প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিবাজরা
১৪ মে ২০২৬ ১০:০৪
অপকৌশলে বাগিয়ে নিচ্ছে লোভনীয় পদ
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ে বসে থাকা অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ উঠছে। এসব দুর্নীতিবাজ আমলা নানা অপকৌশল অবলম্বন ও সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং এমপিদের ম্যানেজ করে ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে লোভনীয় পদে।
অভিযোগ আছে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মধ্যে মন্ত্রী যাকে বরখাস্ত করছেন, প্রতিমন্ত্রী তাকে আগলে রাখছেন, বসিয়ে দিচ্ছেন স্বপদে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা পয়সা খরচ করে আরও বড় দুর্নীতি করার জায়গায় বসে যাচ্ছেন। জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর প্রাথমিক তদন্তে তার সত্যতা পাওয়ার পরও সেই কর্মকর্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকার সময় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাকে করা হয় রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি), এখন সেই কর্মকর্তাকে আরও বড় পদে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শুধু দুর্নীতিবাজরা যে লোভনীয় পদে যাচ্ছেন, তা কিন্তু নয়; দলীয় পরিচয় ব্যবহার করেও অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলে নিচ্ছেন। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিয়োগ দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের পোস্টে থাকার খবর বের হয়, নেটিজেনরা সেই তথ্য ভাইরালও করেন। নির্বাচনের আগে দলীয়করণ-আত্মীয়করণ করা হবে না- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের সব সিটি করপোরেশনে সরাসরি দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি কোনো ব্যাংকার বা অর্থনীতিবিদ নন। তবে তার একটি বিশেষ পরিচয় ছিল, সেটি হচ্ছে তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কমিটি ভেঙে দিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। যে কমিটিতে পদ পেয়েছেন মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রী-সন্তানরা। অর্থাৎ একদিকে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপ্টি মেরে বসে আছে দুর্নীতিবাজরা; অন্যদিকে সর্বত্র দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দুর্নীতিমুক্ত স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ স্বপ্নই থেকে যাবে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি নিয়োগ বিতর্ক
এই তো কিছু দিন আগে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার নতুন ডিসি নিয়োগ হলো। তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কিত সৃষ্টি হয়, পূর্বে তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতি করেছন বলে অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে দুদকের তদন্তও চলছিল। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে তার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণও পেয়েছে, দুদকের পক্ষ থেকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের কাজও শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যেই তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান সময়ের আলোচিত এই কর্মকর্তাকে কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় তিরস্কারের বদলে পুরস্কৃত হলেন- তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। সচেতন মহলের অনেকে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ এই বিএনপি সরকারের আমলে এমন ঘটনায় হতবাকও হয়েছেন। বিএনপিপন্থিরা পর্যন্ত চরম হতাশা ব্যক্ত করছেন। অতীতে কোনো ডিসি পদে পদায়নে এতটা সমালোচনা হয়নি, যা সম্প্রতি সময়ে হয়েছে। তার নিয়োগ নিয়ে তোলপাড় হলেও তিনি ঠিকই আছেন ডিসির চেয়ারে।
তদন্ত-পুনঃতদন্ত খেলা!
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে গত ৯ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান। প্রজ্ঞাপনে সচিব স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্পের পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণ হয়েছে।’ প্রজ্ঞাপনে তবিবুরের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। তাকে বরখাস্তের এই নথি অনুমোদন করেন মন্ত্রী। কিন্তু সচিবের এই জনস্বার্থের আদেশটি টিকতে পেরেছে মাত্র ১১ দিন। নিজেদের তদন্তকে মিথ্যা ও তবিবুর তালুকদারকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সময় লেগেছে মাত্র সাত কর্মদিবস। তদন্ত-পুনঃতদন্ত খেলায় হতবাক পর্যবেক্ষক মহল!
স্বাস্থ্য খাতের হাল-হকিকত
দেশের দুর্নীতি দমনে বিএনপি সরকার এবং সরকারপ্রধানের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীও এ ব্যাপারে আলাদাভাবে কমিটমেন্ট দিয়েছেন একাধিকবার। কিন্তু এ খাতে দুর্নীতি কি বন্ধ হচ্ছেÑ এমন প্রশ্ন সামনে এলে হ্যাঁ উত্তর পাওয়া মোটেও সহজ হবে না। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। যেমন: অভিযোগ আছে, করোনাকালে আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক সংগঠন- স্বাচিপ নেতা ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পদে থেকে দুর্নীতি ও লুটপাটের রামরাজত্ব কায়েম করেছিলেন, যা নিয়ে তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, এসব দুর্নীতির বিচার হবে, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হবে। কিন্তু দেখা গেল, সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠান- সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালকের পদ বাগিয়ে নিলেন ঐ ভাগ্যবান ব্যক্তি। অভিযোগ আছে হাসপাতালটির পরিচালক পদ পেয়েই অনিয়ম-দুর্নীতির পুরনো খেলায় মেতে ওঠেন। আউটসোর্সিং ঠিকাদার থেকে শুরু করে এমন কোনো খাত নেই, যা থেকে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছেন না। এ কাজে নিজের ভাগিনা এবং শ্যালককেও নিয়োজিত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, ৩৬টি প্যাকেজে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের প্রায় ৩০ কোটি টাকার কেনাকাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব দরপত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে এমন ভয়াবহ কারসাজির আশ্রয় নিয়েছেন- যাতে শুধুমাত্র নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দিতে পারেন। খোদ সোহরাওয়ার্দীর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিই এসব কারসাজি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাতে দমেননি বেপরোয়া ‘স’ আদ্যাক্ষরের ঐ ভাগ্যবান ডাক্তার। তিনি মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
আমলাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
সম্প্রতি রাজধানীর ওসমানী স্মতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী ‘জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ, সিন্ডিকেট ভাঙতে, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দায়িত্ব পালনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’ একইসঙ্গে পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতা বদলাতে বলেছেন তিনি। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপেশাদার করে তোলার অন্যতম কারণ। পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে তা জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যেকোনো সময় দেশের যেকোনো স্থানে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি কিংবা পদায়নের মূলনীতি।
যা বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দেশ থেকে দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে প্রথমে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। মুখে বলে আর বক্তৃতা দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। দুর্নীতি দমনে করা আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে না পারলে শুধু বক্তৃতা দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রাজনীতি ও নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি দূর করতে হবে। রাজনীতিতেও নীতিবিরুদ্ধ কাজ বন্ধ করতে হবে উল্লেখ করে বদিউল আলম বলেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে দুর্নীতি বন্ধ করা জরুরি।
অনেক দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বোঝানোর চেষ্টা করেন, দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির কারণে বেতন-ভাতা দিয়ে সংসার চলে না, তাই বাধ্য হয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন অনেকে। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে একমত নন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, অতীতে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে সরকারি খাতে দুর্নীতি কমে, বরং যে হারে বেতনবৃদ্ধি ঘটে, তার চেয়ে বেশি হারে ঘুষসহ অবৈধ লেনদেন বাড়ে, যার বোঝা জনগণকে বইতে হয়।
এদিকে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে’। তবে ইফতেখারুজ্জামান আশা করছেন, বিএনপি অতীতে নিজেদের অনাচারের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগকে স্মরণে রেখে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে তাদের নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী অগ্রসর হবে।