প্যারেন্টিং : আদর্শ অভিভাবকের পরিচয়


২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৬

॥ শাহাদত হোসাইন ॥
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সৎ, সুদক্ষ, দেশপ্রেমিক ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে গড়ে তুলে তাদের সঠিক পথের দিশা দেয়া অভিভাবকদের জন্য একটি কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। আদর্শিক পরিকল্পনায় সন্তান-সন্ততি লালিত-পালিত না হলে আগামীর সূর্যটা ঢেকে যাবে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। মানবজীবনকে সুখ-সমৃদ্ধি ও সফলতার পথে পরিচালনা করার জন্য ইসালামের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সুস্পষ্ট এবং সুনির্ধারিত। হাদীসে এসেছে, “কোনো পিতা-মাতা তার সন্তানকে উত্তম আচার-আচরণ, সৎ চরিত্র ও সুশিক্ষার চেয়ে উত্তম কিছুই শিক্ষা দিতে পারে না।”
মানুষের জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ কুরআনের শাশ্বত নির্দেশনার দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু সেই পরশপাথর সম মূল্যবোধের স্বর্ণসূত্র থেকে সন্তানের জীবনে বাস্তবায়নের দায়িত্বটা বাবা-মায়ের। এ দায়িত্বের পরিধি ও গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা কীভাবে সন্তানকে গড়ে তুলি তার ওপর নির্ভর করে জাতির ভবিষ্যৎ। গুরুত্ববহ এ দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে পিতা-মাতাকে চড়া মূল্য দিতে হয়। এক্ষেত্রে মমতাময়ী মায়ের ভূমিকা আপরিসীম ও এ অনস্বীকার্য।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য সন্তান প্রতিপালন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ওয়াশিংটন পোস্ট ও হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, “মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তানদের সাথে ঘরে থাকতে পারা সন্তানদের মানুষ করার জন্য খুবই ফলদায়ক।”
মুসলমানদের অবশ্যই সুসন্তান গড়ে তোলার গুরুত্ব এবং এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল উপলব্ধি করতে হবে। রাসূল সা.-এর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা পরিণত বয়সে ইসলামের সংস্পর্শে এলেও যেমন আবু বকর রা.-এর বয়স ৩৭ বছর, ওমর রা.-এর, ১৯ উসমাস রা.-এর ৩৬, আর আলী রা.-এর ১২ বছর এবং রাসূল সা.-এর স্ত্রী খাদিজা রা.-এর ছিল ৫৫ বছর। তাদের মৌলিক চারিত্রিক সুষমা শৈশবেই সুগঠিত হয়েছিল। শৈশবে তারা বেড়ে উঠেছিলেন স্বাধীনচেতা, সাহসী ও চির উন্নত মমশির হিসেবে। তারা সমকালীন স্বৈরাচার ও নাফরমান শাসকদের দ্বারা অবদমিত ছিলেন না।
সোনালি যুগের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা লাভ করতো অধিক যোগ্যতাস¤পন্ন, আদর্শিক শিক্ষানুরাগী শিক্ষাগুরুদের কাছে। এ শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল শিশুদের নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশে মৌলিক মানবীয় চর্চায় সদা তৎপর, সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। যারা মুসলিম জাতির অধঃপতনের লাগাম টেনে ধরার নিমিত্তে নিজের শ্রম-সাধনা দিয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য হলোÑ একজন শিশু একই সময়ে সবকিছুতে সেরাদের সেরা হতে পারে না। তবে শৈশব-কৈশোরের সোনালি দিনগুলোয় সন্তানের চরিত্র ও মনন ভূমিতে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তি সুগঠিত হলে তারা বড় হয়ে কখনোই ব্যর্থ হবে না। তারা সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে তাল মিলিয়ে দৃপ্ত দুপায়ে টিকে থাকার প্রাণশক্তি অর্জন করবে।
আপনার পারিবারিক পরিমণ্ডলে দ্বীনচর্চার অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখুন। সেটা বিঘ্নিত হলে সহসা ফিরিয়ে আনুন। ধার্মিকতা ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রকে উৎকর্ষতা এনে দেয়। সন্তানদের মধ্যে ধার্মিকতা, আধুনিকতা ও উন্নত রুচিবোধের বীজ বপন করতে হয় শৈশব-কৈশোর ও তারুণ্যের শুভ সকালে। পিতা মাতার উচিত সন্তানদের ইতিবাচক জীবনাচারে আগ্রহী করে তোলা। মানবতার কল্যাণ ও সরল-সঠিক পুণ্যপথের অভিযাত্রী হিসেবে চলার নিরন্তর অনুপ্রেরণা দেয়া। এটি এমন এক লক্ষ্য, যা সন্তানদের ইহলৌকিক মানমর্যাদা ও অর্থলোভের চেয়ে অল্পতে তুষ্ট থেকে আনন্দময় জীবনযাপনের টেকসই কৌশল পন্থা বাতলে দেবে।
সন্তান প্রতিপালনে গৃহীত পরিকল্পনায় মানবিক, নৈতিক, আদর্শিক ও তামাদ্দুনিক নির্দেশনাকে আলোকবর্তিকা হিসেবে মেনে নেয়াই আদর্শ- চৌকস ও দরদি অভিভাবকের পরিচয়। আপনার সন্তান যত বিনয়ী, তত বিজয়ী হবে। সন্তানের যাবতীয় তৎপরতা যেন তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়; যা পিতা-মাতার দুনিয়া আখিরাতের কল্যাণের জন্যও অপরিহার্য। অভিভাবকের জন্য পৃথিবীতে শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথে মাইলফলক হলো সন্তান প্রতিপালনে সদয় হওয়া।
মানুষ পরকালে নিজের অভাবনীয় মর্যাদা ও আকাশচুম্বী সাফল্য দেখে চমকিত হয়ে বলে উঠবেÑ হে আল্লাহ! এত সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী কীভাবে হলাম? আল্লাহ বলবেন, মৃত্যুর পর তোমার সন্তানরা তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। সে কারণে তুমি এই মর্যাদায় উন্নীত হয়েছ।”
লেখক : সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও ব্যবস্থাপক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, রিয়াজুদ্দীন বাজার উপশাখা, চটগ্রাম।