ফের ব্যাংক খাতে অশনিসংকেত

বিএনপির ঘাড়ে আওয়ামী প্রেতাত্মা


৪ জুন ২০২৬ ১০:৩৭

সরকার পরিবর্তন হলেও বদলায়নি ইসলামী ব্যাংক লুটের কৌশল। ইসলামী অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ছে সরকার
॥ উসমান ফারুক ॥
ক্ষমতা হারিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিলেও বাংলাদেশে এখনো সক্রিয় আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দোসর ও সহযোগীরা। সময় বদলালেও তাদের লুটপাটের কৌশল একই রয়ে গেছে। আগে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে দেশের অর্থনীতি; বিশেষ করে ব্যাংক খাত ধ্বংস করে গেছে। লাখ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পাচার করে বিদেশে আয়েশি জীবনযাপন করছে। এখনো সেই লুটপাটের ফন্দিফিকির করছে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে। তিন মেয়াদে ১৬ বছরে জবরদখল করে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে দেশের অর্থনীতি লুটপাটের শুরুটা করে ইসলামী ব্যাংক দখলের মাধ্যমে। সেই একই কায়দায় এখন অর্থনীতির প্রাণভোমরা ও বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সূচনাকারী ইসলামী ব্যাংক দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র। আওয়ামী সেই চক্রটি এখন সওয়ার হয়েছে বিএনপির একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ নেতাদের ঘাড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং খাত লুটপাটে এস আলমসহ নেতৃত্ব দেওয়া গ্রুপগুলো এখন অর্থায়ন করছে ইসলামী ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য। আওয়ামী সময়ে ব্যাংকটি থেকে ৮২ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে সেই টাকায় শেয়ার কিনে পরিচালক হন এস আলমের ব্যক্তিরা। পরে খোদ এই ব্যাংক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন গ্রুপটি ঋণের নামে। তাতে মদদ জোগায় বর্তমানে গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সরকার ও প্রশাসন। তাতে ব্যাংকটি ধ্বংসের কিনারায় চলে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশ নতুন করে স্বাধীনতা পেলে ব্যাংকটিতে ফের আমানতকারীদের আস্থা আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ব্যাংকটি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যত বড় কেলেঙ্কারি ইসলামী ব্যাংকে হয়েছে, যেকোনো ব্যাংকেরই সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে কমপক্ষে ৬০ বছর লাগতো।
কিন্তু দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রিয় আমানতকারীদের সহযোগিতায় মাত্র দুই বছরেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল ইসলামী ব্যাংক। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ালে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এক অনন্য নজির স্থাপন করতে যাচ্ছিল। তাতে ইসলামপ্রিয় জনগণ সারা বিশ্বেই একটি বার্তা দিতে পারতো। কিন্তু সেই চেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে চক্রটি। দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী লীগের দোসর বলে ব্যাংকপাড়ায় চিহ্নিত ব্যক্তিকে এনে শুধু ইসলামী ব্যাংকই নয়, ইসলামী ধারার অর্থনীতিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে গ্রুপগুলো। এর মাধ্যমে নিজেদের অপকর্ম ঢেকে রাখা ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো থেকে আমানত সরিয়ে সুদি ব্যাংকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ছে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে ইসলামী অর্থনীতি ও ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করতে চায় চক্রটি। ইসলামবিদ্বেষী এই চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বিএনপির কিছু মৌসুমি হাইব্রিড নেতা। কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ ইসলামবিরোধী এই অপকর্মে লিপ্ত হয়ে গেছে। এর আগে ইসলামী আদর্শের বিপরীতে গিয়ে ব্যাংকিং খাত ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে খেসারত দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপিও সেই পথে হাঁটলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বে বলে মনে করছেন বোদ্ধামহল। একইসঙ্গে দেশপ্রেমিক দল বিএনপি জনগণের কাছে ইসলামবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবে। ইসলামী ব্যাংক দখল নিলে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতিবাচক বার্তা যাবে সরকারের বিপক্ষে।
আওয়ামী দোসর এখন বিএনপি নেতাদের সহচর
ঈদের ছুটির আগের সরকারি শেষ কর্মদিবসে তড়িঘড়ি করে দেশের সবচেয়ে বড় শরীয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে চেয়ারম্যান পদে বিতর্কিত খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাকরিরত অবস্থায় রংপুর অফিসে অন্তত ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিসের জন্য কেনা-কাটায় সোফা, খাট, কুশন, চেয়ার, টেবিল ও এসি ক্রয় বাবদ কয়েকগুণ বেশি দর দেখিয়ে এসব অর্থ আত্মসাৎ করেন।
তার এই দুর্নীতি ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে। তদন্ত প্রতিবেদনে শাস্তি দিয়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করা হয়। এরপরই তাকে বদলি করে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। চাকরি বাঁচাতে তখন আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আরাফাত, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার ও ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। নিয়মিত যেতে থাকেন ধানমিন্ডর সুধা সদনে। তারই ফলস্বরূপ তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আটকে দেওয়া হয়। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তারা খুরশীদ আলমের ইনক্রিমেন্ট বাতিল করে পদোন্নতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। এতে তার নিচের সারির কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে তার চেয়ে ওপরের ধাপে চলে যান।
আওয়ামী তদবিরে দীর্ঘ তিন বছর পরে পদোন্নতি জুটিয়ে নেন। এখানে থেমে থাকেননি। শেখ মুজিবের আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগ সরকারের মদদে ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ হাতিয়ে নেন। ডেপুটি গভর্নর হওয়ার পরের দিনই সোজা চলে যান গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবের কবর জিয়ারতে। সেখানে গিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে টুঙ্গিপাড়া ঘুরে বেড়ান। এরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে বনে যান এস আলমসহ ব্যাংকলুটপাটের সঙ্গে জড়িত চক্রের সঙ্গে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরের দিনই আওয়ামী এই দোসরকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেন কর্মকর্তারা। সেদিন আওয়ামী দোসর হিসেবে চিহ্নিত কোনো কর্মকর্তাকেই চাকরি করতে দেননি কর্মকর্তারা। খুরশীদ আলম চেষ্টা করেও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরতে পারেননি। অবশেষে পদত্যাগ করেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে খুরশীদ আলম বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মিলে যান। রাজধানীর বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন প্রকল্পে থাকা এই কর্মকর্তা বিএনপির ঢাকা মহানগরের ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করা আলোচিত এক নেতা, কেন্দ্রীয় এক নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হওয়া ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের মাধ্যমে তিনি বিএনপি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন।
তাদের হাত ধরেই ফের বিএনপিতে যোগ দেন খুরশীদ আলম। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের চর্চা না করা ও আওয়ামী দোসর খুরশীদ আলম এখন বিএনপি না কি আওয়ামী লীগের পরিকল্পনায় চলবে, তা সময় বলে দেবে। ব্যাংকপাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে, দুর্নীতিবাজ এই ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকে পুনর্বাসন করতে এস আলমসহ কয়েকটি গ্রুপ শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে।
একই কৌশলে ইসলামী ব্যাংক দখলের চেষ্টা
দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২১ শতাংশ, রেমিটেন্সের ২৫-২৭ শতাংশ আসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। উন্নত ব্যবস্থাপনা, সুবিশাল ঋণের বহর ও খেলাপির হার কম থাকার কারণে ব্যাংকটি এখন সবার নজরে পড়েছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগের দিন অত্যন্ত সংগোপনে খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ইসলামী ব্যাংকে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নানা ঘটনা ঘটে। কিন্তু এত উথাল-পাতালের মধ্যেও ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
২০১৭ সালে এক সকালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর মাধ্যমে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে তুলে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকটি দখলে নেয় এস আলম গ্রুপ। এরপর থেকে কেলেঙ্কারি চলতে থাকে ইসলামী ব্যাংকে।
আওয়ামী কায়দায় ফের ঈদের আগে ব্যাংকটি সেই দুুষ্টচক্রের হাতে তুলে দিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা। তাতে মদদ দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত। কিন্তু ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে ব্যাংক বাঁচাতে সড়কে নেমে আন্দোলন করছেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। গত কয়েকদিন ধরেই তারা সড়কে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছেন। কিন্তু প্রথম দিনের আন্দোলনেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নিরীহ গ্রাহকদের ওপর হামলে পড়ে পুলিশ সদস্যরা। রঙিন পানি ছিটিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার পাশাপাশি শব্দ বোমা ফোটানো হয়। লাঠিপেটা করলে রক্তাক্ত হন দুই ডজনের বেশি গ্রাহক।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যাংকটি বাঁচানোর চেষ্টাকে ব্যর্থ করলে সরকারও দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিদেশে নেতিবাচক বার্তা যাবে। বড় ব্যাংক হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ম্যাক্রোইকনমিক আউটলুকে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ইসলামী ব্যাংক যেহেতু বাংলাদেশের বৃহৎ ব্যাংক, তাই এখানে সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গভর্ন্যান্স নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে। ইসলামী ব্যাংকের সংঘাত কোনো ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এখন। এটি রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। এটি নিয়ে রাজনৈতিক দল থেকে বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। অথচ এমন কিছু কোনো আইনে নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর দিকেই যাচ্ছিল। সব অর্জন বিসর্জন হয়ে যাচ্ছে। আমানতকারীদের কনফিডেন্স ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এখন উল্টো প্যানিক উইথড্রলের দিকে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ব্যাংক কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এমন একটা মডেল হতে পারতো ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু সেই সুযোগের গুড়েবালি হলো। ব্যাংক খাত নিয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। বুঝে-শুনে এগোতে হবে- যাতে কোনোভাবেই গ্রাহকের আস্থা নষ্ট না হয়।