শৃঙ্খলা না ফেরায় সড়কে কমছে না যানজট
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫০
দৈনিক আর্থিক ক্ষতি ১৩৯ কোটি টাকা
বিদ্যমান ট্রাফিক আইন মানছে না কেউ, কঠোর প্রয়োগও নেই
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। ওইদিন আব্দুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চলাচলকারী জাবালে নূর পরিবহন লিমিটেডের দুটি বাস বেপরোয়া প্রতিযোগিতা করে। বাস দুটির প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারান রাস্তায় অপেক্ষায় থাকা দুই শিক্ষার্থী। নিহতদের একজন ওই কলেজেরই দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজীব এবং অপরজন একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম। ওই ঘটনায় আহত হয়েছিল আরও অন্তত ১০ জন। বেপরোয়া চালকদের গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে সহপাঠীর প্রাণহানির ঘটনায় শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। একইসঙ্গে সড়কে কীভাবে শৃঙ্খলা ফেরাতে হয়, তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তারা। পুরো ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা কন্ট্রোল করে দেখানোর পাশাপাশি সড়কে যানজট কীভাবে কমাতে হয়, উল্টোপথে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলে তাদের কীভাবে ফেরাতে হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ঘরে পড়ার টেবিলে ফিরলে সেই আগের অবস্থায়ই ফিরে ট্রাফিক বিভাগ।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ঢাকার সাইবোর্ড থেকে সাভার পর্যন্ত চলাচল করা ‘লাব্বাইক’ পরিবহনের বাসের সহকারী জুনায়েদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়, তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এই রুটে একটি ‘ট্রিপ’ দিতে কত সময় লাগে, জবাবে তিনি জানান, তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এই রুটের দূরত্ব মাত্র সাতাশ কিলোমিটার। ঘণ্টা ত্রিশ কিলোমিটার স্পিডে চললেও এক ঘণ্টা সময় লাগার কথা নয়, কিন্তু যানজটের কারণে এত বেশি সময় লাগছে বলে জানালেন তিনি। প্রায় একই অবস্থা ঢাকার সব সড়কের। রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ পর্যন্ত সময় জট লেগেই থাকে। মানুষ চাইলেও সঠিক সময় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। গুলিস্তান থেকে গাজীপুর পরিবহনের একটি বাসের হেলপার আবদুল মতিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার এই রুটে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। তাও আবার এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করার পর। এই রুটের দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার। এর চিত্র ঢাকার ভেতরে এবং আশপাশের জেলায় আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে।
দেশের সড়কে; বিশেষ করে রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলার অনেকগুলো কারণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- রাজধানীর মূল ও ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতে অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। ফলে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মূল সড়কেই হাঁটছেন। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনাও। পাশাপাশি ঢাকার সড়কে অবৈধ পার্কিং গড়ে তোলা হয়েছে, রাস্তার উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে আছে এই অবৈধ পার্কিং। ফলে রাস্তার মূল্য অংশের ব্যবহার কম হচ্ছে। ঢাকার সড়কের দুঃখ হচ্ছে প্রায় সব সড়কেই চলছে উল্টোপথে গাড়ি, এই উল্টো পথে গাড়ি চালানো ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেউ। দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য, কিন্তু এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারীরা যখন যে সরকার থাকে, তাদের সঙ্গে আঁতাত করে সড়কে চালাচ্ছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এর সঙ্গে রয়েছে অদক্ষ চালক এবং কোনো কোনো চালক অস্বাভাবিক মানসিকতারও রয়েছে, আর এরাই আইন না মেনে বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছে। তাছাড়া বিদ্যমান ট্রাফিক আইনও মানছে না কেউ, আইনের কঠোর প্রয়োগও নেই, ফলে চালকরা ভয় পাচ্ছে না।
যানজটে নষ্ট দৈনিক ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা, দেশের আর্থিক ক্ষতি ১৩৯ কোটি টাকা
ঢাকায় যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে দৈনিক প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক। সম্প্রতি যানজট নিরসন বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা এ তথ্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, ২০০৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে চার দশমিক আট কিলোমিটারে। যানজটের এই সমস্যার জন্য শৃঙ্খলা না মেনে গাড়ি চালানো, রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে মেগা প্রকল্পগুলোর কালক্ষেপণ, ব্যক্তিগত গাড়ি নির্ভর পরিকল্পনা, দুর্বল ট্রাফিক সিগন্যাল ও মনিটরিং ব্যবস্থা, যানবাহন নিবন্ধনে অব্যবস্থাপনা, সার্বিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক পদ্ধতির অভাবসহ বেশকিছু কারণ দায়ী। এ বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান করা গেলে সড়কে ফিরতে পারে গতি ও শৃঙ্খলা।
রাজধানীর মূল ও ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতে অবৈধ দোকান
পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য রাজধানীর সড়কগুলোর গা-ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে ফুটপাত। সেই ফুটপাত আছে ঠিকই কিন্তু পথচারীরা চলাচল করতে পারছেন না। কারণ ফুটপাত এখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দখলে। রাজধানীর মিরপুর, কল্যাণপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, নিউমার্কেট, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, বাড্ডা লিংক রোডসহ বেশিরভাগ এলাকার অধিকাংশ ফুটপাতই দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছে। অধিকাংশ ফুটপাতে চায়ের দোকান, জামা-কাপড়সহ জুতা-স্যান্ডেলের দোকান রয়েছে। কোথাও কোথাও ফুটপাত রেখে প্রধান সড়কগুলোয়ও দোকান সাজিয়ে বসেছে অনেকে। ফলে সড়কগুলো সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সেখানেও হাঁটার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে তাদের। ফুটপাত অবৈধ দখলদারমুক্ত করতে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়, কিন্তু অভিযান শেষ হতে না হতেই আবারও দোকান সাজিয়ে বসতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা হাসিবা খানের ভাষ্য, ফুটপাত দখলমুক্ত করা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। আমাদের এখানে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট আছেন। তারাই এই কাজগুলো পরিচালনা করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতারা এসব অবৈধ দখলদারদের সুযোগ করে দেন। আর আমরা স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে এদের উচ্ছেদ করি। এটা তো আসলে ইঁদুর-বিড়াল খেলা হচ্ছে।
ঢাকার সড়কে অবৈধ পার্কিং, রাস্তার উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে থাকছে গাড়ি
রাজধানীর অবৈধ পাকিংয়ের প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল। সপ্তাহের রোববার থেকে বৃহস্পতিবার এই পাঁচদিন যে কেউ মতিঝিলের বক চত্বরে দৃষ্টি দিলে দেখো যাবে প্রায় ৬০ ফুট প্রশস্ত এই সড়কের ব্যবহার করা যাচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ ফুট। দুই পাশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টাফবাহী বাস, মাইক্রোবাস এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির অবাধ পার্কিং। এর সঙ্গে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ দোকান। এই সড়কে চলাচলকারীরা বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই সড়ক ব্যবহারকারীরা সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ছে। কারণ অফিস সময়ে কর্মীদের নামিয়ে দেওয়ার পর গাড়িগুলো দিনভর রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে একদিকে যানজট; অন্যদিকে পথচারীদের হাঁটার জায়গাও এখানে নেই বললেই চলে।
মতিঝিলের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে রিকশা নিয়ে এই সড়কে ঢুকলেই জ্যামে আটকে পড়তে হয়। যানবাহন ঢুকতে না পারলেও গাড়ি পার্কিংয়ে জায়গা দখলে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সড়কে চলবে গাড়ি, এখানে করা হচ্ছে পার্কিং। বাসা থেকে বের হলে মনে হয়, কোনো টার্মিনালে আছি। ভুক্তভোগীরা বলছে, একদিকে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং; অন্যদিকে অবৈধ দোকান, সব মিলিয়ে সড়কটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের মতিঝিল জোনের এক কর্মকর্তা জানান, এলাকায় অফিসের কারণে গাড়ির চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। নির্দিষ্ট পার্কিং না থাকায় চালকরা বাধ্য হয়ে সড়কেই গাড়ি রাখছেন। তবে নিয়মিতভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।
প্রায় সব সড়কেই চলছে উল্টোপথে গাড়ি, ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেই
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত (ঢাকা-চট্টগ্রাম) মহাসড়কে উল্টোপথে গাড়ি চলা অনেকটই বৈধ। কেউ কিছু বলছেন না, যে যার ইচ্ছামতো, যেভাবে ইচ্ছা উল্টোপথে গাড়ি চালাচ্ছেন। শুধু রিকশা বা আটোরিকশা নয়, বাস ও ট্রাকও চলছে উল্টোপথে। এতে যেমন জ্যাম বেশি লাগে, তেমনি প্রতিদিনই ঘটে দুর্ঘটনা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকাগুলোয় রিকশা আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো বেপরোয়া, সড়ক সোজা নাকি উল্টো, সেদিকে যেন ভ্রুক্ষেপ নেই কারো; না যাত্রী, না চালকের। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সামনে দিয়ে উল্টোপথে চলাচল যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে সঠিক পথে আসা অনেক যানবাহনের চালক ক্ষণিকের জন্য হলেও ধমকে যেতে পারেন। যে কেউ দাঁড়ালে হয়তো ভেবে নিতে পারেন, সঠিক পথে আসা যানবাহনটাই উল্টোপথে আসছে। এমন চিত্র রাজধানীর প্রায় সব সড়কেই।
ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই
সড়কে চলা অনেক বাসের ফিটনেস নেই। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে তাজাপ্রাণ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী-২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫৯ হাজার ৫৯৭ জন। এর মধ্যে শুধু ২০২৪ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজার ১৯ জন। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহন ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে ফিটনেস সনদ থাকা বাধ্যতামূলক যানবাহনের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। ফিটনেসবিহীন এবং পুরোনো হয়ে যাওয়া যানবাহনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা এলেও তা সফলতার মুখ দেখে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালকের অসুস্থতা, অবসাদ, ক্লান্তি ও যানবাহনের ফিটনেস না থাকা। এছাড়া বেশিরভাগ গাড়িতে সেফ সিস্টেম এপ্রোচ না থাকায় দুর্ঘটনায় বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, আমাদের দেশের গাড়িচালকদের অর্ধেকের বেশি অসুস্থ। তাদের কারও স্বল্প দৃষ্টি, হাইব্লাডসুগার আবার কেউ উচ্চরক্তচাপ সমস্যায় ভুগছেন। অন্যদিকে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখের বেশি। লক্কড়ঝক্কড় ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে পরিত্রাণের উপায় মিলছে না। বিআরটিএ’র তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত মোটরযান ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে গণপরিবহন হিসাবে ব্যবহৃত বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলারের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ৬৬৮টি। দেশজুড়ে ব্যবহৃত এসব গণপরিবহনের অধিকাংশেরই নেই হালনাগাদ ফিটনেস সনদ। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিটনেসবিহীন এসব গণপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল করায় ঝুঁকিতে পড়ছে যাত্রী নিরাপত্তা। দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়কে বিশৃঙ্খলা-যানজটের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে এসব গণপরিবহন।
অদক্ষ ও অস্বাভাবিক মানসিকতার লোকেরা লোকাল বাসের চালক
দেশের সড়কে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ ও নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং করার প্রবণতা বৃদ্ধির ফলে সড়ক দুর্ঘটনা আরও বাড়ছে। এসব অদক্ষ ও দায়ী চালকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি না হওয়ায় সড়ক-মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর পঙ্গু হচ্ছে হাজারো মানুষ। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ মতে, ১৮ বছর বয়স না হলে পাবলিক প্লেসে কেউ মোটরযান চালাতে পারবে না। পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে ন্যূনতম ২২ বছর। পেশাদার চালকদের অবশ্যই মালিকদের কাছ থেকে নিয়োগপত্র নিতে হবে। বেপরোয়া গতি ও মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো যাবে না। তবে যানবাহন-সংক্রান্ত এ আইন থাকলেও তার প্রয়োগ চোখে পড়ে না। যানবাহন চালকদের এক বড় অংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। তাছাড়া শারীরিকভাবে গাড়ি চালানোয় সক্ষম নন, এমন চালকও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারভাবে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নিয়োগপত্রের বালাই নেই। নিয়োগপত্র থাকার আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কেও জানেন না অনেক চালক। আর পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোও তার তোয়াক্কা করে না।
বিদ্যমান ট্রাফিক আইন মানছে না কেউ, কঠোর প্রয়োগও নেই
শৃঙ্খল সড়কের জন্য নির্ধারিত ট্রাফিক আইন মানা অত্যন্ত জরুরি। অথচ অনেকে আইন জানেই না, অনেকে ইচ্ছে করেই মানে না। রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস বা জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করতে পথচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হলে তারা তা মানছে না। যে যেভাবে খুশি পথ চলছেন। গণপরিবহনের যাত্রীরা যেকোনো স্থানেই ওঠানামা করছেন। নির্দিষ্ট বাসস্টপে না নেমে সুবিধা মতো জায়গায় নামছেন। আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়িতেও উঠে পড়ছেন। ট্রাফিক নিয়মে স্পষ্ট বলা রয়েছে, চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা থেকে বিরত থাকুন। নির্ধারিত স্থান থেকেই বাসে ওঠা আর নির্ধারিত স্থানেই নেমে গেলে সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমে যাবে। রাস্তা পারাপারের সময় অনেকেই মোবাইল ফোনে কথা বলেন। আবার ইয়ারফোনে গান শোনেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তা পারাপারের সময় দুই পাশের গাড়ির দিকে নজর রাখা জরুরি। শহরের রাস্তায় চলা অধিকাংশ গাড়ির চালকদেরই সিট বেল্ট পরায় অনীহা থাকে। অথচ আইন অনুযায়ী, চালক ও চালকের পাশের সিটে কেউ বসলে উভয়কেই সিটবেল্ট বাঁধতে হবে। সাইকেল বা মোটরসাইকেলচালকরা হেলমেট ব্যবহার করতেও অনীহা দেখান। আবার আরোহীদের বেশিরভাগই হেলমেট ছাড়াই মোটরসাইকেলে চড়েন। অথচ নিজের নিরাপত্তার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। হেলমেট, চালক ও আরোহী দুজনকেই হেলমেট পরতে হবে। এছাড়া একটি মোটরসাইকেলে ৩ জন উঠাও অপরাধ। এটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এভাবে যত ট্রাফিক আইন রয়েছে কেউ তা ঠিকভাবে মানছেন না।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন সংস্কার ও আইনের প্রয়োগ জরুরি
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন আইন আরও যুগোপযোগী করার দাবি সংশ্লিষ্টদের। ২০১১ সালে মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশফাক মুনীর মিশুকসহ তাঁদের তিন সহকর্মী; যে মামলায় বাসচালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি চলমান রয়েছে উচ্চ আদালতে। এরপর ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে প্রথমে মাঠে নামেন ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। পরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র বদলায়নি। এখন ভুক্তভোগীদের দাবি নতুন আইনকে সময় উপযোগী ও আইনের প্রয়োগ করতে হবে।