আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপির বাক্সে


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৭

॥ এম. গজনবী ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের নেপথ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন হাত থাকার বিষয়টি ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে চলেছে। ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের ভোটাররা নীরবে বিএনপির ব্যানারে ভিড়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। বিষয়টি নির্বাচনের আগে কিছুটা আঁচ করা গেলেও দলটির ভোটাররা স্বীকার করতে চাননি। তবে নির্বাচনের পরদিন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের বন্ধ অফিস ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধ’ু স্লোগান দিয়ে তালা খোলার ঘটনায় খোলাসা হতে শুরু করেছে। খোদ রাজধানী ঢাকা, নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, দলটির সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশ মোতাবেক ধানের শীষে ভোট দেওয়া হয়েছে। প্রথম নির্দেশনা ছিল নির্বাচন ঠেকানোর জন্য যা যা করা দরকার, সেটা করতে হবে। কিন্তু পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বদলিয়ে নির্দেশ এলো যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটভুক্ত দল এনসিপি প্রার্থীর জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেসব আসনে বিএনপির প্রার্থীকে জয়ী করতে ভোট দিতে হবে। বিএনপিকে ভোট দেওয়ার মূল লক্ষ্য জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো। নির্বাচনী ফলাফলে সেটাই হয়েছে। ঠিকই জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট যোগ করে বিএনপির আসনসংখ্যা ২০৯টি। আর জামায়াতে ইসলামী আসন ৬৮টি। জোটভুক্ত দল এনসিপির ৬টি আসন।
ভোট ম্যানেজের কৌশল : নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় হলেও আওয়ামী লীগের ভোট যোগ করে আসন সংখ্যা খুব বেশি না। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসরদের মিলে ৩৫ শতাংশ ভোট- যেটা বিএনপির মোট ভোটের সঙ্গে যোগ হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের ভোট জামায়াতের বিপক্ষে ছিল। তারপরও বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনসমূহের হিসেবে জামায়াতের আসন কমেনি, বরং অনেকে বেড়েছে। দেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিএনপির আসন সংখ্যা ছিল ১৪০। অন্যদিকে জামায়াতের আসন ছিল ১৮টি। ৯১ সালের নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু কিছু জায়গায় ভোট জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও গ্রহণযোগ্য, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে। ভোট জালিয়াতি বা ইলেকশন ইঞ্জিয়ারিং হওয়ার পরও জামায়াত ৬৮টি আসন পেয়েছে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন পাচ্ছে আরো ১১টি। এতে আসন সংখ্যা দাড়াচ্ছে ৭৯টি। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে দলটি। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তত পঞ্চশটি আসনে জামায়াতের প্রাথীরা দুই হাজার থেকে আট হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এই আসনগুলোয় ভোট জালিয়াতি না হলে জামায়াতের আসন সংখ্যা আরো বেড়ে যেত। অন্যদিকে বিএনপির আসন সংখ্যা কমে যেত। ফলে জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো অসম্ভব হতো।
খুলনা-৫ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আলী আসগার লবী। লবীকে ভোট দিয়েছেন এমন কয়েকজন আওয়ামী লীগের ভোটাররা জানান, শীর্ষ মহলের নির্দেশ ছিল যেভাবেই হোক গোলাম পরওয়ারকে হারাতে হবে। কারণ তিনি দলটির সেক্রেটারি জেনারেল। ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলালের নির্দেশে খুলনা-৫ আসনের আওয়ামী লীগের ভোটাররা লবীকে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনের প্রথম দিকে ওই আসনের হিন্দু ভোটাররা গোলাম পরওয়ারকে ভোট দিতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লবী শেখ হেলালকে দিয়ে হিন্দু ভোটারদের ম্যানেজ করেন।
ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জেও। গোপালগঞ্জে মূলত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে ৩টি আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে সেলিমুজ্জামান মোল্লা, কে এম বাবর এবং এস এম জিলানী। এখানেও শেখ হেলাল ফোন করে আওয়ামী লীগের ভোটারদের ধানের শীষ প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেন। আওয়ামী লীগের ভোটে বিএনপির তিনজন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। গোপালগঞ্জের হিন্দু ভোটাররাও ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। হিন্দুদেরও ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেন শেখ হেলাল। গোপালগঞ্জের তিন এবং খুলনা-৫ আসনে হিন্দু ভোটার ত্রিশ শতাংশের মতো। অতীতের নির্বাচনসমূহে হিন্দুরা আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় আওয়ামী লীগেরই সিদ্ধান্তে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
গোপালগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা নড়াইল। নড়াইলও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিগত নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বেশি জয়ী হয়েছেন। নড়াইলে মোট দুটি আসন। এবার আওয়ামী লীগবিহিন নির্বাচনে নড়াইল-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম জয়ী হয়েছেন। নড়াইল-২ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আতাউর রহমান। নড়াইল-১ আসনে হিন্দু ভোটার চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি। অতীতে হিন্দুদের ভোট আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন। এবার আওয়ামী লীগ ও হিন্দুদের ভোট ভাগ হয়ে গেছে। নড়াইল-১ আসনের পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের বাচ্চু মোল্লাসহ কয়েকজন আওয়ামী ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ধানের শীষে ভোট দিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা ভয়ভীতি দেখিয়েছে। ভোট না দিলে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। তারা বলেন, নড়াগাতি থানার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের বাগুয়াডাঙ্গা একটি ভোট কেন্দ্র। এই কেন্দ্রে জামায়াত প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছেন। বিগত সময়ে প্রায় সব কয়টি নির্বাচনে এই কেন্দ্র আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এবার ভয়ভীতি দেখিয়েও এই কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট নিতে পারেনি। কালিয়ায় অনেক কেন্দ্র হিন্দু অধ্যুষিত। সেখানেও ভয়ভীতি দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট নেওয়া হয়েছে। আর আওয়ামী লীগের ভোট নেওয়া হয়েছে কৌশল করে। কৌশল হলো দলটির উচ্চমহলকে ম্যানেজ করে। আওয়ামী লীগও ম্যানেজে রাজি হয়েছে জামায়াতকে ঠেকানোর জন্য।
এদিকে খোদ রাজধানী ঢাকা-৯ আসনেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে বলে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল। নাম প্রকাশ করতে চাননি আওয়ামী লীগ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, দলের উচ্চমহলের নির্দেশে আমরা ধানের শীষে ভোট দিয়েছি। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রশীদ। এখানে জামায়াতের নিজস্ব প্রার্থী ছিল না, ছিল জোটভুক্ত এনসিপির প্রার্থী। তারা বলেন, বিএনপির কর্মীরা আগে-ভাগে আওয়ামী ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার নম্বর দিয়ে এসেছে। কারোর কেন্দ্রে যেয়ে ভোটার নম্বর খোঁজা লাগেনি।
আওয়ামী লীগ কেন বিএনপিকে ভোট দিল : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে পাড়ি জমান। এরপর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তখন রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার। গণদাবির প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার তৎপরতাও তাদের চালাতে দেখা যায়নি। তবে ভারতে বসে ভিডিও বার্তা শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। তার এ বার্তায় কোনো কাজ হয়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত ছিল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে হতে না দেওয়া। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে নির্বাচন ভণ্ডুল করা। এরপর নির্বাচন বর্জনেরও সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নির্বাচন বর্জন করে ভোটদান থেকে বিরত থাকলে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় চলে এলে তাদের জন্য আরো বিপদ ডেকে আনতে পারে- এমনটি ভেবে বিএনপির সঙ্গে গোপনে সমঝোতা হয়। সমঝোতাটি হলো- নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ধানের শীষ প্রার্থীকে ভোট দেবে। এর বিনিময়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেবে। গোপন সমঝোতা বা ষড়যন্ত্রের আলামত লক্ষ করা গেছে নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার ঘটনায়।
সূত্র আরো জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ চিরকালই ভারতের তাঁবেদারি করে আসছে। শেখ হাসিনা সেই ভারতেই পালিয়ে গেছেন। গত ১৮ মাস ধরে সেখানেই আছেন। আরো হয়তো থাকবেন। এখন ভারতে বসে বাংলাদেশে ফেরার নানা কূটকৌশল আঁটছেন। ওই কূটকৌশলের একটি হলো নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত। বিএনপি ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার রাস্তাটি তৈরি হবে। বিএনপি ক্ষমতায় না এসে জামায়াত এলে দেশে ফেরা তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। বাস্তব অবস্থা আঁচ করতে পেরে আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধীদল। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সরকারকে চাপে রাখতে আন্দোলন করবে- এইটা স্বাভাবিক। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপিও আছে। এনসিপি নতুন দল হলেও এই দলটির নেতারা সব তরুণ। রাজপথে তারা অধিক শক্তিশালী। শেখ হাসিনাকে এরাই বিতাড়িত করেছে। সুতরাং জামায়াত-এনসিপি মিলে রাজপথ উত্তপ্ত করলে সরকারকে সামাল দিতে কঠিন হবে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে নিয়ে এলে তারাও তো এক সময় আন্দোলনে নামবে। এক সঙ্গে বিএনপি কয় দিকে সামলাবে। বিএনপি ‘খাল কেটে কুমির’ আনতে চাইলে সে খেসারত বিএনপিকেই দিতে হবে।