমেয়াদি ৬টি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে স্ব-স্ব সংস্থার উদ্যোগে চিহ্নিত সমস্যা দ্রুত সমাধান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় বর্ষা মৌসুমে নিয়মিতভাবে খাল-নালার বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালু রাখা, পানি চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাইপ অপসারণ, খাল-নালায় বর্জ্য না ফেলার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো, খাল-নালা দখলকারীদের উচ্ছেদ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া এবং জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতার বাইরের খাল-নালাগুলো সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নিয়মিত পরিষ্কার করা।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬ কমিটি
চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের অভিশাপ জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে ৬টি পৃথক কমিটি গঠন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। খাল, ড্রেন, নালা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাভিত্তিক গঠিত এই কমিটিগুলোকে দ্রুত মাঠে নেমে কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে গত এপ্রিলে সামান্য বৃষ্টিতে নগরীতে চরম জলাবদ্ধতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি ছিলো। ২০২৭ সালের মধ্যে ‘শূন্য জলাবদ্ধতা’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর আপৎকালীন পরিকল্পনা (Contingency Plan) গ্রহণ করা হয়নি। সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্তকরণ, বিশ্লেষণ ও মোকাবিলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা (Artificial Drainage System) কেন রাখা হয়নি এবং ঝুঁকির পূর্বাভাস পাওয়ার পরও কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও তোলেন জামায়াতের এই নেতা।