দেশ ও জাতির কল্যাণে সবার দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য
২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৪
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ আদম আ. ও বিবি হাওয়া আ.-কে তৈরি করে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের কর্মের ফলও তিনি জানান দিয়ে দীর্ঘসময় দুনিয়ায় বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁরা উভয়েই তাঁদের কাজ যথাযথভাবে করে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়েছেন। আর রেখে গিয়েছেন মানুষের জীবনের করণীয় ও অনুকরণীয় পন্থা। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা.-এর মাধ্যমে মানবজীবনের জন্য সর্বশেষ বাণী আল-কুরআন আমাদের কাছে সত্য হিসেবে মজুদ আছে। শতকোটি বছর পরও মহান আল্লাহর বাণীর আলোকেই দুনিয়ার জীবনযাপন চলছে। যারা মহান আল্লাহর বাণীর আলোকে জীবনযাপন করছে তারা দুনিয়ায়ও ভালো চলছে আর আখিরাতেও তারা পাবে অফুরন্ত সুখ আর শান্তি, যার শেষ নেই।
নিকট অতীতে তাকালে ইরানের শাহ পাহলভী তার দেশের জন্য দায়িত্বশীলতার আচরণ করতে না পারায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার স্বৈরশাসকও একই কারণে দেশ ছেড়েছে। এই মাত্র কয়েকদিন পূর্বে আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালের ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদলের কাছে হার মেনে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হয়েছে বিপ্লবীদের নিয়ে বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে। মাত্র ৩৫ বছরের তরুণ যুবক, যার নেতৃত্বে নেপালে দুর্বার আন্দোলন হয়েছে। বর্তমানে ভারতবিরোধী মতবাদের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীন তার দল। আগেই বলেছি, আরেকটি ছোট দেশ মালদ্বীপ ভারতের সৈন্য তাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছেন মুহাম্মদ মইজ্জু। তিনি ক্ষমতায় এসেই তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে ভারতীয় সৈন্য তাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আমাদের দেশের শক্তিধর দুর্নীতির রানি স্বৈরাচার হাসিনা দেশ থেকে পালিয়েছে তল্পীতল্পা নিয়ে তার দাদার দেশ ভারতে। মাঝেমধ্যে হুঙ্কার দিচ্ছে ফিরে আসবে, যা কোনোদিনই হবে না। এমনকি তার কবরও স্বাধীন বাংলাদেশে হবে বলে মনে হয় না। জাতির সাথে বিশ্বাস ভঙ্গকারী মীরজাফরের নামও কেউ তার সন্তানের জন্য রাখে না।
আমাদের আলোচ্য বিষয় ফ্যাসিস্ট মনোভাব ত্যাগ করে দায়িত্বশীল আচরণ ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে। শুরু করেছি আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর ঘটনা দিয়ে। আমরা মূলত আলোচনা করতে চাই আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের আচার-আচরণে দায়িত্বশীলতা নিয়ে। গত ৫৫ বছর দেশে আমরা দায়িত্বশীল আচরণের সরকার পাইনি। ফলে বারবার দেশের ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছে। কিন্তু তার মূল্য পায়নি। সর্বশেষ দুর্নীতির রানি ২০২৪ সালের ১৫ বছর দেশে নির্বাচনের নামে প্রহসন এবং দুর্নীতির সয়লাব করে দেশকে তার পরিবারের ও দলের পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল। ছাত্র-জনতার বিদ্রোহের কারণে দেশ থেকে পালিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের ৮ তারিখে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়ে নানা কাজে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরলেও ছাত্র-জনতার প্রাপ্য বুঝে পাচ্ছিল না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ও গণভোট ‘হ্যাঁ’য়ের ওপর আনন্দমুখর জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়েছিল। ভোটে আগের মতো কারচুপি না হলেও ভোটগণনায় এক অস্বাভাবিক চাপ ও ইঞ্জিনিয়ারিং করে রাতেই বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ ভোট পাওয়া জামায়াত জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করে একটি গোষ্ঠী। এ ব্যাপারে সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান প্রকাশ্যে জামায়াত জোটকে মেইন স্টিমে আসতে দেয়নি বলে দম্ভবরে ঘোষণা দিয়েছে।
সংসদ অধিবেশন চলছে। শুরু থেকে বাহ্যত ভালো পরিবেশে সরকারি ও বিরোধীদল একে অপরকে আগের মতো গুঁতাগুঁতি কম হলেও মূল সমস্যা হয় সরকারি দলের বিশ্বাস ভঙ্গের বিষয় নিয়ে। সদলবলে প্রকাশ্যে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দেশের প্রায় সব দলের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করে এখন বিএনপির ভারতপন্থী গ্রুপ জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। বিরোধীদল এবং আম-জনতা এ গড়িমসির কারণ ভালো চোখে দেখছে না। সরকারি দল দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। সালাহউদ্দিন সাহেব ইনিয়ে-বিনিয়ে অকার্যকর সংগঠনের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করছেন এবং গণভোটকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছেন। দেশের প্রায় ৭০% মানুষের জেনেশুনে জামায়াত জোটের ডাকে সাড়া দিয়ে ভোট দিয়ে হ্যাঁ জয়যুক্ত করেছে। এখন আবার সংবিধানের দোহাই দিয়ে কথা বলছেন মি. সালাহউদ্দিন গং। যা শহীদ জিয়াপন্থী বিএনপির নেতাকর্মীরা ভালো চোখে দেখছে না। এদেশের মানুষকে ফাঁকি দেয়ার সময় কিন্তু শেষ হয়ে গেছে ৫ আগস্টের বিপ্লবের ফলে। এদেশের মানুষকে কিন্তু আর কেউ ঠকাতে পারবে না। বিশ্বাসঘাতকদের চেহারা জনগণ বুঝে গেছে। যেই দেশের জন্য আধিপত্যের বীজ বপন করতে চাইবে, জনগণ তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দেবে। সে যে দলের লোকই হোক।
বিএনপির মূল কাণ্ডারিরা কিন্তু নীরব ভূমিকায় রয়েছে। এক সালাহউদ্দিন একাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এটাই কি আইনমন্ত্রীর চুপ থাকার কারণ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ মেজর জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া সরকার চালিয়েছেন ভারতীয় লবি উপেক্ষা করেই। তাই তো শেখ হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরার ১৭ দিনের মধ্যেই শহীদ জিয়াকে হত্যা করা হয়। বেগম জিয়াকেও এক কাপড়ে তার বসবাসের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ভরেছিল স্বৈরাচারী হাসিনা।
জুলাই বিপ্লবের পরই তো প্রথম বেগম জিয়া মুক্ত হন। মুক্ত হন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ হাজারো নেতা। তার মধ্যে আমরাও ছিলাম। সাথে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভীসহ হাজারো নেতাকর্মী। এছাড়া বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরতে পেরেছেন জুলাই বিপ্লবের কারণেই। তাই জুলাই বিপ্লবের বিরোধিতা করে বিএনপির জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। সালাহউদ্দিন আজ মন্ত্রী হতে পেরেছেন জুলাই বিপ্লবের কারণেই। তাই বিএনপিকে ভারতের হয়ে কাজ করলে দেশের ১৮ কোটি মানুষ মেনে নেবে না।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের কারসাজি ভেঙে দিয়েই শেখ হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। তাই এদেশের লোক যত বড়ই হোক, দেশের মালিকদের জন্য কাজ না করে আধিপত্যবাদের পক্ষে কাজ করে রক্ষা পাওয়া যাবে না। এবারের সংসদ নির্বাচনে যাই ঘটে থাকুক, জামায়াত জোটের ৭৭ জন এমপি নির্বাচিত হওয়ায় সরকারি দলের এমপিদের লুটপাট-দুর্নীতি করা সহজ হবে না। নোমিনেশন কেনার টাকা আর নির্বাচনের খরচ উঠাতে সরকারি এমপিদের ঘাম ছুটে যাবে। ইতোমধ্যেই খেজুর বিতরণ নিয়ে এবং ঈদের সময় প্রত্যেক এমপিরা যে ১০ লাখ টাকা করে পেয়েছিল, তা কিন্তু জামায়াত জোটের এমপিরা সঠিকভাবে জনগণের নিকট বিতরণ করেছেন। সেখানে সরকারি দলের লোকদের হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। বর্তমানে মিডিয়ার যুগে কেউ দুর্নীতি করে ফাঁকি দেয়ার কৌশল কোনো না কোনোভাবে জনতার আদালতে আসবেই। কেউ রক্ষা পাবে না।
ইতোমধ্যে বিরোধীদল সংসদে সরকারি দলের এমপিদের মোকাবিলা করতে পিছপা হয়নি। আমার মনে হয়, শহীদ জিয়ার অনুসারী বিএনপির লোকেরা ভারতপন্থী লোকদের পছন্দ করছে না। ছাত্রদল থেকে আসা নেতাদের খুব একটা মূল্যায়ন বর্তমান বিএনপিতে হচ্ছে না। ডাকসুর সাবেক নেতা আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবীর খোকন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ড. আসদুজ্জামান রিপনের দলে তেমন মূল্যায়ন নেই। তাই দলের যারা ত্যাগী নেতাকর্মী, তাদের ভাবতে হবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে। শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারী নেতাকেও পালাতে হয়েছে ছাত্র-জনতার রোষে পড়ে। তাই ছাত্র-জনতার প্রাণের দাবি জুলাই সনদের বিপক্ষে গেলে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা যাবে না। এখনই সজাগ হয়ে দলের জন্য ভূমিকা রাখতে হবে।
৩০০ আসনের সরকারি ও বিরোধীদলের সব সদস্যেরই যার যার এলাকায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে জামায়াত জোটের এমপিদের আদর্শ ভূমিকা রাখতে হবে। কাজেকর্মে সততা, দুর্নীতিমুক্ত থেকে সমাজ থেকে চাঁদাবাজদের তাড়াতে হবে। নিজেরা ভালো থাকতে হবে, অন্যদেরও ভালো রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য সামনের বাজেটে নিজ নিজ এলাকার লোকদের জন্য উপকারী প্রকল্প বাজেটে পাস করতে এখন থেকেই কাজ করতে হবে। সব বিভাগের বাজেটে যাতে প্রশাসন এলাকার প্রকল্প প্রাধান্য পায়, তার উদ্যোগ নিতে হবে। বাজেটের পূর্বেই আপনাদের এলাকার অগ্রাধিকারের তালিকা নির্দিষ্ট বিভাগে পেশ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে দুনিয়াব্যাপী জ¦ালানি সরবরাহ বিঘ্ন ঘটবে। খাবার জিনিসসহ আমদানি-রফতানিতে বিরাট বিপর্যয় ঘটবে। তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা না নিলে পস্তাতে হবে। এখনই আমাদের পেট্রোলপাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে তেল নিতে হচ্ছে। যদিও দাম এখনো বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে সরকারের কাছের লোকেরা এই দুর্দিনে জ¦ালানি তেল অবৈধ মজুদ করছে। ধরাও পড়ছে। সরকারকে এ ব্যাপারে তৎপর থাকতে হবেÑ যাতে জ¦ালানির কোনো ঘাটতি না পড়ে। ইরান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালীতে আটকাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। আমরা ইরানের সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সাথে সাথে বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে ইরানের পক্ষে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়ার জোর দাবি করছি। বিশেষ করে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্কসহ ৫৭টি মুসলিম দেশের ওআইসিকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জোর দাবি করছি।
দেশের প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে যার যেখানে দায়িত্ব আছে, তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পরিবারের প্রধান যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে. তবে তার পরিবারের সবার লেখাপড়া, বিয়ে-শাদী দেয়া সবই ভালোভাবে হবে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব পালন করতে পারলে। অন্যদিকে সংসদ সদস্য সরকারি-বিরোধীদলসহ মন্ত্রী, সরকারের আমলা দায়িত্বশীল আচরণের আওতায় আনতে হবে।
গত কয়েকদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া সেক্রেটারিয়েটে বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে ঘুরে তাদের কাজ তদারকি করছেন। সময়মতো কর্মচারীরা অফিসে আসে কিনা, কাজের ফাইল ঠিকমতো চলছে কিনা, বরাদ্দকৃত টাকার সঠিক ব্যয় হচ্ছে কিনা? অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেয়া যায় কিনাÑ সবক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার তদারকি করতে পারলে দেশ ভালো চলবে। সংসদ সদস্যদেরও কাজে তদারকির আওতায় আনতে হবে। জনগণের পয়সায় সংসদ চলে। তাই সংসদ অধিবেশনে কাজের কথা বেশি বললে দেশের উপকার হবে। বহুদিন পর স্বাধীন দেশের সংসদ সদস্যদের কাছে আমাদের অনেক চাওয়া। সততার নজির রেখে সংসদ সদস্যরা কাজ করতে পারলে আমাদের এ জন্মভূমির উন্নতি হতে বাধ্য।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]