আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ


১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৭

॥ ডা. নাজিব ওয়াদুদ ॥
রাষ্ট্র গঠন এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের অভিপ্রায়, আকাক্সক্ষা বা সিদ্ধান্ত প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু জনগণ তাদের অভিপ্রায়কে সরাসরি প্রকাশ বা প্রয়োগ করতে পারেন না, সেজন্য তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হয় জাতীয় সংসদ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বা পার্লামেন্ট, একেক দেশে এটার একেক নাম। এ পার্লামেন্ট জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অভিপ্রায় এবং আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটায় অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইনকানুন প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (দল বা দলের সমষ্টি) সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সুতরাং পার্লামেন্ট নির্বাচন বা গঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক কাজ যার ওপর দেশের সবকিছু নির্ভর করে। এ নির্বাচন প্রক্রিয়াটা এমনভাবে হওয়া উচিত যেন সর্বাধিকসংখ্যক জনগণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, যেন তারা নির্বিঘ্নে, নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পারেন, এবং যেন তাদের প্রতিটি ভোটের মূল্যায়ন হয়। এ বিষয়গুলো যত বেশি পরিমাণে ও মাত্রায় নিশ্চিত করা যাবে, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন তত বেশি ঘটবে। সুতরাং জনগণের এ প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে বিশ্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুটি পদ্ধতি টেকসই হয়েছে- সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতি (Simple Majority System বা First Past-The-Post System) এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Proportional Representation System, সংক্ষেপে পিআর পদ্ধতি)।
সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অনুসৃত হয়। এ পদ্ধতিতে প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান তিনি নির্বাচিত হন। প্রচলিত এ পদ্ধতির একটা বড় এবং মৌলিক ত্রুটি হচ্ছে, এতে অধিকাংশ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না। যেমন ধরা যাক, একটি আসনে একজন প্রার্থী পেলেন ১,২০,০০০ ভোট, দ্বিতীয় জন পেলেন ১,১০,০০০, তৃতীয় জন পেলেন, ৪০,০০০ এবং চতুর্থ প্রার্থী পেলেন ৩০,০০০ ভোট। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি অনুযায়ী নির্বাচিত হবেন প্রথম প্রার্থী। এখানে ১,২০,০০০ ভোটারের মতামত গৃহীত হলো, বাকি ১,৭০,০০০ অর্থাৎ অধিকাংশ ভোটারের মতামত প্রত্যাখ্যাত হলো। তার মানে এ পদ্ধতিতে সকল ভোটার তো দূরের কথা, সংখাগরিষ্ঠ ভোটারের অভিপ্রায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে কী রকম দাঁড়ায় দেখা যাক। গত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০.৮% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ১৪০টি; অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ৩০.১% ভোট পেয়ে ৮৮টি আসন পেয়েছে। জাতীয় পার্টি ১১.৯% ভোট পেয়ে ৩৫টি আসন এবং জামায়াত ১২.১% ভোট পেয়ে ১৮টি আসন লাভ করে। দেখা যাচ্ছে, প্রায় সমানসংখ্যক ভোটারের সমর্থন পেয়েও আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে অনেক কম আসন পেয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত জাতীয় পার্টির চেয়ে বেশি ভোট পেয়েও আসন পেয়েছে তার অর্ধেক। তার মানে, এই যে পার্লামেন্ট গঠিত হলো তাতে জনগণের অভিপ্রায়ের বাস্তব প্রতিফলন ঘটল না। এ পার্লামেন্টে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এই দু দলের ভোট হচ্ছে ৪২.৯%। এটা হয়ে গেল সংখ্যালঘিষ্ঠের সরকার। অর্থাৎ সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৭.১%) ভোটারের মতামতের কোনো প্রতিফলন ঘটল না, তাদের ভোট কোনো কাজে লাগল না, ‘নষ্ট’ হয়ে গেল। এই যে ভোট ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়ার ধারণা বা বাস্তবতা, তার ফলে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনে জেতার বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কেবল এরকম প্রার্থী বা দলকেই ভোট দেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চা এবং সৎ ও যোগ্য লোক এবং দলের বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়।
এভাবে বাংলাদেশের অতীতের নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে প্রত্যেকটি নির্বাচনেই পার্লামেন্টে, এবং সরকারেও, জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনি। এ পদ্ধতিতে এমনও ঘটে যে, ১/২% ভোট পেয়ে কোনো দল ২/৩টা আসন পেয়ে গেল, অথচ ৭/৮% ভোট পেয়েও অন্য একটি দল একটা আসনও পেল না। এমনকি এরকম হওয়াও অসম্ভব নয় যে, ১৫/১৬% ভোট পেয়েও কোনো দল একটা আসনও পাবে না।
এসব কারণে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পদ্ধতিতে নির্বাচিত পার্লামেন্ট এবং সরকারগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। বরং এসব পার্লামেন্ট এবং সরকার কাজ করে শুধুমাত্র নিজেদের অর্থাৎ দলীয় ভোটার বা কর্মীদের জন্য। বিপরীতক্রমে, যারা হেরে যান তারা এ পার্লামেন্ট ও সরকারকে নিজেদের বলে মনে করেন না, তারা বরং চেষ্টা করেন কীভাবে এ পার্লামেন্ট ও সরকারকে ব্যর্থ ও অগ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। এভাবে দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অস্থিরতা-অরাজকতা তৈরি হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সংখ্যালঘু মানুষের অবহেলা ও বঞ্চনা; এমনকি নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হয়। যেহেতু এ পদ্ধতির নির্বাচনে হেরে যাওয়া মানে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হওয়া সে কারণে এ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রায় সকল ব্যক্তি, দল ও পক্ষই কালো টাকা ও পেশিশক্তি ব্যবহার করেন, কারচুপি, প্রতারণা ও দুর্র্নীতির আশ্রয় নেন এবং যারা বিজয়ী হন তারা আধিপত্যবাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন। এভাবে এ পদ্ধতিতে দল, আদর্শ এবং কর্মসূচীর চেয়ে ব্যক্তি এবং তার অর্থ ও পেশিশক্তিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে প্রত্যেকটি নির্বাচনী আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তার নিজ দলীয় ও বিরোধীদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেন্দ্র করে একাধিক অপরাধী ও মাফিয়াচক্র গড়ে ওঠে। সাধারণ জনগণ এসব মাফিয়া চক্রের কাছে অসহায় ও জিম্মি হয়ে পড়ে। সরকার দেশ গঠনের চেয়ে দল এবং গদি রক্ষার জন্য বেশি সময় ও শক্তি ব্যয় করে। তাছাড়া এ পদ্ধতির কুফল হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও গ্রুপিং-লবিং ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি এবং মনোনয়ন বাণিজ্য চালু হয়। বাংলাদেশের বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাস এ পদ্ধতির কুফল এবং অকার্যকরতার জ্বলন্ত সাক্ষী।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি
পিআর পদ্ধতিতে একটি দলের প্রাপ্ত মোট ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টন করা হয়। এখানে ব্যক্তি নয়, ভোট দেওয়া হয় দলকে, অর্থাৎ দলের আদর্শ, লক্ষ্য, কর্মসূচি, দেশপ্রেম, জনকল্যাণকামিতা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও শৃঙ্খলা দেখে ভোটাররা ভোট দেন এবং প্রত্যেক দল তার প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে জাতীয় সংসদে আসন লাভ করে। এর সুবিধা হচ্ছে এ যে, প্রত্যেকটি দল তার জনপ্রিয়তা অনুযায়ী পার্লামেন্টে আসন পায়। সে কারণে এই পার্লামেন্টে সকল দলের সকল মতের ভোটারের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনার যে মূলনীতি তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য আবার ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা যাক। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ১৯৯১ সালে বিএনপি পেত ১৪০টির পরিবর্তে ৯২টি, আওয়ামী লীগ পেত ৮৮টির পরিবর্তে ৯০টি, জামায়াত পেত ১৮টির পরিবর্তে ৩৬টি, এবং জাতীয় পার্টি পেত ৩৫টি। এতে জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটত। এর ফলে প্রত্যেক ভোটারের প্রতিটি ভোটই কাজে লাগত, কোনো একজন ভোটারের ভোটও ‘নষ্ট’ হতো না। এভাবে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন পার্লামেন্ট এবং সরকারে সকল বা ন্যূনপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার মর্যাদা নিশ্চিত করে।
অনেকে বলছেন যে পিআর পদ্ধতি আমাদের দেশের লোক বোঝে না। কথাটা সত্যি নয়। কারণ আমাদের দেশে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হয় পরোক্ষ পিআর পদ্ধতিতে। পরোক্ষ এই জন্যে যে, এ নির্বাচনে সরাসরি জনগণ ভোট দেন না, জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে বিবেচিত হন। পদ্ধতিটা হচ্ছে, এখানে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন দলের মোট সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে সেই দলগুলোর মধ্যে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়। যেমন, ধরা যাক, সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে শাদা দলের রয়েছে ১৬০টি, লাল দলের রয়েছে ৯০টি, কালো দলের রয়েছে ৫০টি। সেক্ষেত্রে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নিয়মে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে সাদা দল পাবে ২৭টি, লাল দল পাবে ১৫টি, আর কালো দল পাবে ৮টি। অর্থাৎ এখানে পিআর পদ্ধতিই অনুসৃত হচ্ছে। সুতরাং পিআর পদ্ধতি এদেশের লোক বোঝে না এটা নিছকই বাতুল কথা।
পৃথিবীর বহু দেশে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে তার রকমফের রয়েছে। প্রত্যেকটি দেশ তাদের নিজ নিজ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রচর্চার মাত্রা অনুযায়ী পিআর পদ্ধতিকে নিজেদের প্রয়োজন মতো বিন্যস্ত করে নিয়েছে। সেজন্য পৃথিবীতে একেক দেশে একেক রকম পিআর পদ্ধতি দেখা যায়।
পিআর পদ্ধতির ধরন
দলীয় তালিকা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Party List PR System): এক্ষেত্রে গোটা দেশকে একটি আসন বা নির্বাচনী এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রত্যেকটি দল নিজ নিজ প্রার্থী তালিকা দেয়। নির্বাচনে প্রাপ্ত দলীয় ভোটের আনুপাতিক হারে সেই তালিকা থেকে প্রার্থীদের মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়। এটির আবার কয়েকটি ধরণ আছে। যেমনÑ
বদ্ধ তালিকা পদ্ধতি (Closed List System): এ পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি দল তার প্রার্থী তালিকা তৈরি করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। ভোটাররা দলকে ভোট দেন এবং প্রাপ্ত মোট ভোটের আনুপাতিক হারে যে দল যে কয়টা আসন পায়, তার বিপরীতে তাদের তালিকা থেকে ক্রমানুসারে সেই কয়টা আসন দেয়া হয়।
উন্মুক্ত তালিকা পদ্ধতি (Open List System): এ পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি দল তার প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। ভোটাররা দলকে এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীকেও ভোট দেন। এ পদ্ধতিতে ভোটার দল ও প্রার্থী পছন্দে অধিকতর স্বাধীনতা ভোগ করেন।
মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Mixed Member PR System), আধা-আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Semi-PR System) এবং সমান্তরাল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Parallel PR System): এ পদ্ধতিগুলো কিছুটা জটিল এবং এতে অঙ্কের হিসাব রয়েছে। তবে এতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং পিআর পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশের জন্য এ পদ্ধতিগুলো বেশ কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
এছাড়া পিআর পদ্ধতির আরও অনেক ধরণ রয়েছে।
এখন প্রশ্ন ওঠে পিআর দেশের কোন পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। বিভিন্ন দেশে এটা বিভিন্নভাবে করা হয়। তবে বেশিরভাগ দেশে জাতীয় পর্যায়ে এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে এ হিসাব করা হয়।
জাতীয়ভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (National-Level PR System): এ পদ্ধতিতে জাতীয় পর্যায়ে ভোটের অনুপাত নির্ধারণ করা হয় এবং সেই অনুযায়ী আসন বণ্টিত হয়। যেমন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ধরা যাক একটি দল সারা দেশে ৩০% ভোট পেয়েছে। তাহলে সেই দল মোট জাতীয় ৩০০টি আসনের মধ্যে ৯০টি আসন পাবে। সেই দলের প্রার্থী তালিকা থেকে ৯০ জনকে এই আসনগুলো দেয়া হবে। এভাবে অন্যান্য দলগুলোও আনুপাতিক হারে আসন পাবে। এ পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এই যে, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বা রাজধানীকেন্দ্রিক প্রার্থীরা মনোনয়নে প্রাধান্য পেতে পারেন এবং তৃণমূলের প্রার্থীরা অবহেলিত হতে পারেন। কোনো এক বা একাধিক বিশেষ এলাকার প্রার্থীদের প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কাও রয়ে যায়।
অঞ্চলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Region-Level PR System): এ পদ্ধতিতে ভোট ও আসনের অনুপাত নির্ধারণ করা হয় একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ভিত্তি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে জেলা, পূর্বের বৃহত্তর জেলা বা বিভাগ। কেবল জেলা হলে আসন সংখ্যা কম হওয়ার কারণে অনুপাত নির্ধারণ কঠিন হতে পারে। আবার বিভাগ হলে সেটা অনেক বড় হয়ে যায়। সেজন্য পূর্বের প্রত্যেক বড় জেলাকে একটি অঞ্চল বা ইউনিট ধরে অনুপাতের হিসাব করলে সুবিধা হবে। যেমন রাজশাহী অঞ্চল হবে বর্তমান রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ মিলে। এই অঞ্চলে প্রত্যেক দলের মোট প্রাপ্ত ভোট এবং মোট জাতীয় সংসদ আসন সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে সেই দল এ অঞ্চলের কয়টি আসন পাবে। সেই কয়টি আসন ওই দলের প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। এ পদ্ধতিটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক। এতে তৃণমূল এলাকা বা নেতাদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
পিআর পদ্ধতির এরকম আরও কিছু ধরন রয়েছে, স্থানীয়ভাবে সেগুলোর উল্লেখ করা হলো না।
মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি এবং অঞ্চলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি পদ্ধতি দাঁড় করালে সেটি বাংলাদেশের জন্য অধিকতর উপযোগী হবে বলে আমার মনে হয়।
পর্যালোচনা
ওপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, আমাদের দেশে এতদিন যে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে তাতে আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে না এবং এর মধ্য দিয়ে একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ গ্রুপের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে, যা কাম্য নয়। অন্যদিকে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে প্রত্যেক ভোটারের মতামত সমান গুরুত্ব পায়, সুতরাং এটিই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে প্রত্যেকটি জিনিসেরই যেমন ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, দুটি দিক থাকে, পিআর পদ্ধতির ক্ষেত্রেও তেমনই তা সত্য। এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, কোনো একক দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০%-এর বেশি ভোট বা আসন) পাওয়া কঠিন। তখন কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয়। বড় দলগুলো অনেক সময় ছোট ছোট দলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এরকম সরকার অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হতে পারে; এমনকি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে না। তবে বিশ্বের যে ৯০টি দেশে পিআর পদ্ধতি চালু আছে তার খুব কমসংখ্যক দেশেই (ইতালি ও ইসরাইল) এরকম সমস্যা দেখা গিয়েছে। যাই হোক, শুরুর দিকে কিছুটা সমস্যা হতে পারে, কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে গেলে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমোন্নতি হলে এ সমস্যা থাকবে না। বরং এরকম পার্লামেন্ট ও সরকার হলে পরমতসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি ও অংশীদারিত্বের মনোভাব নিয়ে কাজ করার প্রবণতা, অভ্যাস ও সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যা প্রকারান্তরে ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনে সহায়ক হবে। এ পদ্ধতির ফলে ছোট-বড় সকল দল রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে, কোনো একটি দল বা নেতার পক্ষে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। তাছাড়া এ সমস্যা দূর করার জন্য বিভিন্ন দেশে নানারকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেগুলো পর্যালোচনা করে আমরাও সে ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারব।
এ পদ্ধতির আরেকটি বড় সমস্যা হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে। মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং অঞ্চলভিত্তিক পিআর পদ্ধতির সমন্বয় করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এ ব্যাপারে নতুন কোনো হিসাব-নিকাশ করতেও কোনো বাধা নেই, যেমন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এককভাবে বা সামষ্টিকভাবে একটি দল গণ্য করে তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে আসন দেয়া যেতে পারে। পিআর পদ্ধতি চালু রয়েছে বিশ্বের এরকম বিভিন্ন দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম নিয়ম অনুসরণ করা হয়। সেগুলোও যাচাই-বাছাই করে দেখা যেতে পারে।
পিআর পদ্ধতির আরেকটি সংকট হচ্ছে, পুরনো বড় পার্টিগুলোর জনসমর্থনের শতকরা হার যুগ যুগ ধরে প্রায় একই রকম থেকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একই দলের দীর্ঘকাল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান অংশীদার হয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এ সমস্যা দূর করাও বেশ কঠিন। তবে মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং অঞ্চলভিত্তিক পিআর পদ্ধতির সমন্বয় করে এ সমস্যা কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।
পরিশেষে
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে অরাজকতা ও অচলাবস্থা চলে আসছে। ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া এ নির্বাচনী ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ত্রুটির ফল হিসেবে শেষ পর্যন্ত এদেশে ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ঔপনিবেশিক অচলায়তন ভেঙে এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারও তা-ই ছিলÑ সেটা হলো গত ৫৪ বছরে আমাদের রাষ্ট্রের যেখানে যত আবর্জনা, কুটিলতা, ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুরাচার জমেছে সবকিছুর মূলোৎপাটন, সংশোধন ও সংস্কার করা। নির্বাচন ব্যবস্থাও তার বাইরে নয়। বরং এটা এখন সময়ের দাবি। কিছু সমস্যা হতে পারে মনে করে যে-পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল জনগণের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত হয়, সেই পদ্ধতিকে নীতিগতভাবে গ্রহণ না করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না, কোনো বিবেকবান, দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রপন্থী মানুষ বা সংগঠন তা করতে পারে না।
এ নৈতিক বোধ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার এবং সর্বোপরি জনগণের আকাক্সক্ষার প্রেক্ষিতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব সামনে এনেছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এ নিয়ে শেষ পর্যায়ের কাজ করছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশ্নে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি পিআর পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন। বিশেষ করে একটি বড় দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পিআর পদ্ধতির দাবিতে সোচ্চার। পিআর পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু না করে আগের মতোই নির্বাচন করলে সেটা একদিকে যেমন জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে, তেমনই অন্যদিকে দেশের শাসন ও পরিচালনা ব্যবস্থায় সকল জনগণের অংশগ্রহণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজটি বিঘ্নিত হবে এবং নির্বাচন ও সরকার গঠন নিয়ে গত ৫৪ বছর যাবত যে অরাজকতা চলে আসছে তারও কোনো প্রতিকার হবে না, দেশ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যাবে। এটা কাম্য হতে পারে না। তাই জামায়াতে ইসলামীর এই আন্দোলনের প্রতি সকল সচেতন ও দেশপ্রেমিক শক্তির সর্বোচ্চ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করা উচিত।
* নিবন্ধটি রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সেমিনারে জেলা পরিষদ
মিলনায়তনে পঠিত।
লেখক: বিশিষ্ট চিকিৎসক, সাংবাদিক, গবেষক, কথাশিল্পী ও অনুবাদক।