ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন-২০২৫ বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামের স্বাগত ভাষণের পূর্ণ বিবরণ
২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৪৫
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন। আসসলাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিহিল কারিম। ওয়াআলা আলিহি ওয়াআসহাবিহি আজমাইন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী, মেধাবী ছাত্রদের প্রিয় ঠিকানা, শতশত শহীদের রক্তে মোড়ানো কাফেলা, আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম, শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের “কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন-২০২৫” এর উপস্থিত সম্মানিত প্রধান অতিথি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহতারাম আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সম্মেলনের উদ্বোধক- শহীদ মুনতাসির রহমান আলিফ ভাইয়ের গর্বিত পিতা জনাব সৈয়দ গাজিউর রহমান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী, বিভিন্ন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ, শ্রদ্ধাভাজন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিবৃন্দ, কার্যকরী পরিষদের বর্তমান ও সাবেক সদস্যবৃন্দ, আমন্ত্রিত দেশি ও বিদেশি অতিথিবৃন্দ, সাংবাদিক বন্ধুগণ এবং আমার প্রাণ প্রিয় সহযাত্রী সদস্য ভাইয়েরা! আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
মহান আল্লাহ তাআলার নিকট মস্তক অবনতচিত্তে শুকরিয়া আদায় করছি, যাঁর অশেষ মেহেরবানিতে আমরা আজকের এই সদস্য সম্মেলন আয়োজন করতে পেরেছি– আলহামদুলিল্লাহ। দরুদ ও সালাম প্রেরণ করছি বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)-এর প্রতি। শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করছি তাদের জন্য যাঁরা দ্বীন বিজয়ের প্রত্যয় নিয়ে যুগে যুগে শাহাদাতের নজরানা পেশ করেছেন।
স্মরণ করছি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী শহীদ আব্দুল মালেককে। যার পথ ধরে বাংলাদেশের এই সবুজ জমিনে কালিমার পতাকাকে উড্ডীন করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রথম শহীদ শাব্বির আহমদসহ কাফেলার শত শত শহীদ এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের। আজকের এই দিনে বিশেষভাবে স্মরণ করছি ছাত্রশিবিরের প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি শহীদ মীর কাশেম আলী রাহিমাহুল্লাহ, দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় সভাপতি শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রাহিমাহুল্লাহসহ ইসলামী আন্দোলনের সকল শহীদ নেতৃবৃন্দকে, যাঁদেরকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা মিথ্যা ও সাজানো মামলায় জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করেছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ২০২৫ সালে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাওয়া ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মরহুম ড. আ জ ম ওবায়দুল্লাহকে; যিনি আমৃত্যু ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্য অসংখ্য বই, গান-গবেষণা প্রকাশ ও শিক্ষাবিস্তারে অবদান রেখেছেন। মহান রাব্বুল আলামিন ভাইয়ের কাজগুলোকে কবুল করুন।
স্মরণ করছি শহীদ আবু সাঈদসহ প্রায় ২০০০ শহীদকে, যাঁরা জালিমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ২০২৪-এর জুলাইয়ে রাজপথে স্বৈরাচারের কবর রচনা করেছেন। বাংলার আকাশে মুক্তির নতুন ভোর আনতে গিয়ে রাজপথে জীবন দিয়েছেন। আরও স্মরণ করছি যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষকে পরাধীনতার জাঁতাকল থেকে স্বাধীনতার মুক্ত বাতাসে আনয়নে সংগ্রাম করে যাওয়া বখতিয়ার খিলজি, হযরত শাহজালাল, হাজী শরীয়তুল্লাহ, ফকির মজনু শাহ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, মীর নিসার আলী তিতুমীর, ১৯৪৭-এর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী মুজাহিদগণ এবং ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদেরকে।
ব্যথাতুর হৃদয়ে স্মরণ করছি শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে, যিনি আমৃত্যু আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। আরও স্মরণ করছি এ বছরের ১৮ ডিসেম্বর শাহাদাত বরণকারী আমাদের সাহসের বাতিঘর শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে, যিনি এই জমিনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ও শহীদ আবরার ফাহাদ, শহীদ অ্যাডভোকেট আলিফসহ সবাইকে স্মরণ করছি আজ; যাঁরা ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর।
শত শহীদের রক্তে স্নাত, হাজারো মজলুমের অশ্রুতে সিক্ত, কোটি মানুষের ভালোবাসা, শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের আজকের এই সদস্য সম্মেলনে আপনাদের সবাইকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
সুপ্রিয় উপস্থিতি,
দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশি গোলামীর শৃঙ্খল থেকে এই ভূখণ্ডের মানুষ আজাদি লাভ করেছিল। তারা আশা করেছিল– পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মাধ্যমে তাদের শাসনব্যবস্থা, তহযিব-তামাদ্দুন, অর্থনীতিসহ জীবনমান উন্নত হবে এবং রাজনৈতিক মুক্তি মিলবে। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকদের দুর্বলতা ও অদূরদর্শিতার দরুন পাকিস্তান তার রাষ্ট্রীয় দর্শন ও লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে জন্ম হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা বাকশাল কায়েম, ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং বাক্স্বাধীনতা হরণের ফলে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছিল। বিজাতীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থায় জাতি হয়েছিল বিধ্বস্ত। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়, তা একটি আদর্শিক ও গঠনমূলক ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা তৈরি করে। সততা ও নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সমাজকে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত করতে ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে এক প্রদীপ্ত আলোর মিছিল, নাম– বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শত বাধা-বিপত্তি, গুম, খুন, নির্যাতন মাড়িয়ে এই কাফেলার পথচলা এখনও চলছে বিরামহীন।
সম্মানিত উপস্থিতি,
আজাদির লড়াইয়ে ৪৭ থেকে ৭১, ৭১ থেকে ২৪; প্রতিটি আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে বিশাল ফারাক রয়ে গিয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট স্বাশন আমলে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচনে করা হয়েছে কারচুপির মহোৎসব। ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তরুণ প্রজন্মকে। ৭১-কে ব্যবহার করে চেতনার নামে দীর্ঘ সময় দেশে মাফিয়াতন্ত্র, ব্যাংকলুট, গুম-খুন, আয়নাঘর ও দুঃশাসনের এক নয়া জাহেলিয়াত কায়েম ছিল। মতের অমিল হলে কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই শিকার হতে হয়েছে জেল-জুলুমের আর বিচারিক হত্যাকাণ্ডের। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপরে চালানো হয়েছে নির্যাতনের স্টিমরোলার।
পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে (Dehumanization) মানবিক সত্তাহীন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। ‘শিবির মানেই হত্যাযোগ্য’–চতুর্দিকে এহেন ভয়াবহ এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে । এমনকি ‘ছাত্রশিবির’ ট্যাগ দিয়ে অগণন সাধারণ শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয়েছে, নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে । ২০১৩ সালে শাহবাগকে কেন্দ্র করে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে ফ্যাসিবাদের বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করা হয়, হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর চালানো হয় নির্মম দমন-পীড়ন। দাড়ি-টুপিকে জঙ্গিবাদের প্রতীক বানিয়ে শুরু হয় পরিকল্পিত মিডিয়া ফ্রেমিং। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার প্রশাসন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বস্তরে ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে দমন করে রেখেছিল। এ সকল কিছুরই প্রতিবাদে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জনতার ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় এবং ইতিহাসের নিকৃষ্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হয় । জুলাই অভ্যুত্থানে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তরুণদের আত্মত্যাগ জাতির মধ্যে নতুন আদর্শিক জাগরণ সৃষ্টি করে। এই জাগরণ আমাদের শেখায় সাহসিকতা, শাহাদাতের তামান্না, আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় না করে ফ্যাসিবাদের সামনে সত্যকে তুলে ধরার। ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের মাধ্যমে সকল ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদকে রুখে দেওয়ার।
সুপ্রিয় সুধীমণ্ডলী,
বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনাময়ী দেশ। আমাদের আছে কর্মঠ বিশাল জনসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জালের মতো ছড়িয়ে আছে হাজারও নদ-নদী। আমাদের আছে অপরিসীম সম্ভাবনার সমুদ্র, যার ওপর বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে আমাদের ব্লু ইকোনমি জোন সম্ভাবনার বহু দ্বার উন্মোচিত করেছে। সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্পসহ রয়েছে নানা সম্ভাবনাময়ী খাত। কিন্তু কেবল যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ সকল সম্ভাবনা আলোর মুখ দেখছে না। আজ বেকারত্ব ও মাদকের নীল দংশন আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। এই ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রশিবির ছাত্রদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং মাদকবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করছে। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের আলোয় (ইকরা বিইসমী রব্বিকা) উদ্ভাসিত হয়ে আমরা ক্যাম্পাসগুলোতে সুস্থ ও শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করতে চাই। ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে যে, এদেশের ছাত্রসমাজ এখন স্বচ্ছ ও আদর্শিক রাজনীতির প্রতি আস্থাশীল। ইনশাআল্লাহ, এই জাগ্রত তরুণদের হাত ধরেই আমরা সমৃদ্ধ ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
সম্মানিত উপস্থিতি,
একটি জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি তার সুশিক্ষার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া উচ্ছিষ্ট, যা জাতিগত ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট, আবাসন সংকট, গবেষণায় পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলোকে ধূলিসাৎ করছে। এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির পেশ করেছে এক যুগোপযোগী ‘৩০ দফা শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা’। আমরা বিশ্বাস করি– এই ৩০ দফা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাঙ্গনগুলো হবে বিশ্বমানের মেধা বিকাশের পবিত্র কেন্দ্র। আমরা বর্তমান সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
সম্মানিত উপস্থিতি,
আপনারা জানেন– ছাত্রশিবিরের দীর্ঘ ৪৯ বছরের পথচলায় শত শহীদের রক্তে এই জমিন শিক্ত হয়েছে। আমাদের ২৩৪ এর অধিক ভাইদেরকে শহিদ করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে শতশত ভাইদেরকে।ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য ওয়ালীউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাস ভাইসহ ৭জন ভাই এখনো ফিরে আসেনি। শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে আমাদের শতশত ভাইদেরকে। হেন কোনো পন্থা নেই, যা আমাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়নি, কিন্তু তারা কিন্তু এত সব প্রতিকূলতা তৈরি করেও তারা আমাদের সত্য ও সুন্দরের আহ্বানকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
ইউরিদুনা লিউতফিউ নুরাল্লাহ…।
ছাত্রশিবির কুরআন ক্লাস, হাদিস পাঠ, পাঠচক্র, শিক্ষাশিবির, শিক্ষাবৈঠক, শব্বেদারি, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, রচনা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, সাহিত্যসভাসহ বহুমুখী কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত সংবর্ধনা, কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, শীতবস্ত্র উপহার, শিক্ষা উপকরণ উপহার, বিনামূল্যে রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, অদম্য মেধাবী ও প্রতিবন্ধীদের বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি নানা কর্মসূচি পালন করেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে সায়েন্স ফেস্ট, রোবটিক্স ফেস্টসহ, বিজনেস কার্নিভাল, রিসার্স কনফারেন্স, মিট দ্যা ব্রিলিয়ান্টস, মিট উয়িথ ফিচার সায়েন্টিস্ট, প্রস্তের প্রেসেন্টেশনসহ নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে এই কাফেলা। এর মাধ্যমে ছাত্রশিবির ছাত্রসমাজের মাঝে ইতিবাচক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
সংগ্রামী ভাইয়েরা,
আমরা এমন একটি সময় সদস্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছি, যখন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনেরা সন্ত্রাসী ও বর্বর ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলায় প্রতিনিয়ত শাহাদাতের নজরানা পেশ করছে। শাহাদাতই হয়ে উঠেছে যেন তাদের নিত্যসঙ্গী! এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের ওপরে নিরীহ ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে। আহতের সংখ্যা প্রায় পৌনে ২ লক্ষ। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো নারী এবং শিশু। হাজার হাজার মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের দোয়ার আর্তনাদ আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ ہٰذِہِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَہۡلُہَا ۚ وَاجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ وَلِیًّا ۚۙ وَّاجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ نَصِیۡرً
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করে নাও, যার অধিবাসীরা জালিম এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ হতে একজন অভিভাবক বানিয়ে দাও এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ হতে একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।’ [সূরা নিসা : ৭৫]
কিন্তু পৃথিবীর সব মোড়ল শক্তিধর দেশগুলো আজ নিশ্চুপ। আজ আমাদের দেশে মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে অধিকারবঞ্চিত। এছাড়া ভারতের কাশ্মীর, চীনের উইঘুরসহ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে আজ নিষ্পেষিত জীবনযাপন করছে মুসলমানরা। আফ্রিকার দেশ সুদানেও সাম্প্রতিক যুদ্ধে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের শাসকরা পশ্চিমা শক্তির গোলামি করতে গিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছে। মানবতার এই ক্রান্তিলগ্নে আজ মুসলিমদের জেগে উঠতে হবে।
প্রিয় সদস্য ভাইয়েরা,
শহীদদের রেখে যাওয়া আমানতই হচ্ছে আমাদের এই কাঙ্ক্ষিত বর্তমান উন্মুক্ত দাওয়াতি পরিবেশ। ইসলামী আন্দোলনের এই জমিনকে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে উর্বর করে দিয়ে গেছেন শহীদরা। তাঁদের সিলসিলায় রেখে যাওয়া আমানত যদি আমরা পূর্ণ করতে না পারি তাহলে কেয়ামতের দিন এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও আন্দোলনের স্পৃহা আরও বেশি বেগবান করতে হবে আমাদের। মজলুমদের আশার প্রতীক হিসেবে আমাদের আবির্ভূত হতে হবে। যতদিন না এই জমিন থেকে অত্যাচার নির্মূল হয়ে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
কবি নজরুলের ভাষায়
আমি সেইদিন সব শান্ত,
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দণ-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
উপস্থিত সংগ্রামী সদস্য ভাইয়েরা,
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে হবে, যেন জাতিও সেই আলোয় আলোকিত হতে পারে। ইসলামের স্বর্ণযুগের আবিষ্কার ও অবদান যেমন পৃথিবীর মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে, তেমনিভাবে আমাদেরকেও সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কুরআনের আলোয় যেভাবে একটি মূর্খ ও জাহেল জাতি শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল, সেভাবে আমাদেরকেও রাসুল (সা) এর দেখানো জ্ঞানের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে হবে।
এই পচনশীল সমাজকে ইসলামের সুমহান নৈতিকতার আলোকে নতুন করে সাজাতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জুলাই বিপ্লব আমাদের যে সাহসিকতা আর ত্যাগের পাঠ দিয়েছে, তাকে পাথেয় করেই আমরা এই ঘুণেধরা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই। আমরা এই জাতিকে কথা দিচ্ছি— অন্ধকার যত গভীরই হোক, আমরা দমে যাব না। ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এবং পথহারা এই প্রজন্মের সামনে আলোর দিশারী হয়ে আমরা ‘পাঞ্জেরী’র ভূমিকা পালন করব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের সংগ্রাম চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না এই জমিনে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হচ্ছে এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাচ্ছে তার ন্যায্য অধিকার।
প্রিয় সদস্য ভাইয়েরা,
এই বছরের সদস্য সম্মেলনের স্লোগান হচ্ছে–
‘জাহেলি আঁধার পেরিয়ে এসেছে
দিন বদলের বাঁক
পৃথিবী আবার গড়তেই হবে
নয়া আজাদির ডাক।’
এই স্লোগানের মাধ্যমে আমরা আপনাদের জানাতে চাই– ফ্যাসিবাদ আমাদের দেশে জুলুমতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে শেষ করতে চেয়েছিল; কিন্তু সে আঁধার মহান রব কাটিয়ে দিয়েছেন। সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি আমরা। এখন যদি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারি, তবে মানুষকে আজাদির স্বাদ দিতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে, আজকের এই কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন 2025 আগত সকল সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, প্রিয় দায়িত্বশীল ও সদস্য ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আশা করছি, আপনাদের সবার আন্তরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের সম্মেলন সফল ও সার্থক হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন ২০২৫-কে কবুল করুন। আমিন।
আল্লাহ হাফেজ।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জিন্দাবাদ।
জাহিদুল ইসলাম
কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির