প্রতিনিয়ত বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, কমছে উন্নয়ন, এটি অশনিসংকেত
৪ জুন ২০২৬ ১০:৫১
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
রাষ্ট্র ও সরকার সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নয়। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্র ও সরকার এক অভাবনীয় এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। রাষ্ট্র ও সরকার এত বড় শক্তিশালী নেটওর্য়াক ও ব্যবস্থা যে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সাধারণ সংগঠন মোকাবিলা দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন। কয়েকশত বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক এই শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা কেন? কাদের জন্য এত বড় শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং অগণিত অর্থ, সম্পদ, শ্রম ও মেধা ব্যয় করে এ রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। তার যথাযথ উত্তর হচ্ছে- একমাত্র জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্যই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কি রাষ্ট্র ও সরকার সাধারণ জনগণ এবং দেশের কোনো উন্নয়ন ও কল্যাণ করতে পারছে। নাকি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে জনগণের অর্থ সংগ্রহ করে রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার কর্তাব্যক্তিরা নিজেদেরই উন্নয়ন করছে।
রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং পরিচালনা করার জন্য একটি বড় জনবল দরকার হয় আর এ জনবলের পেছনে অগণিত অর্থ তথা কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। আবার এ টাকা জনগণের কাছ থেকেই আদায় করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্র ও সরকারের মেকানিজম বিভিন্ন আইনবিধি ও যুক্তির বেড়াজালে সাধারণ জনগণ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ কোটি টাকা আদায় করে থাকে, যাকে খুবই সুন্দর ও মোলায়েম ভাষায় রাজস্ব বলা হয়ে থাকে। প্রকাশ্যে বলা হয়ে থাকে, এ রাজস্ব দেশ ও জনগণের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্যই ব্যয় করা হয়। কিন্তু যে পরিমাণ রাজস্ব প্রতি বছর আদায় করা হয়, তার কী পরিমাণ অর্থ দেশ ও জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়ে থাকে, তা আজ প্রশ্নসাপেক্ষ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক পত্রিকা বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে সরকারের মোট ব্যয়ের ৮৪ শতাংশই হয়েছে পরিচালন খাতে। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) সরকারের মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকায়।
এ ব্যয়ের বেশিরভাগই হয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দৈনন্দিন কাজে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই হয়েছে পরিচালন খাতে; যার একটি বড় অংশ খরচ হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন এবং বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধে।
অর্থ বিভাগের বাজেট বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রান্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম ৯ মাসে অর্জিত হয়েছে ৫২ শতাংশ। এতে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারের ওপর ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্র প্রতি বছর যে রাজস্ব আদায় করে থাকে, তা দুটি খাতে ব্যয় করা হয়ে থাকে- তার একটি হচ্ছে পরিচালন ব্যয় আর একটি উন্নয়ন ব্যয়। পরিচালন ব্যয় (Operating Expenditure) হচ্ছে, এটি হলো রাষ্ট্র সচল রাখার জন্য নিয়মিত বা অনুৎপাদনশীল ব্যয়। এর সিংহভাগ খরচ হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, আগের নেওয়া ঋণের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সুদ পরিশোধ, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিভিন্ন খাতে দেওয়া সরকারি ভর্তুকিতে।
উন্নয়ন ব্যয় (Development Expenditure) হচ্ছে, দেশের উৎপাদনশীল ক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) আওতায় ভৌত অবকাঠামো যেমন- পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে এই অর্থ ব্যয় হয়।
একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বাজেটের পরিচালন (Operating/Non-Development) এবং উন্নয়ন (Development) ব্যয়ের অনুপাত ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি আদর্শ ও গতিশীল অর্থনীতির জন্য বাজেটের অন্তত ৪০% থেকে ৫০% উন্নয়ন খাতে এবং সর্বোচ্চ ৫০% থেকে ৬০% পরিচালন খাতে ব্যয় হওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা গেছে, বাজেটের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০% থেকে ৭১% চলে যায় পরিচালন ব্যয়ে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) পেছনে বরাদ্দ থাকে মাত্র ২৯% থেকে ৩০%। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম তিন প্রান্তিকে সরকারের মোট ব্যয়ের ৮৪ শতাংশই হয়েছে পরিচালন খাতে।
অর্থ বিভাগের বাজেট বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম তিন প্রান্তিকে মোট ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন খাতেই খরচ হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ। আবার পরিচালন ব্যয়ের ৯২ শতাংশ বা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮১০ কোটি টাকা ছিল চলতি ব্যয়। এ সময়ের মধ্যে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় করতে হয়েছে ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২৯ শতাংশ। পরিচালন ব্যয়ের অধীনে রাস্তা, সেতু, অবকাঠামো নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগমূলক খাতে যেসব ব্যয় করা হয়, সেটিকে মূলধনী ব্যয় হিসেবে অভিহিত করা হয়। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে এ খাতে ২৮ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার।
কিন্তু সরকারের নিজস্ব প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে যে, প্রায় ৮৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়েছে পরিচালন তথা অনুন্নয়ন খাতে। তাহলে মাত্র ১৬ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে উন্নয়ন খাতে। এটা দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণের জন্য একটি মারাত্মক ঘাটতি, যাকে অশনিসংকেত বলা যায়। উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের গতিশীলতার অভাব। প্রতি বছরেরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌছে না। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার হচ্ছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫, যা বিগত ৪৮ বছরের মধ্যে সবনিম্ন। বর্তমান অর্থবছরেও এডিপি বাস্তবায়নের হার ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকে একসময় দেখা যাবে উন্নয়ন খাতে ব্যয় নামে মাত্র থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত দেশের জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন খাতে ব্যয়টা সমান সমান হওয়া উচিত। বর্তমানে রাষ্ট্রের বাজেটের প্রায় পুরো টাকাটা কিন্তু সরকার সাধারণ জনগণ থেকেই আদায় তথা সংগ্রহ করে থাকে। বাজেটের এ অর্থটা আদায় করা হয়ে থাকে জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নে ব্যয় করার লক্ষ্য নিয়ে। অর্থটা আদায় এবং ঐ অর্থটা জনগণের কল্যাণ নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ব্যয় করার উদ্দেশ্যেই সরকারের ১৫ লক্ষাধিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে অর্থ আদায় করে যদি পুরো টাকার সিংহভাগই অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়ে যায়, তাহলে এ রাষ্ট্র, সরকার, বাজেট ও কর্মকর্তাদের প্রয়োজনটা কেন?
সরকার রাজস্ব বিভাগসহ বিভিন্ন খাতের মাধ্যমে যে অর্থটা আদায় করে এবং কোথায় কোথায় খরচ করবে তা প্রতি বছর বাজেট আকারে জাতীয় সংসদে পেশ করে অনুমোদন করিয়ে নেয়। সরকারের প্রত্যেক মন্ত্রী জাতীয় সংসদ থেকে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থ মঞ্জুর করে নেয়। সর্বোপরি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের ব্যয়ের অনুমোদনটা জাতীয় সংসদই করে থাকে। পরিচলান ব্যয় তথা অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ছে; অপরদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমছে- এ বিষয়টি জাতীয় সংসদের সরকারি ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা সরকার ও জনগণের দৃষ্টিতে আনতে পারেন। কারণ প্রতিনিয়ত যেভাবে অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ছে, সেভাবে বাড়তে থাকলে একসময় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যাবে। আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে গেলে দেশ ও জনগণের কল্যাণকর কর্মসূচি থেমে যাবে। তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক রাষ্ট্র ও সরকার এবং রাজস্ব আদায় কাদের স্বার্থে এবং কেন ? তাই রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তা ব্যক্তিদেরই পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাত নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com