আ’লীগ : কোনো দিকে পথ নেই, বন্ধ দুয়ার
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৩৩
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
আওয়ামী লীগ কি আসলেই সাধারণ জনগণকেন্দ্রিক একটি ‘জনপ্রিয়’ রাজনৈতিক দল? নাকি বরাবর অন্য দেশের আনুকূল্য লাভে পরিপুষ্ট এবং দেশীয় কিছু সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় লালিত ‘সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী’বিশেষ! বিগত বেশ কয়েকটি একতরফা নির্বাচনেও যেটি প্রমাণিত হয় যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ খুবই সামান্য ভোটের অধিকারী। শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নানা উপায়ে লুটপাটকৃত সম্পদে বলীয়ান হয়ে দেশজুড়ে অসংখ্য বাহিনী তৈরি করে তারা। এসব বাহিনী দিয়ে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার হরণের মাধ্যমে ক্ষমতার সবগুলো কেন্দ্র দখল করে রাখাই ছিল তাদের শক্তির উৎস।
অন্তত বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন এবং কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটের হার তো প্রশ্নবিদ্ধ ছিলই, সেই প্রশ্নবিদ্ধ হারের কত ভাগ আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পেয়েছিল, সেটিও ব্যাপক গবেষণার বিষয়। তারও আগের; যেমন- ১৯৭০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে ভোটই কাস্ট হয় অর্ধেকের কিছু বেশি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে গিয়ে ৮০-৯০ ভাগ ভোট দিয়ে ফেললো- এমন কিছু ঘটতে দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, কাস্টিং ভোটের মধ্যে খুবই মার্জিনে তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজয়ী হতে সমর্থ হয়। সেই ১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগের ‘জোয়ারের কালে’ ভোট পড়েছিল মাত্র ৫৫ শতাংশ। আর ১৯৭৩ সালে ‘মহাজোয়ারে’র সময় ভোট কাস্ট হয় ৫৬ শতাংশেরও কম। ২০০৮ সালের পরে একতরফা নির্বাচনগুলোয়ও ভোটের খরা কাটাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। পরিসংখ্যান জালিয়াতি করে ‘নির্বাচিত’ হওয়ার নিয়তিই যেন স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার প্লাবনভাগ্য তাদের কপালে কখনোই জোটেনি। মিথ্যা, জালিয়াতি, জবরদস্তি, অপকৌশল প্রভৃতি নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রক্রিয়াগুলোই হয়ে যায় তাদের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি।
এরপরের ইতিবৃত্ত বর্তমান প্রজন্মের চোখের সামনে রচিত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ শাসনক্ষমতায় বসে তাদের পরিকল্পনামাফিক সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। এজন্য উচ্চ আদালতের একটি রায় এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করা হয়। এজন্য জনমত যাচাইয়েরও কোনো প্রয়োজন মনে করা হয়নি। সংবিধানে এমন ব্যবস্থা যুক্ত করা হয় যাতে দলীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ এবং বিদ্যমান জাতীয় সংসদের সদস্যদের পদ বহাল রেখে তাদের অধীনস্থ প্রশাসনযন্ত্রের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যায়। এ ব্যবস্থার অধীনেই ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে দশম সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করলে এর প্রতিবাদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করে এবং ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু সরকার যথারীতি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমর্থ হয়। এতে ১৫৩ জন সদস্য বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এক নয়া রেকর্ড তৈরি করে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজেই সরকারি দল এবং তাদের জোটের শরিক জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। অতঃপর ২০১৮ সালের নির্বাচনের নির্ধারিত দিনের আগের রাতেই বিশেষ ব্যবস্থায় বিশেষ প্রতীকের পাশে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা এবং দিনের বেলায় নির্বাচনের মহড়া দেয়া কিংবা ২০২৪ সালে ‘ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি ও বিরোধীদল পয়দা করার অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করা হয়। আর ওই ছিল ‘আওয়ামী জনপ্রিয়তা’র যতসব প্রিয় অপকৌশল।
আওয়ামী জনবল প্রসঙ্গ
উপরের পর্যালোচনা মোতাবেক দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ওপরে ওপরে যতই জনপ্রিয়তার বিপুলতা প্রদর্শন করুক, ভেতরে অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে তাকে নিয়ে আগ্রহ ছিল খুবই কম। তার উপরিতলে রয়েছে পেশাজীবী ও মোড়লগোছের লোকদের আধিপত্যের আবরণ। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আমলাতান্ত্রিক অঙ্গনে সিন্ডিকেটবাজিই হলো তার প্রাণশক্তি। এ সিন্ডিকেটের প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে দলবাজি ও কমিটির প্রাধান্য। যেমন একটি সাংগঠনিক শাখায় যদি এক হাজার দলীয় লোক থেকে থাকে, তাহলে এরা সকলেই কোনো না কোনো কমিটির অন্তর্ভুক্ত থাকে। মূল দলের জেলার প্রধান কমিটির অধীনে একেবারে ওয়ার্ড কমিটি এবং বহুসংখ্যক অঙ্গ সংগঠনের অনুরূপ শাখা কমিটিতে এসব লোক কোনো না কোনো পদ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। এসব পদবিধারীরা হয় একেকজন ‘নেতা’। ফলে দলে আর কোনো কর্মী বা সমর্থক নয়- কেবলই নেতার ভিড় দেখা যায়। এ পদ বা নেতৃত্বই তাদের মূল পুঁজি হয়ে ওঠে। দলে বা সমাজে প্রভাব বিস্তার করা এবং সেই প্রভাব ভাঙিয়ে সুবিধাগুলো দখল করতে বা লুটে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। এ কারণে কমিটি গঠন এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিয়মিত বিবাদ-সংঘাত অনিবার্য হয়ে যায়। এজন্য দেখা যায়, একটি এলাকার জনশক্তি মন্ত্রীর গ্রুপ, এমপির গ্রুপ, মেয়রের গ্রুপ, চেয়ারম্যানের গ্রুপ, সভাপতির গ্রুপ, সেক্রেটারির গ্রুপ প্রভৃতি অসংখ্য ভাগে বিভক্ত থাকে। এই গ্রুপ টিকিয়ে রাখা ও লালন-পালন করার জন্য ব্যবসা, টেন্ডার, নিয়োগ, চোরাকারবার, মাদক, চাঁদা, ইজারা প্রভৃতি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য খাত ও ক্ষেত্রসমূহে কর্তৃৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন পড়ে। আর এ কর্তৃত্বই হচ্ছে দল টিকিয়ে রাখার প্রাণশক্তি। দলের যারা এই গ্রুপ ও কর্তৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ে দলে তার স্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মনোবল প্রসঙ্গ
গত জুলাই-আগস্ট (২০২৪) আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনকালে সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষক বিষয় হলো সরকারবিরোধী অবস্থানে যেভাবে সাধারণ জনতা মাঠে নেমে আসে, সেভাবে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তাদের সমর্থকদের মাঠে দেখা যায়নি। কেবল কিছু দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ছত্রছায়ায় মাঠে মহড়া দেয়। এটি ছিল সরকারের সাধারণ জনসমর্থন মূল্যায়নকারী একটি মাপকাঠি।
এরপর ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে পলাতক নেতাদের উসকানিতে দেশে অবস্থানরত নেতারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। তবে জনসাধারণের ভেতর থেকে প্রশ্রয় ও সাড়া না পেলে তাতে সফল হওয়ার কথা নয়। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে নানামুখী উসকানি ও গুজব ছড়িয়ে একদিকে অভ্যন্তরে থাকা আওয়ামী জনবলকে চাঙ্গা করে রাখার চেষ্টা চলে এবং অন্যদিকে সামনের বিচারগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় তারা। দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী দুঃশাসনের আমলে অন্যরা কথা বলতে না পারলেও এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি অংশ ইস্যু তৈরি করতে উসকে দিচ্ছে। অপরদিকে ভারতও শেখ হাসিনার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে। তারা আওয়ামী আমলে বাগিয়ে নেয়া সুবিধাগুলো পুনবর্হাল করতে চাচ্ছে।
৫ আগস্টের পরপর কিছুদিন হাসিনাপুত্র জয়কে দিয়ে কিছু প্ররোচনামূলক বক্তব্য প্রচার করা হয়। কিন্তু সেগুলো হালে পানি পায়নি। এমনকি ভুয়া ফোনকল ও বানানো ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়। তবে শেষ অবধি সেগুলোর কোনোটি যে হালে পানি পায়নি সেটিও সময়ের ব্যবধানে পরিস্কার হয়ে যায়। তবে এখন আহাজারি শুরু হয়েছে, ‘মোদিজি এবং ভারত তাদের জন্য কিছু করুক।’
ভারত-ভরসা
যদিও সূত্র অনুযায়ী, প্রতিবেশীদের পরিকল্পনা ও প্রকল্প তৈরির বিষয়টির ইতি-সমাপ্তি ঘটেনি। ইতোপূর্বে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ আবার কীভাবে ফিরে আসতে পারে, তা নিয়ে পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনাও হয় বলে দাবি করা হয়। এতে ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরা অংশ নেন বলে জানানো হয় খবরে। বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, ‘বাংলাদেশে চলমান ভারতীয় প্রকল্প ও রি-সেটেল আওয়ামী লীগ’ (আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন)। বৈঠকে বাংলাদেশে চলমান ভারতীয় প্রকল্পগুলোর সঠিক ও বাধাহীন বাস্তবায়নের ওপর ব্যাপক জোর দিতে বলা হয়। পাশাপাশি ভারতের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যকার হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো (এমওইউ) পুনর্বিবেচনা করা হলেও সম্পাদিত চুক্তিগুলো থেকে বর্তমান সরকার যেন সরে না যায়, সেটি নিশ্চিত করার তাগিদ দেয়া হয়। ২০ সেপ্টেম্বর (২০২৪) অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের ‘মিনিটস অব দ্য মিটিং’ এর ভিত্তিতে এ নিয়ে খবর প্রকাশ করে জার্মানির বনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য মিরর এশিয়া।
অপর একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর হলো, হাসিনাকে নিয়ে ভারত এখন এক উভয় সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশ তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। এখন ভারত এ অনুরোধ গ্রহণ করলেও বিপদ, আর প্রত্যাখ্যান করলেও বিপদ। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ নামক অনলাইন পত্রিকায় ‘দ্য কমপ্লেক্স রোড টু এক্সট্রাডিশন: উইল ইন্ডিয়া এগ্রি টু সেন্ড শেখ হাসিনা ব্যাক টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ডকুমেন্ট পাঠিয়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার অনুরোধ করে। এর আগে ডিসেম্বর মাসে একটি নোট ভারবাল পাঠানো হলেও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। নয়াদিল্লি তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘রিজার্ভ’ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো মন্তব্য থেকে বিরত রয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতা ও জনশক্তি কতদিন পর্যন্ত কতটা মনোবল ধরে রাখতে পারবে, সে প্রশ্ন রয়েছে। টিকে থাকতে চাইলে তাদের হাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো- ১. জনবলের মনোবল ধরে রাখা, ২. বিপুল জনরোষের মুখে রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠে বিচরণের সক্ষমতা ফিরে পাওয়া, ৩. ব্যাপকভিত্তিক আইনি লড়াইয়ের মোকাবিলা করে শাস্তি এড়ানো, ৪. অতঃপর ক্ষমতা থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে বিপুল গণহত্যা আর অসংখ্য মানুষকে আহত আর চিরতরে পঙ্গু করে দেয়ার বিষয়গুলো এড়িয়ে জাতির সামনে কী বয়ান হাজির করবে, সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে। এমন ধরনের অসংখ্য বিষয় ও ইস্যুর ওপর তাদেরকে অবিরাম জবাবদিহি করতে হবে।
এমন বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের আলোকে বর্তমান জনবলের মনোবল কি সেই সক্ষমতা আগামী দিনগুলোয় অর্জন করতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো আওয়ামী লীগের নেতারও সংকট দেখা দিচ্ছে। আহ্, কী দুর্গতি! আহ্, কী পরিণতি! তাদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। বন্ধ সব দুয়ার।