যুক্তরাষ্ট্রের বর্বর যুদ্ধনীতি : অতিষ্ঠ মার্কিনিরাসহ বিশ্ববাসী
২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৭
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথমে সরাসরি যোগদান থেকে বিরত ছিল। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার নৌ ও বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। প্রত্যুত্তরে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তীতে একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দেশটি তার বৈদেশিক নীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বকে যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তর করে মার্কিনিদের তথা বিশ্ববাসীর জীবনকে করে তুলছে অতিষ্ঠ।
মার্কিন বৈদেশিকনীতি : দেশটির বৈদেশিকনীতির কৌশলের মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রাধান্য বজায় রাখা; মিত্রদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করা (ন্যাটো, দ্বিপাক্ষিক জোট এবং বিদেশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি); অন্য রাষ্ট্রগুলোকে মার্কিন-পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় (IMF, WTO/GATT এবং বিশ্বব্যাংক) একীভূত করা; এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার সীমিত করা। মার্কিন হাউস কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের লক্ষ্যসমূহ পূরণের হাতিয়ার হিসাবে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে বর্বর যুদ্ধ নীতি গ্রহণ করে থাকে দেশটি।
বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে বৈদেশিক নীতি বিষয়ক ক্ষমতা প্রদান করে, যার মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন, চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ। পররাষ্ট্র দফতর রাষ্ট্রপতির বৈদেশিকনীতি এবং প্রতিরক্ষা দফতর তার সামরিকনীতি বাস্তবায়ন করে। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে বিদেশি কার্যকলাপের ওপর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে। রাষ্ট্রপতির বৈদেশিকনীতি ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়। যেমন, রাষ্ট্রপতির দ্বারা আলোচিত চুক্তিগুলো মার্কিন আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার জন্য সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। রাষ্ট্রদূতের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সিনেটের অনুমোদন লাগে এবং সামরিক পদক্ষেপের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষের পূর্বানুমোদন আবশ্যক, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্বর যুদ্ধনীতি : যুদ্ধনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিকনীতি এবং প্রতিরক্ষানীতিরই অংশ। সেই অংশ হিসেবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিয়ে পরাজিত হয়। অন্যদিকে ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর স্থানীয় মুজাহিদীনদের পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা রাশিয়ার প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক শক্তিকে প্রতিহত করে। ২০০১ সালে War on Terror নামে আফগানিস্তান, ২০০৩ সালে WMD অযুহাতে ইরাক, আরব বসন্তের নামে লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ তছনছ করা সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ করেছে শুধু পরাজয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ পরাজয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনে আক্রমণ করতে উৎসাহ দিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েন না করে সর্বোচ্চ সামরিক সহায়তা দেওয়া। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিল বলেন ইউক্রেনীয়রা শুধু রুশ হামলাকারীদের থেকে নিজেদের রক্ষার পথ খুঁজছেন। তাদের রক্ষার্থে যতদিন লাগবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র এ সহায়তা দিয়ে যাবে।’
দেশটি সেনাদের সরাসরি যুদ্ধে মোতায়েন পরাজয় যেমন দেখছে, তেমনি নিজেরা যুদ্ধে না জড়িয়ে যেসব দেশ নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে, তাদের একপক্ষকে সহায়তার সফলতা দেখছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক ও ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হতে পারে চীন যদি তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যেভাবে সহযোগিতা করেছে, সেভাবে সহযোগিতা করা। তবে বিভিন্ন যুদ্ধসহ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে নতুন করে দেশটি মার্কিনি তথা বিশ্ববাসীর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তানীতি : ২০২৫ সালের শেষভাগে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) ঘোষণা করেছে। এই নীতি শুধু দেশীয় নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনীতি, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বিকাশ সবকিছু নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। এটি আগের নীতিমালাগুলোর ধারাবাহিকতা নয়; বরং এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী বিশ্ব নেতৃত্ব’ থেকে ‘স্বার্থ ও সুরক্ষাকেন্দ্রিক’ কৌশলে সরে আসার কথা তবে তাদের কার্যক্রম সেটির পরিপন্থী, যা মানবতাবিরোধী আগ্রাসী কর্মযজ্ঞ।
ট্রাম্প ২.০-এর অধীনে মার্কিন প্রতিরক্ষানীতি : ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মার্কিন প্রতিরক্ষানীতি ওয়াশিংটনের জোট সম্পর্কে বহু পুরনো ধারণাগুলো সংশোধন করতে চেয়েছিল। পরিবর্তনের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো)-এর মাধ্যমে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস। জোটের সদস্যপদের শর্তানুযায়ী ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যরা প্রতিরক্ষার জন্য তাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) বাধ্যতামূলক ২ শতাংশ বরাদ্দ না করার জন্য ট্রাম্পের দ্বারা ভর্ৎসিত হয়েছিল। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও ন্যাটোর সঙ্গে এই উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বিধিনিষেধ : ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের আমলে ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স (ডিওডি) ও পেন্টাগনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ হ্রাসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তার আগে বাহিনীকে সংযমের সঙ্গে শক্তি ব্যবহার করতে হতো, কিন্তু ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় সেই সীমাবদ্ধতাগুলো সরানো হয়, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীকে করেছে বেপরোয়া যার শেষ দৃশ্য ইরান যুদ্ধ। ট্রাম্পের ইরাননীতি, দেশেই সমালোচিত বিশেষজ্ঞদের মত ‘নিরাপদ নয় আমেরিকা, কোথায় এর শেষ যুক্তরাষ্ট্রও জানে না’!
ওয়াশিংটন ডিসি : ইরানের বিষয়ে ডেমোক্রেটিক সিনেটরদের তরফে অভিযোগ তোলা হয়, যুদ্ধ নিয়ে পরিষ্কার কোনো কৌশল নেই হোয়াইট হাউসের এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আমেরিকাকে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এক্স হ্যান্ডলে দাবি করেছেন, “আজ শেষমেশ ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া নিয়ে তথ্য পেয়েছে কংগ্রেস। এমনকি রুদ্ধদ্বারেও ওরা ওদের কথা সোজা বলতে পারেনি। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট : ওরা জানে না যে, কোথায় এর শেষ এবং এটা নিশ্চিত যে নরকেও আমেরিকা নিরাপদ নয়।”
ট্রাম্পের নীতি ও বিশ্বব্যবস্থার নতুন দ্বন্দ্ব : কংগ্রেসের যৌথ কক্ষে সম্প্রতি এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, আমেরিকা ‘পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা’ হয়ে উঠবে। ট্রাম্পের এ দাবিটি বিশাল এবং প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি একক, প্রধান প্রতিপক্ষ চীন। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁর ২০২০ সালের বই ‘আমেরিকান ক্রুসেড’-এ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, যেখানে চীন কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি ‘আধ্যাত্মিক প্রতিপক্ষ’।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোয় অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউরোপে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন সংকট ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। তবে বর্তমান আশা করা যায় না ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো মাঝারি শক্তিধর দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে ধরে রাখবে। এই নতুন বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে তারা সবাই নিজেদের শক্তিধর দেশ হিসেবেই দেখে।
ইরান: সর্বশেষ মার্কিন বর্বর যুদ্ধনীতির শেষ দৃশ্য ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মার্কিন স্বার্থে আঘাত ইত্যাদি ইস্যুতে শুরু হওয়া মার্কিন ইসরাইল যৌথ আগ্রাসন “Operation Epic Fury” এবং “Roaring Lion”। যে আগ্রাসনে শহীদ হন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক বিষয় কোনো কিছুই পাত্তা না দিয়েই ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণের মুখে পতিত গাজা খালি করতে বলে এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরান খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের সহযোগী নেতানিয়াহু খোলামেলাই বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করলেই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে কিন্তু সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করার পরও যুদ্ধ থামেনি, বরং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাল্টা ‘ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঞৎঁব চৎড়সরংব’ আঘাতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করলে সেখানেও মুসলিমদেরই রক্ত ঝরছে।
যদিও ইরানের এই পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু হয়েছিল শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে যখন যুক্তরাষ্ট্রের তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে ওঠে যেটি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তেহরান ও তেলআবিবের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ ছিল। তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে ইরান ১৯৫০ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব এই সমীকরণ আমূল বদলে দেয়। নতুন শাসনব্যবস্থা ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। বিপ্লবের পর শিয়া উত্থানের আশঙ্কা তুলে মার্কিন বর্বর আগ্রাসী যুদ্ধনীতি মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নি বিভাজন আরও তীব্র করেছে।
সিজিটিএন জরিপ : মার্কিন ‘যুদ্ধনীতি’ আমেরিকাকে বিশ্বজুড়ে বিচ্ছিন্ন করছে : চীনের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৮৯.৬ শতাংশ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান ইস্যুতে যুদ্ধের নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সমাজে আরও গভীর বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদিকে শুক্রবার ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস সম্প্রতি জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ইরানে যুদ্ধের পরিস্থিতি আবার তীব্র হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৯২.৪ শতাংশ উত্তরদাতা এ সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা মার্কিননীতিকে সরাসরি ‘সামরিক বলপ্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে দেখছেন এবং সংঘাত বন্ধে দেশটির আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন। ৯৪.২ শতাংশ উত্তরদাতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
প্রতিদিন প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যুদ্ধব্যয় চলছে। ক্রমাগত বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দাম যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের নাগরিকের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিশ্বে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব। ৮৮.৫ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, এই যুদ্ধ মার্কিন অভ্যন্তরীণ সমাজকেও বিভক্ত করছে।
জরিপটি সিজিটিএনের ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি ও রুশ প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়, যেখানে ১৩,৭৩১ জন নেটিজেন অংশ নেন।
৬১ শতাংশ মার্কিনি ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে-ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস : ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ৪ দিন ধরে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছেÑ ট্রাম্পের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন ৩৬ শতাংশ। গত সপ্তাহে তা ছিল ৪০ শতাংশ।
গত বছরের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। বছরের মাঝামাঝি তা কমে ৪০ শতাংশ হয়। এখন তা আরও কমে ৩৬ শতাংশ হয়েছে।
যুদ্ধের বিরোধিতাকারীর হার বেড়ে হয়েছে ৬১ শতাংশ। গত সপ্তাহে তা ছিল ৫৯ শতাংশ।
ট্রাম্পবিরোধী তৃতীয় ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ : যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অসংখ্য শহরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে শামিল হয়েছে লাখ লাখ মানুষ।
এ নিয়ে তৃতীয়বার বড় বিক্ষোভ-সমাবেশ হলো; আগের দুবারের ‘নো কিংস’ বিক্ষোভেও লাখ লাখ নাগরিক রাস্তায় নেমেছিল।
আয়োজকরা বলছেন, তারা ইরান যুদ্ধ, অভিবাসননীতি কার্যকরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) দমন-পীড়ন ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়সহ ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতেই এ কর্মসূচি ডেকেছেন।
‘ট্রাম্প আমাদের শাসন করতে চান স্বৈরশাসকের মতো। কিন্তু এটা আমেরিকা, এখানে ক্ষমতার মালিক জনগণ- রাজা হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা তাদের ধনকুবের দোসররা নয়,’ আয়োজকরা এসব বলেছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বড় শহরেই শনিবার এ বিক্ষোভ হয়েছে।
আগের ‘নো কিংস’ বিক্ষোভগুলোর মতো এবারও বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদকারীদের হাতে ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ তাদের প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার কুশপুত্তলিকা ছিল। সমাবেশ-মিছিলে এ কর্মকর্তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
আগে অক্টোবরে শেষ ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল।
গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে ট্রাম্প ক্রমাগত তার ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়েই চলছেন। তিনি নির্বাহী আদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক অংশ বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের আপত্তি উপেক্ষা করে একের পর এক শহরে ন্যাশনাল গার্ডও মোতায়েন করে চলেছেন।
তবে ট্রাম্প বলছেন, ‘তারা আমাকে রাজা বলে, আমি রাজা নই,’ অক্টোবরে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছিলেন এ প্রেসিডেন্ট।
প্রায় সব বিক্ষোভেই লোকজন ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অনেক শহরে থাকা মার্কিনিরাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে অংশ নেন। প্যারিস, লন্ডন ও লিসবনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলা প্লাকার্ড হাতে নিয়ে এসেছিলেন; তারা রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্টকে যত দ্রুত সম্ভব অভিশংসিত করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানান।
বর্বর মার্কিন যুদ্ধনীতির ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে তা বিস্তৃত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যার খেসারত পুরো পৃথিবীকে দিতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন। শনিবার ইস্তাম্বুলে ‘স্ট্র্যাটকম সামিটে’ তিনি এই শঙ্কার কথা শোনান বলে আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে।
তুরস্কের ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের’ প্রধান কারিন মনে করেন, ‘গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ইসরাইলের দখলদারিত্ব ও আইন লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।’ কালিন মনে করেন, বর্তমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় গত বছরের জুনে।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিন যুদ্ধ চলে ইরানের। এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে নতুন করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।
এটি এমন এক যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, যার পৃথিবীর মূল্য ৮০০ কোটি মানুষকেই দিতে হবে।’
চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিভাজন আরও গভীর করে তুলতে পারে মন্তব্য করে কালিন বলেন, ‘এই যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নির্মূল করা নয়, বরং তুর্কি, কুর্দি, আরব ও পারস্য অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করা।’
‘আমরা খুব ভালো করেই জানি, যারা এই যুদ্ধ বাধিয়েছে, তারা ধ্বংস ও দখলদারিত্বের নীতির মাধ্যমে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং অন্যান্য স্থানে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করছে।’ কালিনের অভিযোগ, ‘যুদ্ধের আগের মতোই আমরা দেখছি, আলোচনা ও যোগাযোগের পথ নস্যাৎ করতে ইসরাইল জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ প্রকৃতপক্ষে সামরিক শক্তি কখনোই আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির সঠিক উপায় নয়, এটি কেবল ঘৃণা ও সংঘাতকে আরও উসকে দেয়। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমানবতা রক্ষার্থে তার বর্বর যুদ্ধনীতি থেকে সরে এসে শান্তির পথ অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের পতন আর বিশ্ব মানবতার বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
সূত্র : ট্রুথ সোশ্যাল, আল-জাজিরা, রয়টার্স, (CENTCOM), এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]